আনোয়ারার প্রাচীন প্রেম ও ইতিহাস।

Print

চারশ বছর আগের কথা প্রায়। তখন পার্বত্য চট্টগ্রাম নামের কিছু ছিল না। বন্দরের কিছু অংশ সহ দক্ষিণ চট্টগ্রাম আর পাহাড়ি এলাকাকে দেয়াঙ পরগনা বলা হত। এই দেয়াঙ এর কিছু অংশ ত্রিপুরার রাজা কিছু অংশ আরাকান রাজা আর কিছু অংশ মুঘলরা শাসন করত। আরাকান রাজসভার মহাকবি আলাওলের দ্বিতীয় মেয়ে ছুরত বিবির বিয়ে হয় দেয়াঙ পরগণার মুঘল অংশের দেওয়ান পরিবারের এক জমিদার বাড়ির ছেলে দেওয়ান আমির মোহাম্মদ চৌধুরীর সাথে। বছর দেড়েক পর ছুরত বিবির ঘর আলো করে আসে দুই ছেলে জাফর খাঁ আর মুজাফফর খাঁ। দেওয়ান পরিবার খুবই প্রজাবৎসল শাসক ছিল তাই এদের সুনাম ছিল দেশব্যাপী এমনকি দেশ ছাড়িয়ে দিল্লীর মসনদ পর্যন্ত। ছেলেরা একটু বড় হতেই মুঘল সম্রাট এদের ডেকে নেয় দিল্লীতে। হাজার লোক দিল্লীর রাজপথে দাঁড়িয়ে সম্মান জানিয়ে নিয়ে যায় এদের রাজপ্রাসাদে। ছেলেদের নবাবী সনদ দেয়া হয় মুঘলদের পক্ষ থেকে।
এবার আসি আরেক পরিবারে কথায়। মুঘল সম্রাট শাহাজাহানের ছেলে শাহ সুজার প্রধান সেনাপতি ছিল চট্টগ্রামের আনোয়ারা থানার প্রভাবশালী পরিবারের ছেলে শেরমস্ত খাঁ। আরাকান রাজ্যের অধীনে বর্তমানের কক্সবাজারের রামুতে চাকমাদের রাজা ছিলেন তিনি। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি চট্টগ্রাম দখলের আগে পর্যন্ত এই শেরমস্ত খাঁ আনোয়ারা থেকে কক্সবাজারের রামু পর্যন্ত এমনকি বান্দরবান আর রাঙ্গামাটি সহ বিশাল এক এলাকা শাসন করতেন। তাঁর অধীনস্থ অনেক ছোটখাট জমিদার ছিল সে সময়। শেরমস্ত খাঁর তিন ছেলেমেয়ে ছিল। একমাত্র ছেলে ছিল জবরদস্ত খাঁ। আর দুই মেয়ে ছিল বুড়াবিবি চৌধুরানী আর কালাবিবি চৌধুরানী। শেরমস্ত খাঁর মৃত্যুর পরে এই বিশাল সম্পত্তির মালিক হন তাঁর একমাত্র ছেলে জবরদস্ত খাঁ। এই জবরদস্ত খাঁর আরেক নাম ছিল মনুমিয়া। মনুমিয়া প্রভাব প্রতিপত্তিতে তাঁর বাবাকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল। এমনকি দিল্লী থেকে মুঘলদের অনেক বিশাল কামান এনে নিজের অস্ত্রশালায় রেখেছিল পর্তুগীজদের থেকে চট্টগ্রাম বন্দরকে সুরক্ষিত রাখার জন্য।
এবার আবার আগের ঘটনায় ফিরে যাই। মুঘল সম্রাট থেকে সদ্য নবাব খেতাব পাওয়া দেওয়ান পরিবারের দুই কিশোর নবাব ফিরে আসে দেশে। সাড়ম্বরে তাদের বরণ করে নেয়া হয়। মনু মিয়ার কানে আসে এই খবর। তাদের এই প্রতিপত্তি সহ্য হলোনা মনু মিয়ার। সে বিভিন্নভাবে তাদের কাজে বাঁধা দেয় শুরু করলো। এই দুই তরুণ নবাবের পক্ষে মনুমিয়ার প্রতিবাদ করা সম্ভব ছিল না তবু কোনমতে চালিয়ে যেতে লাগল। তখন মনু মিয়া আরেক ফন্দি করলো। তাঁর এক ঘনিষ্ট বন্ধু ছিল চট্টগ্রামের আরেক নবাব ইয়াসিন খান। এই ইয়াসিন খানের সাথে মিলে একরাতে দুই নবাবকে অপহরণ করে মনু মিয়া। এরপর তাদের আর পাওয়া যায়নি। কথিত আছে যে, সপ্তাহখানেক পরে দুই তরুণ নবাবের শরীর বিহীন কাটা মাথা পাওয়া যায় বর্তমান চট্টগ্রামের “কাটা পাহাড়” এলাকায়। এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে দেওয়ান পরিবার উন্মত্ত হয়ে উঠে কিন্তু তবু মনু মিয়ার কূট কৌশলের সাথে পেরে উঠেনা দেওয়ানরা। এক রাতে দেওয়ান পরিবারের ১৬ জন সদস্যকে মনু মিয়া এক মসজিদে কৌশলে এনে এক ছুরি দিয়ে জবাই দেয়। সেই থেকে ঐ গ্রামের নাম হয় ‘ষোলকাটা’ যা মুখে মুখে পরিবর্তিত হয়ে এখন “শোলকাটা” নামে পরিচিত। আনোয়ারার শোলকাটা গ্রামে ছুরত বিবির দীঘির দক্ষিণ পাশে গেলে এখনো সেই ১৬ জনের ভেতর ১২ জনের কবর দেখা যাবে। এই গ্রামে গেলে এখনো কালা বিবির দীঘি, মনু মিয়ার বাড়ি, মনু মিয়ার মসজিদ আর দীঘি দেখতে পাবেন। মনুমিয়ার মুঘল আমলের ৬ ইঞ্চি মোটা ইটের দেয়ালের বাড়ি সংরক্ষণের অভাবে এখন বিলুপ্তপ্রায় কিন্তু মসজিদটি এখনো দৃষ্টি নন্দন। ১৯৮০ সালে মনু মিয়ার বাড়ির পেছনের গেইটের মাটির নিচ থেকে ৩ টন ওজনের এক মুঘল কামান উদ্ধার করা হয় যা এখন নৌবাহিনীর যাদুঘরে সংরক্ষিত আছে।
আনোয়ারার পাশের উপজেলা বাঁশখালি। এটা মনুমিয়ার অধীনে ছিল সে সময়। নিজের নিঃসন্তান স্ত্রী খোরশা বানুকে ঘরে রেখে একদিন মনু মিয়া বাঁশখালির সরল গ্রামের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন জমিদারী তদারকির জন্য। পথে ক্লান্ত হয়ে এক মাদ্রাসার পাশে পাইক পেয়াদা নিয়ে বিশ্রাম করতে বসেন। একটু পরে মাদ্রাসা ছুটি হয়। হঠাৎ এক অপুর্ব সুন্দরী ছাত্রীর উপর চোখ আটকে যায় মনু মিয়ার। মাদ্রাসার হুজুরকে ডেকে জিজ্ঞাসা করেন এই মেয়ের ব্যাপারে। হুজুর বলেন এটা এই গ্রামের বিখ্যাত সওদাগর আমির মোহাম্মদ চৌধুরীর একমাত্র কন্যা মলকা বানু। মলকা ছিল আমির মোহাম্মদের ৮ সন্তানের ভেতর একমাত্র কন্যা। অসাধারণ সুন্দরী মলকার প্রেমে পড়ে মনু। দুই দিন পর পর ছুটে আসতো মাদ্রাসার প্রাঙ্গনে তাকে দেখার জন্য। একদিন হুজুরের মাধ্যমে মলকার বাবাকে বিয়ের প্রস্তাব দেয় মনু মিয়া। বাবা আমির মোহাম্মদ এককথায় রাজি। কিন্তু মলকা রাজি হয়না। সে জানে শ্বশুর বাড়ি যেতে হলে শঙ্খ নদী পাড়ি দিতে হবে আর এই পানিকে তাঁর প্রচন্ড ভয়। এই কথা শুনে মনু মিয়া বর্ষায় উন্মত্ত শঙ্খ নদীতে হাজার হাজার লোক দিয়ে বাঁধ বানালেন। বাধের উপর বানালেন মসৃণ রাস্তা। তারপর বিশাল জাঁকালো বহর নিয়ে মলকাকে নিয়ে আসেন শ্বশুর বাড়ি। একমাত্র মেয়ের অভাবে বাবা আমির মোহাম্মদ এর বুকে শূন্যতা। মেয়ের স্মরণে বাবা সরল গ্রামে নির্মান করেন মলকা বানুর দীঘি আর মসজিদ। এই দুই স্মৃতি একনো সগর্বে টিকে আছে বাঁশখালির সরল গ্রামে। কথিত আছে প্রভাবশালী জমিদার মনু মিয়া ১ মাস ধরে বিয়ের অনুষ্ঠান চালিয়েছিল। দূর দূরান্ত থেকে শিল্পীরা, বাদ্যবাদক আর নর্তকীরা এসেছিল এই অনুষ্ঠানে। সেই অনুষ্ঠানের গান-
“মলকা বানুর দেশেরে, বিয়ার বাদ্য বাজনা বাজেরে…
মলকা বানুর সাত ভাই, অভাইগ্যা মনুর কেউ নাই
মলকার বিয়া অইব মনু মিয়ার সাথেরে
মনু মিয়ার দেশেরে জোড়ের খাড়া বাজেরে
যাইবরে মনু মিয়া হাউসের মলকার দেশেরে
মনু মিয়া লইল সাজ, মাথায় দিল সোনার তাজ
মনু মিয়া যাইবরে মলকা বানুর দেশেরে……”
শত বছর ধরে চট্টগ্রামের সব বিয়ের অনুষ্ঠানে এই গান গাওয়া হত। আস্তে আস্তে বাংলা দেশের সব অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে বিয়ের গান হিসেবে এই গান। এই আধুনিক প্রজন্ম না জানলেও আমাদের আগের প্রজন্মে এই গান জানেনা এমন কোন প্রবীণ বা বৃদ্ধ হয়তো পাওয়া যাবেনা।
মনু মিয়ার কপাল ছিল খারাপ। দ্বিতীয় স্ত্রী মলকার ও কোন সন্তান হয়নি। মৃত্যুর আগে তাঁর সম্পত্তি দুই ভাগ করে মনু মিয়া একভাগ তাঁর বোন কালাবিবিকে আর একভাগ তাঁর দুই স্ত্রীকে ভাগ করে দিয়ে যায়। কালাবিবির স্বামীর নাম ছিল রুস্তম আলী খাঁ যার নামে চট্টগ্রামের বিখ্যাত রুস্তম হাট চালু হয়। মনুর প্রথম স্ত্রী খোরসা বিবি পরে সীতাকুন্ডের কাজী বদিউজ্জামানকে বিয়ে করেন। এটা বদিউজ্জামানের দ্বিতীয় বিয়ে। এই বদিউজ্জামানকে কিছু সূত্রে চট্টগ্রামের কাট্টলীর জমিদারের দেওয়ান বলা হয়েছে। খোরসা বিবির সাথে তাঁর এই ঘরে কোন সন্তান ছিল না। শোলকাটায় মনুমিয়ার বেঁচে থাকা বংশধরেরা বলে খোরসাবিবি বদিউজ্জামানের নামে বিয়ের আগেই সম্পত্তি লিখে দেয় এবং বিয়ের আগের রাতেই মারা যায় খোরসা বিবি। এরপরে বদিউজ্জামানের প্রথম ঘরের মেয়ে আর মেয়ের জামাইরা এসে এই শোলকাটায় বসতি স্থাপন করে।
মলকা বানুর ভাগে কক্সবাজার এলাকার অংশটুকু পড়ে। কিছু সূত্র থেকে পাওয়া যায় মলকা বানু মনু মিয়ার পরে আবদুল হালিম নামে একজনকে বিয়ে করেন এবং সে ঘরে তাজুন্নিসা নামের এক মেয়ের জন্ম হয়। এরপরে মেয়েকে নিয়ে কক্সবাজারের খুরস্কুল নামের জায়গায় থাকতেন মলকা। তাজুন্নিসার ছেলে আশরাফ চৌধুরী। আশরাফ এর ছেলে মোজাফফর আহমেদ চৌধুরী এবং মোজাফফরের ছেলে মমতাজ আলী চৌধুরী। মমতাজ আলী ছোট থাকা অবস্থায় মোজাফফর আলী চৌধুরী হজ্ব করতে যাবার পথে মারা যান ১৯৩২ সালে। মৃত মোজাফফরের দ্বিতীয় স্ত্রী কিছু বংশানুক্রমিক প্রাপ্য কিছু সম্পত্তির জন্য মামলা করে ট্রেজারি থেকে অনেক মূল্যবান সম্পত্তি নেন।

মনু মিয়া যেমন কুটিল ছিলেন তেমনি প্রেমিক ও ছিলেন। তবে শতবছর ধরে মনু মিয়ার প্রেমের গল্পই টিকে আছে। যদিও হাজার লক্ষ প্রেমের গল্পে মনু আর মলকা সমান্য একটা অংশ তবু ইতিহাস একেই বেছে নিয়েছে। ইতিহাসই একে টিকিয়ে রাখবে হয়তো চিরকাল।

তথ্যসূত্রঃ দেয়াং পরগনার ইতিহাস
লেখকঃ জামাল উদ্দীন

[ প্রিয় পাঠক, আপনিও বিডিসারাদিন24 ডট কম অনলাইনের অংশ হয়ে উঠুন। লাইফস্টাইল, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, রান্নার রেসিপি, ফ্যাশন-রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন- bdsaradin24@gmail.com-এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে। নারীকন্ঠ এবং মত-দ্বিমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে  bdsaradin24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরণের দায় গ্রহণ করে না। ]

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 330 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ
bdsaradin24.com