অলি-ইবরাহিমদের তৎপরতায় টেনশনে বিএনপি

Print

ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে কূটনীতিক ও বিশিষ্টজনদের সঙ্গে ডিনার পার্টির আয়োজন বিএনপি নেতাদের একটি অংশকে আমন্ত্রণ, দল ভাঙনের শঙ্কায় হাইকমান্ড

অলি আহমদ ও সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিমদের তৎপরতায় টেনশনে বিএনপির হাইকমান্ড। ২০-দলীয় জোটের বাইরে এসে নতুন করে প্ল্যাটফরম তৈরির উদ্যোগে ‘অস্বস্তিতে’ দলটি। অলি আহমদের জাতীয় মুক্তিমঞ্চের পর সৈয়দ ইবরাহিমের নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণে বেকায়দাও দলটি। এ প্ল্যাটফরমে বিএনপির শীর্ষ ও মধ্য পর্যায়ের নেতাদের বড় একটি অংশই প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে সম্পৃক্ত। জাতীয়তাবাদী ঘরানার সাবেক আমলা, সাবেক উচ্চপর্যায়ের সেনা কর্মকর্তারাও এতে যুক্ত। বিএনপির নীতি নির্ধারকরা এ উদ্যোগকে ‘দল ভাঙার তৎপরতা’ ও দুই শীর্ষ নেতাকে মাইনাসের ‘ষড়যন্ত্র’ হিসেবে দেখছেন। মামলা-হামলায় পর্যুদস্ত বিএনপি এখন কোন পথে হাঁটবে তা নিয়েও স্পষ্ট কোনো নির্দেশনা নেই। জানা যায়, নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণের অংশ হিসেবে সম্প্রতি কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম ধানমন্ডির একটি চাইনিজ রেস্টুরেন্টে দোয়া মাহফিলের আয়োজন করেন। সেখানে বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সাবেক কজন সেনা কর্মকর্তা, সাবেক আমলা, খ্যাতনামা আইনজীবী ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের মিলনমেলা বসে। দোয়া মাহফিলে আগতের সবাই সরকারের বিরুদ্ধে দুঃশাসনের অভিযোগ আনেন। দেশে গণতন্ত্র ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সরকার পতনে আন্দোলনও চান। এদিকে নতুন প্ল্যাটফরমের উদ্যোক্তারা ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে আরও একটি ডিনার পার্টির আয়োজন করবেন। সেখানে কূটনীতিক ও বিশিষ্টজনদের পাশাপাশি বিএনপি নেতাদের একটি অংশকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধির মিলনমেলা ঘটবে ওই ডিনার পার্টিতে।

সূত্রমতে গত ১৪ ডিসেম্বর রাজধানীর পুরানা পল্টন-গুলিস্তান এলাকায় যারা সরকার পতনের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল করেছিলেন তারাই এ দোয়া মাহফিলের উদ্যোক্তা। বিএনপি স্থায়ী কমিটি, ভাইস চেয়ারম্যান, উপদেষ্টা পরিষদ, যুগ্মমহাসচিব, মুক্তিযোদ্ধা দলসহ অঙ্গসংগঠনের কিছু নেতা, সাবেক ছাত্রনেতারাও এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত। আলোচনায় আছে, ২০১৯ সালের নভেম্বর-ডিসেম্বরে থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংকক ও নেপালে ধারাবাহিকভাবে কয়েকটি গোপন বৈঠকের মাধ্যমে বিরোধী এ প্ল্যাটফরমের কার্যক্রম শুরু হয়। সেখানে ২০-দলীয় জোট ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের কয়েকজন শীর্ষ নেতা ছাড়াও সুশীলসমাজের কয়েকজন অংশ নেন। তারাই ১৪ ডিসেম্বর প্রকাশ্যে প্রথম কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামেন। এরপর দোয়া মাহফিলের মাধ্যমে শুরু হয় দ্বিতীয় কর্মসূচি। ধারাবাহিকভাবে এ কর্মসূচি চলতে থাকবে। নতুন প্ল্যাটফরম তৈরির উদ্যোক্তারা জানান, বিএনপির কাছে গুরুত্বহীন দলগুলো নতুন কিছু করতে চায়। তাদের মতে, ২০-দলীয় জোট এখন নিষ্ক্রিয়। তা ছাড়া জোটের বৈঠকেও কোনো সিদ্ধান্ত হয় না। বিএনপি এককভাবেই সব সিদ্ধান্ত নিয়ে চাপিয়ে দেয়। এ কারণেই তারা নতুন একটি প্ল্যাটফরম দাঁড় করাতে চাচ্ছেন। তবে তারাও নীতিগতভাবে এ সরকারের পতন চান। দেশে গণতন্ত্র ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হোক তাও চান। উদ্যোক্তাদের একজন জানান, চলমান দুর্বৃত্তায়নের রাজনীতি, পরিবারতন্ত্র ও রাজনৈতিক কর্মকান্ডের নিষ্ক্রিয়তায় তারা একটি নতুন প্ল্যাটফরম তৈরি করছেন। এটা হবে সরকারবিরোধী আরও একটি প্ল্যাটফরম। এখন থেকে তারা নিয়মিতই বৈঠক করবেন।

এ প্রসঙ্গে কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীরপ্রতীক বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘আমি বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টিকে নিয়ে রাজনীতির মাঠে ঘুরে দাঁড়াতে চাই। আমার দলের নীতি পরিবর্তনের রাজনীতি। এ পরিবর্তনটা বিদ্যমান রাজনৈতিক দলে যারা দীর্ঘদিন ধরে রয়েছেন, ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় অপকর্মে যুক্ত হয়ে গেছেন তাদের দ্বারা সম্ভব নয়। প্রয়োজন স্বচ্ছ মেধাবী সাহসী রাজনৈতিক কর্মী। তাই দলে এমন ব্যক্তিদের সমাবেশ ঘটাতে চাই। আমি মনে করি নিরপেক্ষ সরকার ছাড়া আগামীতে কোনো নির্বাচন সুষ্ঠু হতে পারে না। এটা অবাস্তব ও অসম্ভব। সে নির্বাচন চাইতে গেলে এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে। এ জন্য সরকারবিরোধী আন্দোলনও গড়ে তুলতে হবে।’ 

এ প্রক্রিয়াকে কেউ কেউ তৃতীয় শক্তি হিসেবে দেখছেন- এমন প্রশ্নের জবাবে সৈয়দ ইবরাহিম বলেন, ‘আমি কখনই একে তৃতীয় শক্তি হিসেবে ব্যবহার করিনি। আমি বিএনপির ৫ কোটি নির্যাতিত-নিপীড়িত কর্মীর প্রতি আজীবন অনুগত ও সহমর্মী। তাদের এ কষ্ট লাঘবের জন্য কী করা যায় তা নিয়েও আমি আগ্রহী। সব সময় তাদের নিয়েই চিন্তা করি।’ লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি-এলডিপির সভাপতি অলি আহমদ বলেন, ‘২০-দলীয় জোট এখন সক্রিয় নয়। আমাদের জাতীয় মুক্তিমঞ্চের কর্মকান্ড চলছে। সৈয়দ ইবরাহিমও তার দোয়া মাহফিলে আমাকে দাওয়াত দিয়েছিলেন। করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে অনুষ্ঠানে যাইনি। তবে সরকারের দুঃশাসনের বিরুদ্ধে আমাদের আন্দোলন কর্মসূচি অব্যাহত রাখতে হবে।’ তবে সাবেক এমপি মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান বলেছেন, ‘দোয়া মাহফিলে যারা অংশ নিয়েছেন তারা বিএনপির শত্রু। তারা বিএনপির ভালো চান না। দলে সংস্কার বা কিছু করতে চাইলে দলীয় ফোরামেই করতে হবে। আলাদা দল বা প্ল্যাটফরম করে নয়। ওয়ান ইলেভেনেও এ ধরনের তৎপরতা হয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা সফল হননি।’

বিএনপির হাইকমান্ডের আশঙ্কা, সরকারের ‘সবুজ সংকেত’ নিয়েই বিএনপির মূলধারার বাইরে নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণের চেষ্টা করা হচ্ছে। সেখানে বিএনপির একটি অংশকে যুক্ত করা হবে। এ অংশটি সরকার পতন চাইলেও ভিতরে ভিতরে সরকারের সঙ্গে সমঝোতা করেই পথ চলতে চায়। জাতীয়তাবাদী ভাবধারার এ অংশটিকে নিয়ে সরকার আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন করতে চায়। তারা মূলধারার বিএনপিকে ভোট ও রাজনীতির বাইরে রাখতে চায়। তারা বিএনপি ভেঙে দলের শীর্ষ দুই নেতাকে ‘মাইনাস’ করে নতুন জাতীয়তাবাদী শক্তি গড়ে তুলতে চায়।

দলের এক সূত্র জানান, দোয়া মাহফিলের পর লন্ডনে অবস্থানরত বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান কয়েকজন সিনিয়র নেতার সঙ্গে এ নিয়ে আলাপ করেন। নতুন প্ল্যাটফরম তৈরির উদ্যোক্তাদের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানতে চান। ওই নেতারা তারেক রহমানকে জানান, সব দলমতের নেতাদের নিয়ে এমনকি সাবেক আমলা ও সেনা কর্মকর্তাদের নিয়ে তারা নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফরম তৈরি করতে চান। তারাও সরকারবিরোধী শক্তি হিসেবে মাঠে সক্রিয় হতে চান। বিষয়টি পর্যবেক্ষণে রাখতে তিনি নেতাদের নির্দেশনা দেন। একই সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের সিনিয়র দুই নেতাকে ওই প্ল্যাটফরমের খোঁজখবর রাখতে তাদের আমন্ত্রণে অংশ নেওয়ারও নির্দেশনা দেন তারেক রহমান।

এদিকে বিএনপির দুই ভাইস চেয়ারম্যানকে শোকজ দেওয়ার পর শওকত মাহমুদের জবাবে সন্তুষ্ট হয়ে দলে কাজ করার সুযোগ দিলেও আরেকজন এখনো সবুজ সংকেত পাননি। সহসাই মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদকে সবুজ সংকেত দেওয়া হবে না বলে দলের এক সূত্র জানিয়েছেন। তার গতিবিধি আরও পর্যবেক্ষণ করবে দলটি। এ ছাড়া দলের আরও অন্তত দুই ডজন নেতাকে পর্যবেক্ষণে রেখেছে বিএনপির হাইকমান্ড। আগামীতে বিএনপিসহ অঙ্গসংগঠনের কমিটিতেও সন্দেহভাজন নেতাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে ঠাঁই মিলবে না বলে সূত্র জানান। তবে চলমান পরিস্থিতিতে কাউকে বহিষ্কারের মতো কঠোর কোনো সিদ্ধান্তে যাচ্ছে না বিএনপি। অনেকটা নরম সূরেই নেতাদের ঐক্যপ্রক্রিয়া ধরে রাখার চেষ্টায় দলটি।

দোয়া মাহফিলে অংশ নিয়ে এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) ফখরুল আজম বলেন, ‘দেশের পরিস্থিতি এমন যে ন্যায়বিচার কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না। সে কারণে আমরা যে বাংলাদেশ দেখতে চেয়েছিলাম এখন আর সে দেশ দেখতে পাচ্ছি না। আমি আপনাদের সবার সঙ্গে অংশগ্রহণ করব। এর দ্বারা একটি পরিবর্তন আনতে পারব। আমরা দেশে সুশাসন ফিরিয়ে আনতে চাই।’

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘একটা সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্র ও সুশাসন চাই। প্রধানমন্ত্রীকে নিশ্চিত করতে চাই সুষ্ঠু নির্বাচনে যদি হেরে যান আপনি যে অত্যাচার চালিয়েছেন তা চালানো হবে না। আপনি সুষ্ঠু বিচার পাবেন।’ সবাইকে রাস্তায় নামার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এভাবে একটা দেশ চলতে পারে না। তাই সবাইকে একত্রিত হতে হতে হবে। একটি প্ল্যাটফরম গড়ে তুলতে হবে।’ নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ‘আমরা সরকারের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থান গড়ে তুলতে চাই। এ জন্য দল গোছানোর প্রক্রিয়া চলছে। সরকারের দুঃশাসন থেকে মানুষ যাতে মুক্তি পায় সেটাই আমাদের লক্ষ্য।’

[ প্রিয় পাঠক, আপনিও বিডিসারাদিন24 ডট কম অনলাইনের অংশ হয়ে উঠুন। লাইফস্টাইল, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, রান্নার রেসিপি, ফ্যাশন-রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন- bdsaradin@gmail.com-এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে। নারীকন্ঠ এবং মত-দ্বিমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে  bdsaradin24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরণের দায় গ্রহণ করে না। ]

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 187 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ