এভাবেই কি ধ্বংস হবে আমাদের প্রানের ক্রিকেট?

Print

ঠিক এক বছর আগে বাংলাদেশ যখন শ্রীলংকা সফরে যায় তখন তিন ফরম্যাটে সিরিজ ড্র করেছিলো বাংলাদেশ। দশ মাস পরে ঘরের মাঠে সেই বাংলাদেশ যেন এক অচেনা দল, দলটা যেন ফিরে গিয়েছে সেই বিশ্বকাপের আগের অবস্থায়।

পার্থক্য কোথায়? পার্থক্য মানসিকভাবে পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। কোথাও কোন পরিকল্পনা নেই, সেটা গেম প্ল্যানে নেই, একাদশ নির্বাচনে নেই, নেই উইকেটের রেসিপিতে!

বলা হয়েছিলো হাথুরুসিংহের কড়া কোচিং সিস্টেমে প্লেয়াররা অখুশি ছিলো। কিন্তু এখন তারা পূর্ন স্বাধীনতা নিয়ে খেলেই বা কি হচ্ছে? নেই সঠিক গেম প্ল্যান, এলোমেলো বোলিং, ব্যাটিং। বাহির থেকে দিব্যি বোঝা যাচ্ছে টিম ম্যানেজমেন্টের ভেতরের অবস্থাও ভালো না। খালেদ মাহমুদ সুজন সরাসরি প্লেয়ারদের দায়ভার দিয়েছিলেন টেস্ট সিরিজের পর।

এটাও বলেছিলেন হাথুরুসিংহের বিদায়ের জন্য অনেক কিছু মিডিয়া প্রতিষ্ঠা করেছিলো। আমিও তাই বিশ্বাস করি, যত কথা ছড়ানো হয়েছিলো তার অনেক কিছুই বানানো, মনগড়া। যেমন তেমন হোক হাথুরুসিংহে সাউথ আফ্রিকা সিরিজের আগ পর্যন্ত ফলাফল পাচ্ছিলেন। ওই সাউথ আফ্রিকা সিরিজের রিপোর্ট তিনি যখন দিলেন তখনই বলেছিলেন প্লেয়াররা দ্বায়িত্ব নিয়ে খেলছেন না, এতো খারাপ ফলাফল হবার কথা না।

একই কথা কি সুজন বলেননি? মানছি সুজন হাই প্রোফাইল কোচ না, কিন্তু দলের সাথে থেকে এটাতো বুঝেন দলটা শতভাগ নিবেদিত কিনা খেলার প্রতি? এই যে প্রায় সব সিরিজেই তামিমের “অদ্ভুত ভূতুড়ে” ইনজুরি হয়, আবার এক ম্যাচ পরেই ঠিক হয়ে যায়। শ্রীলংকা, সাউথ আফ্রিকার শুনেছিলাম চান্দিকার সাথে “অভিমান”, ব্যাট ছুড়ে মারা আর এবার বাতাসে গুঞ্জন “অধিনায়কত্ব” নিয়ে অভিমান?

যাই হোক মাঠের খেলার চেয়ে আমার কাছে এসবই বড় সমস্যা মনে হচ্ছে। অতিরিক্ত স্বাধীনতাই কি সমস্যা? আপনার পিচ যেমনই হোক বোলাররা ইয়র্কার কেন মিস করবে? বাউন্সার দিতে যেয়ে লুজ শর্ট বল কেন দিবে? গ্রাউন্ড ফিল্ডিং কেন খারাপ হবে? ক্যাচ কেন পড়বে? এগুলাতো তখন হয় যখন প্লেয়ারদের মন খেলার ভেতরে না, মাঠের বাইরের বিষয়ে বিক্ষিপ্ত থাকে!

ঢাকা টেস্টের উইকেট যদি বলেন, এটাতো হুবহু হাথুর রেসিপি মেনে অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ডের সাথে বানানো উইকেট! কেন? আজ তিন মাসের উপর সময় চলে গেছে কোচ চলে গিয়েছেন, বর্তমান ম্যানেজমেন্ট ভিন্ন কিছু কেন চিন্তা করেনা? চিটাগাং এর উইকেট আর ঢাকায় এতো পার্থক্য! প্রথমে ভেবেছিলাম স্পোর্টিং উইকেট হয়তো সম্ভব না মিরপুরে।

টানা ম্যাচে উইকেটের রেস্ট হয়না। কিন্তু সুজনের বক্তব্য শুনে আর প্রথম টি-টুয়েন্টির উইকেট দেখে আমি শতভাগ নিশ্চিত দোষ উইকেট বা গামিনি ডি সিলভার না, দোষ ম্যানেজমেন্টের, তারা ওইরকম স্পিনিং উইকেট চেয়েছিলো! শ্রীলংকার স্পিনারদের পাত্তাই দিয়েছিলো না!

টি-টুয়েন্টি সিরিজের দিকে যদি তাকাই, মনে হবে যেন গনহারে অভিষেক দেয়ার জন্যেই ছয়জনকে আনা হয়েছিলো। নতুন প্লেয়ার এনে এই ফরম্যাটে পরীক্ষা চালানোর সবচেয়ে বড় সাপোর্টার মনেহয় আমি নিজেই। তবুও জাকির আর মেহেদি হাসানের অভিষেক আমার কাছে প্রচন্ড অপেশাদার আচরন মনে হয়েছে। এদের অভিজ্ঞতা কি! কয় সিজন! কয় বিপিএল! আরিফুল, অপু, রাহি ঠিক আছে।

অবস্থা বিবেচনায় আফিফকে যদি খেলাতেই হয়, তাহলে এক ম্যাচ পরেই বসিয়ে দেয়ার কোন মানে হয়না। প্রথম ম্যাচেও জাকিরের জায়গায় মিথুনকে নেয়া উচিৎ ছিলো। এটা কি সবাইকে এক ম্যাচ করে সুযোগ দিয়ে খুশি করার চেষ্টা ছিলো? রাহিকে প্রথম ম্যাচেই খেলানো উচিৎ ছিলো, সাতজন ব্যাটসম্যান যথেষ্ঠ আমি প্রথম ম্যাচেই লিখেছিলাম। সেই ম্যাচে না নিয়ে নিলো আজকে। অবশ্যই রুবেল সেরা খেলাটা দেয়নি আগেরদিন কিন্তু তবুও এতো অনভিজ্ঞ বোলিং নিয়ে নামটা কতখানি পেশাদার আচরন?

প্রতিটা ব্যাটসম্যানের বিপক্ষে ওদের নিখুঁত পরিকল্পনা ছিলো। যার ব্যাটের দিকে সবাই চেয়ে থাকে সেই সৌম্যকে কিভাবে ওয়াইড বল খেলতে ফোর্স করা হলো! জাস্ট মানসিকভাবে চাপে ফেলে। মুশফিক মনেহয় স্বাভাবিক ফর্মে ফিরেছে এই ফরম্যাটের। নিরীহ শর্ট বলটা কোন নিয়ন্ত্রন ছাড়াই মিড অনে তুলে দিলো। তামিমের উইকেট সেটাও পরিকল্পনা করেই নেয়া।এগুলা একজন মাস্টার মাইন্ডার, একজন দুর্দান্ত টেকনিক্যাল মানুষের কাজ।

দ্বায়িত্ব নিয়ে চান্দিকা শ্রীলংকার প্লেয়ারদের টেকনিক বদলে ফেলেননি। তিনি যেটা করেছেন পজিটিভ মানসিকতা আর আক্রমনাত্বক ক্রিকেটের মন্ত্র ঢুকিয়ে দিয়েছেন। ভারত সফরে বাদ পড়া কুশল মেন্ডিসকে ফিরিয়েছেন ওপেনার হিসেবে। টেস্টের পর টি-টুয়েন্টি সিরিজেও এই কুশল মেন্ডিস সর্বোচ্চ ভুগিয়েছে। মিডিল অর্ডারের অফ ফর্মে থাকা মেন্ডিস ওপেনিং পজিশনে এতো স্বাধীনতা নিয়ে কিভাবে খেলছে?

এই ক্রেডিট ওই চান্দিকার। দুসান শানাকা, এই সিরিজের আগে তার গড় ছিলো ১৮ (প্রায়) আর স্ট্রাইক রেট ছিলো ১১১। ব্যাট করতেন সাত নাম্বারে। অথচ তাকেই চার নাম্বারে তুলে এনে ভয়ংকর ক্লিন হিটার বানিয়ে দিয়েছেন শুধুমাত্র পজিটিভ মানসিকতার মাধ্যমে। থারাঙ্গার পজিশন ডাউন করেছেন।

মাধুশানকা অভিষেকে হ্যাটট্রিক করেন, আকিলা টেস্টে ধ্বসিয়ে দেয়, দলে ফিরেন আমিলা আপোন্সো। যাই বলেন হাথুরুসিংহে “র ট্যালেন্ট” চিনেন। এই যে আজকের স্টিভ স্মিথ, তার পেছনে হাথুরুসিংহের কতখানি অবদান সেটা অনেকেই হয়তো জানেন। নিউ সাউথ ওয়েলসের কোচ থাকাকালীন স্টিভের পেছনে অনেক সময় দিয়েছেন তিনি।

হাথুরুসিংহে আগেও একজন আক্রমনাত্বক কোচ ছিলেন, এখনো আছেন। তার এই আক্রমনাত্বক গেম প্ল্যানের কাছেই হেরেছে বাংলাদেশ। আশ্চর্য লাগে বাংলাদেশের অভিজ্ঞ ড্রেসিং রুম, টেকনিক্যাল ডিরেক্টর, অন্য সকল কোচ তারাও জানতো হাথু কিরকম গেম প্ল্যান করবে! যেনে শুনেও আটকাতে পারলোনা।

অথচ হাথু ঠিকই আমাদের দূর্বলতা গুলাকে কাজে লাগিয়ে ভাঙাচুরা আর আত্মবিশ্বাসের তলানীতে থাকা শ্রীলংকা দলকে নিয়ে সিরিজ শুধু জিতেই যায়নি, একপ্রকার বেইজ্জতি করে গেলো। আর শ্রীলংকা দলকেই অন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবেন এই মাস্টারমাইন্ড কোচ চান্দিকা হাথুরুসিংহে।

২০১৪ সালে ভারতের “বি” দলের কাছে হারা, আফগানিস্তান, হংকং-এর কাছে হারা বাংলাদেশকে যেভাবে নতুন চেহারা দিয়েছিলেন। সেই একই মানুষ!

আমাদের প্রাপ্তি কি এই এক মাসে? শ্রীলংকার বিপক্ষে একটা ম্যাচে জয়? আর ফ্ল্যাট পিচে একটা ম্যাচ ড্র? অন্যভাবে বলি, ওয়ানডেতে ১-২, টেস্টে ০-১ আর টি-টুয়েন্টি সিরিজে ০-২। শ্রীলংকাই শ্রেয়তর দল, ডোমিনেট করে খেলেছে।

কিছু প্রাপ্তির জায়গা আছে অবশ্য, ওয়ানডেতে মুস্তাফিজ খুব ভালো বল করেছিলেন, অবশ্য টি-টুয়েন্টি সিরিজে এসে ছন্দ হারালেন বলে মনে হয়েছে। মমিনুল রানে ফিরেছেন তিন বছর পর জোড়া সেঞ্চুরী করে। যদিও স্পিনিং পিচে অফ স্পিনে দূর্বলতা রয়েছে এখনো।

জানেন কিনা ২০১৪ থেকে ২০১৮ সালে এশিয়ার মাটিতে মমিনুল মাত্র তিনবার পেস বলে আউট হয়েছেন, ঘরের মাঠে সর্বশেষ ২০১৫ সালে পাকিস্তানের জুনায়েদ খানের বলে! এছাড়া সব ইনিংসে আউট হয়েছেন অফ স্পিনে।

নাজমুল হাসান অপুকে নিয়ে আশাবাদি। ভালোই বল করেছেন। আরিফুলকে আরো সময় দেয়া উচিৎ। আফিফ আর রাহিকে স্কোয়াডে রাখা যায় একাদশে না রাখলেও। তবে জাকির আর মেহেদিকে আরো অনেক পরে আনা উচিৎ ছিলো।

আর একটা জিনিস বলবো, সবাইকেই তো দেখলাম, তামিমের যোগ্য সঙ্গী ওই সৌম্য সরকার-ই। সে লীগের প্লেয়ার না। ঘরোয়া খেলে ফর্মে ফিরবে এইরকম কথা আর না বলাই ভালো।সে জাতীয় দলে খেলেই রান পাবে। হাতে সৌম্যের চেয়ে ভালো অপশন আর নাই। কাজেই খুশি মনে দেন আর অখুশি মনে, ওকেই সুযোগ দিতে হবে। কিচ্ছু করার নাই আর!

আর সাইফউদ্দিনকে নিয়ে অনেক বেশি কাজ করতে হবে। ভুল থেকে শিক্ষা নিতে অনেক বেশি সময় নিচ্ছেন তিনি। পেশাদার ক্রিকেটেই এতো সময় নেয়া উচিৎ না সেখানে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তো একরকম বাড়াবাড়ি রকমের বেশি সময় নিচ্ছেন।

ব্রড, স্টোকসদের মতো বেড়ধক পিটুনি খেয়েছেন, তখন সাপোর্ট করেছি কিন্তু ব্রড, স্টোকসদের মত দ্রুত শিক্ষা নিয়ে সামনে আগাতে হবে তো!

সিরিজ শুরুর আগে বিষয়টা ছিলো বাংলাদেশ বনাম হাথুরুসিংহে। যেন শ্রীলংকা কোন বিষয় না! কিন্তু মাঠে কি হাথুরুসিংহে খেলে? মাঠে খেলে শ্রীলংকা, আর সেই শ্রীলংকা হেসে খেলে হারিয়ে দিয়ে গেলো আমাদের।

সময় বেশিদিন বাকি নেই। মাত্র বিশ দিন পরেই নিদাহাস কাপ। সেখানেও প্রতিপক্ষ এই শ্রীলংকা, আর ভারত। যদিও আমার ধারনা লম্বা সাউথ আফ্রিকা সিরিজ শেষে ভারত পূর্ন শক্তির দল পাঠাবে না, তবুও ওই টুর্নামেন্টে আমি বাংলাদেশের তেমন কোন সম্ভাবনা দেখিনা। হয়তো সব ম্যাচেই হারতে পারে বাংলাদেশ যদি দ্রুত দলের ভেতরের এবং মাঠের গেম প্ল্যানের সমস্যা দূর না করা যায়।

আর হেড কোচ ছাড়া যদি দল চলতো তাহলে রিকি পন্টিং-এর অস্ট্রেলিয়ার কোচ থাকতো না! হাথুরুসিংহের বিদায়ের পর অনেকটা সময় পার হয়ে গিয়েছে। এখনো নতুন কোচের দেখা নেই! হয়তো এই দেশে কেউ আসতেই সাহস পায়না! তবুও যতদ্রুত সম্ভব নতুন কোচ নিয়োগ দেয়া উচিৎ কারন বুঝতে কোন সমস্যা হচ্ছেনা “কড়া হেডমাস্টার” ছাড়া বাংলাদেশ দলের সাফল্য সম্ভব না, একেবারেই না।

[ প্রিয় পাঠক, আপনিও বিডিসারাদিন24 ডট কম অনলাইনের অংশ হয়ে উঠুন। লাইফস্টাইল, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, রান্নার রেসিপি, ফ্যাশন-রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন- bdsaradin24@gmail.com-এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে। নারীকন্ঠ এবং মত-দ্বিমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে  bdsaradin24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরণের দায় গ্রহণ করে না। ]

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 106 বার)


Print
bdsaradin24.com