অ্যান্টিবায়োটিকের অযৌক্তিক ব্যবহার কমছে না

Print

২০১৪ সালের ৩০ এপ্রিল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা পৃথিবীর ১১৪টি দেশে পরিচালিত গবেষণার ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স সম্পর্কে তাদের সর্বশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে উদ্বেগের সঙ্গে বলা হয়েছে, অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স থেকে সৃষ্ট মহাবিপর্যয় এখন আর কোনো ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার ব্যাপার নয়।

এখনই, এ মুহূর্তে বিশ্বের প্রতিটি দেশের প্রতিটি অঞ্চলে সব বয়সের সব মানুষ অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের শিকার হওয়ার প্রবল হুমকির মধ্যে রয়েছে। ‘অ্যান্টিমাইক্রোবায়াল রেজিস্ট্যান্স : গ্লোবাল রিপোর্ট অন সার্ভেইলেন্স’ (জীবাণুর প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন : কড়া নজরদারির ওপর বিশ্ব প্রতিবেদন) শীর্ষক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, অসংখ্য সংক্রামক রোগ সৃষ্টিকারী অসংখ্য জীবাণু বেশিরভাগ অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন করে ফেলেছে।

প্রতিবেদনে ডায়রিয়া, কলেরা, নিউমোনিয়া, মূত্রনালির সংক্রমণ, গনোরিয়া, সেপসিস (রক্তের সংক্রমণ)-এর মতো সাধারণ থেকে শুরু করে খুব মারাত্মক সংক্রামক রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণুর ওপর অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের ফলাফল প্রকাশ করা হয়। প্রতিবেদনে প্রকাশিত ফলাফল খুব উদ্বেগ ও আতঙ্কজনক। কারণ প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জনকারী বহু জীবাণুর বিরুদ্ধে শেষ অবলম্বন হিসেবে বিবেচিত খুব কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিকগুলোও এখন কার্যকারিতা হারাতে বসেছে।

কার্বাপেনেমকে এতদিন একমাত্র নন-রেজিস্ট্যান্ট শতভাগ কার্যকর শেষ অবলম্বন অ্যান্টিবায়োটিক হিসেবে গণ্য করা হতো। জীবন বিপন্নকারী অন্ত্রের জীবাণু ক্লেবসিলা নিউমোনি কার্বাপেনেমের কার্যকারিতাকে ব্যর্থ করে দিয়ে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে।

ক্লেবসিলা নিউমোনি হাসপাতালে নিউমোনিয়া, সেপসিস, নবজাতকের সংক্রমণ এবং জরুরি বিভাগে চিকিৎসারত বিপন্ন রোগীদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়ানোর মূল কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বহু দেশে রেজিস্ট্যান্সের কারণে কার্বাপেনেম ক্লেবসিলা নিউমোনিতে আক্রান্ত ৫০ শতাংশ রোগীকে সুস্থ করে তুলতে ব্যর্থ হচ্ছে।

মূত্রনালির সংক্রমণের জন্য দায়ী গ্রাম নেগেটিভ জীবাণু ই. কোলাইয়ের বিরুদ্ধে বহুল পরিচিত সিপ্রোগ্রুপের (ফ্লোরোকুনোলন) অ্যান্টিবায়োটিকগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এখন আর কাজ করছে না। ১৯৮০ সালে বাজারে আসা সিপ্রোগ্রুপের ওষুধগুলোর বিরুদ্ধে জীবাণুর প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জনের পরিমাণ ছিল শূন্য। এখন পৃথিবীর অধিকাংশ দেশেই সংক্রামক রোগ চিকিৎসায় সিপ্রোগ্রুপের ওষুধগুলোর কার্যকারিতা ৫০ শতাংশেরও নিচে নেমে গেছে।

গনোরিয়া চিকিৎসায় শেষ অবলম্বন হিসেবে পরিচিত তৃতীয় প্রজন্মের সেফালোস্পোরিন গ্রুপের ওষুধগুলো এখন অস্ট্রেলিয়া, অস্ট্রিয়া, কানাডা, ফ্রান্স, জাপান, নরওয়ে, স্লোভেনিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, সুইডেন এবং যুক্তরাজ্যের গনোরিয়ায় আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসায় অকার্যকর হয়ে পড়েছে। প্রতিদিন সারা বিশ্বে দশ লাখ মানুষ গনোরিয়ায় আক্রান্ত হয়।

জীবাণু কীভাবে অ্যান্টিবায়োটিকের কর্মক্ষমতাকে নিষ্ফল করে দিয়ে বহাল তবিয়তে বেঁচে থাকতে পারে তা নিয়ে অনেকেরই প্রচণ্ড আগ্রহ আছে। এ বিষয় নিয়ে সংক্ষেপে এখানে একটু আলোচনা করা যেতে পারে। বিশেষ কোনো এনজাইম অ্যান্টিবায়োটিকের গাঠনিক সংকেতে (structure) এমন কোনো রাসায়নিক পরিবর্তন নিয়ে আসতে পারে যার কারণে অ্যান্টিবায়োটিক অকার্যকর হয়ে পড়ে।

এনজাইম দ্বারা স্ট্রেপ্টোমাইসিন রাসায়নিকভাবে এমনভাবে পরিবর্তিত হয়, যাতে করে প্রোটিন সংশ্লেষণ করার জন্য অ্যান্টিবায়োটিকটি রাইবোজোমের সঙ্গে যুক্ত হতে না পারে।

দ্বিতীয়ত, অনেক সময় জীবাণু এমন সব এনজাইম তৈরি করে যা অ্যান্টিবায়োটিকের গাঠনিক সংকেতকে ভেঙে দিতে সক্ষম। অ্যান্টিবায়োটিকের গাঠনিক সংকেত ভেঙে গেলে অ্যান্টিবায়োটিক নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। যেমন- বিটালেকটামেজ এনজাইম পেনিসিলিনেইজ পেনিসিলেনের বিটালেক্টাম রিংকে ভেঙে দেয়ার কারণে পেনিসিলিন অকার্যকর হয়ে পড়ে।

তৃতীয়ত, কোনো কোনো জীবাণু আছে যেগুলো জন্মগতভাবে অ্যান্টিবায়োটিকের প্রতি সংবেদনশীল নয়। যেমন- গ্রাম নেগেটিভ জীবাণুগুলোর কোষ প্রাচীর এমন জটিলভাবে তৈরি যার প্রতিবন্ধকতার বিরুদ্ধে অসংখ্য অ্যান্টিবায়োটিক কোনোভাবেই কার্যকর প্রভাব ফেলতে পারে না।

চতুর্থত, জেনেটিক মিউটেশনের (জিনের রাসায়নিক পরিবর্তন) মাধ্যমে অনেক জীবাণু অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন করে ফেলে। কোটি কোটি জীবাণুর মধ্যে যে কোনো একটি যদি মিউটেশনের মাধ্যমে পরিবর্তিত হয়ে যায়, সেই জীবাণু পরবর্তী সময়ে বংশবৃদ্ধি ও বিস্তারের মাধ্যমে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে।

এসব জীবাণু পরিবর্তিত জিনকে অন্য জীবাণুতে ট্রান্সফার করার মাধ্যমে রেজিস্ট্যান্স জীবাণুর ব্যাপক বিস্তার ঘটায়। এসব জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত কোনো রোগী তখন কোনো অ্যান্টিবায়োটিকের দ্বারা সংক্রমণমুক্ত হয়ে আরোগ্য লাভ করে না।

[ প্রিয় পাঠক, আপনিও বিডিসারাদিন24 ডট কম অনলাইনের অংশ হয়ে উঠুন। লাইফস্টাইল, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, রান্নার রেসিপি, ফ্যাশন-রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন- bdsaradin24@gmail.com-এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে। নারীকন্ঠ এবং মত-দ্বিমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে  bdsaradin24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরণের দায় গ্রহণ করে না। ]

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 18 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ
bdsaradin24.com