ইভটিজিং এর একাল সেকাল

Print

জেসমিন চৌধুরী:

আমারাও কিন্তু স্কুল/কলেজ জীবনে ইভটিজিং এর শিকার হয়েছি, কিন্তু এখন যেসব ঘটনার কথা শুনি সেগুলোর তুলনায় আমাদের অভিজ্ঞতাকে বরং বেশ কাব্যিক মনে হয়।

আমি রিক্সা করে একা শহরের স্কুলে যেতাম। শিবগঞ্জ থেকে একটা ছেলে মোটর বাইকে করে আমাকে ফলো করত। তার পেছনে বসা থাকত বাচ্চা একটা ছেলে। খানিকটা এগিয়ে গিয়ে সে বাইক থামিয়ে অপেক্ষা করত, আমার রিক্সা কাছাকাছি এলে আবার কিছুক্ষণ পাশাপাশি বাইক চালিয়ে যেত। পেছন থেকে বাচ্চাটা ‘ভাবী, ভাবী’ বলে ডাকত। সিলেট তামাবিল সড়ক তখন দুপুর বেলায় একেবারেই নির্জন, হঠাত দুই একটা বেবি ট্যাক্সি অথবা ট্রাক ছাড়া তেমন কোনো যানবাহন চলাচল করত না। এই ছেলেগুলো চাইলেই আমার সাথে যা ইচ্ছে তা করতে পারত, কিন্তু দুষ্টুমিটা ঐ ভাবী ডাকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। তবু ভয় লাগত খুব।

আব্বাকে ঘটনাটা বলার পর স্কুলবাসে যাতায়াতের ব্যবস্থা করা হলো। কষ্ট বেড়ে গেল অনেক। একই বাসে শহর থেকে পূর্ব/পশ্চিম/উত্তর/দক্ষিণে চারটা ট্রিপ দেয়া হতো। ফার্স্ট ট্রিপ আমাদের দিকে পড়লে ভোরে উঠে স্কুলে যেতে হতো, আবার লাস্ট ট্রিপের সময় বাড়ি ফিরতে সন্ধ্যা হতো। অর্থাৎ স্কুল শুরুর আগে এবং পরে কয়েক ঘন্টা সময় স্কুলেই কাটাতে হতো, বাসায় ফিরতাম প্রচণ্ড ক্লান্ত হয়ে। প্রায়ই পথে বাস নষ্ট হয়ে যেত, আমরা মেয়েরাই অনেক সময় নেমে বাস ঠেলে ইঞ্জিন স্টার্ট দিতে সাহায্য করতাম। অনেক সময় বাস আর ঠিকই হতো না, তখন রিক্সা নিয়েই বাড়ি ফিরতে হতো।

বাস শিবগঞ্জ দিয়ে যাওয়ার সময় একদিন খেয়াল করলাম সেই ছেলেটা একটা ফার্মেসিতে বসে আছে। আমি তাকাতেই তার সাথে চোখাচোখি হয়ে গেল। ব্যস, এবার শুরু হলো বাসকে নিয়মিত ফলো করা। সাথের মেয়েদেরকে একথা আমি কখনোই বলিনি। বিষয়টাকে আমার নিজের জন্যই লজ্জাজনক মনে হতো। তখনকার সেই আমি এই আমার মত ছিলাম না।

কলেজে যখন ভর্তি হলাম তখন আমি অনেক সাহসী হয়ে উঠেছি। শুধু নিজের নয়, অন্যের প্রতি নির্যাতনের প্রতিবাদেও মুখর হয়ে উঠতে শুরু করেছি। একদিন ট্যাম্পুতে করে কলেজে যাচ্ছি, মিরাবাজারের কাছাকাছি এসে ট্যাম্পু আর এগোতে পারছে না। রাস্তায় কিছু একটা ঝামেলা হয়েছে, সবাই ভীড় করে দেখছে। উঁকিঝুঁকি দিয়ে দেখি কয়েকটা ছেলে একটা রিক্সাওয়ালাকে হুমকি ধামকি করছে, ভাড়া নিয়ে ঝগড়া। হঠাত ছেলেগুলো রিক্সাওয়ালাকে পেটাতে শুরু করল। জনতা নীরবে দেখছে, কেউ কিছু বলছে না। আমি ট্যাম্পু থেকে নেমে গিয়ে ছেলেগুলোর মুখোমুখি হলাম, ‘গরীব লোকটাকে এতোজন মিলে পেটাচ্ছেন, আপনাদের লজ্জা করে না?’ এইটুকু বলার সাহস সঞ্চয়ের পরিশ্রমে আমি তখন রীতিমত হাঁপাচ্ছি, গলা ভেঙ্গে যাচ্ছে, চোখে পানি এসে গেছে। তবু লোকগুলো ভড়কে গেল। সিলেটের মত রক্ষণশীল একটা শহরে বাচ্চা একটা মেয়েকে এভাবে রাস্তায় নেমে পুরুষদের মোকাবেলা করতে সেই সময়ে কেউ খুব একটা দেখেনি। এবার নীরব দর্শকদেরও বিবেক জেগে উঠল, অনেকেই রিক্সাওয়ালার পক্ষ নিয়ে কথা বলতে শুরু করল।

কলেজে আমি বন্ধুদের অভিভাবকে পরিণত হলাম। আমার অসম্ভব সুন্দরী বন্ধুটি একদিন কেঁদে চোখমুখ লাল করে কলেজে ঢুকল। একটা ছেলে তাকে ফলো করে কলেজ গেট পর্যন্ত এসেছে এবং গান গেয়েছে, ‘তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি প্রিয়, সে কি মোর অপরাধ?’ একটা ছেলে একটা মেয়েকে এমন একটা গান গেয়ে শোনাতেই পারে, কিন্তু মেয়েটা যদি এতে ভয় পায়, তাহলে তো একশন নিতেই হয়? আমি রেগেমেগে লাল হয়ে ছেলেটাকে ধরতে বের হলাম, সে আমাকে দেখে পালিয়ে গেল।

আরেকদিন আমরা জিন্দাবাজার পয়েন্টের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি। হঠাত কে যেন আমার নাম ধরে ডাকল, ‘এই জেসমিন!’ শব্দটা আসছিল একটা মার্কেটের দোতলা থেকে। তাকিয়ে দেখলাম কেউ নেই। দুই পাড়া হাঁটতেই আবার ডাক। এবার দ্রুত তাকালাম, ছেলেটা মুখ লুকাবার আগেই ধরা পড়ে গেল। আমি দুমদাম সিঁড়ি বেয়ে দোতলার ফটো স্টুডিওটার সামনে গিয়ে হাজির হলাম। আমাকে দেখে ছেলেটা কোন দিকে পালাবে ভেবে পেল না।

‘ডাকছ কেনে?’
‘ডাকছি না তো।’
‘অয় ডাকছ, আমরা আইছি, এখন কও ঘটনা কিতা?’

ছেলেটা মাফ চেয়ে বলল আর কোনদিন এমনটা করবে না। আমরা বিজয়ীর হাসি হেসে চলে এলাম।

এখনকার সময় হলে হয়তো এই ছেলেগুলোর কেউ একজন আমাকে পরে খুঁজে বের করে কুপিয়ে মারত।

[ প্রিয় পাঠক, আপনিও বিডিসারাদিন24 ডট কম অনলাইনের অংশ হয়ে উঠুন। লাইফস্টাইল, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, রান্নার রেসিপি, ফ্যাশন-রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন- bdsaradin24@gmail.com-এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে। নারীকন্ঠ এবং মত-দ্বিমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে  bdsaradin24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরণের দায় গ্রহণ করে না। ]

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 502 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ
bdsaradin24.com