এল সি কি? কিভাবে এল সি করবো? ইমপোর্ট এক্সপোর্ট করার সঠিক নিয়ম ?

Print

লেটার অব ক্রেডিট বা এল সিঃ

রপ্তানিকারকের রপ্তানি করা পণ্যের মুল্য প্রাপ্তির নিশ্চয়তার লক্ষে আমদানিকারকের পক্ষ নিয়ে ব্যংক যে প্রত্যয়ন পত্র দেয় তাকেই এল সি বলা হয় । ব্যাংক আমদানিকারকের পক্ষে রপ্তানিকারককে এই মর্মে নিশ্চয়তা প্রদান করে যে , আমদানিকারক কোন কারনে পণ্যের মূল্য পরিশোদ করতে অস্বীকার করলে উক্ত ব্যাংক রপ্তানিকারককে সেই পণ্যের মূল্য পরিশোদ করবে বা করতে বাধ্য থাকবে । এল সির মাধ্যমে রপ্তানিকারক যেমন তার পণ্যের মুল্য প্রাপ্তি সম্পর্কে নিশ্চিত হয় তেমনি আমদানীকারক এল সি’র বিপরিতে ব্যাংক থেকে ঋণ সুবিধাও পায় । ব্যাংকের মাধ্যমে পণ্য প্রাপ্তির পর রপ্তানিকারক মুল্য পরিশোদ করার সুযোগ পায় ।

আমাদের মধ্যে অনেকেই আছেন যারা ইমপোর্ট এর ব্যবসা করতে চান এবং এ বেপারে তথ্য পাওয়ার জন্য নানন জায়গায় ঘোরাঘুরি করেন, তাদের জন্যই আজকে আমাদের এই পোস্ট। আপনাদের জন্য এই পোস্ট টি লিখেছেন আমাদের স্রদ্ধের বড় ভাই “মাহমুদ হাসান খান” তার হয়ে আমি আপনাদের কাছে এই পোস্টটি তুলে ধরছি।

আসলে ইমপোর্ট বলতে এক দেশ থেকে অন্য দেশে পণ্য আমদানী করা কে বুঝে থাকি, আর এই ইমপোর্ট করার জন্য আপনাকে এলসি বা  (লেটার অব ক্রেডিট) যেটিকে ইতালিয়ান ভাষায় বলে লেত্তেরা দি ক্রেদিতো, করতে হবে। তাহলে আসুন দেখে নেই কিভাবে এই এলসি করা হয়।

এলসি করতে হলে সবার আগে আপনার কোম্পানীর টিন ভ্যাট করাতে হবে। এরপর ব্যাংকে গিয়ে কোম্পানীর নামে একাউন্ড খুলতে হবে। তারপর ব্যাংক থেক এলসিএ ফর্ম কালেক্ট করে ফিলাপ করে ব্যাংক এ জমা দিতে হবে। এখানে কিছু ইনফো লাগবে (যেমন : কি পন্য, দাম কত, কোন দেশ থেকে আসবে এসব)। আমি নীচে ধারাবাহিকভাবে দিচ্ছি আরো বিস্তারিত :

কিভাবে এলসি করতে হয় এ বিষয়ে নিচে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হোলঃ

পর্যায় : কোম্পানীর ট্রেড লাইসেন্স, টিন, ভ্যাট করা। আইআর সি (ইমপোর্ট রেজি: সার্টিফিকেট) করা।

পর্যায় : কোন ব্যাংক এ কোম্পানীর একাউন্ট করা।

পর্যায় : যে পন্য আনবেন তার ইনডেন্ট কালেক্ট করা (ধরা যাক আপনি ১৫ টন নিউজপ্রিন্ট কাগজ আনবেন চাইনা থেকে। এখন যে কোম্পানী থেকে আনবেন সে কোম্পানীর বাংলাদেশ প্রতিনিধির কাছে গিয়ে দাম দর ঠিক করে একটা ডকুমেন্ট নেবেন। এটাই ইনডেন্ট। আর সে কোম্পানীর যদি বাংলাদেশ প্রতিনিধি না থাকে তাহলে সে কোম্পানীতে সরাসরি মেইল করে দাম ঠিক করে ডকুমেন্ট আনাতে হবে। তখন এটাকে বলা হয় পি আই বা প্রফরমা ইনভয়েস। এতে পণ্যের বিস্তারিত, দাম, পোর্ট অব শিপমেন্ট এসব তথ্যাদি থাকে।)আপনাদের জন্য নিচে একটি ছবি দিয়ে দেওয়া হল।

পর্যায় : ব্যাংক থেকে এলসিএ (লেটার অব ক্রেডিট এপ্লিকেশন) ফর্ম কালেক্ট করে ইনডেন্ট/পিআই অনুযায়ী তা পূরন করে ব্যাংক এ জমা দেয়া।

পর্যায় : এলসি মার্জিন জমা দেয়া । প্রথম দিকে ব্যাংক এ পুরো টাকাটাই জমা দিতে হবে। ধরা যাক এলসি ভ্যালু ২০,০০০ ডলার। ব্যাংক এ আপনাকে ১৬ লাখ টাকা জমা দিতে হবে। তবে আস্তে আস্তে ব্যাংকের সাথে ব্যবসা বাড়লে তখন ১০-২০% মার্জিন দিয়ে এলসি খুলতে হবে। টাকার সাথে অন্যান্য কিছু ডকুমেন্টও দিতে হবে। যেমন:

  • আপনার কোম্পানীর সব কাগজ (ট্রেড লাইসেন্স, টিন, ভ্রাট, আইআরসি)
  • ইনডেন্ট/পিআই এর ৩/৪ টি কপি।
  • সাপ্লায়ার কোম্পানীর ব্যাংক ক্রেডিট রিপোর্ট
  • ইন্সুরেন্স কভার নোট (যে কোন ইন্সুরেন্স কোম্পানীতে ইনডেন্ট দেখিয়ে ফি দিয়ে এটা নিত হবে)

এরপর ব্যাংক আপনাকে এলসির একটা কপি দেবে। অরিজিনালটা পাঠিয়ে দেবে বিদেশে সাপ্লাইয়ারের কাছে।

ব্যাক টু ব্যাক এল সিঃ

প্রয়োজন ও পণ্যের ধরণের বিবেচনায় এল সি পদ্ধতির ভিন্নতা রয়েছে । বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের আমদানী ও রপ্তানির কাজ ব্যাক টু ব্যাক এল সির মাধ্যমে হয় । সহজ কথায় ব্যাক টু ব্যাক এল সি রপ্তানিকারকের অনুকূল পদ্ধতি ।  রপ্তানিকারকের মূলধনের পরিমান যখন কোন একটি পণ্য সরবাহের জন্য যথেষ্ট থাকে না, সে ক্ষেত্রে ব্যাক টু ব্যাক এল সি ইস্যু করা হয় । রপ্তানি পণ্য উৎপাদনের প্রয়োজনীয় উপকরণ সংগ্রহের জন্য রপ্তানি এলসির সহায়ক জামানত হিসেবে রেখে Advising Bank কে বা ব্রোকারের দেশীয় কোন ব্যাংক পণ্যের মুল-সরবরাহকারীর অনুকূলে যে আর একটি এল সি ইস্যু করে ।

প্রথম এলসির প্রায় সব শর্তাবলী হুবুহু দ্বিতীয় এলসি তে অন্তর্ভুক্ত করা হয় । তবে এক্সপোর্ট ডেভেলপমেন্ট ফান্ড স্কিম(ই ডি এফ এস) এর অধীনে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে অর্থায়নের ব্যবস্থা আছে । যাকে At sight back to back L/C বলে । দেশের রপ্তানি বৃদ্ধির লক্ষে রপ্তানি সহায়তা (export incentive) হিসেবে বাংলাদেশ সরকার রপ্তানিকারকদের ই ডি এফ সুবিধা প্রদান করে ।

এই সুবিধার আওতায় রপ্তানিকারক বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থায়নে রপ্তানির বিপরীতে বিদেশ থেকে কাঁচামাল আমদানী করতে পারে । সেক্ষেত্রে আমদানিকারকদের ঋণ গ্রহনের তারিখ হতে ১৮০ দিনের মধ্যে (অনুরোধে ২৭০) ১ % বাড়টি হারে গৃহীত ঋণের টাকা পরিশোদ করতে হয়। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক উৎপাদন ও রপ্তানিকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাক টু ব্যাক এল সির মাধ্যমে পোশাক তৈরির উপকরণাদি সংগ্রহ করে থাকে। রপ্তানিকারকদের বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশ মোতাবেক ব্যাক টু ব্যাক এলসি খুলতে হয় ।

উদাহরন স্বরূপ ভাবা যাক আইভোরি কোস্ট এর কোন ফার্ম “এ” তুলা রপ্তানি করতে আগ্রহী । ভারতীয় কোন সমন্বয়কারী প্রতিষ্ঠান বা ব্রোকার “বি” বাংলাদেশের স্পিনিং কোম্পানি “সি” সম্পর্কে অবহিত যারা তুলা ক্রয় করতে ইচ্ছুক । কিন্তু সি কোম্পানির কাছে তূলার মূল্যের পুরো টাকা নেই । কোম্পানি “এ” বিক্রি করতে আগ্রহী কিন্তু,  ঝুকি নিতে নিতে নয় ।

এ অবস্থায় ব্যাক টু ব্যাক এল সি লেনদেনকে ঝুকিহীন করাতে সাহায্য করবে । “সি” কোম্পানি, ব্রোকার “বি” কে সাথে নিয়ে বাংলাদেশের কোন আর্থিক প্রতিষ্ঠান(ব্যাংক) এর কাছে যাবে এল সি’র জন্য । ব্রোকার “বি” ঐ এল সি কে কাজে লাগিয়ে তার কোন পরিচিত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে যাবে ২য় এল সি টির জন্য, যাকে কোম্পানি “এ” এর কাছে ইস্যু করার যাবে ।

কোম্পানি “এ” এর কাছে এলসি পৌঁছানোর সাথে সাথে সে তার তুলা জাহাজীকরণ করবে, এই জেনে যে তুলা পৌঁছালে জার্মান ব্যাংক পুরো পেইমেন্ট করবে । এভাবে বাংলাদেশের একটি পোশাক রপ্তানিকারন টেক্সটাইল কোম্পানি ব্যাক টু ব্যাক এল সির দ্বারা কম মূলধন নিয়েও তার উৎপাদন কাজ শুরু করতে পারে ।

ব্যাংকে এল.সি করার সঠিক নিয়মঃ

এলসি করতে কম্পানির ট্রেড লাইসেন্স, টিন নম্বর লাগে। কম্পানির নামে খুলতে হয় ব্যাংক অ্যাকাউন্ট। ব্যাংক থেকে এলসির ফরম নিয়ে পূরণ করে জমা দিতে হবে। কোন পণ্য আনা হবে, দাম কত, কোন দেশ থেকে আসবে- দিতে হবে এসব তথ্য। ব্যবসায়ী আতিকুর রহমান বলেন, ‘এলসি করার জন্য যেসব পণ্য আনা হবে তার তালিকা (ইনডেন্ট) করতে হবে প্রথমে। দেশটির বাংলাদেশ প্রতিনিধির কাছ থেকে পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করে আনতে হবে ডকুমেন্ট। যদি সে দেশে প্রতিনিধি না থাকে, তবে কম্পানিতে মেইল করে দাম ঠিক করে ডকুমেন্ট আনাতে হবে। এতে পণ্যের বিস্তারিত বিবরণ, পণ্যের মূল্য, পোর্ট অব শিপমেন্ট- এসব তথ্য থাকে।’ প্রয়োজন দরকারি সব তথ্য শুরুতে ব্যাংক থেকে এলসির (লেটার অব ক্রেডিট) আবেদন ফরম সংগ্রহ করে ইনডেন্ট অনুযায়ী পূরণ করে জমা দিতে হবে। ফরমের সঙ্গে লাগবে আইডেন্টিফিকেশন নম্বর (টিন), ইমপোর্ট রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট (আইআরসি), ইনডেন্ট, কম্পানির ব্যাংক ক্রেডিট রিপোর্ট, ইনস্যুরেন্সের কাগজপত্র। টাকা জমা দেওয়ার পর ব্যাংক এলসির একটা কপি দেবে এবং আসলটা পাঠিয়ে দেওয়া হবে বিদেশি সরবরাহকারীর কাছে। আইআরসি করতে আইআরসির জন্য মতিঝিলের এক্সপোর্ট ও ইমপোর্ট বিভাগের প্রধান নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় থেকে ফরম নিতে হয়। এ সময় জমা দিতে হয় কম্পানির ট্রেড লাইসেন্স, টিন, ব্যাংক স্টেটমেন্ট ও নির্ধারিত ফি। নিরাপত্তা দেবে এলসি অর্থের নিরাপত্তার জন্য চালু আছে প্রি-শিপমেন্ট ইন্সপেকশন (পিএসআই) প্রক্রিয়া। এ ক্ষেত্রে ব্যাংক ১ শতাংশ টাকা কেটে পিএসআই কম্পানিকে দেয়। এ ক্ষেত্রে শিপমেন্ট হবে পণ্য পরীক্ষা করে সনদ দেওয়ার পর। নিম্নমানের পণ্য সরবরাহ করা হলে সরবরাহকারীর লোকাল এজেন্ট বরাবর লিখিত অভিযোগ করতে হবে। সার্ভেয়ার পণ্য পরীক্ষা করে রিপোর্ট দেবে। রিপোর্টে অভিযোগ প্রমাণ হলে ব্যাংকের মাধ্যমে সরবরাহকারীর কাছ থেকে টাকা ফেরত আনার আবেদন করলে হতে পারে সমস্যার সমাধান।

[ প্রিয় পাঠক, আপনিও বিডিসারাদিন24 ডট কম অনলাইনের অংশ হয়ে উঠুন। লাইফস্টাইল, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, রান্নার রেসিপি, ফ্যাশন-রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন- bdsaradin24@gmail.com-এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে। নারীকন্ঠ এবং মত-দ্বিমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে  bdsaradin24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরণের দায় গ্রহণ করে না। ]

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 1696 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ
bdsaradin24.com