ওষুধের বিরূপ প্রভাব থেকে নিরাপত্তায় ফার্মাকোভিজিলেন্স নেটওয়ার্কে বাংলাদেশ

Print
কানের ব্যথা নিয়ে বাবার হাত ধরে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে যায় ছোট্ট মেয়ে সারা আয়শা আহমদ। চিকিৎসক পরীক্ষা করে দেখেন তার কানের পাশাপাশি গলায়ও ব্যথা রয়েছে। ব্যথা উপশমে তিনি এন্টিবায়োটিক সেবনের ব্যবস্থাপত্র দেন।

কিন্তু এন্টিবায়োটিক খাওয়ার পর পরই আয়শার সারা গায়ে র‌্যাসে ভরে যায়। এ অবস্থায় অয়শার বাবা চিকিৎসককে ফোন করে বিষয়টি জানালে তিনি এন্টিবায়োটিক বন্ধ করতে বলেন। বাবার বুদ্ধিমত্তায় ওষুধের বিরূপ প্রভাব থেকে দ্রুত মুক্তি মেলে আয়শার।

দেশে এমন অনেক রোগী প্রতিদিন ওষুধের বিরূপ প্রভাবে পড়েন। বিষয়টি বুঝে ওঠার আগেই অনেককে নানা শারীরিক প্রতিবন্ধকতার শিকার হতে হয়। ক্ষেত্রবিশেষ ঘটে মৃত্যু। এ সমস্যা সমাধানে ফার্মাকোভিজিলেন্স নেটওয়ার্কে প্রবেশ করেছে বাংলাদেশ। ফার্মাকোভিজিলেন্সের মূল লক্ষ্য হল ওষুধের নিরাপদ ও যুক্তিসঙ্গত ব্যবহার নিশ্চিত করার মাধ্যমে রোগীর যত্ন এবং স্বাস্থ্যসেবা উন্নত করা।

এখন থেকে ওষুধের বিরূপ প্রভাব দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গে অভিযোগ জানানো যাবে ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরে। রোগী, রোগীর স্বজন, সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক- এমনকি ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধি অভিযোগ জানাতে পারবেন। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে অধিদফতর উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে বিরূপ প্রভাবের কারণ অনুসন্ধানে নির্দেশনা প্রদান করবে। পাশাপাশি নিুমানের ওষুধ কোম্পানি যাতে মানহীন ওষুধ উৎপাদন করতে না পারে সে বিষয়টিও নিশ্চিত করবে। যাতে পরবর্তীতে ওষুধ ব্যবহারে চিকিৎসকরা আরও সতর্ক হতে পারেন।

জানা গেছে, ওষুধের বিরূপ প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণের জন্য বর্তমানে ৫০টি হাসপাতাল ও ৫০টি ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিকে ফার্মাকোভিজিলেন্স কার্যক্রমের আওতায় আনা হয়েছে। এছাড়া প্রায় ৬০০ চিকিৎসক, নার্স, ফার্মাসিস্টদের এ কার্যক্রমের আওতায় প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। কার্যক্রমকে শক্তিশালী করতে ইউএসএআইডি’র সহায়তায় ন্যাশনাল গাইডলাইন অন দ্য ফার্মাকোভিজিলেন্স সিসটেম ইন বাংলাদেশ প্রণয়ন করা হয়েছে। গাইডলাইন ওষুধের বিরূপ প্রতিক্রিয়া মনিটরিং ও প্রতিরোধের ক্ষেত্রে কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহনে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। ওষুধ কোম্পানী, হাসপাতাল, জনস্বাস্থ্য কর্মসূচি, চিকিৎসক, ফার্মাসিষ্ট, নার্সসহ সংশ্লিষ্ট সবাই গাইডলাইন অনুসরণ করে ফার্মকোভিজিলেন্স কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করলে জনগণের স্বাস্থ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক আ ব ম ফারুক যুগান্তরকে বলেন, ওষুধের যুক্তিসঙ্গত ব্যবহার নিশ্চিতে আমাদের আরও আগেই এ ব্যবস্থা বাস্তবায়নের প্রয়োজন ছিল। আশার কথা দেরিতে হলেও শুরু হয়েছে। তবে ওষুধের যৌক্তিক ব্যবহার নিশ্চিতের ওপর জোর দিতে হবে। মুড়ির মতো যত্রতত্র ওষুধ বিক্রি বন্ধ করতে হবে।

ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৮ সাল থেকে উপসালা মনিটরিং সেন্টারের (ইউএমসি) মাধ্যমে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বর্তমানে ১৩০টিরও বেশি দেশে ফার্মাকোভিজিলেন্স নেটওয়ার্ক গঠন করেছে। ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ওষুধ প্রশাসন অধিদফতর ও সাইআপস কর্মসূচির মাধ্যমে বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় ফার্মাকোভিজিলেন্সের যাত্রা শুরু হয়। ২০১৪ সালে বাংলাদেশ ইউএমসি-বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ১২০তম সদস্য দেশে হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়। বাংলাদেশে এ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করতে সম্প্রতি ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরকে আন্তর্জাতিক ওষুধ পর্যবেক্ষণ সেন্টারের পূর্ণ সদস্য পদ প্রদান করেছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, ফার্মাকোভিজিলেন্স সম্পর্কিত বিষয়গুলো জানা অপিরহার্য। এরমধ্যে রয়েছে- এ্যাডভারস ড্রাগ ইভেন্ট। এটা হল ওষুধের কারণে মানবদেহে যে ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে তা। ওষুধের গুণগত মান, প্রয়োজনের তুলনায় কম বা বেশি মাত্রায় ওষুধ সেবন এবং ভুল ওষুধ ব্যবহার ইত্যাদি কারণে এ্যাডভারস ড্রাগ ইভেন্ট সংগঠিত হতে পারে।

আরেকটি এ্যাডভারস ড্রাগ রিএকশন (এডিআর)। এটি হল- ওষুধের বিরূপ প্রতিক্রিয়া হলে ওষুধের ব্যবহারে সৃষ্ট ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়া- যা সুপারিশকৃত মাত্রায় ওষুধ সেবন বা ওষুধের সঠিক পদ্ধতি মানার পরও হতে পারে।

কিভাবে জানাতে হবে : বিশেষ কোনো ওষুধ ব্যবহারের পর বিরূপ প্রতিক্রিয়া হলে আক্রান্ত রোগী তার ডাক্তারকে অবিলম্বে জানাবেন এবং এ সংক্রান্ত বিশেষ এডিআর ফরম পূরণ করতে ডাক্তারকে সহযোগিতা করবেন। ওষুধের বিরূপ প্রতিক্রিয়া নিয়ে রিপোর্ট করার জন্য ডাক্তার, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী এবং ফার্মাসিস্টরা পূরণীয় পিডিএফ-এ এডিআর ফরমটি পূরণ করে ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরে পাঠাতে পারবেন।

সামগ্রিক বিষয়ে ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বিশ্বে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ ওষুধের বিরূপ প্রভাবে বা এডিআর সমস্যায় পড়ে। যার জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ১৯৬১ সাল থেকে এডিআর রিপোর্টের ওপর গুরুত্বারোপ করে আসছে। তবে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার জন্য সবসময় ওষুধ দায়ী নাও হতে পারে। এর জন্য ওষুধের ভুল ব্যবহার, শরীরের সহনীয় মাত্রা, এমনকি অন্য ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও এর কারণ হতে পারে। তিনি বলেন, ইতিমধ্যে বেশ কিছু চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্টদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। এ সংক্রান্ত জনসচেতনতা গড়ে উঠলে আশা করছি এজাতীয় সমস্যা সমধান সহজ হবে।

[ প্রিয় পাঠক, আপনিও বিডিসারাদিন24 ডট কম অনলাইনের অংশ হয়ে উঠুন। লাইফস্টাইল, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, রান্নার রেসিপি, ফ্যাশন-রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন- bdsaradin24@gmail.com-এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে। নারীকন্ঠ এবং মত-দ্বিমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে  bdsaradin24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরণের দায় গ্রহণ করে না। ]

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 190 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ
bdsaradin24.com