চার কারণে জয়ী জাহাঙ্গীর

Print

গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে বিএনপি প্রার্থী হাসানউদ্দিন সরকারের ভোটের ব্যাবধান দ্বিগুণেরও বেশি। ২৬ জুন ভোটগ্রহণ ও গণনা শেষে গতকাল বুধবার সকালে ঘোষিত ফল অনুসারে ৪২৫ কেন্দ্রের মধ্যে ৪১৬টিতে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী জাহাঙ্গীর ৪ লাখ ১০ ভোট পান। ধানের শীষের হাসানউদ্দিন সরকারের ভোটের সংখ্যা ১ লাখ ৯৭ হাজার ৬১১। নির্বাচন কমিশন সূত্র জানিয়েছে, নির্বাচনে ৫৮ শতাংশ ভোট পড়েছে। স্থানীয়দের সঙ্গে আলপকালে নৌকার জয় ও ধানের শীষের পরাজয়ের নেপথ্যে মূল কারণ চারটি। এগুলো হলো দলীয় ঐক্য, নিজস্ব ভোটব্যাংক, আঞ্চলিকতা ও পোশাক শ্রমিকদের সমর্থন। এ ছাড়াও বিভিন্ন দল ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের সমর্থন, দলীয় কোন্দল বা ব্যক্তিকেন্দ্রিক পছন্দ-অপছন্দও নির্বাচনে জয়-পরাজয়ে ভূমিকা রেখেছে। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী তরুণ এবং ক্ষমতাসীন থাকায় তাকে দিয়ে নগরের উন্নয়ন হবে এমন প্রত্যাশাও ভোটারদের। অন্যদিকে অপেক্ষাকৃত বয়োবৃদ্ধ বিএনপির মেয়র প্রার্থী হাসানউদ্দিন সরকার কাজ করতে পারবেন না এমন প্রচারে ভোট কমেছে বিএনপির। নির্বাচনে মেয়র পদে সাতজন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।স্থানীয়রা জানান, বিএনপি প্রার্থী হাসানউদ্দিন সরকার বয়স্ক ও অসুস্থ হওয়ায় সিটির সব জায়গায় যেতে পারেননি। এ ছাড়া সাবেক মেয়র অধ্যাপক আবদুল মান্নানের সমর্থকরাও তার পক্ষে কাজ করেননি। পাশাপাশি দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকায় নেতাকর্মীরা সংঘবদ্ধ নেই। এ ছাড়া যারাও আছেন তাদের বিরুদ্ধে মামলা থাকায় সক্রিয়ভাবে কাজ করতে পারেননি। একই সঙ্গে আওয়ামী রীগ ক্ষমতায় থাকাকালে বিএনপির মেয়র আবদুল মান্নান হওয়ায় তেমন কোনো উন্নয়নকাজ হয়নি। আবার বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মেয়র হলে উন্নয়ন না-ও হতে পারেÑ এমন শঙ্কায় তারা ধানের শীষে ভোট দেননি।

অন্যদিকে বিজয়ী মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম বয়সে তরুণ। তিনি প্রায় সব ওয়ার্ড চষে বেড়িয়েছেন। গেছেন ভোটারদের দুয়ারে দুয়ারে। তরুণ ও নারী ভোটারদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি দিয়ে আকৃষ্ট করতে সক্ষম হয়েছেন বলেই তারা ভোট দিয়ে জয়ী করেছেন। এ ছাড়া তিনি জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়ার আগেই সিটিতে জনকল্যাণমূলক কাজ করেছেন। পাশাপাশি ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী হওয়ায় তার পক্ষে উন্নয়নকাজ করা সম্ভব এমন বিশ্বাসে জনগণ তাকে ভোট দিয়েছেন।ভোটব্যাংক : সিটি করপোরেশন এলাকাটি তিনটি সংসদীয় আসনে পড়েছে। এগুলো হলো গাজীপুর-১, ২ ও ৩। বিশাল এই সিটি করপোরেশনের মোট ওয়ার্ড ৫৭টি। এর মধ্যে ৩৫টি পড়েছে গাজীপুর-২ আসনে, যেখানে ভোটার সংখ্যা সাত লাখ ৪৩ হাজারের বেশি। ১৮টি ওয়ার্ড আছে গাজীপুর-১ আসনে। এখানে ভোটার সংখ্যা তিন লাখ ২৩ হাজারের বেশি। গাজীপুর-৩ আসনের চারটি ওয়ার্ডে মোট ভোটার ৬০ হাজার ৮৮৬ জন। এই তিন আসনই দীর্ঘদিন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের দখলে। ১৯৯১ সালে গাজীপুর-১ আসন থেকে জেতেন বিএনপির এমএ মান্নান। এরপর সেখানে আর জিততে পারেনি বিএনপির কেউ। আর বাকিগুলোয় সব সময় বড় ব্যবধানে জিতে এসেছেন নৌকা মার্কার প্রার্থী। ফলে বিএনপির তুলনায় এখানে আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক বেশি।স্থানীয়রা বলছেন, অতীতের নির্বাচনী ফল আর ভোটব্যাংকের হিসাবে সুস্পষ্ট ব্যবধানে সব সময় এখানে আওয়ামী লীগ এগিয়ে। তবে বিএনপি দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা এবং দলীয় ও সহযোগী সংগঠনের ঝিমিয়ে পড়া কর্মসূচির কারণে এ অঞ্চলে তাদের প্রভাব কমেছে। এ ছাড়া জনকল্যাণে বিএনপির তেমন কর্মসূচি না থাকায় খোদ নেতাকর্মীরা তাদের কর্মসূচি নিয়ে দ্বিধাবিভক্ত।গত পাঁচ বছরের মূল্যায়ন : ২০১৩ সালের নির্বাচনে জয়ী বিএনপি নেতা এমএ মান্নান তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির সিংহভাগই পূরণ করতে পারেননি। বিষয়টি স্বীকার করেছেন দলের এবারের প্রার্থী হাসানউদ্দিন সরকারও। তবে এজন্য তিনি দায়ী করেছেন সরকারকেই। নাশকতার একাধিক মামলার আসামি মান্নান দুই বছরেরও বেশি সময় মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারেননি। এই সময় তিনি হয় বরখাস্ত ছিলেন, নয় তো ছিলেন কারাগারে। ফলে এলাকার রাস্তাঘাটের উন্নয়ন, ড্রেনেজ ব্যবস্থাসহ তার নির্বাচনী ইশতেহারের অনেক কাজই থাকে অসম্পূর্ণ। নির্বাচনের প্রচারে বিএনপির গত মেয়াদের খতিয়ান দেখিয়ে ভোটারদের নিজের দলে ভেড়ান জাহাঙ্গীর। এ সময় ভোটের প্রচারে পাঁচ বছরের উন্নয়নের বঞ্চনার বিষয়টি তুলে ধরে ভোটারদের গ্রিন ও ক্লিন সিটির পরিকল্পনা তুলে ধরেন জাহাঙ্গীর। আর উন্নয়নবঞ্চিত সাধারণ ভোটাররা মনে করেন আওয়ামী লীগ সমর্থিত জাহাঙ্গীর সরকারের কাছ থেকে তাদের নাগরিক অধিকার আদায় করতে পাারবেÑ এমন আশায় বুক বেঁধে নৌকায় ভোট দেন ভোটাররা।পোশাকশ্রমিকদের সমর্থন : পোশাক কারখানা অধ্যুষিত এলাকায় কর্মরত শ্রমিকরা এই নির্বাচনে বড় ভোটব্যাংক হিসেবে কাজ করেছে। দেশের পোশাক কারখানার বেশিরভাগই গাজীপুরে। তাই বিপুলসংখ্যক পোশাকশ্রমিকের বসবাস এই সিটিতে। সাড়ে ১১ লাখ ভোটারের প্রায় সোয়া লাখ ভোটার শ্রমিক। নির্বাচনের আগে বিজিএমইএ, বিকেএমইএসহ পোশাক ও শ্রমিক সংগঠনগুলো জাহাঙ্গীরকে সমর্থন জানিয়ে তার পাশে দাঁড়ায়। প্রচারে অংশ নেন সংগঠনের শীর্ষ নেতারা। ফলে ভোটের ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তারা। পোশাকশ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে জাহাঙ্গীরের বিশদ পরিকল্পনা এ ভোটারদের আশ^স্ত করে। আর হাসান সরকার টঙ্গীতে এক সময় দাপুটে শ্রমিকনেতা থাকলেও দীর্ঘ দিন ক্ষমতার বাইরে থাকায় এবং বয়োবৃদ্ধ হওয়ায় নিজেদের কাজে তাকে শ্রমিকরা তেমন পাননি বলে অভিযোগ রয়েছে।শ্রমিকরা মনে করেন, প্রধান দুই দলের মেয়রপ্রার্থীর মধ্যে আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপত্তাসহ জীবনমান উন্নয়নে জাহাঙ্গীর আলম অপেক্ষাকৃত আস্থাভাজন। এর আগে বিএনপি মেয়র অধ্যাপক এমএ মান্নান শ্রমিকদের উন্নয়নে নানা মেগা পরিকল্পনা দিলেও সেগুলো বাস্তবায়ন হয়নি।আঞ্চলিকতার টান : জাহাঙ্গীর আলমের বাড়ি গাজীপুর সদরে আর হাসানউদ্দিন সরকারের বাড়ি টঙ্গীতে। জাহাঙ্গীর আলম প্রচারে টঙ্গীতে সময় বেশি দেওয়ায় অনেক ভোটার তার দলে ভেড়ে। টঙ্গীর ১৫টি ওয়ার্ডে প্রায় সাড়ে ৩ লাখ ভোট রয়েছে। ১৯৯১ ও ২০১৩ সাল বাদে টঙ্গীতে বরাবরই আওয়ামী লীগের জয়জয়কার। এখানে তাদের কর্মী-সমর্থকের সংখ্যাও বেশি। এ ছাড়া নির্বাচনে আহসান উল্লা মাস্টারের হত্যাকা- এবং হাসানউদ্দিন সরকারের ছোট ভাই নূরুল ইসলাম দ-িত হওয়ায় এই ইস্যুকে এ অঞ্চলে কাজে লাগিয়েছে আওয়ামী লীগ।জাতীয় পার্টি ও ইসলামি দলগুলোর সমর্থন : গাজীপুরে বিএনপি সমর্থন পেয়েছে জোটসঙ্গী জামায়াতে ইসলামীর। আওয়ামী লীগ সমর্থন পেয়েছে সংসদে বিরোধী দল জাতীয় পার্টির। গাজীপুরে অতীতের নির্বাচনগুলোয় জামায়াত কখনো ভালো করতে পারেনি। আর জামায়াত সঙ্গের কারণে অনেক প্রগতিশীল ভোটার বিএনপিকে প্রত্যাখ্যান করেছে। তবে জাতীয় পার্টির সমর্থন আওয়ামী লীগের জন্য বাড়তি সুবিধার এনে দেয়। এই অঞ্চলে জাতীয় পার্টির সে রকম সাংগঠনিক তৎপরতা না থাকলেও উত্তরাঞ্চলে জাতীয় পার্টি অধ্যুষিত এলাকার বিপুল পোশাকশ্রমিক এখানে কাজ করায় তাদের ভোট নৌকা জয়ে ভূমিকা রাখে। আরেক আলোচিত সংগঠন হেফাজতে ইসলামও এই নির্বাচনে একটি প্রভাবক ছিল। ২০১৩ সালে রাজধানীর শাপলা চত্বরে হেফাজতকর্মীদের উচ্ছেদ অভিযান নিয়ে নানা গুজব আর হেফাজত নেতাদের বিকৃত ও আবেগি বক্তব্য আওয়ামী লীগের পরাজয়ের অন্যতম কারণ ছিল বলে ধারণা করা হয়। তবে এবারের নির্বাচনে চিত্র ছিল ভিন্ন। অরাজনৈতিক সংগঠন হেফাজতের গাজীপুর শাখার সাধারণ সম্পাদক ফজলুর রহমান এবার মেয়র পদে নিজেই প্রার্থী ছিলেন। ফলে ভোটে ধর্মীয় আবেগ কাজে লাগিয়ে বিএনপির ফায়দা নেওয়ার সুযোগ এবার ছিল না। অন্যদিকে কওমি মাদ্রাসার দাতা হিসেবে পরিচিত জাহাঙ্গীরও সমর্থন পেয়েছেন ছাত্র-শিক্ষকদের একটি বড় অংশের।প্রচারে হাসান সরকারের শারীরিক অসুস্থতা : আওয়ামী লীগ গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেছে বিএনপির প্রার্থী হাসান সরকারের শারীরিক অবস্থা। হাসান হাঁটাচলা করতে পারেন না স্বাভাবিকভাবে। অন্যের সহযোগিতায় চলাচলের বিষয়টি ভোটাররা দেখেছেন প্রচার চলাকালেই।আওয়ামী লীগ মেয়রপ্রার্থীর দাবিÑ এমন একজনকে মেয়র নির্বাচন করলে গাজীপুরবাসী প্রত্যাশিত সেবা পাবেন না।দলীয় কোন্দল নিরসন : শেখ হাসিনার প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপে সিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগ দলীয় নেতাকর্মীদের বিভেদ নিরসনে উদ্যোগ নেওয়া হয়। তার কড়া নির্দেশনায় দলের সব সহযোগী সংগঠন ও মূল দলের নেতারা জাহাঙ্গীর আলমকে বিজয়ী করতে মাঠে নামেন। এমনকি মেয়র প্রত্যাশী আজমত উল্লা খানও প্রচারে অংশ নিয়ে জাহাঙ্গীরের পক্ষে ভোট চান। তবে বিএনপির হাসান-মান্নানের সমর্থকদের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধ এই নির্বাচনেও একটি প্রভাব ফেলে। যদিও বিএনপির নেতাদের দাবি, তাদের দলে অনৈক্য নেই; কিন্তু হাসানের প্রচারে মেয়র মান্নানের অংশ না নেওয়া এবং তার অনুসারীদের নির্লিপ্ত থাকায় বিএনপির ভরাডুবি হয়েছে বলে মনে করছেন দলটির তৃণমূল নেতাকর্মী।

  • আমাদের সময়ের খবর
[ প্রিয় পাঠক, আপনিও বিডিসারাদিন24 ডট কম অনলাইনের অংশ হয়ে উঠুন। লাইফস্টাইল, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, রান্নার রেসিপি, ফ্যাশন-রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন- bdsaradin24@gmail.com-এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে। নারীকন্ঠ এবং মত-দ্বিমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে  bdsaradin24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরণের দায় গ্রহণ করে না। ]

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 191 বার)


Print
bdsaradin24.com