কৃষ্ণকলির কথকতা!

Print

 

আজ ওয়ালমার্টে আমার কাজের স্কেজিউল ছিল দুপুর ৩টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত। বারো বছরের বেশি সময় ধরে অয়ারলেস ডিপার্টমেন্টে কাজ করছি। পাঁচ বছর আগেও কাজটা আমার খুব উপভোগ্য মনে হতো। কারণ তখন স্টেটের তিনটি বড় ফোন কোম্পানির ডিলার হিসেবে গ্রাহকদের কাছে দুই বছরের চুক্তিতে ফোন সার্ভিস বিক্রি করতাম। কত রকমের গ্রাহকের সাথে পরিচয় হতো, কত রকমের গ্রাহক, সাদা কালো চায়নিজ, ভারতীয়, ভিয়েতনামি এবং মেক্সিকান। মেক্সিকান গ্রাহকরা আবার ইংলিশ বলতে পারেনা, তাদের সাথে আমি ইশারায় কথা বলতাম। এখন ফোন কোম্পানিগুলোর দুঃসময় চলছে, আমার কাছে তাই চাকরিটা অনুপভোগ্য মনে হচ্ছে।

পাঁচ বছর আগে আমার মনে আনন্দ ছিল, স্বভাবে তারুণ্য ছিল, চেহারায় ঔজ্জ্বল্য ছিল। ওয়ালমার্টের সহকর্মীরাতো বটেই, পরিচিত অপরিচিত, প্রথম দেখাতেই কাস্টমারদের প্রায় সকলে আমাকে খুব সুন্দরী বলতো। সুন্দরী যে, সে জানে সে সুন্দরী, তবুও রূপের প্রশংসা শুনতে চায়, প্রশংসা শুনে খুশি হয়। সেখানে আমার মত একজন নারী, দেশে যার রূপ ছিল কালো রঙের আড়ালে, সে যখন আমেরিকায় সাদা কালো সাহেব মেমদের মুখে রূপের প্রশংসা শুনে, খুশিতে তো তার ডিগবাজি খাওয়ার কথা। ঐ সময়টাতে আমারও সত্যি সত্যি ডিগবাজি খেতে ইচ্ছে করতো। বুড়ো বয়সে ডিগবাজি তো খাওয়া যায় না তাই সারাক্ষণ “ কালো তারে বলে গাঁয়ের লোক, কৃষ্ণকলি আমি তারে বলি’ গানের কলি গুনগুন করতাম।

[তবে একটা কথা এখনও বলা হয়নি, আমাকে কালো নারীরা কেউই সুন্দর বলেনি, আজও বলেনা। আবার কালো পুরুষদের সকলেই সুন্দর বলতো, আজও কেউ কেউ বেখেয়ালেই সুন্দর বলে ফেলে। এবং সুন্দর শুনে পাঁচ বছর আগে যেমনই খুশি হতাম, এখন সব সয়ে গেছে।]

কালো মহিলা গ্রাহক ছাড়া বাদ বাকী সব গ্রাহক আমাকে খুব পছন্দ করতো। কালো মহিলারা কেন আমায় পছন্দ করতো না বা এখনও করে না, তা নিয়ে অনেক ভেবেছি।
কালো আমেরিকান মহিলাদের মধ্যে আমাদের দেশের বস্তিবাসী মহিলাদের খুব মিল আছে, যারা প্রতিদিনের জীবন সংগ্রামে ক্লান্ত হতে হতে চেহারার লাবন্য হারিয়ে ফেলে, ভাষার মাধুর্য হারিয়ে ফেলে, কন্ঠে কোমলতা হারিয়ে ফেলে। এদের গন্ডায় গন্ডায় বাচ্চা হয়, বাচ্চাদের মুখের খাবার জোগাড় করতে হয়, সংসারে বয় ফ্রেন্ড বা স্বামীর সাথে টাকা পয়সা নিয়ে খিটিমিটি লেগেই থাকে। এদের অধিকাংশই কথা বলে ঝগড়াটে ভঙ্গিতে, শান্তশিষ্ট পরিবেশেও তাদের চেহারায় ভাব থাকে ‘বিনা যুদ্ধে নাহি দেব সূচাগ্র মেদিনী” ধরণের।

এই ধরণের মারমুখি মেজাজের নারীগণ কোন এক অজানা কারণেই আমাকে শত্রুপক্ষ ভেবে নেয়। যারা জীবনে মোটামুটি সফল, স্বচ্ছল, তেমন ধরণের কালো নারীরা নিজেদের ভাবে ‘ব্রাহ্মণ, আমাকে ভাবে ‘ওয়ালমার্টের শ্রমিক’। মোটকথা কালো মহিলারা আমাকে পছন্দই করেনা।
কালো পুরুষদের বেলায় আবার এর উলটো চিত্র। কালো পুরুষগুলো খুবই আমুদে, তাদের কখনও হাসি ছাড়া দেখা যায়না। এরা আবার রূপের সমঝদার। স্বজাতি মেয়েদের দিকে ইশক দৃষ্টি নিয়ে তাকাবে তো বটেই, অন্য জাতির আমার দিকেও মুগ্ধ নয়নে তাকায়। সরাসরি তাদের মুগ্ধতার কথা প্রকাশও করে দেয়। মুগ্ধতার পরিমান বেশি হলে বাম অনামিকায় চোখ ফেলে দেখে আংটি আছে কিনা। আংটি না দেখে প্রায়ই ডিনার বা লাঞ্চের নেমন্তন্ন করে বসে! এসব দেখে আগে ঘাবড়ে যেতাম, ধীরে ধীরে সব সয়ে গেছে। কালো পুরুষরা ভীষণ মারদাঙ্গা হয় শুনেছি, কিন্তুঁ ওয়ালমার্টে তাদের সব সময় ফূর্তি মুডে দেখা যায়। দুই একটা বাদে কালো পুরুষগুলোর আচরণ আমার খুব ভালো লাগে।

অবশ্য কালো বুড়িমা যারা, তারা কিন্তু আবার আমাকে পছন্দ করে।কালো বুড়িমাদের মাঝে আমি খুঁজে নেই আমাদের দেশের নানী দাদী দিদিমা ঠাকুমাদের। আমিও তাদের খুব পছন্দ করি।
এই ফোন সার্ভিসের চাকরিতে যে কয়দিন আমি আড়ালে কেঁদেছি, অথবা মন খারাপ করেছি তার সবক’টির জন্য কালো ধুমসি মহিলা গ্রাহকগণ দায়ী।

মেক্সিকান গ্রাহকদের আমি ছাড়া আর কেউ সার্ভিস দিতে চায় না, ওরা ইংলিশ বলতে পারেনা বলে। ওদের সাথে ইশারায় কথা বলবে, এমন সময় কারো নেই, এমন সদিচ্ছাও কারো নেই। আমি যদি কাউকে অসহায় অবস্থায় দেখতে পাই, সেখানেই আমি এগিয়ে যাই, এটা আমার চরিত্রের ‘ঝামেলাযুক্ত একটি অংশ’। আমার তিন কন্যার মধ্যে মেজো কন্যাটি পেয়েছে আমার চরিত্রের ঝামেলাযুক্ত দিকটি।

আসলে আমি নিজে ভুক্তভোগী, ভিনদেশ থেকে আমেরিকায় এসে বসত গেড়েছি। ভিন্ন পরিবেশ, ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন সংস্কৃতি, এতসব ভিন্নতার মধ্যে টিকে থাকার সংগ্রাম যাকে প্রতিনিয়ত করতে হয়, সে ছাড়া আর কে বুঝবে আমেরিকায় একজন মেক্সিকান অথবা একজন চায়নীজের ভাষাগত সমস্যার বিষয়টি।
আমি মেক্সিকান গ্রাহকদের সাথে এত যত্ন করে কথা বলতাম, তাই হয়তো ওরা আমাকে দেখলেই প্রয়োজন না থাকলেও এগিয়ে আসতো, ” অলা, গ্রাসিয়াস, কোমোএস্তাস’ বলে বিগলিত হাসি দিত।

মজার ব্যাপার হতো ভারতীয়দের নিয়ে। ভারতীয় গ্রাহকেরা আমাকে দেখলেই মুখে অতি আপনজনের দেখা পেয়েছি ভাব এনে হিন্দীতে কথা বলা শুরু করতো।

এবার বলি, বুড়ো গ্রাহকদের কথা। বুড়োদের বেলায় সাদা কালো বাদামী নাকবোঁচা, নারী পুরুষ সকলেই সমান।বুড়োরা আমায় আগেও খুব পছন্দ করতো, এখনও করে। কিছু বুড়ো আছে, তারা আমার জন্য অপেক্ষা করে। অন্য রেজিস্টার থেকে চেক আউট না করে লম্বা গ্রাহক লাইনে দাঁড়িয়ে থাকে। যখন আমি ফ্রি হই, তখন আমার কাছে আসে। খুব সহজ কাজ, ফোনে মিনিট এড করে দেয়া। ভলিউম বাটন বাড়িয়ে দেয়া, স্ক্রিন ব্রাইটনেস বাড়িয়ে দেয়া এইসব ছোটখাটো সমস্যা, তাদের কাছে যা কিনা বিশাল সমস্যা মনে হয়।

আমি মানুষ ভালোবাসি, এই চাকরিতে সারাক্ষণ মানুষের মাঝে থাকা যেত বলেই চাকরিটা আমার ভাল লাগতো।সেই চাকরি এখন আর ভাল লাগেনা। পাঁচ বছর আগে ওয়ালমার্ট তাদের নিজস্ব প্রিপেইড ফোন সার্ভিস মার্কেটে নিয়ে আসার পর থেকে নামী ফোন কোম্পানিগুলোর বাজার নষ্ট হয়ে গেছে। এত সস্তায় প্রিপেইড সার্ভিস পেয়ে তাদের গ্রাহকেরা ওয়ালমার্টের প্রিপেইড সার্ভিস কিনতে শুরু করেছে। ফলে তারা বাধ্য হয়েছে দুই বছরের ফোন সার্ভিস বাতিল করে প্রিপেইড ফোন সার্ভিস চালু করতে। প্রিপেইড ফোন সার্ভিস মানে, নগদে ফোন কিনো, মান্থলি কার্ড কিনো, নিজে নিজে ফোন এক্টিভেট করো। আমাদের কাজ কমে গেছে। আমি বাদে অন্য এসোসিয়েটরা মহাখুশি এই পরিবর্তনে, তারা কাজে আসে ঠিকই, গায়ে হাওয়া লাগিয়ে কাজ ফাঁকি দিয়ে ইতি উতি ঘুরে বেড়ায়।

তবুও চাকরি বলে কথা। চাকরি করতেই হয় তাই চাকরিটা রাখতেও হয়। চাকরিটা রাখতে হবে বলেই নিরস মনে কাজে যাই। যেন তেতো ওষুধ খাচ্ছি, এমন মনে কাজ করি। এখন আবার চলছে ট্যাক্স রিটার্ন থেকে পাওয়া নগদ টাকার কামড়ানি। টাকার কামড়ে কালোরা বেশি জর্জরিত, এরাই দল বেঁধে ওয়ালমার্টে এসে টাকার কামড়ের জ্বালা মিটিয়ে যায়। দুই ঘন্টা আগে যদি আই ফোন সিক্স কিনে বাড়ি গেলো, দুই ঘন্টা পর ফিরে এসে বলবে, আই ফোন সিক্স নেবো না, সিক্স এস প্লাস দাও, ( ডাবল দাম)। এরা এমন করে, রাগে আমার শরির জ্বলে।

আজও ওয়ালমার্টের ঊদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছি, ট্রাফিক লাইটের কাছে আসতেই পকেটে থাকা ফোন ভাইব্রেট করা শুরু করেছে। লালবাতিতে গাড়ি থামিয়ে দেখি, কানাডা থেকে বড়দা কল দিয়েছে। বললাম, ড্রাইভ করছি। কাজে যাচ্ছি।
বড়দা অবাক হয়ে বলল, এখন কাজে যাচ্ছিস? এটা কেমন শিফট?
বললাম, এমনই শিফট। কিছু বলবে?
-না, তোর সাথে কতদিন কথা হয়না। ফেসবুকেও তুই নেই, ফেসবুকে থাকলেতো তবুও প্রতিদিন দেখতে পেতাম।

কাটা ঘায়ে লবনের ছিটা এসে লাগলো। বললাম, আমি ভাল আছি।
-তোর ব্যান কবে শেষ হবে?
-জানিনা। ব্যানের খবর আর রাখিনা। ফেসবুক নিয়ে আমার আর কোন আগ্রহ নেই।

আমার কন্ঠস্বর বড়দার চেনা। বলল, আচ্ছা ঠিক আছে, কাজে যা। কাল কল দিবো নে।

মাথাটা জ্বলছিল। ইনবক্স ঠেসে থাকে মেসেজে, ” দিদি আপনি কই? দিদি কি রাগ করে ফেসবুক ছেড়ে চলে গেলেন? দিদি, কবে ফরবেন? দিদি, আপনাকে ফেসবুকে দেখিনা কেন?——
আমার ভাই বোন মাসি পিসি সকলের সাথে ফেসবুকেই যোগাযোগ হতো। তাদের কারো সাথেই যোগাযোগ নেই।

কাজে গেছি, ভেবেছিলাম মাত্র পাঁচ ঘন্টার স্কেজিউল, কেটে যাবে সময়। গিয়ে দেখি, দুই জন এসোসিয়েট এবসেন্ট। আমাকেই আমার ডিপার্টমেন্ট ওপেন করতে হয়েছে, ক্লোজ করতে হয়েছে। পাশের ইলেকট্রনিক ডিপার্টমেন্টেও আমাকেই হেল্প করতে হচ্ছে। আজ গ্রাহকরাও সব এক রঙের, যাদের ট্যাক্স রিটার্নের টাকা কামড়াচ্ছে।
এখন আমি অনেক সেয়ানা হয়ে গেছি, ভালোর সাথে ভালো, মন্দের সাথে মন্দ হইনা তবে আলগা পিরীতিও দেখাতে যাই না। আজ তিতা মনে মুখে হাসি এনেই কাজ করছিলাম।

আমাকে এদেশে আগে অনেকেই মনে করতো, আমি মেক্সিকান। আমাকে দেখলেই বলতো, ‘অলা’। আমি খুশিই হতাম। তবে এখন খুশি বা অখুশি কিছুই হইনা।
আজ এক কালো সাহেব দূর থেকে আমাকে ডেকে টিভির দাম জিজ্ঞেস করছে। তার জিজ্ঞেস করার ভঙ্গিটাই ভাল লাগেনি। আগেই বুঝেছি, এই টিভি সে কিনবে না, আজাইরা এইটার দাম কত, ঐটার দাম কত বলে বলে সময় নষ্ট করবে।
তখন ইলেক্ট্রনিকস ডিপার্টমেন্টে কেউ ছিলনা তাই আমাকেই যেতে হয়েছে। কাছে যেতেই কালো সাহেব বলে, ‘ অলা’।

কেন জানি আমার মাথাটা দপ করে জ্বলে উঠেছে। ফাজলামো নাকি? বারো বছরের বেশি এখানে কাজ করছি, এখনও আমাকে ‘অলা’ বলার মানে কি?
মুখ চোখ কঠিন করে বললাম, ” আমি স্প্যানিশ বলিনা। আমার সাথে ইংলিশে কথা বলো”।
কালো সাহেব একটু সামলে নিল।

যা ভেবেছি তাই, টিভির দাম শুনে বলল, ওকে, এমনিই দাম জানতে চেয়েছিলাম।”

এক মেক্সিকান নারী তার দুই কিউট বাচ্চা নিয়ে এসেছে। নারী ইংলিশ পারেনা, বালিকা কন্যাকে পাঠিয়েছে আমার কাছে, বালিকা ইংলিশেই আমাকে প্রশ্ন করেছে।

বালক বালিকাদের আমি খুব পছন্দ করি, শিশুদেরতো কথাই নেই ( শিশুদের বেলায় কিছুটা বৈমাত্রেয় ভাব প্রকাশ পায় আমার মধ্যে। সাদা শিশু দেখলে মুগ্ধ হয়ে তাকাই, চায়নিজ মেক্সিকান শিশুদের দিকে তাকাই কিউট দৃষ্টিতে, কালো শিশুদের দিকে কিন্তু মুগ্ধ বা কিউট কোন দৃষ্টিই দেইনা। কেন দেইনা, জানিনা। কালো শিশুদের দিকে তাকাই মায়া নিয়ে, ওদের দেখলে আমার মায়া লাগে। কেন মায়া লাগে, তাও জানিনা। হয়তো মনে পড়ে যায়, দেশে থাকা অসহায় গরীব, বস্তিবাসী, পথের ধারে কাগজ কুড়ানি শিশুদের মুখ)।

মেক্সিকান বালিকাকে আমি খুব সুন্দর করে বুঝিয়ে বলে দিলাম। মেয়ের সাথে আমি এত আদর করে, সুন্দর করে আধো আধো উচ্চারণে কথা বলেছি, মেক্সিকান মা ইংলিশ বলতে না পারলেও আমার সহজ সুন্দর আচরণের ব্যাপারটা ঠিকই বুঝেছে। কাছে এসে কী যে সুন্দর হাসিতে মুখ ভরিয়ে বলল, গ্রাসিয়াস। তারপর বলল, থ্যাঙ্ক ইউ’। হাসিটা লাগিয়েই রাখলো মুখে। আমার মনটা ভাল হয়ে গেলো।

আমেরিকা এসে আমিও এমন করতাম। মেয়েদের সাথে যেখানেই যেতাম, শপিং মল, বিভিন্ন স্কুল কলেজের অনুষ্ঠান, এয়ারপোর্ট— আমেরিকানদের সাথে কথা বলতে ভয় আর লজ্জা লাগতো। মিশা আর মৌটুসিকে এগিয়ে দিতাম কথা বলার জন্য। যারা আমার মেয়েদের সাথে খুব সুন্দর করে হেসে হেসে কথা বলতো, আনন্দে খুশিতে আমার মন ভরে উঠতো। আমিও এগিয়ে গিয়ে তাদের থ্যাংক ইউ, থ্যাংক ইউ’ বলতাম।

একেবারে সন্ধ্যার মুখে এক কাস্টমার এলো। আমার সামনে একটা পেতি ফোন বের করে বলল, ” এই ফোনটা অনেক পুরানো। এখন কাজ করেনা। যার ফোন, সে আছে ক্লিনিকে। খুব অসুস্থ। খুব কম দামের একটা নতুন ফোন দিতে পারো?”
আমি কিছুটা বিভ্রান্ত হলাম। কথাগুলো সবই বুঝেছি, কিন্তু লোকটা ইংলিশে কিছুই বলেনি তো! লোকটার মুখের দিকে তাকালাম, আমেরিকান চেহারা নয়। সে আবার কিছু বলতেই খেয়াল হলো, সে হিন্দীতে কথা বলছে।

মনে মনে হেসে ফেললাম। তাকে ফোন পছন্দ করে দিলাম। জিজ্ঞেস করলাম, তুমি আমার সাথে হিন্দীতে কথা বলছিলে, তুমি জানলে কি করে যে আমি হিন্দী জানি?

-আমি তোঁ তোমাকে চিনি। একদিন আমার বউয়ের গলায় মঙ্গলসূত্র দেখে তুমি বলেছিলে, খুব সুন্দর। মনে পড়ে? আমি তোমাকে সব সময় দেখি, অন্যদিন কাউলারা তোমার আশেপাশে থাকে তাই হিন্দী বলিনা। হিন্দী বললে কাউলারা মুখ ভেচকাবে তাই ইংলিশ বলি।
( কালো আমেরিকানদের আমাদের দেশীয়রা ‘কাউলা’ ডাকে)।

হিন্দী ভাইয়ের কথায় হেসে ফেললাম। বললাম, আমি হিন্দী বলতে পারিনা কিন্তু বুঝি। আমি বাংলাদেশের মেয়ে। সাথে সাথে হিন্দী ভাই বলল, ” আমি বাংলা বুঝি। বাংলা বলতেও পারি। তুমি কেমন আছো। তুমি কি খাবে।পাঁচ বছর কলকাতা ছিলাম। তখন বাংলা শিখেছি, এখন ভুলে গেছি”।

-তুমি ভারতের কোন প্রদেশের?

-পাঞ্জাব।
-তুমি কি শিখ সম্প্রদায়ের?
-না, আমি হচ্ছি শর্মা।
-শর্মাতো টাইটেল, তোমার নাম কি?
-ভিনোদ শর্মা।

শর্মাজির ফোন সেট করে দিয়েছি। ফোন শর্মাজির বোনের। বোনের হাই ডায়াবেটিস, অন্ধ হয়ে গেছে। ক্লিনিকে ভর্তি আছে, চোখে দেখতে পায়না কিন্তু কথা তো বলতে হয়। তাই ফোন দরকার। পুরনো ফোনটা ছিল প্রাগৈতিহাসিক যুগের, ছোট চ্যাপ্টা। এখনকারটা ফ্লিপ ফোন, ক্যামেরা আছে।
শর্মাজি খুশি, তার বোন চোখে দেখতে পাচ্ছেনা, তাতে কি, ফোনের ক্যামেরায় ছবি তুলতে পারবে।
বললাম, বোনের হয়ে তুমিই নাহয় ছবি তুলে দিও। চোখে দেখতে পায়না বললে, তার উপর এই ফোনের ক্যামেরায় ছবি তুলতে গেলে তো তার চোখে চাপ পড়বে।।

তা ঠিক।আচ্ছা, এই ফোন যদি পছন্দ নাহয়, তাহলে স্মার্ট টাচ স্ক্রিন ফোন নিলে ভাল হবে?
-না , টাচ স্ক্রিন ফোন তোমার বোনের জন্য ভাল হবেনা। তিনি বাটনওয়ালা ফোন ব্যবহার করে অভ্যস্ত, চোখে না দেখেও আন্দাজের উপর বাটনে চাপ দিয়ে নাম্বার ডায়াল করতে পারে। টাচ স্ক্রিন ফোনে যা কিছু সব আঙ্গুলের টাচে করতে হবে। তিনি কিভাবে পারবেন? তাছাড়া টাচ স্ক্রিন ফোনগুলো মাঝে মাঝেই স্ট্যাটিক হয়ে যায়, স্ক্রিন আটকে থাকে। ফোনের কভার খুলে ব্যাটারি খুলে রিবুট করতে হয়। তোমার অসুস্থ বোন কি এতসব ঝামেলা করতে পারবে?

-আরেব্বাস, এদিকটা আমার মাথাতেই আসেনি।ডাক্তাররাও স্মার্ট ফোন রোগির আশেপাশে রাখতে দেয় না। থাক থাক, যেটা তুমি দিয়েছো, সেটাই থাক।

ততক্ষণ শর্মাজি দাঁড়িয়েই থাকলো যতক্ষণ কোন ‘কাউলা’ ্সেখানে আসেনি। যেই মাত্র এক কালো ষন্ডা টাইপের এক মেয়ে কাস্টমার এসে বলল, ” আমি তোমাদের ম্যানেজারের সাথে কথা বলতে চাই”, শর্মাজি আমাকে চোখের ইশারায় শুভকামনা জানিয়ে বিদায় নিল।

মন মেজাজ ভালো থাকলে এই ষন্ডা মেয়েকে আমিই জিজ্ঞেস করতাম, ম্যানেজারকে কি প্রয়োজন। সম্ভব হলে আমিই তার প্রয়োজন মিটিয়ে দিতাম। আজ আমার জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করলো না। ইন্টারকমে বলে দিলাম, ম্যানেজারকে পেইজ করে দিতে, এরপর ফটোল্যাবে গিয়ে সহকর্মি কেভিনকে বলে বাড়ির পথে রওনা দিলাম।

  • রীতা রায় মিঠু
[ প্রিয় পাঠক, আপনিও বিডিসারাদিন24 ডট কম অনলাইনের অংশ হয়ে উঠুন। লাইফস্টাইল, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, রান্নার রেসিপি, ফ্যাশন-রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন- bdsaradin24@gmail.com-এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে। নারীকন্ঠ এবং মত-দ্বিমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে  bdsaradin24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরণের দায় গ্রহণ করে না। ]

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 89 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ
bdsaradin24.com