খালেদা হাসপাতালে: কাদের লাভ কাদের ক্ষতি?

Print
জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় সাজাপ্রাপ্ত বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে কারাগার থেকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে আজ শনিবার।

বিকেল ৩টার দিকে কড়া প্রহরায় বিএনপি চেয়ারপারসনকে পুরান ঢাকার নাজিম উদ্দিন রোডের পুরানো ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে শাহবাগের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) কেবিন ব্লকে স্থানান্তর করা হয়। দীর্ঘদিন ধরেই খালেদা জিয়া দাবি করে আসছিলেন তিনি অসুস্থ।

এ কারণে হাসপাতালেও যেতে চাচ্ছিলেন তিনি। এই পরিপ্রেক্ষিতে সরকার তাঁকে প্রথমে বিএসএমএমইউ এবং পরে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসা গ্রহণের প্রস্তাব দেয়। কিন্তু খালেদা জিয়া ইউনাইটেড হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ব্যাপারে অনড় থাকেন। পরবর্তীতে খালেদার চিকিৎসার বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ায়। অবশেষে বিভিন্ন ঘটনার পর শেষ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়েই ভর্তি হলেন খালেদা জিয়া।

বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, এর আগে তিন দফা চিকিৎসকরা খালেদা জিয়াকে দেখেছেন। কিন্তু বিশেষ কোনো শারীরিক সমস্যা পাওয়া যায়নি। খালেদা জিয়া যতটুকু অসুস্থ ছিলেন, বার্ধক্যে এরকম অসুস্থতা থাকেই। তারপরও তিনি হাসপাতালে, বিশেষ করে ইউনাইটেড হাসপাতালে যেতে চাচ্ছিলেন।

প্রশ্ন হচ্ছে, যেসব সুবিধার জন্য তিনি ইউনাইটেড হাসপাতালে যেতে চাচ্ছিলেন সেই সুবিধাগুলো বিএসএমএমইউতে তিনি কতটুকু পাবেন। আরেকটি প্রশ্নও দেশের রাজনীতি অঙ্গনে দীর্ঘদিন ধরে ঘুরপাক খাচ্ছে– খালেদা জিয়া কি অসুস্থতার জন্য হাসপাতালে যেতে চাচ্ছিলেন নাকি তাঁর হাসপাতালে যাওয়ার পেছনে অন্য কোনো কারণ ছিল? কারণ যাই হোক, খালেদা জিয়া আজ থেকে হাসপাতালে থাকছেন।

হাসপাতালে যাওয়ায় খালেদা জিয়া ও বিএনপির লাভ: পছন্দের হাসপাতাল ইউনাইটেডে যেতে না পারলেও বিএসএমএমইউতে খালেদা জিয়া কারাগারের চেয়ে ভালো অবস্থায় থাকবেন একথা নিশ্চিত। আর এটাই আসলে চাইছিল খালেদা জিয়া ও তাঁর দল বিএনপি। হাসপাতালে গেলে আরও কিছু সুবিধা তিনি পাবেন বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।

১। খালেদা জিয়া হাসপাতালের ভিআইপি ব্লকে থাকবেন। বিএসএমএমইউতে ভর্তি হওয়ার একটি বড় সুবিধা হলো, সেখান থেকে খালেদা জিয়া বিভিন্ন লোকজনের সঙ্গে কথা বলতে পারবেন, যোগাযোগ করতে পারবেন। ওয়ান-ইলেভেনের মতো ঘটনাগুলোর সময় দেখা গেছে, কারাবন্দী রাজনৈতিক নেতারা বঙ্গবন্ধুতে ভর্তি থাকা অবস্থায় নিজ নিজ কর্মীদেরকে সহজেই বার্তা দিতে পেরেছেন। বিষয়টি আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয় দলের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। এছাড়া বঙ্গবন্ধু মেডিকেলের চিকিৎসকদের বিরাট একটি অংশও বিএনপিপন্থী। তাই খালেদা জিয়া বঙ্গবন্ধুতে থাকাকালীন দলীয় নেতাকর্মীদের কাছে বার্তা পৌঁছে দিতে পারবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাছাড়া বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই সময়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এই মুহূর্তে একাদশ নির্বাচনে যাওয়া, না যাওয়া বিএনপির একটি বড় ইস্যু। আগামী ১০ অক্টোবর আবার ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায় ঘোষিত হতে যাচ্ছে যাতে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক জিয়ার দণ্ডিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যেহেতু দলীয় নেতাকর্মীদের কাছে বার্তা পৌঁছে দেওয়ার বিষয়টি খালেদা জিয়ার জন্য নাজিমউদ্দিন রোডের তুলনায় বিএসএমএমইউতে সহজতর হবে, তাই এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে খালেদা জিয়ার কারাগার থেকে মেডিকেলে যাওয়া তাঁর ও তাঁর দলের জন্য একটি বড় সুবিধা বলে গণ্য হবে।

২। নাজিমউদ্দিন রোডের কারাগারে যে পরিবেশে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ছিলেন সে পরিবেশে খালেদা জিয়া স্বচ্ছ্বন্দ্য ছিলেন না। আজীবন বিলাস-ব্যাসনে অভ্যস্ত খালেদা জিয়া। কিন্তু কারাগারে তাঁর কক্ষে এয়ার কন্ডিশনার ছিল না, তাঁকে চৌকিতে ঘুমাতে হতো। কিন্তু বিএসএমএমইউতে খালেদা জিয়া ভিআইপি কেবিনে থাকবেন। সেখানে সকল ভিআইপি সুবিধাই থাকবে। উন্নত পরিবেশে ফিরে আসাও খালেদা জিয়ার জন্য একটি বড় সুবিধা হতে যাচ্ছে।

৩। কারাগারে খালেদা জিয়াকে জেলের খাবারই খেতে হতো। বিশেষ কোনো খাবারের বন্দোবস্ত ছিল না তাঁর জন্য। কিন্তু তিনি যখন হাসপাতালে আসবেন চিকিৎসকদের অনুমতি সাপেক্ষে তাঁকে বাড়ির তৈরি খাবারও দেওয়া হতে পারে। এটি খালেদা জিয়ার জন্য একটি বড় লাভ।

৪। কারাগারে থাকা অবস্থায় খালেদা জিয়া কারাগারের লোকজন ছাড়া কারও সঙ্গে সহজে দেখাসাক্ষাৎ করতে পারতেন না। মাসে দুদিন দর্শনার্থী ছাড়া কারও সঙ্গে দেখা করার সুযোগ ছিল না তাঁর। কিন্তু বিএসএমএমইউতে তাঁকে দুইজন পছন্দের চিকিৎসক দেওয়া হয়েছে, দেওয়া হয়েছে পছন্দের টেকনিশিয়ান। তাই হাসপাতালে তিনি অনেকটাই মুক্তভাবে চলাফেরা করতে পারবেন। বিএনপি চেয়ারপারসনের মুক্তভাবে চলাফেরা করতে পারাও খালেদা জিয়া ও তাঁর দলের জন্য একটি বড় লাভ।

খালেদা জিয়া হাসপাতালে যাওয়ায় বিএনপির ক্ষতি, সরকারের লাভ: খালেদা জিয়া হাসপাতালে যাওয়ায় শুধু যে তাঁর ও তাঁর দল বিএনপিরই লাভ হয়েছে তাই নয়, এ ঘটনায় সরকারেরও কিছু লাভ হয়েছে বলে মনে করছে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

১। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে হাসপাতালে নেওয়া আওয়ামী লীগের একটি কৌশলগত বিজয় বলে মনে করা হচ্ছে। খালেদা জিয়া অনড় ছিলেন, তিনি ইউনাইটেড হাসপাতাল ছাড়া চিকিৎসা গ্রহণ করবেন না। আর সরকার অনড় ছিল, খালেদা জিয়াকে ইউনাইটেড হাসপাতাল বা অন্য কোনো বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হবে না। খালেদা জিয়া অস্বীকৃতি জানালেও গত চারমাস ধরে তাঁকে বারবার বিএসএমএমিউতেই ভর্তি হতে বলছে সরকার। শেষ পর্যন্ত সরকারের অবস্থানটিই খালেদা জিয়া মানতে বাধ্য হলেন। এতে আপোষহীন নেত্রী হিসেবে খালেদা জিয়ার যে পরিচিতি তা ঠুনকো হয়ে গেল।

২। খালেদা জিয়ার হাসপাতালে আসার মধ্য দিয়ে বিএনপিকে নির্বাচনের দিকে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে লাভবান হবে সরকার। সরকারের কাছে খবর আছে খালেদা জিয়াই বিএনপির মধ্যে সবচেয়ে বেশি নির্বাচনমুখী। যে কোনো মূল্যে নির্বাচনে যেতে চান খালেদা জিয়া, এমনকি যদি তাঁর মুক্তি না হয় তবুও। সম্প্রতি খালেদা জিয়া বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে ঈদের পরেরদিন একান্ত বৈঠক করেছেন।

সেখানেও তিনি নির্বাচনে যাওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন। কিন্তু বিএনপির তারেক জিয়া প্রভাবিত তরুণ অংশটি নির্বাচনে যাওয়ার বিপক্ষে। দাবিদাওয়া অর্জিত না হলে নির্বাচনে যেতে আগ্রহী নয় তাঁরা। এমন অবস্থায় খালেদা জিয়া হাসপাতালে থাকাকালীন সময়ে বিভিন্ন জনের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পাবেন এবং দলকে নির্বাচনমুখী করতে ভূমিকা পালন করতে পারবেন। যেহেতু দলের মধ্যে তারেকের চেয়ে খালেদা জিয়ার জনপ্রিয়তা বেশি তাই দলকে নির্বাচনমুখী করতে খালেদা জিয়ার বার্তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছে সরকার।

৩। বিএসএমএমইউতে বিএনপির বিভিন্ন নেতারা যখন গোপনে যোগাযোগ করবে তখন দলে কার কী অবস্থান তা সরকারের সামনে উন্মোচিত হয়ে যাবে। গোয়েন্দা নজরদারির মাধ্যমে প্রকৃতভাবে বিএনপিতে কে কোন ভূমিকা পালন করছে তা জানতে পারবে সরকার, যা সম্ভব হচ্ছে খালেদা জিয়ার হাসপাতালে যাওয়ার মাধ্যমেই।

৪। নির্বাচনে আসার জন্য বিএনপি কিছু নূন্যতম অর্জন চাইছিল। খালেদা জিয়াকে জেল থেকে বের করে আনা হয়েছে এবং হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে- একে বিএনপি নিজেদের অর্জন হিসেবে দেখাতে পারবে। এমন অর্জন দেখিয়ে বিএনপিকে নির্বাচনে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবে আওয়ামী লীগ সরকার।

বিএনপি যে সময়টায় কঠোর আন্দোলন করার চিন্তাভাবনা করছিল, তখন খালেদা জিয়া কারাগারের বাইরে আসায় দলটির মধ্যে নমনীয় ভাব চলে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এছাড়া খালেদা জিয়া বিএসএমএমইউতে আসায় সরকার আন্তর্জাতিক মহলকে দেখাতে পারবে, খালেদা জিয়ার ওপর কোনো নির্যাতন-নিপীড়ন হচ্ছে না। এটাই হবে সরকারের সবচেয়ে বড় লাভ।

  • সম্পাদক.কম

 

[ প্রিয় পাঠক, আপনিও বিডিসারাদিন24 ডট কম অনলাইনের অংশ হয়ে উঠুন। লাইফস্টাইল, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, রান্নার রেসিপি, ফ্যাশন-রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন- bdsaradin24@gmail.com-এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে। নারীকন্ঠ এবং মত-দ্বিমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে  bdsaradin24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরণের দায় গ্রহণ করে না। ]

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 166 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ
bdsaradin24.com