কী হতে চেয়েছিলাম?

Print

প্রতিটি মানুষের জীবনে একটি লক্ষ্য থাকে, আমার কোন লক্ষ্য ছিলনা। বাবা লেখাপড়া করতে বলতেন, আমি লেখাপড়া করেছি। লেখাপড়া করার সময় একবারও ভাবিনি, বড় হয়ে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার হবো নাকি কবি সাহিত্যিক হবো। সময় আমাকে যখন যেভাবে টেনে নিয়ে গেছে, সময়ের স্রোতে আমি ভেসে গিয়েছি। কেমিস্ট্রিতে অনার্স মাস্টার্স করেছি, বি এড করেছি কিন্তু শ্রুতিনন্দন কোন পেশা বেছে নিতে পারিনি। আমার বাবা মনে দুঃখ পেয়েছেন, বাবা সবসময় বলতেন, চার সন্তানের মধ্যে আমি নাকি সবচেয়ে মেধাবী এবং সবচেয়ে বেয়াড়া। নিজের ইচ্ছেমত চলেছি। আমার তিন ভাই বাবার স্বপ্ন পূরণ করেছে, আমি বাবাকে স্বপ্ন দেখাইওনি, স্বপ্ন পূরণও করিনি। সময়ের স্রোতে নিজেকে ভাসিয়ে দিয়েছি, সময়ের স্রোতে ওয়ালমার্টে চাকরি নিয়েছি, এখনও সময়ের সাথেই এগোচ্ছি।

আমি যা হতে পারতাম, মনে মনে যা হতে চেয়েছিলাম আমাদের পরিবারে থেকে তা হওয়া সম্ভব ছিলনা। আমি হতে চেয়েছিলাম অনেক বড় সঙ্গীতশিল্পী, সমাজে কোন না কোনভাবে বিখ্যাত কেউ। সিনেমা হলে গিয়ে সিনেমা দেখার সুযোগ ছিলনা, মাঝে মাঝে টেলিভিশনে বাংলা সিনেমা দেখার সুযোগ হতো, কখনও নিজেকে কবরী ভাবতাম, কখনও শাবানা। বড় হয়ে নিজেকে সুচিত্রা সেন ছাড়া আর কিছুই ভাবতাম না। বিখ্যাত হওয়ার লোভ ছিল। বুঝতে পারতাম, শিল্পীসত্তা আমার রক্তে মিশে আছে, সুযোগ পেলে ভালো গায়িকা হতাম, ভালো অভিনেত্রী হতে পারতাম। যখন অস্ট্রেলিয়া ছিলাম, মঞ্চে নক্সিকাঁথার মাঠ গীতি নাট্যে দুখাই ঘটকের রোল প্লে করেছিলাম। ছোট রোল, পুরো অডিটোরিয়াম মুহূর্মুহু করতালি দিয়েছিল। অথবা বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ‘যেমন খুশী সাজো’ খেলায় দুই বাচ্চা কোলে ভিখিরি মা, সারা মাঠ মনে রেখেছে আমার সেদিনের তাৎক্ষণিক অভিনয়।
এখনও ভাবি, কোন নাট্যকার বা চলচিত্র নির্মাতা যদি আমাকে চ্যালেনজিং কোন চরিত্রে অভিনয় করার সুযোগ দিতেন!

মায়ের ছিল গল্পের বই পড়ার নেশা। গরীবের সংসারে টিভি, ফ্রিজ না থাকলেও বুকশেলফ ভর্তি বই ছিল। মা পড়তো, মেজদা পড়তো। দুই একটা বই আমিও পড়তাম। নতুন বই আর কেনা হতো না, বড় হয়ে নিজের সংসার হলো। সেই সংসারেও মায়ের মত আঙ্গুলের কড় গুনেছি, আর হিসেবের সংসার চালিয়েছি। অন্যের বাড়িতে গল্পের বই দেখলে চেয়ে এনেছি, বই পড়ে ফেরত দিয়েছি। গল্পের বই পড়তাম আর ভাবতাম, যাঁরা এত সুন্দর বই লিখেন, তারা কি আমার মত সাধারণ কেউ? কেমন করে লিখেন তাঁরা? শুরুটা করেন কিভাবে?

আমার স্বামী ছাত্রাবস্থায় বাংলায় জৈব রসায়ন বই লিখেছিলেন। প্রায় চৌদ্দ বছর পর বইটির দ্বিতীয় সংস্করণ হয়েছিল। তখন আমি তার জীবনসঙ্গী। দ্বিতীয় সংস্করণে কৃতজ্ঞতায় তিনি আমার নাম লিখেছিলেন। জৈব রসায়ন বইয়ে লেখকের কৃতজ্ঞতা নোটে আমার নাম দেখে এতটাই আবেগাপ্লুত হয়েছিলাম! তখন কল্পনার ধারে কাছেও আসেনি যে ছবি, একদিন তিনখানা বইয়ের কভারে লেখক হিসেবে আমার নাম ছাপা হবে।

হ্যাঁ, ছয় বছর আগে ফেসবুকে একাউন্ট খুলেছিলাম। প্রতিদিন এক দুটো করে স্ট্যাটাস লিখতাম। খোঁজ পেলাম প্রিয় ডট কম নামের ওয়েবপেজের। খুঁজে পেলাম প্রিয় ডটকমের কর্ণধার জাকারিয়া স্বপন ভাইকে। আমি অনলাইন জগতে একেবারেই কাঁচা, কিছুই জানিনা। স্বপন ভাই নিজে প্রিয় ব্লগে আমার একাউন্ট খুলে দিলেন, প্রিয় ব্লগে লিখতে শুরু করলাম। স্বপন ভাই আমার প্রতি ভীষণ সহানুভূতিশীল ছিলেন, ব্লগে যাই লিখতাম, কোন স্ক্রিনিং ছাড়াই সরাসরি পোস্ট হতো। এরপর বিডিনিউজ২৪ ব্লগ, আমার ব্লগ, জলছবি বাতায়নে লিখতে শুরু করি। একই সময়ে বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকার তৎকালীন নির্বাহী সম্পাদক বিখ্যাত কলামিস্ট পীর হাবীবুর রহমান সাহেব ঐ পত্রিকায় আমাকে কলাম লেখার সুযোগ করে দিলেন। লেখালেখিতে আমার নেশা ধরে গেলো।

স্বামীর বইয়ের কৃতজ্ঞতায় আমার নাম দেখে যে আমি আবেগাপ্লুত হয়েছিলাম, সেই আমার লেখা পত্রিকায় ছাপা হচ্ছে, ব্লগে ছাপা হচ্ছে, পাঠক সমালোচনা করছে! এটাইতো চেয়েছিলাম! কোন না কোনভাবে বিখ্যাত হতে চেয়েছিলাম, বিখ্যাত নাই বা হলাম, কিছু মানুষের কাছে পরিচিত হয়ে উঠবার সিঁড়ি তো পেলাম!

২০১২ সালে পত্রিকা, ব্লগে লেখালেখি শুরু। দেড় বছরের মাথায় ২০১৪ সালের একুশে বইমেলায় সিঁড়ি প্রকাশন থেকে আমার লেখা প্রথম বই ঠাকুরবাড়ির আঁতুড়ঘরে প্রকাশিত হয়। ২০১৫ সালে একই প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয় দ্বিতীয় বই ‘মুহূর্তে দেখা মানুষ’। উল্লেখ করার মত ঘটনা হলো, যেখানে দুই একজন বিখ্যাত লেখক ছাড়া বাকী সব লেখকের বই গাঁটের টাকা খরচ করে ছাপাতে হয়, সেখানে আমার প্রথম বই এবং দ্বিতীয় বই সিঁড়ি প্রকাশন নিজেদের খরচে ছাপিয়েছে!
এ যে আমার কত বড় পাওয়া, এই নিস্তরঙ্গ জীবনে, অসফল জীবনে, কিছুই হতে না পারা জীবনে, ঊদ্দেশ্যহীন জীবনে এ যে কত বড় পাওয়া, আমি ঠিক লিখে বুঝাতে পারবো না। মানুষ ঈশ্বর খুঁজে বেড়ায়, আর ঈশ্বর স্বয়ং প্রকাশক হাশিম মিলনের রূপ ধরে আমায় দেখা দেন।

প্রথম বই ঠাকুরবাড়ির আঁতুড়ঘরে যখন প্রকাশিত হলো, প্রিয় ডটকমের মিজানুর রহমান সোহেল আমার একটি সাক্ষাৎকার গ্রহণ করে প্রিয়.কমের হোম পেজে ছাপিয়ে দিলো! সেই সাক্ষাৎকারের ছাপানো অংশ দেখে অদ্ভুত এক ভালো লাগায় আমি গলে গেছিলাম। দুচোখ গড়িয়ে জল পড়ছিল, সোহেলকে কাছে পেলে জড়িয়ে ধরে কাঁদতাম।

বাবা মায়ের অকেজো সন্তান আমি, যখন কিছুটা কেজো হলাম, মা’কে তা দেখানোর সুযোগ পেলামনা। দেড় বছর আগেই মা পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন! মা থাকলে দেখাতাম, মায়ের গরীবী বুকশেলফ ভর্তি বই কখন অগোচরে আমার চোখে লেখক হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে ঘুমিয়ে ছিল।

২০১৪ সালে বইমেলায় গেছিলাম, হিসেবের সংসারে প্রতিবছর দেশে যাওয়া সম্ভব হয়না। ২০১৫ তে যেতে পারিনি, ২০১৬ বইমেলায় নন্দিতা প্রকাশ বের করলো আমার তৃতীয় বই ‘তুমি বন্ধু তুমি সখা’, আমার লেখা ১২টি গল্প দিয়ে সাজানো ‘তুমি বন্ধু তুমি সখা’। ২০১৬ তে বইমেলায় গেছিলাম।

গায়িকা হওয়ার স্বপ্ন ছিল, নায়িকা হওয়ার স্বপ্ন ছিল কিন্তু কোনটাই হয়ে উঠেনি। যা কখনও স্বপ্নেও দেখিনি, দুঃস্বপ্নেও দেখিনি, মধ্যবয়সে পৌঁছে নিজেকে সেই স্থানে আবিষ্কার করেছি। এতদিনে লেখালেখিতে মনোযোগ দিতে শুরু করেছি, মধ্যবয়সে পৌঁছে নিজেকে আবিষ্কার করেছি, গায়িকা নায়িকা হতে না পারলেও লেখিকা হওয়ার সিঁড়ি খুঁজে পেয়েছি।

২০১৭ তে সিঁড়ি প্রকাশন বের করেছে আমার চতুর্থ বই ‘সাগর ডাকে আয়’।

সিঁড়ির প্রকাশক হাশিম মিলন বয়সে ছোট হলেও আমার প্রতি বড় ভাই্সুলভ আচরণ করে। ভীষণ প্রশ্রয় দেয় আমাকে, ছোট বোনের মত মমতা করে। প্রবাসে জীবন ভীষণ কঠিন, ব্যাপারটা আর কেউ বুঝুক আর নাই বুঝুক মিলন বুঝে। আট ঘন্টা ওয়ালমার্টে চাকরি করে, ঘর সংসার সামাল দিয়ে মাত্র ১৫ দিনে ৩০০ পৃষ্ঠার বই লেখা, কমপিউটারে টাইপ করা লেখা মেইল করার আগ মুহূর্তে কমপিউটার নষ্ট হয়ে যাওয়া, পেন ড্রাইভে সেভ করা, লেখা ল্যাপটপে ট্র্যান্সফার করার পর প্রকাশককে মেইল করার দুঃসাধ্য কাজটুকু সম্পন্ন করা, অন্য প্রকাশক হলে আমার চতুর্থ বই প্রকাশ করা ছিল প্রায় অসম্ভব। লেখককে যতখানি স্বাধীনতা দিলে লেখক আপাত অসম্ভবকে সম্ভব করে তুলতে পারে, মিলন তার চেয়ে বেশী স্বাধীনতা আমাকে দিয়েছিল।

‘সাগর ডাকে আয়’ বইটি নিয়ে আমি খুব আশাবাদী। তরুণীবেলায় আমার খুব ইচ্ছে করতো জাহাজে চড়ে সমুদ্র যাত্রা করি। সৈকত থেকে সমুদ্র যতখানি দেখা যায়, তাতে আমার মন ভরতোনা। ইচ্ছে করতো সমুদ্রের মাঝখানে চলে যাই, শুনেছি মাঝ সমুদ্র থেকে চারদিকে তাকালে জল ছাড়া কিছুই দেখা যায়না! আমি খুব রোমান্টিক ছিলাম, শুধু মাঝ সমুদ্র নয়, ইচ্ছে করতো রাতের বেলা জাহাজের ডেকে শুয়ে আকাশের তারা গুনি, পাশে থাকবে আমার প্রিয় পুরুষ। অথবা প্রিয় পুরুষের কাঁধে হেলান দিয়ে সূর্যোদয় দেখি, অথবা সূর্যাস্ত! স্বামীর সাথে জাহাজে চড়ে ভারতের গোয়া বেড়াতে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তরুণীবেলার সেই স্বপ্ন সংসার নামক কঠিন বাস্তবতার আড়ালে চলে যায়।

শেষ পর্যন্ত দেড় বছর আগে সমুদ্র যাত্রা করেছি। জাহাজে চড়েই সমুদ্রে বেড়িয়েছি, স্বামীর সাথেই গিয়েছি। তবে কথায় বলে সময় পেরিয়ে হয়না সাধন! সমুদ্র যাত্রা নিয়ে তরুণীবেলায় যে উচ্ছ্বাস ছিল, মধ্যবয়সে পৌঁছে সেই উচ্ছ্বাস ছিল কি? তাই নিয়েই লেখা ‘সাগর ডাকে আয়’।

কঠিন বাস্তবতার কাঠগড়ায় আমাদের জীবন, ২০১৭ বইমেলায় উপস্থিত থাকতে চাইলেও তা হয়ে ওঠেনি। আমি উপস্থিত না থাকলেও আমার লেখা ‘সাগর ডাকে আয়’ ছিল সিঁড়ি প্রকাশনের স্টলে। এবছরও সিঁড়ি প্রকাশনের স্টলে ‘মুহূর্তে দেখা মানুষ’, ‘সাগর ডাকে আয়’ শোভা পাচ্ছে। ২০১৮ বইমেলায় আমার দেশে থাকার কথা ছিল নতুন দুখানা বই নিয়ে। মানুষ ভাবে এক, ঘটে আরেক। ২০১৮ তে আমার দেশে যাওয়া হয়নি, জানুয়ারী-ফেব্রুয়ারী জুড়ে ফেসবুকে থাকা হয়নি। দেশে যেতে পারিনি বাস্তবতার কঠিন বাস্তবতায়, ফেসবুকে থাকতে পারিনি— থাক কিছু কথা অপ্রকাশ্যই থাক।

কুহেলি গতকাল আমার জন্য নীচের দুটো ছবি পাঠিয়েছে। ‘মুহূর্তে দেখা মানুষ’ হাতে গোঁফসম্রাট শফী আজিম ভাই, ‘সাগর ডাকে আয়’ বইটি হাতে এক তরুণী ও কুহেলি।

আমার খুব সাধ হয়, আমার লেখা বইগুলো পাঠকের বুকশেলফে শোভা পাক, মনটা সারাক্ষণ বাংলাদেশেই ঘুরে বেড়ায়। বইটা যদি পাঠকের হাতে থাকে, বইয়ের পাতার ভেতর থেকে উঁকি দিয়ে দেখতে পারবো আমার প্রিয় বাংলাদেশকে।

[ প্রিয় পাঠক, আপনিও বিডিসারাদিন24 ডট কম অনলাইনের অংশ হয়ে উঠুন। লাইফস্টাইল, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, রান্নার রেসিপি, ফ্যাশন-রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন- bdsaradin24@gmail.com-এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে। নারীকন্ঠ এবং মত-দ্বিমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে  bdsaradin24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরণের দায় গ্রহণ করে না। ]

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 121 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ
bdsaradin24.com