ভাই গিরিশ চন্দ্র সেনের জন্ম ১৮৩৪ সালে নরসিংদী সদর উপজেলার পাঁচদোনা গ্রামে। ১৯১০ সালের ১৫ আগস্ট ঢাকায় মারা যান তিনি। ব্যক্তিজীবনে গিরিশ চন্দ্র সেন একাধারে সাহিত্যিক, গবেষক ও ভাষাবিদ ছিলেন। এ ছাড়া ব্রাহ্মধর্ম প্রচারক হিসেবে তিনি ‘ভাই’ খেতাবে ভূষিত হন। আরবি, ফার্সি ভাষায় ব্যুৎপত্তি অর্জন এবং কোরআন হাদিসের প্রথম অনুবাদক হিসেবে লাভ করেন ‘মৌলবি’ খেতাব।

মেঘলা সকালে পাঁচদোনা চত্বরের ভাস্কর্য। সোর্স: লেখিকা

কোরআন শরিফের প্রথম বাংলা অনুবাদক গিরিশচন্দ্র সেন ১৮৩৫ খ্রিষ্টাব্দে নরসিংদী জেলার পাঁচদোনা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৯১০ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ আগস্ট ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। নতুন প্রজন্মের অনেকে হয়তো জানেও না এই সাধকের কথা।

অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, গিরিশচন্দ্র সেন একজন ব্রাহ্মধর্মাবলম্বী হয়েও কেন পবিত্র কোরআন শরিফ অনুবাদ করতে গেলেন? তার আত্মজীবনী থেকে জানা যায়, ব্রাহ্মধর্মের নববিধান মণ্ডলীর প্রতিষ্ঠাতা কেশবচন্দ্র সেনের উৎসাহ এবং অনুরোধে তিনি এ কাজ শুরু করেন। কেশবচন্দ্র সেন সকল ধর্মের মধ্যে একটা সমন্বয় আনতে চেয়েছিলেন। সেই সংকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে তিনি বোধ করেন সমন্বয়সাধন করতে হলে সব ধর্ম সম্পর্কে সাধারণ জ্ঞান থাকতে হবে। আর তাই প্রধান ধর্মগুলোর সারকথা জানার জন্য তিনি ইসলাম, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান ধর্মের মূলগ্রন্থগুলো বাংলায় অনুবাদের উদ্যোগ নেন। চার ধর্মের মূলধর্মগ্রন্থ অনুবাদের জন্য চারজন পণ্ডিত ব্যক্তিকে দায়িত্ব প্রদান করেন।

উর্দু, ফার্সি এবং সংস্কৃত ভাষায় দখল থাকার কারণে কোরআন শরিফ অনুবাদের দায়িত্ব দেয়া হয় গিরিশচন্দ্র সেনের ওপর। কিন্তু অনুবাদ করার মতো আরবি জ্ঞান ছিল না গিরিশচন্দ্র সেনের। তিনি তখন আরবি ভাষা শিক্ষার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। ১৮৭৬ সালে ভারতের লখনৌ শহরে পাড়ি জমান আরবি ব্যাকরণ শেখার জন্য। ৪২ বছর বয়সের গিরিশচন্দ্র সেন সেখানে একজন মৌলবির কাছে আরব্য ভাষার তালিম নিতে শুরু করেন। আরবি ব্যাকরণে বিজ্ঞ পঁচাত্তর বছর বয়সের মৌলবি এহসান আলী তাকে যত্নের সঙ্গে আরবি ভাষা শিক্ষা দেন। এরপর কলকাতার একজন মৌলবির কাছে কিছুদিন আরবি ভাষার শিক্ষা নিয়ে ঢাকায় চলে আসেন গিরিশচন্দ্র সেন।

নলগোলার মৌলবি আলীমুদ্দিনের কাছে আরবি ইতিহাস ও সাহিত্য চর্চা শুরু করেন। এ সময় তিনি কোরআন পাঠ আরম্ভ করতে গিয়ে বুঝতে পারেন, কোনো মুসলমান কোরআন বিক্রেতা তার কাছে পবিত্র কোরআন শরিফ বিক্রি করবে না। তখন তিনি তার একজন মুসলমান বন্ধু মিয়া জামাল উদ্দিনের মাধ্যমে একটা কোরআন শরিফ সংগ্রহ করেন। নিজের আত্মজীবনীতে গিরিশচন্দ্র সেন লেখেন, ‘আমি তফসির ও অনুবাদের সাহায্যে পড়িতে আরম্ভ করি। যখন তফসিরাদির সাহায্যে আয়াত সকলের প্রকৃত অর্থ কিছু বুঝিতে পারিলাম, তখন তাহা অনুবাদ করিতে প্রবৃত্ত হইলাম।’

উর্দু ভাষায় ভালো দখল থাকার কারণে তিনি এ সময় শাহ রফিউদ্দিন ও শাহ আবদুল কাদেরের উর্দু অনূদিত কোরআন থেকে সাহায্য নেন। অনুবাদ করতে গিয়ে তিনি যশোরের মৌলবি আলতাফ উদ্দিনের কাছ থেকেও পরামর্শ গ্রহণ করেন।

ভাই গিরিশচন্দ্র সেনের বাড়ি। সোর্স: লেখিকা

১৮৮০ সালে গিরিশচন্দ্র সেন সর্বপ্রথম কোরআন শরিফের ক্ষুদ্র একটি সংকলন প্রকাশ করেন। প্রথম খণ্ড প্রকাশের সময় অনুবাদকের নাম গোপন রাখা হয়। কারণ অনুবাদক হিসেবে তার নাম প্রকাশ করা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। ৩২ পৃষ্ঠার এই খণ্ডের মূল্য ছিল মাত্র চার আনা। এর পর তিনি পূর্ণাঙ্গ অনুবাদের কাজে হাত দেন এবং ১৮৮১ সালে ময়মনসিংহে অবস্থানকালে কোরআন শরিফের ছোট ছোট অংশের অনুবাদ প্রকাশ করতে শুরু করেন। একই বছরের শেষ দিকে তিনি শেরপুরের চারুযন্ত্র প্রেস থেকে তার অনুবাদের প্রথম খণ্ড প্রকাশ করেন।

প্রথম সংস্করণে তা মাত্র এক হাজার কপি ছাপা হয়েছিল। তখন গিরিশচন্দ্র সেনের অনূদিত কোরআন শরিফ নিয়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হয়েছিল মুসলমানদের মধ্যে। পক্ষে-বিপক্ষে নানা রকমের বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছিল। গিরিশচন্দ্র তার আত্মজীবনীতে লেখেন, মুসলমান বন্ধুদের মধ্যে একজন বন্ধু ক্রুদ্ধ হয়ে বলেছিলেন, ‘আমাদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থের অনুবাদ একজন কাফের করেছেন, তাকে পাইলে তার শিরোচ্ছেদ করব।’

১৮৮২ সালে দ্বিতীয় খণ্ড প্রকাশ হলে দৃশ্যপট বদলাতে থাকে। কয়েকজন আলেম গিরিশচন্দ্র সেনকে অভিনন্দন জানান এবং জমিদার, ধনাঢ্য মুসলমানরা তার অনূদিত কোরআন শরিফ কেনার জন্য অগ্রিম মূল্য পরিশোধ করতে শুরু করেন। এর ফলে পরবর্তী খণ্ডগুলো তিনি অতি সহজে প্রকাশ করতে সক্ষম হন। কলকাতার বিধানযন্ত্র ছাপাখানা থেকে খণ্ডে খণ্ডে প্রকাশ হতে থাকে কোরআন শরিফের বাংলা অনুবাদ। প্রায় ছয় বছর সময় লাগে সম্পূর্ণ কোরআনের অনুবাদ এবং মুদ্রণ শেষ করতে। অবশেষে ১২ খণ্ডের পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ বাঁধাই করে বাজারে ছাড়া হয় এবং দাম ধরা হয় মাত্র আড়াই টাকা, যা ওই সময়ের একজন প্রাথমিক স্কুল শিক্ষকের মাসিক বেতনের সমান।

গিরিশ সেনের বাড়ির ঐতিহ্য রক্ষার্থে কোন রড-সিমেন্ট ব্যবহার না করে শুধু ইট, চুন, সুরকি ও বালি ব্যবহার করা হয়েছে এই বাড়ির সংস্কারে। সোর্স: লেখিকা

১৮৯৮ সালে বাংলায় অনূদিত কোরআন শরিফের দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয় কলকাতার দেবযন্ত্র প্রেস থেকে। কলকাতার মহালগঙ্গা মিশন প্রেস থেকে তৃতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয় ১৯০৮ সালে এবং বাংলাদেশ থেকে পূর্ণাঙ্গ অনুবাদের প্রথম সংস্করণ প্রকাশিত হয় ১৯৭৭ সালে ঢাকার ঝিনুক পুস্তিকা থেকে।

সব মিলিয়ে প্রায় বিতর্কহীনভাবেই গিরিশচন্দ্র সেনের বাংলা অনুবাদ সে সময়ের মুসলিম সমাজ এবং আলেমগণ গ্রহণ করেন। তখন অনেক বিজ্ঞ আলেম গিরিশচন্দ্রের প্রশংসা করে পত্র লেখেন। যারা পত্র লিখেছিলেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন মওলানা আকরাম খাঁ, ইসলামি চিন্তাবিদ মজফর আবদুল্লাহ, কলকাতা মাদ্রাসার আরবি শিক্ষক আহমদ উল্লাহ প্রমুখ। মুসলমান সমাজ তখন গিরিশচন্দ্র সেনকে ‘ভাই’ বলে সম্বোধন করতে শুরু করে এবং কোনো কোনো ব্যক্তি তাকে ‘মৌলবি গিরিশ’ বলে উপাধি দেন। মওলানা আকরাম খাঁ তার অনুবাদকর্মটিকে পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্য বিষয় বলে উল্লেখ করেছিলেন।

নরসিংদী এলাকার সে সময়ের নির্মাণ রীতি অনুসারে দেওয়ালে কাঠের তাক লাগানোর জন্য নকশা যুক্ত বাটামও লাগানো হয়েছে। সোর্স: লেখিকা

ইতিহাস থেকে জানা যায়, খ্রিষ্টীয় দ্বাদশ শতাব্দীর আগে থেকেই ভারত উপমহাদেশের বাংলাভাষী অঞ্চলে মুসলমানদের আগমন ঘটে। ব্যবসায়ী এবং ধর্মপ্রচারকদের আগমন হয় তারও অনেক আগে। সে সময়ে প্রায় সাত কোটি মানুষের ভাষা ছিল বাংলা। অনেক সমৃদ্ধ সাহিত্যও ছিল বাংলা ভাষায়। আরবি, ফার্সি, উর্দু ভাষায় পারদর্শী অনেক আলেম ছিলেন যারা বাংলা সাহিত্যেও পারদর্শী ছিলেন। কিন্তু তাদের কেউ ১৮৭৬ সাল পর্যন্ত কোরআন শরিফের পূর্ণাঙ্গ অনুবাদের কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেননি। টাঙ্গাইলের মাওলানা আমির উদ্দিন বসুনিয়া আমপারার কিছু অংশ কাব্যাকারে অনুবাদ করেছিলেন, যা কলকাতার বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের গ্রন্থগারে সংরক্ষিত আছে বলে জানা যায়।

গিরিশচন্দ্র সেন শুধু কোরআন শরিফের অনুবাদ করেই তার কাজ শেষ করেননি। তিনি হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রথম বাঙালি জীবনীকার। তিনি ১৯০৫ সালে মুসলমানদের কল্যাণে বঙ্গভঙ্গকে সমর্থন জানিয়ে বক্তৃতা এবং পুস্তক রচনা করেছিলেন। তিনি ইমাম হাসান এবং হোসেনের জীবনীসহ মিশকাত শরিফের অর্ধেকটা বাংলায় অনুবাদ করেছেন। এছাড়াও ইসলাম ধর্মবিষয়ক প্রায় ৪২টি বই রচনা এবং অনুবাদ করেছেন গিরিশচন্দ্র সেন। তার অনূদিত গ্রন্থের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, শেখ ফরিদুদ্দিন আত্তারের ‘তাজকেরাতুল আউলিয়া’ অবলম্বনে ‘তাপসমালা’, (এ বইটিতে ৯৬ জন প্রখ্যাত মুসলিম মনীষীর জীবনীর বর্ণনা রয়েছে), মাওলানা জালালুদ্দিন রুমির ‘মসনবি শরিফ’ ও শেখ আত্তারের ‘মানতেকুহতায়ের’ অবলম্বনে ‘তত্ত্ব-রত্নমালা’, শেখ সাদির ‘গুলিস্তাঁ’ ও ‘বুস্তাঁ’ অবলম্বনে ‘হিতোপাখ্যান মালা’ ইত্যাদি। টীকাসহ কোরআন শরিফ অনুবাদের সময় গিরিশচন্দ্র সেন তাফসিরুল হোসাইন, শাহ আবদুল কাদিরের ফায়িদা এবং তাফসিরুল জালালাইন অনুসরণ করেন।

সংরক্ষণের আগের অবস্থা। সোর্স: লেখিকা

গিরিশচন্দ্র সেনের প্রথম বই ব্রহ্মময়ী-চরিত(জীবনী) প্রকাশিত হয় ১৮৬৯ সালে। দ্বিতীয়টি ‘হিতোপদেশমালা’ (১৮৭১) ‘ধর্ম ও নীতি’ (১৮৭৩), ‘আকসিরে হেদায়েত’ (১৮৭৬), ‘তাজকিরাতুল আউলিয়া’ (১৮৭৭), ‘আকসিরে হেদায়েত’ থেকে তিনি মুসলিম দরবেশগণের বাণী সংকলন ও অনুবাদ করে প্রকাশ করেন। ‘নীতিমালা’ শিরোনামের এই গ্রন্থটি প্রকাশিত হয় ১৮৭৭ সালে। ‘দরবেশদের ক্রিয়া’ (তাসাউফ, ১৮৭৮), ‘দরবেশদিগের সাধন প্রণালী’ (১৮৭৯), কোরআনের বাছাই করা আয়াতের অনুবাদ ‘প্রবচনবলী (ধর্ম উপদেশ)’ প্রকাশিত হয় ব্রাহ্মসমাজ থেকে ১৮৮০ সালে।

নরসিংদী সদর উপজেলার পাঁচদোনায় ভাই গিরিশ চন্দ্র সেনের বাড়ি। সংস্কারের অভাবে আর দখলদারিত্বের চাপে শতবর্ষী বাড়িটি তার পুরনো ঐতিহ্য হারিয়ে ফেলেছিল। ২০০৮ সালে বাড়িটির মূল কাঠামো অক্ষুণ্ন রেখে সংস্কারে অনুদান দিতে আগ্রহ প্রকাশ করে ভারতীয় হাইকমিশন। পরে ২০১৫ সালে নরসিংদী জেলা প্রশাসন ও প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা কেন্দ্র ঐতিহ্য অন্বেষণের মধ্যে বাড়িটি সংরক্ষণ ও একটি প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘর নির্মাণের চুক্তি হয়। এরপর সরকারের নিয়ন্ত্রণে ও দিক নির্দেশনায় সংরক্ষণের কাজ শুরু হয় ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে। ‍চুক্তি অনুযায়ী, ভারতীয় হাইকমিশন থেকে ১ কোটি ২০ লাখ অনুদানও পায় ঐতিহ্য অন্বেষণ।

সংরক্ষণকালীন সময়কার ছবি। সোর্স: লেখিকা

গিরিশচন্দ্রের বাড়িটির মূল অবকাঠামো অক্ষুণ্ন রাখতে প্রথমে ডকুমেন্টেশন করা হয়। পরে সে নকশা অনুযায়ী নওগাঁ ও কুড়িগ্রামের পুরাকীর্তির কাজে অভিজ্ঞ ২০/২৫ জন শ্রমিককে কাজে লাগানো হয়। তারা পরম মমতায় শৈল্পিকভাবে ফুটিয়ে তুলছেন হারিয়ে যেতে বসা গিরিশ সেনের বাড়ির ঐতিহ্য। কোনো রড-সিমেন্ট ব্যবহার না করে শুধু ইট, চুন, সুরকি ও বালি ব্যবহার করা হয়েছে এই বাড়ির সংস্কারে। বাড়িটিতে আগে যা ছিল, এখনও ঠিক তাই থাকছে।

ঐতিহ্য অন্বেষণ সূত্রে জানা গেছে, মূল অবকাঠামো অক্ষুণ্ন রেখে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মেরামত ও সংরক্ষণের এই কাজে ব্যবহার করা হয়েছে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে সংগ্রহ করা ব্রিটিশ আমলের মূল্যবান কাঠ, আসবাবপত্র ও যশোরের টালি। এ ছাড়া, ঐতিহ্য অন্বেষণের নিজ উদ্যোগে উয়ারী-বটেশ্বর এলাকায় তৈরি করা একটি বিশেষ আয়তনের ইটও ব্যবহার করা হয়েছে।

জাদুঘরের নেমপ্লেট। সোর্স: লেখিকা

বেশ যত্ন করে আদি রূপ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। ইটের সাইজ মেলাতে মাটির টালি ব্যবহার করা হয়েছে। বেচে যাওয়া টালিগুলো পাশেই স্তুপ করা। দোতলার ধ্বংসপ্রাপ্ত ছাদ বেশ যত্নের সাথে পুনঃনির্মিত হয়েছে। ছাদের নীচে সাপোর্ট হিসেবে বেশ মোটা কাঠের বীমও ব্যবহৃত হয়েছে। নরসিংদী এলাকার সে সময়ের নির্মাণ রীতি অনুসারে দেওয়ালে কাঠের তাক লাগানোর জন্য নকশা যুক্ত বাটামও লাগানো হয়েছে।

এটি প্রত্নতত্ত্ব সংরক্ষণ ও জাদুঘর, তাই আদিরূপে কিছু আসবাবও বানানো হয়েছে। আসবাবগুলো কিন্তু সম্প্রতিককালে বানানো, গিরিশচন্দ্র সেন এর ব্যবহৃত নয়। সেটা না হয় মেনে নেওয়া গেল। কিন্তু কিছু ব্যাপারে বড্ড অপটুতা দেখিয়েছে সংস্কারকবৃন্দ। ভবনে ব্যবহৃত কাঠগুলো পরিরক্ষণ করা নয়। এই কাঠে খুব দ্রুতই ঘুণ ধরার সম্ভাবনা আছে। আর কাঠ রাঙানো হয়েছে গ্লোসি সিনথেটিক এনামেল দিয়ে, যা গিরিশচন্দ্রের আমলে পাওয়া যেত না। জানালায় কাঠের শেড সে আমলের নির্মাণ শৈলীর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ও বিজ্ঞান সম্মত নয়। জানালার উপর কার্নিশ হিসেবে কাঠের শেডটুকু বাদ দিলে সংস্কার কাজ বেশ চমৎকার।

ব্রাহ্ম সমাজ। সোর্স: লেখিকা

আমরা যখন গিরিশ চন্দ্রের বাড়ি গেলাম, তখন সবে সকাল হচ্ছে। তাই জাদুঘরে তালা মারা ছিল। একজন লোককে দেখতে পেয়ে বললাম, ‘এটা খুলবে কখন?‘ জবাব এলো, ‘দশটায়।’

কী আর করা! বাইরে থেকে কিছুক্ষণ ঘুরে দেখে, ইতিহাস পড়ে ফিরে গেলাম পাঁচদোনা। ঠিক করলাম, ডাঙ্গায় জমিদার বাড়ি ঘুরে এসে আরেকবার ঢুঁ মারবো এখানটায়। জাদুঘর না দেখে গেলে ভালো লাগবে না আমার।

কিন্তু ভাগ্য অতো সহায় হলো না। লক্ষ্মণ সাহার জমিদার বাড়ি ঘুরে পাঁচদোনা এসে, কষ্ট করে আবারোও পাঁচশ মিটার হেঁটে গিরিশ চন্দ্রের বাড়ি আসার ফলাফল হলো শূন্য। তখনো গেটে তালা মারা ছিল। আরোও ছিল একজোড়া কপোত কপোতী এবং একজন পাহারাদার। একজন প্রেমিক তার স্কুলপড়ুয়া প্রেমিকাকে সঙ্গে নিয়ে এখানে আড্ডা দিচ্ছিল। প্রেমিকার সঙ্গে ছিলো, আরোও একজন স্কুলপড়ুয়া বালিকা। সে খুব বিরক্ত বদনে পায়চারি করছিল। ইউনিফরম দেখে বুঝতে পেরেছিলাম স্কুল পালিয়ে এরা এখানে গল্পের আসর বসিয়েছে।

গিরিশচন্দ্র সেনের বই। সোর্স: লেখিকা

তাদেরকে আর বিরক্ত করলাম না। পাশের ভূমি অফিসের লোকজনকে জিজ্ঞেস করে নিশ্চিত হলাম, জাদুঘরটি আজ আর খোলা হবে না। বন্ধের দিন ছিল না সেদিন, তাও কেন জাদুঘরটি বন্ধ ছিল জানি না। আদৌ খোলা হয় কি না, তাও জানতে পারিনি। ব্যর্থ মনোরথে পা বাড়ালাম আমাদের পরবর্তী গন্তব্যে।

কীভাবে যাবেন :

ঢাকা থেকে নরসিংদী যাওয়ার সবচেয়ে সহজ ব্যবস্থা ট্রেন। স্টেশন থেকে অটো/সিএনজি তে করে পাঁচদোনা যাওয়া যায়।
ঢাকা গুলিস্তান থেকে আসতে হলে গুলিস্তান সার্জেন্ট আহাদ পুলিশ বক্সের সামনে থেকে মেঘালয় লাক্সারী, মেঘালয়, বিআরটিসি, সোহাগ বাসে পাঁচদোনা। বাসে মাধবদীর টিকিট কাটবেন। মূলত মাধবদীর টিকিটে আপনি পাঁচদোনা মোড় নামতে পারবেন। অবশ্যই বাস সুপারভাইজারকে বলে রাখবেন যেন পাঁচদোনা মোড় নামায়।

পাঁচদোনা গোল চত্বর থেকে মাত্র ৫০০ মিটার দূরত্বে ভাই গিরিশচন্দ্র সেনের বাড়ি।

লেখিকা–