অতিরঞ্জিত ‘মা’ রোল সামাজিক এবং আরোপিত

Print

‘মায়ের এক ধার দুধের দাম, কাটিয়া গায়ের চাম’ – এধরনের অনেক অনেক কথা দিয়ে মায়ের রোলকে অতিরঞ্জন করা হয়। অতিরঞ্জিত ‘মা’রোল সামাজিক এবং আরোপিত। এ আরোপিত মাহাত্মপূর্ণ ‘রোল’ এ সাজেশন নিহিত। এ রোল তাদের জন্য এভাবে তৈরি করা হয়।
মা হওয়া জৈবিক প্রক্রিয়ার অংশ। নারীর শরীরের এ ফাংশনের কারনেই সে সন্তান ধারন করে। শুক্রাণু আর ডিম্বানুর যৌথ প্রযোজনায়ই প্রাণের সঞ্চার হয় নারীর ওম্বে। নয় মাস সেখানে সন্তান বড় হয়। প্রসব ঘটে। স্তন্য দানও এ প্রসেসের অংশ। সন্তানের জন্মের ২৪ ঘণ্টার ভেতর শিশু মাতৃদুগ্ধ পান করতে শেখে। এর কোনটাই মা এড়াতে পারেনা। মায়ের শারীরিক উপস্থিতি বা সন্তানের উপস্থিতি মায়ের শরীরে এ প্রসেসে একটি দৃশ্যমান ভুমিকা রাখে। গর্ভধারণের সার্বিক প্রসেসটি মায়ের শরীরে এবং তার শরীর সেভাবে তৈরি। তার স্তন থেকে ন্যাচারালভাবেই দুধ ঝরতে থাকে। শিশুর পানের মাধ্যমে সে নিঃস্বরণ বৃদ্ধি পেতে থাকে। এটি একটি জৈবিক প্রক্রিয়া। এ প্রসেসের ভেতর মা এবং সন্তান দুজনের একটি নিবিড় সম্পর্ক স্থাপিত হতে থাকে এবং দুজনই তাদের নৈকট্য উপভোগ করে।
এ প্রসেসে আর একজন মানুষ থাকে তিনি সন্তানের বাবা। মনে রাখা দরকার সন্তানের জন্য বাবা এবং মা দুজনই সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। শুনে অবাক হবার কারন নেই যে, গবেষণায় দেখা গেছে, শিশুর জন্মের মাত্র দু সপ্তাহের ভেতর সে বাবাকে ‘বাবা’ বলেই চিনে ফেলে। বাবা কাজে গেলে সে বাবাকে খুঁজতে পারে এবং মিস করে। পশ্চিমের অনেক দেশে জন্মের সময় বাবাকে লেবাররুমে পুরোটা সময় রাখা হয়। লেবার পেইন এবং শিশুর জন্মের পুরো প্রসেসে বাবা অংশগ্রহণ করে। অনেক বাবাই সন্তানের নাভি থেকে নাড়িটি কাটেন। জন্মের সাথে সাথে মিডওয়াইফ বাচ্চাটিকে মায়ের বুকে শুইয়ে দেয়। এর মাধ্যমে মায়ের গর্ভের গরম থেকে পৃথিবীতে প্রবেশের পর যে ট্রমা ও একাকীত্ব সে অনুভব করে সেটাকে দুরিভুত করার চেষ্টা করা হয়। সে মায়ের বুকে মায়ের গন্ধ বুঝতে সক্ষম হয়। এর পর বাচ্চাকে তার বাবার বুকের উপর শুইয়ে দেওয়া হয়। সে বাবার গায়ের গন্ধ চিনতে শেখে এভাবে। গবেষণা বলে, একটি শিশু জন্মের পর থেকেই সমানভাবে বাবা এবং মাকে নিড করে, মিস করে। শিশু তার বাবাকে খুঁজে।
এরপর যেটা ঘটে বাবা এবং মায়ের রোলকে সামাজিকরণ করা হয়। তাকে স্টারাকচার করা হয় সামাজিকভাবে। সেটি জৈবিক নয়। সামাজিক।
ধরে নেওয়া হয় মাকেই সন্তানের বেশী দরকার। বাবার দরকার সেভাবে নেই। বিষয়টির সেটি নয়। জন্মের পর কিছু কারনে হয়ত মায়ের ভূমিকা বেশী থাকে। যেমন স্তন্যদান। কিন্তু পশ্চিমে অনেক বাবা এবং মা জন্মের পর একসাথে ছুটিতে থাকতে পারেন। এমন ছুটির সময়কাল সুইডেনে ৪০ দিন। এরপর বাবা এবং মা প্যাটারনাল লিভ ভাগ করে নেন। একটি তিন মাসের শিশুকে বাবা দিব্যি চমৎকারভাবে মানুষ করছে। সে বাচ্চা মার অভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছে এমন কোন বৈজ্ঞানিক প্রুফ এরা খুঁজে পায়নি। এমন কোন ঘটনাও ঘটেনি।
আমাদের সমাজ বাবার রোল দূরত্ব দিয়ে তৈরি করে। বাবাদের সন্তানের প্রতি অভিব্যক্তিতেও পার্থক্য দেখা যায়। বাবারা মায়েদের মত আবেগ প্রদর্শন করবেনা যা তাদের পুরুষরোলকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। সন্তান পরিচর্যার ক্ষেত্রেও দেখা যায়, সন্তানের পরিচ্ছন্নতা থেকে শুরু করে সবকিছু মা বা ঘরের অন্য নারীরা করবে। তারা বাচ্চাকে সুন্দর করে তৈরি করে দেবে। বাবা তাকে কোলে করবে বা সামান্য বড় হলে হাত ধরে বাইরে যাবে। দোকানে গিয়ে মিষ্টি কিনে দেবে। বাবাকে এমন রোলে দেখেই সন্তান বড় হয়। এভাবে সে নিজেও সে রোল নিজের ভেতর রচনা করে ফেলে।
বাস্তব হলো, সন্তানের জীবনে বাবা এবং মা উভয়ের রোল দরকারি। একজনের ভূমিকা আর একজন পূরণ করতে পারেনা। বাবা এবং মা উভয়ের ইমোশনাল টাচ সন্তানের জন্য জরুরী।
আমাদের আধুনিক জীবনে দাম্পত্য সম্পর্ক চিরস্থায়ী কোন ব্যবস্থা নয়। এখানে বিচ্ছেদ অনেক বেশী এক বাস্তবতা। ‘সুখী বিবাহ বিচ্ছেদ’ বলে কিছু নেই হয়ত বেশীরভাগ ক্ষেত্রে তবে যুক্তি ও বুদ্ধিবৃত্তি দিয়ে বিবাহ বিচ্ছেদকে অনেক বেশী সহজ করে তোলা যায়। বিশেষ করে যদি সন্তান থাকে। সন্তানকে নিজেদের কনফ্লিক্টের পার্ট না করে সন্তানের কাছে বিচ্ছেদকে সম্মানিত এবং ক্লেশ্মুক্ত রাখতে পারেন বাবা মা ই শুধু তাদের সন্তানের অধিকারকে অগ্রগণ্য হিসেবে দেখতে পারার ক্ষমতা দিয়ে। সন্তান ভিন্ন রূপরেখায় বাবা মাকে ভালবাসতে পারে। সম্মান রাখতে সক্ষম হয়। বিচ্ছেদকেও অনেক পেইনফ্রিভাবে দেখতে পারে। আর তার জন্য বাবা ও মায়ের রোল বিষয়ে ধারনাকে শার্প করতে হবে। স্বীকার করতে হবে সন্তানের জীবনে বাবা এবং মা উভয়ের রোল সমান। একজনের রোল অন্যজনের জন্য থেকে কম নয়।
মাকে প্রয়োজনের বেশী মাত্রায় ভুমিকায়িত করার পেছনে থাকে সামাজিক ষড়যন্ত্র। নারীকে তার স্বকীয় স্বত্বার থেকে সম্পর্কায়িত করে তাকে সীমাবদ্ধ করা হয়। তার সকল দোষে গুনে গড়া স্বত্বাকে গৌণ করা হয়। একজন নারীর নিজের ইন্ডিভিজুয়াল আইডেন্টিটির থেকে তাকে ভূষিত করা হয় বিভিন্ন রোলে। মা স্ত্রী ভগ্নি ইত্যাদি আদর্শায়িত রোলে তাকে এমনভাবে মহিমান্বিত করে তোলা হয় যে এ ‘রোলে’ বাইরে তার আর কোন স্বত্বা আছে, পরিচয় আছে তিনি আর নিজেও মনে করতে পারেননা।। এ রোলগুলোতে তাকে কিভাবে অ্যাক্ট করতে হবে সেটিও নির্ধারন করে দেওয়া হয়। আর এগুলো নির্ধারণ করা হয় রোলগুলো ডিফাইন করার মাধ্যমে।
মা সারাজীবন চোখের জল ফেলা কোন করুন প্রাণী নয়। এ রোল তার জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে। তিনি কেবল সে রোলটি প্লে করে যান। এ ডিজাইন সামাজিকভাবে তার মস্তিষ্কে এবং তার সারা যাপিত জীবনে রোপণ করা। আরোপ করা হয়। এর বাইরে কিছু ভাবা বা করা অর্থ ‘খারাপ’ মা। মা মানেই চোখের সামনে ভেসে উঠবে একটি রূপ যিনি কেবল দিয়েই যান। নিজের জন্য ভাবেননা। দিতে দিতে তিনি নিঃস্ব হয়ে যাবেন কিন্তু আজীবন থাকবেন মা।
এটি কোনভাবেই একটি আদর্শ রোল হতে পারেনা। মাকে একজন ইন্ডিভিজিউয়াল হয়ে উঠতে হবে । তার জীবনের দেনা পাওনা বুঝে নিতে হবে। তাকে ভাল মন্দ মিলিয়ে একজন মানুষ হিসেবে দেখতে শিখতে হবে। মাও ভিন্ন। এক মা আরেক মা থেকে আলাদা। তার ব্যক্তিত্ব এবং ইন্ডিভিজুয়াল স্বত্বা হিসেদে আলাদা হবার রাইট রয়েছে এবং সেজন্য তিনি ‘খারাপ’মা এমন ভাবনা থেকে মাকে মুক্ত করতে হবে।
তিনি একজন মানুষ। ভাল এবং মন্দের সমষ্টি। অতিরিক্ত মহানুভতা মা চরিত্রে আরোপ করে তাকে ভারাক্রান্ত করবেননা। মা কোন রোল নয়। মা একটি প্যারেন্টাল স্বত্বা। ঠিক যেমন বাবাও একটি প্যারেন্টাল স্বত্বা। কেউ কমও নয়। কেউ বেশি নয়।

[ প্রিয় পাঠক, আপনিও বিডিসারাদিন24 ডট কম অনলাইনের অংশ হয়ে উঠুন। লাইফস্টাইল, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, রান্নার রেসিপি, ফ্যাশন-রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন- bdsaradin24@gmail.com-এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে। নারীকন্ঠ এবং মত-দ্বিমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে  bdsaradin24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরণের দায় গ্রহণ করে না। ]

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 119 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ
bdsaradin24.com