অবশেষে চুয়াডাঙ্গা আবাসিক হোটেলে হত্যা করা সেই নারীর প্রেমিক আটক

Print

চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি,সালেকিন মিয়া সাগর: চুয়াডাঙ্গা আবাসিক হোটেল থেকে উদ্ধার হওয়া নিহত তরুণী ফরিদা খাতুনের ঘাতক আনোয়ার হোসেন ওরফে ফটিককে (৩০) আটক করেছে পুলিশের একটি চৌকস দল। শনিবার গভীররাতে গাজীপুর শ্রীপুরের নয়নপুর গ্রামের শ্বশুরবাড়ি থেকে তাকে আটক করা হয়।

গত ২১ ফেব্রুয়ারি রাত সাড়ে ৯টার দিকে স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে চুয়াডাঙ্গা আবাসিক হোটেলের ২০৪ নম্বর কক্ষ ভাড়া নেয় ফরিদা ও আনোয়ার। ঘটনার আগ পর্যন্ত তারা ওই হোটেল কক্ষে অবস্থান করছিল। কয়েকদিন যাবত হোটেলে অবস্থান করায় তাদের আচরণে কোন সন্দেহের বিষয়ও লক্ষ্য করতে পারেনি কতৃপক্ষ। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি সোমবার রাতে গলাটিপে হত্যা করা হয় ফরিদা খাতুন (২৫) নামের ওই তরুণীকে। এরপর আনোয়ার হোসেন কৌশলে রুমের দরজায় তালাবদ্ধ করে বাইরে বেরিয়ে যায়; সারারাত আর সে রুমে ফেরেনি। পরদিন ২৭ ফেব্রুয়ারি সকালে রুমের দরজা না খুললে হোটেল কর্তৃপক্ষের সন্দেহ হয়। পরে তারা পুলিশকে জানালে সকাল ৯টার দিকে পুলিশ এসে হোটেলের ওই কক্ষের বিকল্প চাবি ব্যবহার করে ফরিদা খাতুনের বিবস্ত্র লাশ উদ্ধার করে। লাশের ময়নাতদন্তের জন্য সদর হাসপাতাল মর্গে প্রেরণ করা হয়। তবে তাৎক্ষণিক সঠিক পরিচয় মেলেনি দু’জনের। হোটেল রেজিস্টারে দেয়া পরিচয়ে জানাযায় নিহতের নাম ফরিদা ও তার সাথে থাকা পুরুষসঙ্গীর নাম আনোয়ার হোসেন। এ ছাড়া আর কোন তথ্য রেজিস্টারে উল্লেখ ছিল না।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মোহা. কলিমুল্লাহ সাংবাদিকদের বলেন, ‘গত ২৭ ফেব্রুয়ারি সকালে চুয়াডাঙ্গা আবাসিক হোটেল থেকে খবর আসে একটি কক্ষ সন্দেহজনক তালাবদ্ধ। খবর পেয়ে পুলিশ সদস্যরা ওই হোটেলের তালাবদ্ধ রুম খুলে একটি মহিলার লাশ উদ্ধার করে। লাশ পুলিশের জিম্মায় নেয়ার পর হোটেলের ওই কক্ষে যে সকল ক্লু ছিল তা দেখে হত্যা রহস্য উন্মোচন করা সম্ভব হচ্ছিল না। এরই একপর্যায়ে ওই মহিলার ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে একটি বাংলালিংক সিমের স্টিকার উদ্ধার করা হয়। যেখানে ০১৯০৮……………১৮ ফোন নম্বর পাওয়া যায়। ওই ফোন নম্বরটির বায়োমেট্রিক তথ্য যাচাই করে জানা যায় সিমটি নিহত মহিলার পিতা আবু মিয়ার। আবু মিয়ার ঠিকানা ময়মনসিংহের ফুলপুর উপজেলার রামভদ্রপুরে। সেখানকার থানা পুলিশের সহায়তায় জানতে পারি আবু মিয়ার দুই মেয়ের মধ্যে ফরিদা খাতুন বেশ কিছুদিন ধরে নিখোঁজ রয়েছে। তবে আবু মিয়ার নামে রেজিস্ট্রেশনকৃত সিমটি ফরিদা খাতুন ব্যবহার করতো। পরে ফরিদার ছবি দেখে তার পিতা লাশ সনাক্ত করে। মেয়ের পরিচয় বের করার পর তার সিমের সিপিআর বের করা হলো। সিপিআর তথ্যানুযায়ী ওই সিমে দুইটি নম্বরে সবচেয়ে বেশি কথা বলা হয়েছে। পরে ওই দুটি নম্বরেরও সিপিআর বের করা হলো। নম্বর দুটির রেজিস্ট্রেশন যদিও অন্য নামে দেখাচ্ছিল; কিন্তু ওই নম্বর দুটোর লোকেশন ঘটনার তিন চারদিন আগ থেকে চুয়াডাঙ্গার ভেতরেই ছিল। তখনি মোটামুটি ধারণা আসে এই নম্বর দুটির মালিকই মূলত ঘাতক। আবারো তার নম্বরের সিপিআর নিয়ে লোকেশন ট্র্যাকিং করে দেখা যায় নম্বর দুটি গাজীপুর জেলার শ্রীপুরের অভ্যন্তরে রয়েছে। এরপর তাকে ধরতে আমরা সোর্স নিয়োগ করি। সন্দিগ্ধ তথ্যের ভিত্তিতে ওই সোর্স ঘাতক আনোয়ায়ের শ্বশুর বাড়িতে ভাড়াটিয়া হিসেবে ওঠে। এ ছাড়াও ওই নম্বর দুটি দিয়ে ফেসবুক, ইমোসহ বিভিন্ন অনলাইন অনুসন্ধান করে আনোয়ারের ছবি বেরিয়ে আসে। ছবি দেখে হোটেল কর্তৃপক্ষ সনাক্ত করে- এটিই সেই ছেলে যে ঘটনার বেশ কিছুদিন আগে ওই মেয়েকে নিয়ে হোটেলে উঠেছিল। এ থেকে আমরা নিশ্চিত হলাম এই ছেলেই আসল ঘাতক। পরবর্তীতে ওই সোর্স আমাদেরকে আনোয়ারের আসা যাওয়ার তথ্য সরবরাহ করতে থাকে। তার অবস্থান নিশ্চিত করে চুয়াডাঙ্গা পুলিশ সুপার মাহবুবুর রহমান পিপিএম’র নির্দেশক্রমে গত ২৪ তারিখ সদর থানার ইন্সপেক্টর (তদন্ত) মো. আব্দুল খালেকের নেতৃত্বে পুলিশের একটি চৌকস দল গাজীপুর শ্রীপুরে যায়। গতকাল গভীর রাতে গাজীপুর শ্রীপুরের নয়নপুর নামক গ্রামের বাড়ি (আনোয়ারের শ্বশুর বাড়ি) থেকে এ ঘটনার মূল আসামী ঘাতক আনোয়ার হোসেন ওরফে ফটিককে আটক করতে সক্ষম হয় তারা।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) আরো বলেন, আনোয়ারের ছবি ফরিদার স্বামী মালয়েশিয়া প্রবাসী আলমগীর হোসেনকে দেখানো হলে সেও নিশ্চিত করে- এই ছেলে আমার সাথে ভালো সম্পর্ক করার চেষ্টা করে এবং তার সাথে আমার স্ত্রীর দীর্ঘ সময়ের অবৈধ সম্পর্ক রয়েছে।

আটকের পর আনোয়ার পুলিশের কাছে অকপটে স্বীকার করে যে- তাদের দু’জনের মধ্যে দীর্ঘ ৮ বছরেরও বেশি সময় ধরে অবৈধ সম্পর্ক চলে আসছিল। অবৈধ সম্পর্কের কারণে ফরিদা চাইতো যেন আনোয়ার তাকে বিয়ে করে। কিন্তু আনোয়ারের বউ বাচ্চা থাকাতে কৌশলে বিয়ের বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতো। বলতো যে- আমি তোমাকে বিয়ে করতে পারবো না। তবে তোমার সাথে যে আমার বন্ধুত্ব সম্পর্ক রয়েছে তা থাকবে; এ ভাবেই চলবে। ঘটনার রাতে বিয়ের দাবি মানা না মানা নিয়ে উভয়ের মধ্যে ধস্তাধস্তি হয়। এরই একপর্যায়ে ফরিদাকে গলাটিপে ধরে হত্যা করে সে।

এদিকে নিহত ফরিদার সাথে ময়মনসিংহ ফুলপুর উপজেলার রামভদ্রপুরের প্রবাসী আলমীগের বিয়ে হয় বছর দশেক আগে। বিয়ের পর স্বামী আলমগীর মালয়েশিয়া চলে গেলে গাজীপুরে একটি গার্মেন্টস’এ চাকরী নিয়ে সেখানেই থাকা শুরু করে ফরিদা। সেই সুবাদে গাজীপুরের শ্রীপুর এলাকার নয়নপুরের বাসিন্দা কাভার্ডভ্যান চালক আনোয়ার হোসেন ওরফে ফটিকের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে ফরিদার। তবে আনোয়ার নরসিংদী জেলা সদরের বাহেরচর গ্রামের দুলু মিয়ার ছেলে। তবে নয়নপুরে স্ত্রী লিপি ও ২ মেয়েকে নিয়েই থাকতো আনোয়ার। স্ত্রী-কন্যার কথা জানতো না ফরিদা। তাদের রেখেই আনোয়ার ফরিদার সাথে গভীর প্রেমজ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। এ সম্পর্ক চলে আসছিল ৮ বছরেরও বেশি সময় ধরে। স্বামী প্রবাসে থাকার সুযোগে পরোকিয়া সম্পর্কে জড়িয়ে গার্মেন্টস কর্মী ফরিদা আনোয়ারের প্রেমে অনেকটা পাগল হয়েই তার সাথে ঘুরতে থাকে এদিক সেদিক। সম্প্রতি বিয়ের দাবি তোলায় ফরিদাকে জীবন থেকে সরাতে কুটকৌশল আটতে থাকে আনোয়ার। অনেকটা পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ীই ফরিদাকে চুয়াডাঙ্গায় নিয়ে এসে ওই হোটেলের একটি কক্ষে থাকা শুরু করে। ফরিদার মাথায় বিয়ের ভূত চেপে বসায় তাকে আর সহ্য করতে পারছিল না আনোয়ার। একপর্যায়ে ৮ বছরের প্রেম গলাটিপে হত্যা করেই ক্ষান্ত হয় ঘাতক আনোয়ার হোসেন ওরফে ফটিক।

[ প্রিয় পাঠক, আপনিও বিডিসারাদিন24 ডট কম অনলাইনের অংশ হয়ে উঠুন। লাইফস্টাইল, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, রান্নার রেসিপি, ফ্যাশন-রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন- bdsaradin24@gmail.com-এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে। নারীকন্ঠ এবং মত-দ্বিমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে  bdsaradin24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরণের দায় গ্রহণ করে না। ]

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 662 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ
bdsaradin24.com