কল্পনাপ্রবণ মন, কল্পনাতেই জীবন যাপন!

Print

রীতা রায় মিঠু:

ছোটবেলা থেকেই আমি কল্পনাপ্রবণ। না, সেরকম কল্পনাপ্রবণ নয়, যে রকমটা প্রতিটি মানুষই হয়ে থাকে তার শৈশবে কৈশোরে বা যৌবনে। আমি একটু অন্যরকম কল্পনাপ্রবণ ছিলাম, যেরকম খুব অল্পসংখ্যক মানুষই হয়ে থাকে তার শৈশব কৈশোর যৌবনে। তাদের কল্পনাগুলো কখনও আকাশ কুসুম, কখনও বিলাসী, কখনও দুঃখী, কখনওবা সুখী ধরণের হয়ে থাকে। কল্পনা তো কল্পনাই, কল্পনা যে ধরণেরই হোক, বাস্তবে যেটুকু মিলে না, কল্পনায় সেই বাস্তবকে ছাড়িয়ে যাওয়া যায়। স্বভাবে ডানপিটে নয় অথচ ডানপিটে হতে চায় ছেলেটা, চঞ্চল নয় অথচ চঞ্চলতা করতে চায় যে বালিকা, দুষ্টু নয় কিন্তু দুষ্টুমি করতে চায় যে শিশু, ভিক্ষের অন্ন খাওয়া মানুষটির পোলাও বিরিয়ানী খেতে পাওয়া, কেরাণীবাবুর কোম্পানির বড় চেয়ারটায় বসতে পাওয়া, কুঁজোর চিৎ হয়ে শুতে পারা, মিঠু রাণীর সুচিত্রা সেন হয়ে যাওয়া, এক দল এক নেতার প্রধানমন্ত্রী হতে পারা— কল্পনায় এর সবই করা যায় বলেই কিছু মানুষ কল্পনাপ্রবণ হয়।সেই অল্প কিছু কল্পনাপ্রবণ মানুষ জীবনের প্রতি স্তরেই কল্পনায় স্থলে জলে বনে অন্তরীক্ষে ঘুরে বেড়াতে ভালোবাসে।

আমিও তেমনই কল্পনাপ্রবণ একজন মানুষ। শৈশব কৈশোর যৌবন পেরিয়ে এই মধ্যবয়সেও কল্পনায় দিল্লী কা লাড্ডু খাওয়া থেকে শুরু করে, সিনডেরেলা থেকে সুচিত্রা সেন হয়ে, বাংলাদেশের সুন্দরবন, সুইজারল্যান্ড থেকে শুরু করে ভারতের কন্যাকুমারিকা কাশ্মীর বেড়িয়ে আমেরিকার আলাস্কাও বেড়িয়ে আসি।
কল্পনা আমি এখনও করি। ছোটবেলায় দুষ্টুমি, ডানপিটেপনা করবার সুযোগ ছিলোনা তো, কল্পনাতেই হাতী ঘোড়া মারতাম, পাহাড়ের চূড়োয় উঠতাম, ব্যাবিলনের উদ্যান হয়ে মিসরের পিরামিড দেখে আসতাম। কল্পনায় কখনও নায়িকা হতাম, কখনও গায়িকা হতাম, কখনওবা স্বদেশী যুগের প্রীতিলতা হয়ে যেতাম। পাগলের সুখ মনে মনে, আমার সুখ কল্পনার উদ্যানে।
শিক্ষক মায়ের কঠিন শাসনে বেড়ে উঠেছি, তাই পিঠে ডানা গজাতে পারেনি। তাই বলে ওড়াওড়ি কি বন্ধ থাকে! ভোজনরসিক যেমনি কল্পনায় দিল্লীকা লাড্ডু খায়, কঠিন শাসনের খাঁচায় বন্দী পাখিও কল্পনায় আকাশ মহাকাশ উড়ে বেড়ায়।কল্পনাপ্রবণ না হয়ে আমার উপায় ছিল না।

একেক বয়সে একেক রকম কল্পনা করতাম। ছোটবেলার কল্পনাগুলো ছিল গুপি গায়েন বাঘা বায়েনের ভূতের রাজার বর পাওয়ার মত। পাঁচ বছরের আমি কোয়ার্টার বাসার বারান্দায় বসে আছি, বাসার সামনেই পিচ ঢালা রাস্তা, রাস্তার পরেই শীতলক্ষ্যা নদীর চওড়া খাল। কত রকমের দৃশ্য!

রাস্তা দিয়ে হুড তোলা রিকসা যায়, রিকসার সিটে বসা দুইজন মহিলা, তাদের কোলে দুইজন আমার বয়সী বাচ্চা, রিকসার পেছনে মেজদার বয়সি কোন ছেলে দাঁড়ায়, আর রিকসার পাদানিতে রিকসার শিক ধরে বসে থাকে আরও দুইজন। দেখতে কি যে ভাল লাগতো, একেবারে আমাদের মত ওরা। আমাদের মামার বাসা ছিল আমলাপাড়া। আমাদের বাসা খানপুর। খানপুর থেকে আমলাপাড়া যেতে রিকসা ভাড়া ছিল চার আনা। মা স্কুলে শিক্ষকতা করতো, মায়ের স্কুল ছিল মিশনপাড়া, খানপুর আর আমলাপাড়ার মাঝামাঝি। ছোটবেলায় অতসব হিসেব বুঝতামনা। শুধু জানতাম, রিকসা চড়ে মা স্কুলে যায় প্রতিদিন। যেদিন মার স্কুল ছুটি থাকতো, হয় আমরা মা’র সাথে আমলাপাড়া দাদুর বাসায় যেতাম, নয়তো দিদিমা আমাদের বাসায় আসতো আমার ছোট ছোট দুই মাসিকে নিয়ে।

দিদিমা ফিরে যাওয়ার সময় আমি আর মেজদাও চলে যেতাম মামার বাড়ি। তখন এক রিকসায় সিটে বসতো দিদিমা আর সেজ মাসী, ছোট মাসি দিদিমার কোলে, মেজদা আর আমি বসতাম রিকসার পাদানিতে। আমরা সবাই খুব মিলে মিশে থাকতাম, তাই বাসার সামনে দিয়ে যাওয়া রিকসার যাত্রীদের দেখে কল্পনা করতাম, ওরা এখন বাসায় যাবে।ওদের দিদিমা নিশ্চয়ই ওদেরকে মুড়ি গুড় খেতে দিবে, ওদের মাসি পুতুলের বাক্স বের করবে। পুতুলের কি বিয়ে হবে আজকে? বিয়েতে ওরা কি খাওয়াবে? বিস্কুট, চানাচুর আর কি! মজা খাওয়াবে? মজা কি? সেদিন একটা রিকসা যাচ্ছিল, ছোট একটা মেয়ে কি জোরে জোরে কাঁদছিল। তখন রিকসাওয়ালা বলছিল, ” এই যে এহনই তুমারে মজা কিন্না দিমু, কাইন্দোনা, চলো চলো, মজা কিন্না দিমু”। আমার কল্পনার ক্ষমতার পুরোটা উজাড় করে দিতাম ‘মজা’ কেমন হতে পারে তা বুঝার জন্য।

রাস্তার পরেই যে নদী, বারান্দায় বসে সেই নদীর কত দৃশ্য দেখতাম। নদীর দিকে তাকালেই কত নৌকা, নৌকার ছইয়ের মাথায় সাদা রঙের পাল। ছোট ছোট লঞ্চ, স্পিড বোটগুলো ছুটে চলে। কোন কোন নৌকা থেকে মাইকে গান বাজে, ” ঢেউ দিওনা ঢেউ দিওনা, ঢেউ দিওনা জলে, ওলো প্রাণ সজনী, আর জলে ঢেউ দিওনা” গানটা বেশি বাজতো। এই গানের সুরে কেন জানি আমার বুকে মোচড় দিত। যে নৌকায় মাইক বাজতো, সেই নৌকায় হয় বরযাত্রী থাকতো, নইলে নতুন বউ থাকতো। বিয়ে সংসার বুঝার বয়স ওটা ছিলনা, কিন্তু “ঢেউ দিওনা’ গানের সুরে আমার মনে হতো, বিয়ে খুব ভাল নয়, এটা কষ্টের। কেন কষ্টের, কষ্টটা কোথায় ঠিক ঠাহর করতে পারতামনা, তবে বিয়ের নৌকা যেতে থাকলে আমার কান্না পেতো। কোনটা রেখে কোনটা দেখি।

সন্ধ্যার সময় প্রায়ই রাস্তা দিয়ে ঘোড়ার গাড়ি যেত, কী সুন্দর করে সাজানো। আমরা বলতাম টম টম গাড়ি। টম টম গাড়িতে করে জামাই যেত। আমার মেজদা বলতো, “মিঠুর বিয়ের সময় আমরাও জামাই আনবো টম টম গাড়িতে করে। আমি চালামু টম টম গাড়ি”। মেজদার কথা শুনে বড়দের সবাই হাসতো, আমি কল্পনা করতাম টম টম গাড়িতে চড়ে আমার জামাই এসেছে, মেজদা ঘোড়ার গাড়ির ড্রাইভার।

কল্পনার কি শেষ আছে! একটু বড় হতেই মায়ের সাথে, দিদিমার সাথে সিনেমা হলে যাওয়ার সুযোগ হয়ে গেলো। মা দিদিমা দুজনেই ছিল সিনেমা পাগল, সপ্তাহে একটা সিনেমা তারা দেখতোই। আমাকে কেন সাথে নিত জানিনা, মেজদা আর ছোট মাসির হাতে চার আনা পয়সা দিয়ে আমাকে নিয়ে ওরা সিনেমা দেখতে যেত।এদিকে সিনেমা দেখতে দেখতে ঢেউ দিওনা গানের জগত ছেড়ে নতুন কল্পনার জগত খুঁজে পেলাম। কোন ছোটখাটো ভূমিকায় নয়, ছয় বছরের আমি নিজেকে নায়িকা শবনম, কবরীর ভূমিকায় দেখতে শুরু করলাম। কল্পনায় নায়করাজ রাজ্জাক, নায়ক রহমানের সাথে নায়িকার ভূমিকায় অভিনয় শুরু করলাম। মনে মনে একটু পেকেই গেলাম মনে হলো। নাহলে শিশু ভূমিকায় নিজেকে না খুঁজে কেন নায়িকার ভূমিকায় নিজেকে খুঁজবো তাও ছয় বছর বয়সে?

মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলো, বাংলাদেশ স্বাধীন হলো। সিনেমা হলে গিয়ে আর সিনেমা দেখা হয়না, টেলিভিশনে মাসে এক দুইটা সিনেমা দেখায়, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সিনেমা। সেখানে যুদ্ধ, গোলাগুলি পাক সেনা, মুক্তিযোদ্ধাদের দেখানোর পাশাপাশি নায়িকাকে দেখানো হয় পাকবাহিনীর হাতে অত্যাচারিত হতে। আমার চোখের সামনে খুলে যায় অন্য এক দরজা। মুক্তিযুদ্ধ বলতে শুধু জানতাম বিচ্ছু বাহিনী, মুক্তিবাহিনী, পাক সেনা। মুক্তিবাহিনীর গুলিতে পাক সেনা মরে যাবে, এই পর্যন্ত ছিল আমার ধারণা। কিন্তু ওরা এগারো জন, অরুনোদয়ের অগ্নিস্বাক্ষী দেখার পর আমার কল্পনার জগতে বিরাট ধাক্কা লাগলো। ধর্ষণ বা বলাৎকার শব্দ দুটোর সাথে পরিচয় ঘটেনি, কিন্তু খান সেনার কামড়ে ক্ষত বিক্ষত নায়িকার পাগলা চেহারা দেখে, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর পাকসেনার কবল থেকে মুক্ত ববিতার কোলে ছোট বাচ্চা দেখে আট বছরের বালিকার কল্পনাজগতে আমূল পরিবর্তন ঘটে গেলো।

বালিকা তখন কল্পনায় নিজেকে দেখতে শুরু করলো পাকবাহিনীর হাতে বন্দী। পাকবাহিনীর হাত থেকে কিভাবে পালানো যায় সেই চিন্তা ভাবনায় তার সময় কাটে। মুক্তিযুদ্ধের আরেকটি সিনেমায় দেখিয়েছিল, নায়িকা সুচন্দা পাকসেনাকে মারবার জন্য কাঠের চকির পায়া খুলে নিয়েছিল। পাকসেনা ঘরে ঢুকতেই সুচন্দা সেই কাঠের পায়া দিয়ে পাকসেনাকে পিটিয়ে খোলা দরজা দিয়ে দৌড়ে পালিয়ে গেছিল। আমার এই দৃশ্যটা খুব ভাল লেগেছিল। নূতন বা ববিতা নয়, নিজেকে সুচন্দার ভূমিকায় দেখতে শুরু করি।

এভাবে কৈশোর আসে, নর নারীর মধ্যেকার তফাতটুকু বুঝার বয়স হয়।সিনেমা হলে যাওয়া হয়না, অন্যের বাড়িতে গিয়ে টিভি দেখা বন্ধ, তাই নায়িকা দেখা হয় না। তখন রেডিওতে গান শোনা শুরু হলো। আকাশবাণী থেকে অনুরোধের আসর, আগরতলা থেকে অনুরোধের আসর। শুরু হলো নতুন ভূমিকায় নিজেকে কল্পনা করার কাল। কল্পনা থেকে নায়িকার বিদায়, গায়িকার আগমন।
কল্পনায় কখনও লতা মঙ্গেশকার হয়ে স্টেজে লক্ষ শ্রোতার সমাগমে গান গাই, কখনও প্রতিমা, কখনও আরতি হয়ে যাই। সন্ধ্যা মুখার্জি হতে চাইতাম না, কেন জানি উনার গান আমায় টানতো না। গানগুলো কঠিন মনে হতো।

শুধু কি নায়িকা গায়িকা প্রেমিকার ভূমিকায় নিজেকে কল্পনা করেছি? মায়ের মুখে স্বদেশী আন্দোলনের গল্প শুনতাম, প্রায়ই নিজেকে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের ভূমিকায় দেখতে পছন্দ করতাম। প্রীতিলতাকে চিনি মুক্তিযুদ্ধের আগে থেকেই, অর্থাৎ পাঁচ ছয় বছর বয়সেই প্রীতিলতার নাম জানি। জানারইতো কথা, আমাদের কোয়ার্টারের বাসার সামনের রাস্তা দিয়ে শুধু রিকসা ঘোড়ার গাড়িই কি যেত! ” জেলের তালা ভাঙ্গবো, শেখ মুজিবকে আনবো, তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা মেঘনা যমুনা” শ্লোগান দিতে দিতে কত বড় বড় মিছিল যেত। কোন কোন মিছিলে মশাল থাকতো। মেজদা অনেক ডানপিটে ছিল। তখন তার মুখে ক্ষুদিরাম, মাস্টারদার নাম শুনেছি, তখনই প্রীতিলতার নামও শুনেছি।

তখন আমার রক্তে গান নাচের তাল খেলতো না, রক্তে প্রবাহিত হতো দেশপ্রেমের উন্মাদনা। খুব ভালোবাসতাম বালিকা আমিকে বুকে ডিনামাইট বেঁধে পাকিস্তানী সৈন্যদের ট্যাংকের আসা যাওয়ার পথে শুয়ে থাকতে দেখে। কখনও নিজেকে দেখতাম ফাঁসীর মঞ্চে, ক্ষুদিরাম বিনয় বাদল দীনেশের ভূমিকায়। স্বদেশীদের ভূমিকায় নিজেকে কল্পনা করার নেশা এসেছিল মায়ের মুখে স্বদেশী আন্দোলনের গল্প শুনে। রূপকথার গল্প পড়ে যেমনি নিজেকে কখনও সিন্ডেরেলা, কখনও চাষীর ছেলে ইভানের ভূমিকায় কল্পনা করতাম। উভচর মানুষ বইটা পড়ার পর নিজেকে ইকথিয়ান্ডরের ভূমিকায় কত বড় হয়েও কল্পনা করেছি। এগুলো ছোট বয়সের ফ্যান্টাসি কল্পনা।

ছোটবেলায় ক্ষুদিরাম বিনয় বাদল দীনেশের নাম শুনেছি, একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি গান শুনে ক্ষুদিরামের জন্য মনে কষ্ট পেয়েছি। তখনও বুঝতে পারিনি, ফাঁসির ভয়াবহতা কি জিনিস! তখন ফাঁসি শুনলে মনে হতো, বীরপু্রুষোচিত ঘটনা। সবার ফাঁসি হয়না, শুধুমাত্র ক্ষুদিরামের মত সাহসী ছেলেদের ফাঁসি হয়। ফাঁসি হলে ক্ষুদিরামের মত হাসতে হাসতে গলায় ফাঁসির দড়ি পড়তে হয়।

কৈশোরেই ঘটে গেলো বঙ্গবন্ধু হত্যার নির্মম নিষ্ঠুর কান্ড। আমারই বয়সী বঙ্গবন্ধুর ছোট ছেলে শেখ রাসেল, যাকে টেলিভিশনে দেখেছি বঙ্গবন্ধুর সাথে সব জায়গায় ঘুরছে, যাকে দেখে মনে মনে কল্পনা করেছি, আমি যদি শেখ রাসেল হতাম তাহলে প্রধানমন্ত্রীর ছেলে হতে পারতাম। শেখ কামালের বিয়ের সময় ভেবেছি, আমি যদি প্রধানমন্ত্রীর ছেলের বউ হতে পারতাম, মাথায় সোনার মুকুট পরতে পারতাম। সোনার মুকুট যে চাইলেই স্বর্ণকার দিয়ে বানিয়ে নেয়া যায়, সেই ধারণা আমার ছিলনা।তাই ভাবতাম সোনার মুকুট বুঝি শুধু রূপকথার রাজকন্যা পড়ে আর প্রধানমন্ত্রীর ছেলের বউ পড়ে। আমার স্বপ্নের সেই শেখ রাসেল, সোনার মুকুট মাথায় দেয়া শেখ কামালের বউ—সবাইকে মেরে ফেলেছে!!

শেখ রাসেল কেন খাটের নীচে লুকিয়ে থাকলোনা? ওরা সবাই কেন দরজা ভেতর থেকে টাইট করে বন্ধ করে রাখলোনা? একটা ঘরে সবাই যদি একসাথে থাকতো, দরজা বন্ধ করে খাট ড্রেসিং টেবিল টেনে এনে দরজার মুখে রেখে দিত, তাহলে কি মিলিটারিরা সেই ঘরে ঢুকতে পারতো? কেমন লেগেছে ওদের যখন মিলিটারিরা মেশিনগান নিয়ে ওদের সামনে দাঁড়িয়েছে? যখন একজন একজন করে মারছিল, ভয়ে কাঁপতে থাকা অন্যজন কি চোখ বন্ধ করেছিল? যার গায়ে তখনও গুলি লাগেনি, সে কি অলৌকিক কিছু ঘটবে ভাবছিল? একবারেও জন্যও কি কারো মনে হয়েছিল, ” আমাকে হয়তো মারবেনা! আমাকে হয়তো ছেড়ে দিবে!”
ওরা তখন কি ভাবছিল? ওরা কি ভাবছিল, এখন আমরা এখানে দাঁড়িয়ে ভয়ে কাঁপছি, একটু পরেই সব অন্ধকার হয়ে যাবে। আমরা কোথায় যাব কেউ জানেনা! শেখ রাসেল ছোটই ছিল, খাটের নীচে লুকালে কেউ খেয়াল করতোনা। রাসেল কেন ওয়ার্ড্রোবের পেছনে গিয়ে লুকালো না?
এর তিন মাস পরেই ঘটে গেলো জেল হত্যাকান্ড। জেলে বন্দী জাতীয় চার নেতাকে মিলিটারীরা নির্মমভাবে হত্যা করলো।

—- পর পর অনেকগুলো বছর আমি এসবই কল্পনা করেছি। কৈশোর থেকে কুড়িতে পা দেয়া পর্যন্ত সময়টায় আমি ভাল কিছুই কল্পনা করতে পারিনি।

সেসব দিন, সেসব কাল, সেই বয়স পেরিয়ে কখন কোন ফাঁকে তারুণ্যে পা দিয়েছি টের পাইনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবন শুরু হলো, কল্পনার জগত থেকে মন অন্যরকম এক বাস্তবতায় ভিড়তে শুরু করলো। সে বাস্তবতার সাথে প্রচুর বন্ধু, আড্ডা, ক্যাফেটেরিয়া, কঠিন ক্লাস, কঠিন বই, নীরস লেখাপড়া মিলেমিশে একাকার হয়ে গেলো। সাথে যোগ হলো রাজনীতির গন্ধ মাখা কিছু শব্দ, কিছু ভাবনা, কিছু উত্তেজনা। তারুণ্যের শুরুতে মাথায় চিন্তায় চেতনায় রাজনীতির গন্ধ হালকা থেকে স্পষ্ট হতে শুরু করলো। রাজনীতি মানেই মিটিং, মিছিল, আন্দোলন, জেল। রাজনীতি মানেই উন্মাদনা, উত্তেজনা। আবারও কল্পনার পর্দায় একটু একটু করে ভেসে উঠতে থাকা ঊনসত্তর-সত্তরে বাসার সামনের রাস্তা দিয়ে যাওয়া ‘জেলের তালা ভাঙ্গবো, শেখ মুজিবকে আনবো, তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা মেঘনা যমুনা” শ্লোগান।”শেখ মুজিবকে আনবো”–কিন্তু কোথা থেকে আনবো!

মুজিব তখন ঘুমিয়ে আছেন টুঙ্গিপাড়ায়। আবার কল্পনায় ফিরে আসে কৈশোরের সেইসব স্মৃতি, এক রাতের তান্ডবে চিরতরে হারিয়ে যাওয়া সোনার মুকুট মাথায় দেয়া সুন্দরী বধূর মুখ, এক নিষ্পাপ বালকের মুখ, বেঁচে থাকলে যে আজ আমারই মতো বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হতো, হারিয়ে গেলো কোথায়! মিলিটারির মেশিনগানের সামনে কি ভাবছিলেন বেগম ফজিলাতুন্নেসা, কী ভাবছিলো তরুণী দুই বধূ, অথবা বালক রাসেল! অথবা জেলে বন্দী চার জাতীয় নেতা!

আচ্ছা, জেলের ভেতর ঢুকে যখন চার জাতীয় নেতাকে হত্যা করলো মিলিটারি, বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়েছিল সৈয়দ তাজউদ্দিনকে, মৃত্যুর মুখোমুখি পৌঁছে এই বয়স্ক চার নেতা কি ভেবেছিলেন! কিছু কি ভাববার অবকাশ পেয়েছিলেন উনারা, নাকি মৃত্যুর মুখোমুখি পৌঁছে আরেকটিবার বাঁচতে চেয়েছিলেন! বাঁচতে চাওয়া কি অন্যায়? উনাদের কি মনে হয়েছিল, এ যাত্রা বেঁচে গেলে দেশটাকে আবার নতুন করে গড়ে তুলবো!

নাহ! কল্পনা আর নয়, এর চেয়ে ভাল রাজনীতি নিয়ে ভাবা, মিছিলে শ্লোগান দেয়া। তখনও রাজনীতি শব্দটা অনেক মূল্যবান ছিল। বর্তমান সময়ের মত এমন অস্পৃশ্য হয়ে ওঠেনি। তখন ছাত্র রাজনীতি করতো ছাত্ররাই, দলের রাজনীতি করতো দলীয় মানুষেরা। আর সকল রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করতে চাইতো সেনাশাসকেরা। সেনাশাসক মানেই বন্দুক, কামান দেখিয়ে ভয় দেখানো। আর ছাত্র রাজনীতি মানেই সেনাশাসকের রক্তচক্ষুর প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলী প্রদর্শন।

—চলবে

[ প্রিয় পাঠক, আপনিও বিডিসারাদিন24 ডট কম অনলাইনের অংশ হয়ে উঠুন। লাইফস্টাইল, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, রান্নার রেসিপি, ফ্যাশন-রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন- bdsaradin24@gmail.com-এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে। নারীকন্ঠ এবং মত-দ্বিমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে  bdsaradin24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরণের দায় গ্রহণ করে না। ]

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 131 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ
bdsaradin24.com