আমরা বেশি সৎ হতে গিয়ে আমাদের হাঁস-মুরগিকে দানাপানি বন্ধ করে দিয়ে মেরে ফেলব, না কি হাঁস মুরগিকে খাইয়ে মোটা তাজা করে দানাপানির দাম শোধ করব?


সম্প্রতি একটি সুপরিচিত অনলাইন পোর্টালের একটা প্রতিবেদন প্রকাশের পর বাংলায় অনুবাদ করা বইয়ের মূল লেখককে যথাযথভাবে রয়্যালটি শোধ করা হচ্ছে কি না, কপিরাইট আইন সঠিকভাবে মানা হচ্ছে কি না—সে প্রশ্নগুলো আবার সামনে এসেছে। যথারীতি বাংলাভাষী পড়ুয়ারা দুই শিবিরে বিভক্ত হয়ে গিয়েছেন, রয়্যালটি-কপিরাইটের পক্ষে আর বিপক্ষে। বাংলাদেশের সবচেয়ে দক্ষ, অভিজ্ঞ আর খ্যাতিমান অনুবাদকেরাও স্বীকার করেছেন, তাদের অনুবাদ করা সব বইয়ের মূল লেখককে রয়্যালটি, কপিরাইট দেওয়া হয় নাই, এবং বর্তমান বাস্তবতা অনুযায়ী সেটা সম্ভবও না। অপরদিকে নীতিজ্ঞান আর নীতিবোধসম্পন্ন পাঠকেরা মুল লেখককে তাঁর প্রাপ্য না দিয়ে অনুবাদ করাকে অনৈতিক, অন্যায় হিসাবে চিহ্নিত করা ছাড়াও এ কাজকে তস্করবৃত্তির সামিল বলে দাবি করতেছেন।

বর্তমান বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের দেশের অনুবাদ বইয়ের বাজার মূল লেখকের রয়্যালটি প্রদান করা কতটা বাস্তবসম্মত, এখনই যথাযথ রয়্যালটি প্রদান আমাদের বইয়ের বাজারে কতটুকু লাভ ক্ষতি বয়ে আনবে, সে প্রশ্নগুলোর যথাসম্ভব নিরাবেগ, বাস্ততসম্মত জবাব খোঁজার চেষ্টা করি। প্রথমেই একটা প্রশ্ন : আমরা কেন টরেন্ট, লিবজেন, পাইরেটেড সফটওয়ার, বিদেশি বইয়ের ফটোকপি, পিডিএফ ইত্যাদি ব্যবহার করতে বাধ্য হই? কারণ আমাদের অর্থনীতি যতই “মধ্যম আয়ের দেশ” হোক না কেন, পয়সা দিয়ে মেধাস্বত্ব কিনে প্রথম বিশ্বের কোনো পণ্য ব্যবহার করার অবস্থা আমাদের নাই। নামে মধ্যম আয়ের দেশ, কিন্তু সরকারি অফিসের প্রত্যেকটা পিসি পাইরেটেড উইন্ডোজ, মাইক্রোসফট অফিসে চলে, স্বয়ং সরকারের পক্ষেও প্রতিটা পিসিতে অরিজিন্যাল সফটওয়ার ব্যবহার করার সামর্থ্য নাই। মেধাস্বত্ব মূল্য দিয়ে ব্যবহার করতে হলে আমাদের দুইটা অপশন আছে; হয় ওপেনসোর্স ব্যবহার করে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে কাজ করা, অথবা সব কাজ বন্ধ করে ১০০ বছর পিছিয়ে থাকা।

প্রথম বিশ্বের প্রত্যেকটা মেধাভিত্তিক পণ্য এমন উচ্চ মূল্যে পেটেন্ট করা, আমাদের দেশের সম্পূর্ণ বাজেট অরিজিন্যাল প্রোডাক্ট কিনতে ব্যয় করলেও দেশের চাহিদা অনুযায়ী মেধাভিত্তিক পণ্য দেওয়া অসম্ভব। একটা গ্রাফিক্স সফটওয়ারের দাম কয়েক হাজার ডলার, সেই সফটওয়ার আমাদের দেশের অলিতে গলিতে ব্যবহার করে লক্ষ লক্ষ মানুষ মগ, টিশার্ট, পোস্টার, কার্ড, ফোটোগ্রাফি এডিট করে দুইটা ভাত খেতে পারছে।

এবারে সম্পুরক প্রশ্ন, কেন মাইক্রোসফট, এডোবি, থ্রিডি স্টুডিও ম্যার্ক্স, হার্পার কলিনস, জন উইলি, পিয়ার্সন, ম্যাকগ্র হিল, পেঙ্গুইন, পেলিক্যান পাইরেসির স্বর্গরাজ্য বাংলাদেশে এসে ক্ষতিপুরণ মামলা করতেছে না? কারণ তারা হিসাব করেই দেখেছে, এই অর্থনীতি তাদের মেধাস্বত্বের মূল্য দিতে পারবে না। ১৭ কোটি মানুষের দেশ, কিন্তু এ সব বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান জানে এ দেশের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা এতই কম যে এখানে একটা ছোট অফিস রাখাও পুরা লস প্রজেক্ট। যতদিন এ বাজার বড় না হয়, আমাদের ক্রয়ক্ষমতা না বাড়ে, তাদের আমাদের নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নাই।

এই কারণেই সব বড় বড় ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশে ওষুধ নির্মাণের পেটেন্টে একটা সময় পর্যন্ত ছাড় দিয়ে রেখেছে, তাই আমরা কয়েক শ ডলার দামের সর্বাধুনিক অ্যান্টিবায়োটিক কয়েক শ টাকায় কিনে খাই। একইভাবে বড় পাঠ্যপুস্তক কোম্পানি ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ-পাকিস্তান অঞ্চলের জন্য পাঠ্যপুস্তকের ইকোনমি এডিশন বের করে, যা দিয়ে তাদের কোনো লাভ আসে বলে মনে হয় না, কিন্তু আমরা কয়েক গুণ কম দামে পাঠ্যপুস্তক কিনতে পারি। এবার বাস্তব কথাটা শুনুন, আমরা এত দরিদ্র, আমাদের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়গামী ছাত্রছাত্রী ইন্ডিয়ান এডিশনও কেনার সামর্থ্য রাখেন না, তাই বাধ্য হয়ে সেগুলোর ফটোকপি পড়ি।

এবার আসি অনুবাদের ব্যাপারে। অনুবাদ করলে লেখকের অনুমতি নিতে হবে, রয়্যালটি দিতে হবে। নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে কথাগুলো খুবই সত্যি। মূল লেখকের অবশ্যই তার পরিশ্রমের মুল্য পাওয়া উচিত, কোনো সন্দেহ নাই। আমি তীব্রভাবে এ নীতির পক্ষে। কিন্তু বাজার কী বলে? আমাদের দেশের অনুবাদ বইয়ের মার্কেট কি এমন সমৃদ্ধ হয়েছে যে বই অনুবাদের রয়্যালটি দিয়ে অনায়াসে হেসে খেলে হাজার হাজার কপি চালাতে পারবে? যে দেশে ৫০০ কপি বিক্রি হলে বইকে বেস্ট সেলার ঘোষণা দেওয়া হয়, সেই দেশ মূল অনুবাদকের রয়ালটি কতটুকু দিতে পারবে?

আগেই বলে রাখি, মিলিয়ন মিলিয়ন কপি বিক্রি করা লেখক কিন্তু চিন্তা করবেন না বাংলাদেশ গরিব দেশ, এখানে রয়্যালটি কম নিই। কম রয়্যালটি নেওয়া লেখকের ব্যক্তিগত অনুগ্রহ বা ফেভার হতে পারে, কিন্তু লেখক কোনোমতেই আমাদের কাছ থেকে কম রয়্যালটি নিতে বাধ্য নন। যার মানে হচ্ছে, অধিকাংশ বেস্ট সেলার লেখকই এমন রয়্যালটি দাবি করবেন, যা পরিশোধ করে ৫০০ কপি কেন, ১০,০০০ কপি বিক্রি করেও রয়্যালটির খরচ উঠবে না। ফারসীম স্যার লিখেছেন, একজন প্রয়াত ব্রাজিলীয় লেখক ২০০৬-২০০৭ সালেই একটা বইয়ের রয়্যালটি বাবদ ২০০০ ডলার দাবি করেছিলেন। ২০০০ ডলার ঐ লেখকের একদিনের ডিনারের খরচ হতে পারে, কিন্তু আমাদের প্রকাশনা জগত বিবেচনায় ২০০০ ডলার একটা আকাশছোঁয়া অংক।

রয়্যালটি আর কপিরাইট দেওয়ার দাবিটা উঠতেছে পাঠকদের মধ্যে। আবার একই পাঠক বইয়ের দাম কেন এত বেশি—সে নিয়ে অনুযোগ করতেছেন। কিছু পাবলিশার আর অনুবাদকও এ বিতর্কে রয়্যালটির পক্ষে। এখানে একটা জিনিস পরিস্কার করে দিই, রয়্যালটি, কপিরাইট নীতি-নৈতিকতার প্রশ্ন না, এটা আইনগত প্রশ্ন। আইনের প্রয়োগ আর সহজে রয়্যালটি প্রদানের উপায় সৃষ্টি করার দায় লেখক, পাঠকের না, এ দায় রেগুলেটরের। ব্যাপারটা এমন হয়ে যাচ্ছে, জিপি, বাংলালিংক, একটেল—গ্রাহক আর মালিক সবাই মিলে ঠিক করতেছে লাইসেন্স ফি দিবে নাকি দিবে না। টেলিকম রেগুলেটর কোম্পানির কোনো আওয়াজ নাই। এরকম কি সম্ভব? এটা অসম্ভব, কারণ বাংলাদেশের টেলিকম বাজার যথেষ্ট বড়। বড় বলেই লাইসেন্সিং আর রেগুলেশনের প্রয়োগ দেখি।

এখানে পাঠক লেখকের দায় যতটা, তার চেয়ে অনেক বেশি দায় যারা বইয়ের বাজার রেগুলেশন করেন, নিয়মনীতি ঠিক করেন—তাদের। তারা ঘুমাচ্ছে, আর আমরা নিজেদের মোরাল পুলিশিং করতেছি, পাবলিক শেমিং করতেছি—এটা কেমন হাস্যকর কাজ হচ্ছে না? সর্বোপরি পেঙ্গুইন, পেলিক্যান আর বিশ্ববিখ্যাত লেখকদের মধ্যে কোনো উদ্বেগ দেখতেছি না তাদের রয়্যালটি নিয়ে। তাদের যদি দায় থাকত, আজই বাংলাদেশে আসত, এসে রয়্যালটি সংগ্রহের জন্য অভিযান শুরু করত। এটা করবে শুধু মাত্র তখন, যখন দেখবে বাংলাদেশের বইয়ের বাজার যথেষ্ট বড়। তা না হলে তাদের একদিনের চা নাস্তার খরচ আদায়ের জন্য তৃতীয় বিশ্বের একটা দেশে মামলা, হামলার হুজ্জত করার ইচ্ছা তাদের কোনোভাবেই নাই।

এবার চোখ ফিরান বাংলাদেশের বইয়ের বাজারের দিকে। আমাদের বইয়ের বাজার এমনিতেই ধুঁকে ধুঁকে মরতেছে—ভালো বইয়ের অভাবে। বৈচিত্র্যময় বইয়ের অভাবে। শুধু গল্প উপন্যাস কবিতা দিয়ে বইয়ের বাজার চলে না। আবার আমাদের এমন গবেষকেরও অভাব যারা মৌলিক গবেষণা করে সহজ ভাষায় লিখতে পারবেন। বাংলা বইয়ের জগত দ্রুত সমৃদ্ধ করার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো যত বৈচিত্র্যময়, আগ্রহউদ্দীপক, আকর্ষণীয় বই আছে—সব অনুবাদ করে ফেলা। শুধু মাত্র এ কাজই দ্রুত বাংলা বইয়ের পাঠক বাড়াবে। একটা পর্যায়ে এসে অনেকে বই পড়া ছেড়ে দেন। তাদের বই পড়া ছেড়ে দেওয়া আটকানোর উপায় হচ্ছে ভালো বইয়ের যোগান ধরে রাখা। এ কারণে অনুবাদের কোনো বিকল্প নাই।

এমনিতেই বইয়ের জগত আধমরা হয়ে আছে, ভালো কন্টেন্ট আসতেছে না, এর মধ্যে রয়্যালটি ভীতি মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে আসবে। রয়্যালটি আর কপিরাইট কম দামে পেলে ভালো, সহজ উপায়ে পেলে আরও ভালো, কিন্তু এখনই এ কারণে যদি আমরা বই বের করব না, অনুবাদ করব না বলে বাছবিচার করতে থাকি, তাহলে আর দেখতে হবে না, কয়েক দশক পর বাংলা বই পড়ার পাঠকও পাওয়া যাবে কি না, সন্দেহ। এভাবেই বাংলা বইয়ের জগত আঁতুরঘরেই মরবে।

তাই বলে আমরা কি রয়্যালটি না দিয়েই যাব সবসময়? কখনো না। এটা সম্ভবও না। দেশি প্রকাশনী আর লেখকের উপর রয়্যালটি, মেধাস্বত্ব কঠিনভাবে প্রয়োগ করা হোক। দেশি মেধাগুলো যেন রক্ষা পায়, তারা যেন কাজ করতে উৎসাহিত হয়। গোটা বিশ্ব অনেক পরের কথা ,আগে দেশের মেধাগুলোর মূল্য দিই। তারপরে বিদেশি মেধার প্রশ্ন। আগেই বলেছি, বাজার বড় হলেই বড় কোম্পানিগুলোর শকুন চোখ আমাদের উপর পড়বেই পড়বে। যখন ওরা দেখবে আমাদের দেশে হেসে খেলে যে কোনো বই ১০ হাজারের উপর বিক্রি হয়, আপনাদের বলতে হবে না, ওরাই লুঙ্গি মালকোঁচা মেরে বাংলাদেশে এসে মধ্যম আয়ের দেশের নীতিনির্ধারকদের চাপ দিবে।

সবসময় এটাই হয়। নীতি দিয়ে ব্যক্তিগত উদ্যোগে কয়েকটা বই কপিরাইটসহ বের করা সম্ভব, কিন্তু সবাইকে বাধ্য করতে পারবেন না। এটা পারবেন শুধুমাত্র তখন, যখন আইনের শাসন আর প্রয়োগ থাকে। যতদিন তা না থাকে, স্পষ্ট রেগুলেশন আর নীতিমালা না থাকে, ততদিন একে অন্যকে নীতিহীন, তস্কর, লোভী ইত্যাদি বলে, মোরাল পুলিশিং করে, কতটা পারবেন? সর্বোপরি এটা কি আমাদের বইয়ের জগতে ইতিবাচক প্রভাব রাখবে? রাখলে কতটা? আমরা বেশি সৎ হতে গিয়ে আমাদের হাঁস-মুরগিকে দানাপানি বন্ধ করে দিয়ে মেরে ফেলব, না কি হাঁস মুরগিকে খাইয়ে মোটা তাজা করে দানাপানির দাম শোধ করব?

শেষ করি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর জাপানের গল্প বলে। সনি প্রতিষ্ঠাতা আকিও মোরিতা, টয়োটা প্রতিষ্ঠাতা কিচিরো টোয়োডা, প্যানাসনিক প্রতিষ্ঠাতা কোনোসুকি মাৎসুশিতা, সবাই একটা বিশেষ পদ্ধতি অবলম্বন করে জাপানকে আজকের জাপান বানিয়েছেন। সে পদ্ধতি রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিং। আমেরিকান আর জার্মান গাড়ি, টিভি, ক্যালকুলেটর, ক্যামেরা কিনে উনাদের ইঞ্জিনিয়াররা খুলে খুলে অবিকল একই পার্টস তৈরি করত। তারপর সেগুলো জোড়া লাগিয়ে চুড়ান্ত পণ্য বানাত। একই ভাবে কোরিয়ার স্যামসাং, দায়েউ, আজকের চীনের শাওমি, হুয়াওয়েও উঠতেছে। জাপান কোরিয়া মেধাস্বত্বের কঠিন প্রয়োগ শুরু করেছে শুধুমাত্র তখন, যখন তাদের ভিত্তি শক্ত হয়েছে। যতদিন ভিত্তি শক্ত না হয়, ততদিন পর্যন্ত এমন বাঁচা আর মরার প্রশ্নে এমন স্ট্রিক্ট এথিক্স, চুলচেরা নীতি কপচিয়ে আমরা কি নিজেরাই নিজেদের শেষ করব? যেখানে আর সবক্ষেত্রে পাইরেসি মেনে নিয়েছি, সেখানে বইয়ের প্রশ্নে এত নীতি-নৈতিকতা কেন? বইয়ের পবিত্রতা বেশি বলে? আমাদের পর্যাপ্ত রয়্যালটি দেওয়ার ক্ষমতা নাই—এ বাস্তবতা আমরা অস্বীকার করছি কেন?

***কিছু কিছু ক্ষেত্রে লেখকের নিজস্ব বানান ও শব্দব্যবহার অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।

সুত্রঃ কালকূট