ওভারব্রীজের নীচে চলে সাকিব-তামিমের লেখাপড়া!

Print

দিনটি ছিল ৪ এপ্রিল বুধবার। বাসা থেকে বের হয়ে অফিসে আসছিলাম। শ্যামলী ওভারব্রীজ দিয়ে রাস্তা পার হবো এমন সময় চোখে পড়ল ব্রীজের নিচে প্লাস্টিকের বস্তা বিছিয়ে স্কুল ড্রেস পরীহিত দুটো বাচ্চা ছেলে হাটুর ব্যাগ নিয়ে তার উপর বই রেখে লেখাপড়া করছে। বাচ্চা দুটো দেখতে বেশ সুন্দর। পাশ দিয়ে অসংখ্য লোকজন হেঁটে যাচ্ছে কিন্ত তাদের লেখাপড়ার কোন ব্যাঘাত ঘটছে না। পাশে এক অসুস্থ ভদ্র মহিলা মাথায় কাপড় দিয়ে বসে আছে। তারা খাতায় লিখে অই মহিলাকে দেখাচ্ছে, আরা উনি জাজমেন্ট করছেন। আবার দেখলাম কেউ কেউ অই মহিলাকে টাকা দিচ্ছেন। বিষয়টি দেখে ভাল লাগলো। তাই ছবি উঠানো লোভ সামলাতে পারলাম না। কৌতুহল বশত অদের সাথে কথা বলার ইচ্ছে হল। তাই একটু এগিয়ে অদের সাথে কথা বলা শুরু করলাম। জানতে পারলাম অই ভদ্র মহিলা তাদের মা। আমার কথা বলা দেখে অনেকেই দাঁড়িয়ে গেল। কথা বলছিলাম সাকিব-তামিমের কথা। ওরা দুজন বাংলাদেশ জাতীয় দলের খেলোড়ার নয়, ওরা পথ শিশু।

সাকিব ও তামিম দুভাই। যমজ হলেও তাদের দুজনের চেহারায় কোন মিল নেই। দুজনই ঢাকার শ্যামিলী মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণীর ছাত্র। আদাবরের একটি বস্তিতে মাকে নিয়ে থাকে সাকিব-তামিম।

তাদের বাবা ইমরুল কায়েস পেশায় মাইক্রোবাসের ডাইভার ছিলেন। ভালই চলছিল দুই সন্তানের জননী মা গৃহিণী সাথী আক্তার ছোট্ট সংসার। সাকিব-তামিমের বয়স যখন ১ বছর তখন তাদের বাবা মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান। এক নিমিষেই শেষ হয়ে যায় সুখের সংসার।

বাবা হারা দুই সন্তানকে বাঁচাতে সাথি আক্তার অন্যের বাসায় কাজ শুরু করেন। কিছু দিন কাজ করার পর পেটে টিউমার ধরা পড়ে। অপারেশন করান তিনি কিন্তু হারিয়ে ফেলেন কাজ করার ক্ষমতা। কথায় আছে ‘অভাগা যেদিকে যায় ভরপুর সাগরও শুকিয়ে যায়।’ কোন উপায়ন্তর না দেখে ছেলেদের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার জন্য মানুষের কাছে হাত পেতে টাকা নেওয়া শুরু করেন। এখন সাকিব-তামিমদের বয়স ৬। খাবারের খরচ যোগানোর পাশাপাশি যোগ হয় লেখাপড়ার খরচ।

সাথি আক্তার জানান, অসুখের কারণে বাসা-বাড়িতে কাজ করতে পারি না। তাই ওদের লেখা পড়ার খরচ যোগাতে বাধ্য হয়ে ভিক্ষা করতে হচ্ছে। সকালে বাচ্চাদের স্কুলে পাঠিয়ে এখানে চলে আসি এবং দুপুর হলে অদেরকে নিয়ে প্রাইভেট টিচারের কাছে যায়। বাসায় ফিরতে রাত হয়ে যায়। এভাবেই চলছে আমার প্রতিটি দিন। আমি সাকিব-তামিমকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করতে চাই।

সাকিব-তামিম জানায়, তারা প্রতিদিন সকাল ৭টায় স্কুলে যায়। ১০টায় স্কুল ছুটি হলে সরাসরি চলে আসে ওভারব্রীজের নীচে। এখানের এসে প্রতিদিনের হোম ওয়ার্ক শেষ করে। আবার ৩টা বাজলে মা আমাদের সাথে করে প্রাইভেট পড়াতে নিয়ে যায়। মাঝখানের এটুকু সময় মা আমাদের পড়াশোনায় সাহায্য করেন। বড় হয়ে সাকিব আর্মি অফিসার এবং তামিম ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তা হতে চাই।

বইয়ে পড়েছি ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর ল্যাম্পোস্টের নিচে বসে পড়াশোনা করেছেন। আমার দেখা ওভারব্রীজের নিচে লেখাপড়া করা সাকিব-তামিমের বিষয়টি কিন্তু মন্দ নয়।

বাচ্চা দুটো পড়ছে আর পাশেই মা ভিক্ষা করছেন। এ বিষয়টিকে অনেকেই ভিক্ষাবৃত্তির নতুন পন্থা বলে মনে করে গালিগালাজ করছেন। আবার কেউ কেউ পজিটিভলি নিচ্ছেন। ভিক্ষা করাকে আমিও সাপোর্ট করি না তবে লেখাপড়া করার জন্য একটি অসুস্থ্য মায়ের ভিক্ষাবৃত্তিকে আমি খারাপ কিছু মনে করি না। রাস্তার একজন ভিখারিকে জিজ্ঞেস করলে বলবে পেট চালানোর জন্য ভিক্ষা করি কিন্তু কখনই বলতে শুনিনি সন্তানদের সু-শিক্ষায় শিক্ষিত করতে ভিক্ষা করছি; যা সাকিব-তামিমের মা আমাকে বলেছে।

আমি সাধ্যের মধ্যে যা পেরেছি সাকিব-তামিমের হাতে তুলে দিতেই দুজনের মিষ্টি হাসি একনিমিষেই মন ছুঁয়ে দিল। অতপরঃ কর্মস্থলের দিকে দিয়ে রওনা হলাম।

[ প্রিয় পাঠক, আপনিও বিডিসারাদিন24 ডট কম অনলাইনের অংশ হয়ে উঠুন। লাইফস্টাইল, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, রান্নার রেসিপি, ফ্যাশন-রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন- bdsaradin24@gmail.com-এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে। নারীকন্ঠ এবং মত-দ্বিমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে  bdsaradin24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরণের দায় গ্রহণ করে না। ]

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 265 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ
bdsaradin24.com