‘কোটা’ সমস্যা!

Print

রীতা রায় মিঠু

এত কমপিটিটিভ বাস্তবতায় ‘কোটা’ সিস্টেম স্বাভাবিক কারণেই ‘বিনা অপরাধে’ কোটার বাইরে থাকা ছেলেমেয়ের মনে অসহায়ত্ব, হতাশা সৃষ্টি করতেই পারে!

দেশ স্বাধীনের ৪৭ বছর পর ‘নতুন চাকরি’ পাওয়ার ক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধা কোটা কি আক্ষরিক অর্থেই থাকা উচিত? এত বছর পরেও মুক্তিযোদ্ধা কোটা রাখা মুক্তিযুদ্ধের গৌরবকে মলিন করে না?

আমার মতে স্বাধীনতার ৪৭ বছর পর চাকরি ক্ষেত্রে ‘মুক্তিযোদ্ধার সন্তান’ কোটা মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযুদ্ধের গৌরবকে ম্লান করে! মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল বৈষম্যহীন সমাজ সৃষ্টির জন্য, মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল অসাম্প্রদায়িক সমাজ সৃষ্টির জন্য। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিল দেশের সর্ব জনসাধারণ। কী হাতে বন্দুক নিয়ে, কেউ বন্দুকধারী মুক্তিযোদ্ধার পাশে দাঁড়িয়ে, কেউ সর্বস্বান্ত হয়ে।

দেশ স্বাধীন হলো, ৪৭ বছর অতিবাহিত হলো, দেশটায়তো এখন সকলের জন্য সমান সুযোগ অধিকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল! এত বছর পর কেন আজও কোটা থাকবে? এর জন্য কি ৩০ লক্ষ মানুষ প্রাণ দিয়েছিল? এর জন্য কি দেশের বুদ্ধিজীবীরা প্রাণ দিয়েছিলেন? এর জন্য কি কৃষক হাতে বন্দুক তুলে নিয়েছিল? এর জন্য কি এত এত মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হয়েছিলেন?

কোটা সিস্টেমের কারণে সাধারণ জনগণের মনে বৈষম্য বোধের সৃষ্টি হবে। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি অহেতুক ঈর্ষা সৃষ্টি হবে! তাদের মনে প্রশ্ন তৈরী হবে, , মুক্তিযুদ্ধে আমাদের কি কোন অবদান ছিলনা? তাহলে আমাদের বংশধরেরা কেন আজ কোটা বৈষম্যের শিকার হবে? ”

এক বন্ধু প্রশ্ন করেছে, ‘ এই কোটায় সাধারণ জনগণ আসবে কেন”?

তাকে বললাম, মুক্তিযুদ্ধে দেশের সাধারণ জনগণও তাদের সর্বস্ব স্যাক্রিফাইস করেছিল। সাধারণ জনগণের একজন আমি, আমরা, আমাদের সন্তান, তাদের সন্তান।
মুক্তিযুদ্ধে আমার পরিবার সর্বস্ব হারিয়ে একেবারে নিঃস্ব অবস্থা থেকে জীবন শুরু করেছিলাম। আমরা এক বেলা ভাত খেয়েছি, দুই বেলা রেশন থেকে পাওয়া গমের আটা দিয়ে রুটি খেয়েছি। আমাদের দৈনন্দিন বাজার হতো ৫ টাকায়, ফলে বাড়ন্ত বয়সে আমাদের যে পুষ্টি পাওয়ার কথা ছিল, তা পাইনি। কাজেই আমাদের মেধার যথাযথ প্রকাশও হতে পারেনি। সেই অবস্থায় আমাদের সন্তানেরা চাকরির বাজারে গিয়ে যদি কোটা বৈষম্যের শিকার হয়, সেটা কি আমাদের জন্য বেদনার হবেনা?

এবার মূল কথায় আসি। মুক্তিযোদ্ধা কোটা কেন আমি অপছন্দ করছি! মুক্তিযুদ্ধ আমার অহঙ্কার, মুক্তিযোদ্ধা আমার অহঙ্কার।মুক্তিযুদ্ধ অথবা মুক্তিযোদ্ধার অপমান আমার অন্তর বিদীর্ণ করে। এই কোটা সিস্টেমটাও আমার কাছে অপমানজনক লাগছে।
বাংলাদেশে বড় দলের রাজনৈতিক নেতাগণ যাঁরা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন, তাঁদের অনেকেই রাজাকার বংশের সাথে বৈবাহিক সূত্রে আত্মীয়তা স্থাপন করে অলরেডি মুক্তিযুদ্ধের গৌরবকে ম্লান করে দিয়েছেন। বাংলাদেশে সত্যিকারের মুক্তিযোদ্ধার নুন আনতে পান্তা ফুরায়, তাদের মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট নেই। যাদের মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট আছে তাদের অধিকাংশ মুক্তিযুদ্ধ করেনি। কাজেই মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকরি দিতে গেলে সার্টিফিকেট দেখেইতো চাকরিটা দিতে হবে, তাইনা? কারা পাবে চাকরিটা, হিসেব করে দেখেছেন?

আর আদিবাসি সম্প্রদায়ের জন্য বিশেষ সুবিধা দেয়ার বিষয়টি সমর্থন করছি।
এত কমপিটিটিভ বাস্তবতায় সমাজের অবহেলিত, অবদমিত নাগরিক সুবিধা বঞ্চিত জনগোষ্ঠি্কে নাগরিক সভ্যতার আলোর বৃত্তের কাছাকাছি আনতে হলে সেই জনগোষ্ঠির ছেলেমেয়েদের জন্য ‘কোটা’ সিস্টেম সৃষ্টি করাটাও জরুরী, তবে তা হওয়া উচিৎ নির্দিষ্ট সময়ের জন্য।

মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তানদের জন্য, আদিবাসি সম্প্রদায়ের সন্তানদের জন্য স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা অবৈতনিক করে দেয়া হোক! চাকরির বাজারে ‘কোটা’ সিস্টেম তুলে নেয়া হোক।

কাজেই কোটা নিয়ে মারামারি নয়, হানাহানি নয়, জ্বালাও পোড়াও নয়, আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধান জরুরী।

[ প্রিয় পাঠক, আপনিও বিডিসারাদিন24 ডট কম অনলাইনের অংশ হয়ে উঠুন। লাইফস্টাইল, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, রান্নার রেসিপি, ফ্যাশন-রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন- bdsaradin24@gmail.com-এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে। নারীকন্ঠ এবং মত-দ্বিমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে  bdsaradin24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরণের দায় গ্রহণ করে না। ]

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 142 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ
bdsaradin24.com