আন্তর্জাতিক No Bra Day ( নো ব্রা ডে) মানে ব্রা ছাড়া একটা দিন

Print

শিরোনাম দেখেই যারা ‘নারীবাদী নেকড়ে’ বলে তেড়ে আসবেন ভাবছেন, অথবা যারা এই ভাদ্র মাসের শেষেও ঠোঁটে লালা ঝুলিয়ে রগরগে যৌনতা পূর্ণ একখানা লেখা পড়ার আশায় লেখাখানা স্ক্রল করছেন, কিংবা যারা এই আশায় বসে আছেন নো ব্রা ডে মানেই মেয়েরা ব্রা খুলে উন্মুক্ত বুকে রাস্তায় প্যারেড করবে, ব্রহ্মা আল্লা যীশু অচিরেই যেন তাদের নিজের কাছে ডেকে নেন, এই কামনা করে বিশদে শুরু করছি।

No Bra Day । মানে ব্রা ছাড়া একটা দিন। কেন ব্রা ছাড়া একটা দিন?? স্তন ক্যান্সার শব্দটার সাথে সবাই পরিচিত আছেন। অনেকেরই পরিবারের কোন মহিলা নিকটাত্মীয় এই অসুখে ভুগে মারা গেছেন বা কিছু ক্ষেত্রে সারভাইব ও করেছেন। এবং ইদানীং কালের কিছু সমীক্ষা অনুযায়ী স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দিন কে দিন বাড়ছে। ১৫ থেকে ৪৪ বছর বয়সী মহিলাদের প্রতি ৮ জনের মধ্যে ১ জনের তার জীবদ্দশায় স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই ২০১৫ সাল থেকে অক্টোবর মাস টি স্তন ক্যান্সার সম্পর্কে সকলের মাঝে সচেতনতা গড়ে তুলতে উদযাপিত হয়ে আসছে। এবং ১৩ ই অক্টোবর দিনটি নো ব্রা ডে হিসেবে পালিত হচ্ছে। উদ্দেশ্য এই একটা দিন যাতে মহিলারা ব্রা খোলে নিজের স্তন পরীক্ষা করেন, যত্ন নেন। স্তন ক্যান্সারের লক্ষণসমূহ সম্পর্কে নারীদের সচেতন করতেই এই উদ্যোগ। এই দিনে সমস্ত নারীকে আহ্বান জানানো হয় সারা দিন ব্রা না পরেই স্বাভাবিক কাজকর্মে অংশ নিতে। আর কেউ যদি ব্রা না পরতে অস্বস্তি বোধ করেন তাহলে যেন অন্তত পার্পল রঙের পোশাক পরেন সহযোগীতা, একাত্মতা জানাতে। পুরুষদেরও আহ্বান করা হয় এই রঙের পোশাক পরতে এই দিনটাতে।

অনেকেই ভাবেন বেশী সময় ধরে ব্রা পরলে, টাইট ব্রা পরলে, অথবা রাতের বেলায় ব্রা পরে ঘুমালে স্তন ক্যানসার হতে পারে। এই ধারনা ভ্রান্ত কিনা এখনই বলতে পারবো তবে স্তন ক্যান্সারের সাথে ব্রা পরার সম্পর্কের কোন বৈজ্ঞানিক ভিত্তি এখন অব্দি আবিষ্কার হয়নি। ৯০’র দশকে একটি গবেষণায় প্রাথমিকভাবে ব্রাকে স্তন ক্যানসারের ঝুঁকির জন্য কিছুটা দায়ী বলে মনে করা হলেও পরবর্তীতে সেটার গুরুত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। এবং বৈজ্ঞানিকভাবে সেটা প্রমাণ করাও যায়নি। কেন যায়নি, তার ইতিহাস লিখতে গেলে লেখা দীর্ঘ হবে। বরং যাদের মনে এই প্রশ্ন আসবে তারা গুগোল দেখে নিতে পারেন বা কিছু বই সাজেস্ট করতে পারি।

মোদ্দা কথা হল, ব্রা’র সাথে স্তন ক্যান্সারের সরাসরি যোগ না থাকলেও, ব্রা’র বিভিন্ন ক্ষতিকারক দিক আছে। সারাদিন ব্রা পরে থাকলে, টাইট ব্রা পরলে, রাতে ঘুমোনোর সময় ব্রা পরলে, স্কিন র্যাশ থেকে ইনফেকশন সব-ই হতে পারে। সবচেয়ে বড় কথা, তৃতীয় বিশ্বের গরীবগুর্বো আমরা ছোটবেলা থেকে ব্রা সম্পর্কে ভুল ধারনা নিয়ে বড় হই। তার কারন আমাদের মা-বাবা-দিদিরা এই বস্ত্র পরিধানের সঠিক নিয়ম আমাদের বলে দিতে পারেন না। কেননা এই তৃতীয় বিশ্বে, বিশেষত এই উপমহাদেশে মহিলাদের সমস্ত পোষাক ই ট্যাবু, লজ্জা, অশ্লীল, লুকিয়ে রাখার জিনিষ। তা জনসমক্ষে বের করতে দেওয়া হয় না। স্নানের পর ব্রা ধুয়ে রোদে মেলে দেওয়ারও উপায় নেই। সেটা অন্য কাপড়ের নীচে ঢুকিয়ে মেলে দিতে হয় যদি কোন পুরুষ দেখে ফেলে সেই ভয়ে। এবারে ভয় তো আর এমনি এমনি আকাশ থেকে পড়ে না! তারও কারন থাকে। এইক্ষেত্রে কারন হলো এই সমাজব্যবস্থা, পুরুষদের অশ্লীল রসিকতা, ফ্যান্টাসি। তাই লজ্জা। তাই লুকোনো। এবারে ভাবুন রোদে না শুকানো একটা আধভেজা বস্ত্র কি পরিমাণে আনহাইজেনিক হতে পারে?? সেই আনহাইজেনিক বস্ত্র থেকে কি কি রোগ হতে পারে?? আজ্ঞে, আমাদের দেশের শতকরা ৮০ ভাগ মহিলা, কিশোরী এইরকম আনহাইজেনিক কাপড় পরে সারাজীবন কাটান।

দ্বিতীয়ত, সাইজ। এই উপমহাদেশের শতকরা ৮০ ভাগ কিশোরী মেয়ে তার ব্রা’র সাইজ জানে না। কারন তাকে কেউ সাইজ বোঝার মতো করে বিষয়টি ব্যাখ্যা করে দেয় না। কারন ট্যাবু। কারন লজ্জা। মেয়েতে মেয়েতে বলতেও লজ্জা। ফলত নিজের মতো করেই টাইটীব্রা পরে দম আটকানো অবস্থায় সে স্কুল, বাড়ি, টিউশন যাচ্ছে। আরেকটা কারনও আছে টাইট ব্রা পরার ক্ষেত্রে। প্রত্যেকটা মেয়েরই যখন কিশোরীবেলা থেকে স্তনের আকার একটু একটু করে বাড়তে থাকে, তখন তাকে এই সমাজ ব্যবস্থা, টিভি, মিডিয়া বোঝায় স্তনকে যতো সুডোল, আটসাট করে পারবে ততোই সে আকর্ষণীয়। ঠিক যেভাবে ফেয়ারনেস ক্রিম দিয়ে বোঝানো হয় ফর্সা হওয়াই একটা মেয়ের জীবনের আল্টিমেট গোল। তার মেধা, বুদ্ধি, প্রজ্ঞা না থাকলেও হবে। রঙ ফর্সা হলেই কেল্লা ফতে। ঠিক সেইভাবে আকর্ষণীয়, উন্নত, সুডোল, স্তন হলেই সে সেক্সি। সুন্দর। ছেলেরা ঘুরঘুর করবে পিছনে। ইত্যাদি। নাহলে বডি শেমিং এর শিকার করা হবে তাকে। এই সেদিন ফেইসবুকেই দেখলাম জওহরলাল নেহেরু ইউনিরভার্সিটির ছাত্রী ঐশী’র স্তন নিয়ে নোংরা মিম। এই যখন সমস্ত সমাজ, রাষ্ট্রের চিত্র, নিজেকে আকর্ষণীয় করে তুলতে মেয়েটি তাই টাইট ব্রা পরছে, সাথে ভয়ঙ্কর সব অসুখের ঝুঁকি নিয়ে জীবন কাটাচ্ছে।

অথচ মানুষ হিসেবে প্রত্যেকটা মেয়ের উচিৎ ব্রা’র সঠিক ব্যবহার জানা। এর ক্ষতিকারক দিক জানা এবং এর ব্যাপারে সতর্ক হওয়া! সারাদিন ব্রা পড়ে থাকা কিংবা রাতের বেলা ব্রা পড়ে থাকা যে অত্যন্ত ক্ষতিকারক, সেটা বোঝা। অন্তর্বাস রোদে শুকানো অত্যন্ত জরুরী, সেটা জানা। এবং সর্বোপরি, স্তন বা পেনিসের সাইজের উপর একজন মানুষের মেধা, প্রজ্ঞা, বুদ্ধি, শিক্ষা, রুচি, সংস্কৃতি, মানবিকতা কিছুই নির্ভর করে না, এটা মাথার ভিতরে গেঁথে নেওয়া। বিশাল স্তন বা ছোট স্তন মানুষকে মানুষ করে তোলে না, বরং তার চিন্তা, প্রজ্ঞা তাকে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে, আকর্ষণীয় করে তোলে এটা বোঝা খুব জরুরী। তাই প্রতিবছর নো ব্রা ডে। তাই এই দিনটা প্রত্যেক মহিলার তার শরীর সম্পর্কে সমস্ত লজ্জা, অশূচীতা, ট্যাবু সব ঘোচাবার দিন। মহিলাদের নিজের শরীর সম্পর্কে সচেতন হওয়ার দিন। ট্রেন্ড ভুলে, ফ্যাশন ভুলে, নিজের শরীরকে ভালোবাসার দিন। সম্মান করার দিন।

এবারে হয়তো কোন অতি আঁতেল এসে যুক্তি দেবেন , ‘এখন যদি পুরুষরা “নো জাঙ্গিয়া দিবস” পালন করে তাহলে কেমন হবে? উত্তর হলো, অবশ্যই পালন করুন। পেনিস শুধু জনি সিন্সের মতো দেখানোর জিনিষ নয় বা মহিলাদের নির্যাতন করার অস্ত্র নয়, কিংবা শুধু সন্তান জন্ম দেওয়ারও অঙ্গ নয়। এবং অবশ্যই মধ্যরাতে মেয়েদের ইনবক্সে সেটার ছবি পাঠানোরও বস্তু নয়। সেটা আপনার শরীরের ই একটা অঙ্গ। তাই একে হাইজিন রাখা, সুস্থ রাখা, কোন রোগ ব্যাধি না হতে দেওয়া আপনাদের দায়িত্ব। নিজের শরীরকে ভালোবাসুন, সম্মান করুন, দেখবেন অন্যের শরীরকেও সম্মান করতে শিখে গেছেন। অন্যের শরীরকে আর পাপ, লজ্জা, ট্যাবু, লুকিয়ে রাখার জিনিষ মনে হচ্ছে না।

 

লেখক>> সুমনা চৌধুরী

[ প্রিয় পাঠক, আপনিও বিডিসারাদিন24 ডট কম অনলাইনের অংশ হয়ে উঠুন। লাইফস্টাইল, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, রান্নার রেসিপি, ফ্যাশন-রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন- bdsaradin24@gmail.com-এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে। নারীকন্ঠ এবং মত-দ্বিমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে  bdsaradin24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরণের দায় গ্রহণ করে না। ]

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 119 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ
bdsaradin24.com