আজ শেলির বিয়ে

Print

কোথায় যেন পড়েছিলাম মেয়েদের ঘুম আসে না বিয়ের আগের রাতে। তীব্র উত্তেজনায়, অচেনা ভয়ে অথবা অদেখা সুখে! কী হবে কেমন হবে, কীভাবে হবে? অসংখ্য প্রশ্নচিহ্নর মাঝে ঘুমানো দায় হয়ে উঠে। কিন্তু আমার ঘুম আসছে। ভীষণ ক্লান্তির ঘুম। যেন অনেকদিন আমি ঘুমায় নি, বা সারাদিন প্রচুর খেটেছি এমন ক্লান্তির ঘুম। অথচ আজ সারাদিন তেমন কোন কাজই করি নি। আজ আমার গায়ে হলুদ হওয়ার কথা ছিল, মানে হয়ে গেছে। না কোনো ধুমধাম, না কোনো নাচগান, না কোনো হইচই না কোনো কেক কাটাকাটি। মা আর মামি মিলে দু ফোটা হলুদ লাগিয়েছে কপালে। একটা হলুদ রঙের শাড়ি পরে আয়নায় কয়েক মুহূর্ত দেখেছিলাম নিজেকে। একটু কাজল, হালকা পাওডারও লাগিয়েছিলাম গালে। মামাত বোনটি আড়াল থেকে মুচকি মুচকি হাসছিল। লজ্জায় ইচ্ছে করছিল পাওডার না কালি মাখি মুখে।

বড় বিরস এবং মলিন মুখে মা হাতে মেহেদি লাগিয়ে দিয়েছে। দু হাতে দুটা বড় বড় গোল ভরাট বৃত্ত।। আহা মায়ের মনটা বড় খারাপ। একমাত্র মেয়ে তাঁর। আচ্ছা আমি যখন চলে যাব, তখন মা কেমন থাকবে? যে রুম আমরা ভাগাভাগি করে থাকি, একই বিছানায় দুজনে শুই, সেখানে কাল থেকে মা একলা। কিন্তু আমি একলা ঘুমাব না। বড় হওয়া পর্যন্ত কোনওদিন একা ঘুমাই নি। বা একা বিছানা ভাগ্যে জুটে নি। থাকি আমরা মামার আশ্রয়ে, সেখানে প্রাইভেসি বলে কিছু থাকা অতিরঞ্জিত চাওয়া।

আচ্ছা একটা দিন যদি আমার জন্য পেতাম কেমন হতো? যেমন , সব কিছু একা একা করা। একা খাবো, যা খুশি খাবো। সবার খাওয়া শেষের অপেক্ষা করতে হবে না। সবার বিছানা ঠিক করে দিয়ে তবেই নিজের বিছানায় আসতে হবে না। একটা শুভ্র সাদা চাদর পাতা, নরম তুলতুলে বিছানায় ইচ্ছে মত গা এলিয়ে দিলে কেমন লাগত? একা একা ওই গলির মুখ পর্যন্ত হেঁটে গেলে কেমন লাগত?

যখনই বাইরে গেছি কেউ না কেউ ছিলই সাথে। স্কুলে যেতাম আশেপাশের মেয়েদের সাথে, এরপর কলেজ গিয়েছিলাম কয়েকদিন। মামাত বোনের সাথ একই রিকশায়। কিন্তু এরপর আর যাওয়া হয় নি। একদিন রাস্তায় এক ছেলে (ছেলে না ছোকরা, এদের ছোকরা শব্দে মানায়, ছেলে অনেক ভদ্র শব্দ) একটা কাগজ মুড়ানো ঢিল ছুঁড়ে। পড়েছিল মামাত বোনের গায়ে। উদ্দেশ্য ছিলাম আমি। সেই থেকে মামা সিদ্ধান্ত নিলো কলেজ বন্ধ। যেহেতু ছোকরারা বিরক্ত করবেই! বিরক্ত করতে করতে যদি আমি আবার পটে যাই! তাহলে তো বিপদ! মান তো আমারই যাবে, সাথে যাবে মামার সম্মান। থাক এরচেয়ে ঘরে থেকে মামিকে সাহায্য করাই বেশ নিরাপদ। মামা নিশ্চয়ই আমার খারাপ চাইবে না!?

সবার আগে ঘুম থেকে উঠার অভ্যাস। সবার জন্য চা আর গরম পানি রেডি করার অভ্যাস আমার। আজ আমি মরার মত ঘুমিয়েছি। মা নাকি দুবার ডেকেছে তাতেও আমার ঘুম ভাঙ্গে নি। হুট করে কানে গেল মামি যেন বলছে “আজকেও যদি ঘুমায় তাইলে শ্বশুরবাড়ি গিয়ে তো বদনাম হবে”

ও হ্যাঁ তো বদনাম করতে দেওয়া যাবে না। এখন ওটাই আমার বাড়ি। যেহেতু আমার নিজের কোনো বাড়ি নেই। সুতরাং যার সাথে বিয়ে হচ্ছে আজ থেকে ওটাই আমার বাড়ি। বাপের বাড়িও থাকে সবার। আমার তাও নেই। মামার বাড়ি আছে। যে বাড়ি আমার নয়, কখনই নয়। যদিও এখানে আমার শৈশব কেটেছে, কেটেছে কৈশোর, যৌবনে পা দিতেই এ জায়গা ছাড়তে হবে। আচ্ছা আমাকে কী নাইউর আনা হবে? অজান্তেই ঠোঁট বেঁকে গেলো আমার। অনাড়ম্বর বিয়েতে নাইয়র হয় না। বিদায় হয়।

এইতো আমার বিয়ের শাড়ি। বিয়ের গয়না। দু গাছি চুরি, এক জোড়া দুল , একটি চেইন। বাহ! আর কি চাই বৌ সাজতে। এতেই আমি খুব সাজবো। একবারই তো, শেষবার। আজ না সাজলে কখন সাজবো? শুনেছি সাপরা নাকি চামড়া পালটায়। আমিও আজ এক চামড়া খুলে আরেক চামড়া পরবো। এক জীবন শেষে আরেক জীবন বাঁচব।

গোলাপি জর্জেটের শাড়ি মাথার উপর লাল জরির ওড়না জড়িয়ে আমি বঁধু সেজে বসে আসি। লিপস্টিক দিয়েছি গাঢ় লাল, কাজল দিয়েছি মোটা করে। টিপ দিয়েছি বড়। আয়নায় সুন্দর লেগেছে নিজেকে। আমি সুন্দর। শ্যাম বর্ণে আমি সুন্দর। অল্প শিক্ষায় আমি সুন্দর। অনাধুনিকতায় আমি সুন্দর।

আমার যে হবু বর, যাকে আমি দেখেছি এক ঝলক এক কারেন্ট চলে যাওয়া সন্ধ্যায় তাঁকে আমি ভালবাসব। যেভাবে ভালোবাসে স্ত্রীরা। তাঁর আগের স্ত্রী মারা গেছে পাঁচ বছর আগে। বেচারা একা সামলে উঠতে পারছে না তাই আবার বিয়েতে রাজি হয়েছে। আহারে! তাঁর সব কাজ আমি করে দিবো। তাঁর কোনও অসুবিধা হতে দিবো না। শ্বশুর বাড়ির সবার মন জুগিয়ে চলবো। একজন আদর্শ বৌ হবো আমি। আদর্শ মেয়ে কাকে বলে জানি না। তবে আদর্শ স্ত্রী কাকে বলে জানি। আমাকে শেখানো হয়েছে। আমি মন দিয়ে শিখেছি। এ’ই যদি না শিখি তবে মা তো আশ্রয় হারাবে।

হবু বরের অপেক্ষায় কিছুক্ষণ বারান্দায় গিয়ে বসি। আমার ভীষণ আগ্রহ হচ্ছে কবুল বলার জন্য, তাড়াতাড়ি গাড়িতে উঠে অন্য একটা বাসায় চলে যাওয়ার জন্য। এক জীবন শেষের কয়েকটা মুহূর্ত আর সহ্য হচ্ছে না।

সামনাসামনি দালানে একটি ছেলে প্রায় আমাকে দেখে দাঁড়িয়ে থাকত বারান্দায়। আমিও দেখতাম ছেলেটিকে। ভাল লাগত । ছেলেটি আমাকে দেখত মলিন কামিজে। তবুও তাঁর চোখে স্নিগ্ধতা থাকত। এক আকর্ষণ নিয়ে আমি চলে যেতাম বারান্দায়। যখন সে তাকাত আমার দিকে আমি শিহরিত হতাম তাঁর দৃষ্টিতে। তাঁর ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসিতে খানিক লজ্জা পেতাম, বা পেতাম না। আমি শুধু জানতাম এই ছেলেটিকে আমার ভাল লাগে। জানতাম ছেলেটি ছোকরা নয়। ছেলেটি আমার বুকে কম্পন জাগাত। আমি সেই কম্পন ভালবাসতাম।

বরাবর বারান্দার দিকে তাকিয়ে আছি। আজ একবার আসুক। দেখুক বউ রূপে আমাকে। দেখুক একটু অন্যরকম সাজে। এক নতুন শেলিকে। ওই তো রুমের পর্দাটা ঠেলে কেউ আসছে। হ্যাঁ সে আসছে। ঠিক ঠিক অন্য দিনের মত তাকিয়ে একটু মুচকি হাসি। সেই দৃষ্টির স্নিগ্ধতা । যা শিহরণ জাগাত ভেতরে। আজো জাগায়। কিন্তু আজ কেন জানি বুকটা মোচড় দিয়ে উঠলো এই মুহূর্তে। একটা ব্যাথা কোথায় যেন কিছু ভেঙে দিচ্ছে ভেতরে। একটা প্রচণ্ড হাহাকার গলায় আটকে আছে। চোখ দুটি জালা করছে। কেন জানি ভীষণ তীব্র ভাবে ছেলেটিকে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করছে। একবার তাঁর উষ্ণতা নিতে ইচ্ছে করেছে।

একবার।আহারে একবার!

নীচে গাড়ির হর্নের আওয়াজ শোনা গেল। বর এসেছে।

খানিক আগে বয়ে যাওয়া বেওয়রা অনুভূতি গুলোকে মেরে ফেলে আমি উঠে দাঁড়াই। আমাকে যেতে হবে আমার প্রাণপ্রিয় হবু স্বামীটির কাছে। ঠোঁট নেড়ে ছেলেটিকে বললাম “যাই”

ছেলেটি কিছু বলল কিনা জানি না। কারণ ততক্ষণে আমি পেছন ফিরে গেছি।

  • ফারজানা নিলা
[ প্রিয় পাঠক, আপনিও বিডিসারাদিন24 ডট কম অনলাইনের অংশ হয়ে উঠুন। লাইফস্টাইল, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, রান্নার রেসিপি, ফ্যাশন-রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন- bdsaradin24@gmail.com-এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে। নারীকন্ঠ এবং মত-দ্বিমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে  bdsaradin24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরণের দায় গ্রহণ করে না। ]

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 169 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ
bdsaradin24.com