কেয়ামতের দিন আরশের ছায়া পাবে যারা

Print

দুনিয়া হচ্ছে পরকালের শস্যক্ষেত্র। পরকালে সবাইকে দুনিয়ার জীবনের সকল কৃতকর্মের হিসাব দিতে হবে। দুনিয়াতে যেমন কোনো বিচারকাজের জন্য একটা পরিবেশ তৈরি করা হয়, তেমনি কিয়ামতে এমন একটা পরিবেশ সৃষ্টি করা হবে, যা হবে অত্যন্ত ভয়াবহ। তখন মানুষ খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করবে, সূর্য তার তীব্রতা বাড়িয়ে মাত্র আধ হাত মাথার ওপর অবস্থান করবে। মানুষ তার পাপ অনুযায়ী নিজের ঘামে নিমজ্জিত হতে থাকবে। কেউ মাথা পর্যন্ত, কেউ কাঁধ পর্যন্ত, কেউ কোমর আর কেউ পা পর্যন্ত নিমজ্জিত হতে থাকবে। সে দিন আরশের ছায়া ব্যতীত এই প্রখর সূর্যের তাপ থেকে মুক্তির বিকল্প কোনো ছায়া থাকবে না। এই আরশের ছায়া সবাই পাবে না। বোখারি শরিফের এক হাদিসে হজরত আবু হুরায়রা রা: থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, ‘সাত প্রকার মানুষকে আল্লাহ তায়ালা কিয়ামতের দিন তাঁর আরশের ছায়ায় স্থান দেবেন। সেদিন আরশের ছায়া ছাড়া আর অন্য কোনো ছায়া থাকবে না।’ এই সাত শ্রেণীর মানুষ হলো :
১. ন্যায়পরায়ণ শাসক :

যারা ন্যায়পরায়ণতার সঙ্গে শাসনকাজ পরিচালনা করে তারা আল্লাহর আরশের ছায়ার নিচে স্থান পাবে। এখানে শাসক বলতে সর্বস্তরের দায়িত্বশীল ব্যক্তিকে বোঝানো হয়েছে। তিনি পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র বা কোনো দলের নেতা যাই হোন না কেন, নেতৃত্বের ব্যাপারে ন্যায় ও ইনসাফ করতে হবে। রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, ‘সাবধান! তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেকে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।’ (বোখারি ও মুসলিম)। ইনসাফভিত্তিক নেতৃত্ব না হলে তা অধীনস্থদের মাঝে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি করে। নেতৃত্বের প্রতি অনীহা সৃষ্টির ফলে সমাজ ও রাষ্ট্রে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি মুসলমানদের যাবতীয় ব্যাপারে দায়িত্বশীল হওয়ার পর তাদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করবে আল্লাহ তার জন্য বেহেশত হারাম করে দেবেন।’ (বোখারি ও মুসলিম)।
২. যে যুবক আল্লাহর ইবাদতে মশগুল থাকে :

যৌবনকাল মানুষের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সময়। এই সময় মানুষ যে কোনো দিকে ধাবিত হতে পারে। আর এই সময়ে যে আল্লাহর ইবাদত করবে, সে এই ছায়ার নিচে আশ্রয় পাবে।
৩. যার অন্তর মসজিদের সঙ্গে ঝুলে থাকে :

অন্তর মসজিদের সঙ্গে ঝুলে থাকার অর্থ হলো আল্লাহর সঙ্গে সান্নিধ্য লাভের ব্যাপারে তার ব্যাকুলতা। দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ মসজিদে পড়ার জন্য ব্যাকুলতা। এক ওয়াক্ত নামাজ পড়ার পর আরেক ওয়াক্ত নামাজ কখন মসজিদে গিয়ে আদায় করবে- যার মনের মধ্যে এমন অস্থিরতা কাজ করবে সে আরশের ছায়ায় স্থান পাবে। রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, ‘নামাজ মুমিনদের জন্য মেরাজস্বরূপ।’ মসজিদে জামাতে নামাজ পড়ার গুরুত্ব অনেক।
৪. আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য বন্ধুত্ব :

সেই দুই ব্যক্তি যারা শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই বন্ধুত্ব রাখে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্যই বিচ্ছিন্ন হয়, তারা আরশের ছায়ায় স্থান পাবে। মুসলমানদের প্রত্যেকটি কাজ আল্লাহর উদ্দেশ্যে এবং ঈমানের পরিপূর্ণতার জন্যই হওয়া উচিত। কোনো কিছুকে ভালোবাসলে তা আল্লাহর জন্য এবং পরিত্যাগ করলে তাও আল্লাহর জন্য হতে হবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘বলুন আমার নামাজ, আমার কোরবানি, আমার জীবন, আমার মরণ সবই একমাত্র আল্লাহর জন্য।’ (সূরা আনআম : ১৩২)। আবু উমামা রা: থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, যে ব্যক্তির কাউকে ভালোবাসা, ঘৃণা করা, দান করা ও দান না করা নিছক আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই হয়ে থাকে, সে ব্যক্তি পূর্ণ ঈমানদার। (বোখারি)
৫. আল্লাহর ভয়ে ভীত ব্যক্তি :

যে ব্যক্তিকে কোনো অভিজাত ও সুন্দরী রমণী আহ্বান করে (ব্যভিচারের জন্য), তখন সে তা প্রত্যাখ্যান করে বলে, আমি আল্লাহকে ভয় করি। সেই ব্যক্তি পাবে আরশের ছায়া। যৌবনকালে নারী-পুরুষ একজন অপরজনের সান্নিধ্য চায়। সৃষ্টিগতভাবে এটা একটা স্বাভাবিক কামনা। তখন সম্ভ্রান্ত ঘরের কোনো সুন্দরী রমণী ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়ার প্রস্তাব করলে শুধু আল্লাহর ভয়েই তা থেকে বিরত থাকা যায়। এভাবে চরিত্রের হেফাজত করলেই আরশের ছায়ায় স্থান লাভ করা যাবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আর তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না। নিশ্চয়ই এটা অশ্লীল কাজ এবং অসৎ পন্থা।’ (সূরা বনি ইসরাইল : ৩২)। তিনি আরো বলেন, ‘লজ্জাহীনতার যত পন্থা আছে তার কাছেও যেয়ো না, তা প্রকাশ্যে হোক বা গোপনে হোক।’ (সূরা আনআম : ১৫২)। ইসলাম বিবাহের মাধ্যমে বৈধ পন্থায় যৌনচাহিদা মেটানোর নির্দেশ দিয়েছে।
৬. দানশীল ব্যক্তি :

যে ব্যক্তি এতটা গোপনে দান করে যে, তার ডান হাত কী দান করে বাম হাত জানে না। তার মনে সে শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্যই দান করে, মানুষের কাছে দাতা সাজার জন্য নয়। দান করার নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আমি তোমাদের যে রিজিক দিয়েছি তা থেকে খরচ করো মৃত্যু আসার আগেই।’ (সূরা মুনাফিকুন : ১০)। তিনি আরো বলেন, ‘তোমরা কিছুতেই কল্যাণ লাভ করতে পারবে না, যতক্ষণ না তোমরা তোমাদের প্রিয় বস্তুগুলোকে আল্লাহর পথে ব্যয় করবে।’ সূরা (আলে ইমরান : ৯২)। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনই হবে দান করার মূল লক্ষ্য। প্রকাশ্যে দান করলে মনে অহঙ্কার আসতে পারে, এ জন্যই গোপনে দান করার কথা বলা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, ‘আল্লাহ তোমাদের সৌন্দর্য ও সম্পদের দিকে লক্ষ করেন না বরং তোমাদের অন্তঃকরণ ও কাজের দিকে লক্ষ করেন।’
৭. গোপনে আল্লাহকে স্মরণকারী :

আর যে ব্যক্তি গোপনে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং চোখের পানি ফেলে। এর অর্থ হলো, সে গোপনে আল্লাহকে স্মরণ করে নিজের পাপ মার্জনার জন্য চোখের পানি বের করে। নির্জনে আল্লাহর ভয়ে দুই কারণে চোখের পানি ফেলা হয়। ক. আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ও মহত্ত্বের জন্য। খ. নিজের অপরাধ স্মরণ করে মুক্তিলাভের জন্য। রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর ভয়ে চোখের পানি ফেলেছে, তার জাহান্নামে প্রবেশ করা তেমনি অসম্ভব যেমনি অসম্ভব দোহন করা দুধকে পুনরায় ওলানে প্রবেশ করোনো। যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তার পথে জিহাদ করেছে সে ব্যক্তি আর জাহান্নামের ধোয়া একত্র হবে না।’ (তিরমিজি)। রাসূলুল্লাহ সা: আরো বলেছেন, ‘দুই প্রকার চোখকে জাহান্নামের আগুন স্পর্শ করতে পারবে না। ১. ওই চোখ যা আল্লাহর ভয়ে অশ্রু বিসর্জন দেয়; ২. ওই চোখ যা আল্লাহর পথে পাহারাদারিতে রাত জাগে।’ (বোখারি)।
কিয়ামতের দিন আমরা যেন আল্লাহর আরশের ছায়ায় স্থান পেতে পারি দুনিয়ার জীবনে এমন নেক আমলই আমাদের সবার করা উচিত।

[ প্রিয় পাঠক, আপনিও বিডিসারাদিন24 ডট কম অনলাইনের অংশ হয়ে উঠুন। লাইফস্টাইল, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, রান্নার রেসিপি, ফ্যাশন-রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন- bdsaradin24@gmail.com-এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে। নারীকন্ঠ এবং মত-দ্বিমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে  bdsaradin24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরণের দায় গ্রহণ করে না। ]

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 1696 বার)


Print
bdsaradin24.com