রুমানা বিনতে রেজা:

কিছুদিন আগে পিহু নামের একটা ইন্ডিয়ান মুভি দেখেছিলাম।
তিন বছর বয়সী এক মেয়ের মা ঘুমের ওষুধ খেয়ে আত্মহত্যা করেন, পরের সারাটা দিন মেয়ের বাবা কলকাতা থেকে মুম্বাই আসতে পারেন না। সেই দেড়দিন অত ছোট বাচ্চা বাসার ইস্ত্রি, গ্যাস, ইলেকট্রিক সুইচ, বারান্দার রেলিং এইসবের মধ্যেও কীভাবে সারভাইভ করে সেই গল্প।
মুভিটা দেখতে গিয়ে পিহুর জন্য যতোটা আতংক হচ্ছিল, পিহুর মায়ের জন্য আরো বেশি আক্রোশ তৈরি হচ্ছিল, রাগ হচ্ছিল।
নিজের মৃত্যুর ইচ্ছে কারো হতেই পারে, কিন্তু এই যে একটা বাচ্চার জন্ম দেয়ার সময় কি মায়ের মধ্যে এই দায়িত্ববোধটুকু চলে আসা উচিত না যে বাচ্চাটির সাবালক বা অন্তত নিজের বুদ্ধিতে চলার মতো উপযুক্ত করার আগ পর্যন্ত তার আসলে ‘মুক্তি’ নেই?
যিনি নিজের মৃত্যুর আয়োজন করলেন, নিজের রাগ ও আক্রোশে মারাও গেলেন, অথচ একবার নিজের সন্তানের নিরাপত্তার কথাটুকুও ভাবলেন না, এ কেমন মাতৃত্ব?

কাল ‘জোকার’ দেখতে গিয়েছিলাম, কতগুলা বাচ্চা পুরো হল জুড়ে। সম্ভবত নাম আর পোস্টার দেখে কিছু বাবা-মা তাদের বাচ্চাদের এই সিনেমা দেখাতে নিয়ে চলে এসেছেন।
একই ঘটনা দেবী সিনেমার সময়েও দেখেছি।
বাচ্চাদের এইসব সাইকোথ্রিলার বা হরর মুভি দেখানোর সময় হলের বাচ্চাদের চিৎকার বার বার আমাকে বার বার অস্বস্তিতে ফেলে।
এরা কেমন বাবা-মা যারা বাচ্চাদের মনের গঠন নিয়ে বিন্দুমাত্র চিন্তা করেন না??

আমাদের দেশে বাচ্চা জন্ম দেয়া সবচাইতে সহজ কাজ।
ইউরোপ আমেরিকায় একটা বাচ্চা জন্ম দেয়ার জন্য নারী ও পুরুষের একটা বিশাল ‘আয়োজন’ আছে।
সেই আয়োজন মনস্তাত্ত্বিক, সেই আয়োজন শারীরিক, সেই আয়োজন অর্থনৈতিক।

আমাদের দেশে জনসংখ্যা বাড়ার কারণ হিসেবে ছোটবেলায় সমাজ বইয়ে অনেক কারণ লেখা ছিল, এর মাঝে এখন ‘বিনোদনের অভাব’ আর ‘মুখ দিয়েছেন যিনি আহার দিবেন তিনি’ এই মানসিকতার কথা বলা ছিল।
এই দুই হাজার উনিশ সালেও অবস্থা একটুও বদলায়নি।

বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ এইসব আইন করে না করা হয়েছে, কিন্তু আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বলে গ্রামের দিকে এই দুইটা এই ফেসবুক আর সহজ ইন্টারনেটের যুগে আরও বেড়েছে।
সুস্থ প্রেমের বদলে প্রেম আজকাল সম্ভবত সামাজিক আর ধর্মীয় কারণেই রেজিস্ট্রি-বিয়েতে পরিণত হচ্ছে, এইগুলি ভেংগেও যাচ্ছে খুব তাড়াতাড়ি।
অনেক সময়ই এইসব বালখিল্য রেজিস্ট্রি-বিয়েতে পরিবারে বিয়ে মেনে নেয়ানোর পদ্ধতি হিসেবে বাচ্চাও জন্ম দিয়ে ফেলা হচ্ছে।
এই বাচ্চাগুলিকে একটা অস্থির সমাজের আরও অস্থির সময়ের ‘বাইপ্রোডাক্ট’ বলা যায়।

অস্থির সময় বলছি কারণ বাংলাদেশ এখন এমন একটা সময়ে, যার জনগোষ্ঠীর বিরাট একটা অংশ একই সাথে কিছুটা পাশ্চাত্যের অনুকরণে ফ্রি-সেক্স আবার প্রাচ্যের অনুকরণে সামাজিক ধর্মীয় অনুশাসনের দ্বিধায় ভুগছে।
প্রেমের সম্পর্ককে বিয়েতে পরিণত করতে খুব দ্রুত সিদ্ধান্ত নিচ্ছে সম্ভবত বহুকালের আচারিত ধর্মীয় মূল্যবোধের জন্য, একই সাথে সামান্য মতের উনিশ বিশে ডিভোর্সের সিদ্ধান্ত নিতে চাইছে পাশ্চাত্যের অনুকরণে।
অথচ বিয়ে এবং ডিভোর্স দুইটাই পাশ্চাত্যে খুবই সময় নিয়ে নেয়া ডিসিশন!

যাই হোক, বাচ্চা জন্ম দেয়ার দায়িত্ববোধের কথা বলছিলাম।

এই যে সম্প্রতি একটা বাচ্চা ছেলেকে নিষ্ঠুরভাবে তার বাবা হত্যা করেছে, এই ঘটনায় আমার বার বার মনে হচ্ছে এই যে এই সন্তানের জন্ম দিয়েছেন যে বাবা, তিনি কি আসলেও পিতা হবার মতো উপযুক্ত ছিলেন?
এই যে এতো বাচ্চা ধর্ষণের শিকার হচ্ছে, শিশুদের উপর এতো অত্যাচার, নিপীড়ন–বাবা মা হিসেবে আরেকটু দায়িত্ববোধ কি হওয়া উচিত না?

পত্রিকায় নিউজ হয়েছিল এই বৃহস্পতিবার, এক ইমাম চার শিশুকে খেলার মাঠ থেকে তুলে নিয়ে ধর্ষণ করেছেন।
কিছুটা অবাক লাগায় পুরো নিউজ পড়ে জানলাম, প্রতিটা শিশুর বাবা-মায়েরা এই সময়ে গার্মেন্টেসে কাজ করতে চলে যান, তাই শিশুরা মাঠেই নিজেরা নিজেরা খেলে।
না, এতে ধর্ষণ জাস্টিফাই হয় না, কিন্তু আমার পয়েন্ট হলো, এই বাচ্চাগুলিকে মাঠে একা খেলতে দিয়ে দীর্ঘ সময়ের জন্য কাজে চলে যায়…এরা কেমন বাবা-মা?
চারজন শিশুর আটজন বাবা-মা সবাই কাজে যাবে বাচ্চাদের কোথায় রাখবে, কী করবে তারা এইটা জানে না, এইটা আসলেও অদ্ভুত লাগছে।
হ্যাঁ, দরিদ্র শ্রেণির মানুষ, তাদের পেটের দায় আছে, সেক্ষেত্রে বাচ্চাকে তারা পালাক্রমে দেখতে পারতো, কাজের জায়গায় বাচ্চা রাখার ব্যবস্থার কথা বলতে পারতো (থিওরির মতো কথা হচ্ছে, জানি)।
কিন্তু বাচ্চাদের নিরাপত্তা তো ঘর থেকেই শুরু হওয়া উচিত।
চারটা বাচ্চা (এবং মেয়ে) তাদের ধর্ষণ ছাড়াও অন্য কতো বিপদ-ই তো হতে পারতো!
এই জায়গায় আসলেও কি প্যারেন্টস হিসেবে আরো কিছুটা সচেতনতা থাকা উচিত ছিল না?

একটা সন্তানকে জন্ম দেয়া ও বড় করার ডিসিশন কি এতোটাই সহজ?

আপনারা যারা নিঃসন্তান/সন্তানহীন দম্পতি দেখলেই বাচ্চা হবার ব্যাপারে প্রশ্ন করেন, আপনারা কি জানেন আপনাদের বাবা মায়েরা বড্ড হেলাফেলায় আপনাদের জন্ম দিয়েছিলেন?
এ কারণে তারা আপনাদের উপযুক্ত পরিচর্চা করেনি, উপযুক্ত পরিচর্চার অভাবে আপনারা কিছুটা গাবর শ্রেণীর মানুষ হিসেবে বেড়ে উঠেছেন।
তাই এই প্রশ্নগুলো অনায়াসে আপনাদের মুখ থেকে বের হয়। একটু যত্নআত্তি করে আপনাদের বড় করলে আপনারা কিছুটা সুস্থ স্বাভাবিক বুদ্ধির মানুষ হতেন, আপনারা বুঝতেন যে বাচ্চা নেয়া/না নেয়া/বাচ্চা নেয়ার সময় প্রতিটা দাম্পত্য জুটির নিজেদের ব্যাপার।

গোলাপ ফুলের দুইটা বাড়ি, তারপরের সিনে বউয়ের মাথায় তোয়ালে জড়িয়ে বাথরুম থেকে বের হয়ে ঘুমন্ত স্বামীর সাথে খুনসুটি আর তারপর মাথা ঘুরে পড়ে গিয়ে ডাক্তার এসে পালস দেখে আপনি মা হতে চলেছেন, এরপর ওটি বেডে বাচ্চা কোলে নিয়ে বাচ্চার কোল থেকে বের হওয়া ‘সমাপ্ত’ লেখা শুধু সিনেমাতেই হয়।

জীবনটা সিনেমা না।
জীবন শুরু হয় এরপর থেকে।
সবাই বাচ্চার নেয়ার জন্য-ই বাচ্চা জন্ম দেয় না,অনেকে বাচ্চাটাকে আস্ত একটা মানুষ হিসেবে বড় করার উপযুক্ত হয়ে তারপর সেই দায়িত্ব মাথা পেতে নিতে চায়।