চিকিৎসক সংকটে দোহার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ভোগান্তিতে হাজারো রোগী!

Print

 

মোঃ শাকিল মৃধাঃ
ঢাকার দোহার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রবল চিকিৎসক সংকটের ফলে চরম ভোগান্তিতে রয়েছে হাজারো রোগী! পাশাপাশি দক্ষ জনবলের রয়েছে বিরাট সংকট। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটিতে ৩০ জন চিকিৎসক থাকার কথা থাকলেও হাসপাতালে কর্মরত আছেন মাত্র ০৯ জন মেডিকেল অফিসার।

দোহার উপজেলা একটি আঞ্চলীক এলাকা। যেখানে স্বপ্ল আয়ে খেটে খাওয়া মানুষের সংখ্যাই বেশি। অধিক অর্থকরি খরচ করে প্রাইভেট ক্লিনিক বা হাসপাতালগুলোতে গিয়ে চিকিৎসা সেবা গ্রহন করার সামর্থ নেই অনেকেরই। তাই সরকারী ব্যাবস্থায় বিনাখরচে সঠিক চিকিৎসা সেবা গ্রহনের জন্য তারা ভিড় জমায় এই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটিতে। কিন্তু সরেজমিনে গত কয়েক সপ্তাহ অনুসন্ধান করে দেখা যায়, গাইনি, নাক-কান গলা, অর্থপেডিকস্ সহ বিভিন্ন রোগের রোগীদের সেবা প্রদান করেন হাসপাতালের জরুরী বিভাগে থাকা ডিগ্রী প্রাপ্ত কিছু ডাক্তার সহকারী। যাদের হালকা সেলাই বা ব্যান্ডেস করার চেয়ে আর কোনো চিকিৎসা প্রদানের দক্ষতা নেই। কিন্তু মূল চিকিৎসক না থাকায় তারাই এই সমস্ত রোগীদের প্রেসক্রিপশন করে ওষুধ লিখে দিচ্ছেন, যেখানে শুধুমাত্র বেথানাশক এন্টিবায়োটিক ছাড়া আর কোনো গ্রুপতত্ত্ব ওষুধ লিখার দক্ষতা নেই তাদের। এতে রোগীদের রোগ তো মুক্তিই পাচ্ছেই না বরংচ রোগীরা হচ্ছেন হয়রানির শীকার। এরমধ্যে আবার হাসপাতালে ৩০ জনের মধ্যে ৯ চিকিৎসক জন থাকলেও নানান কারনে এই ৯ জন চিকিৎসক প্রতিনিয়ত হাসপাতালে সেবা প্রদানের সময়টুকুতেও চেম্বারে উপস্থিত থাকেন না। যার ফলে শুধু ভোগান্তিই নয় মানে হাসপাতালটি থাকলেও কাজের সময় চরম সংকটে দোহার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। ৯ টি ইউনিয়ন নিয়ে দোহার উপজেলার প্রায় ৩ লক্ষাধিক মানুষের সরকারী চিকিৎসা সেবা প্রদানের জন্য এই ৫০ শয্যা বিশিষ্ট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থাকলেও বর্তমান চিকিৎসক সংকটে প্রাপ্ত সেবা থেকে বঞ্চীত হচ্ছে প্রতিদিন চিকিৎসা সেবা গ্রহন করতে আসা তিন থেকে চারশ রোগী। যা গড় হিসাবে প্রতি মাসে রোগী সংখ্যা গিয়ে দাঁড়ায় প্রায় দশ হাজারো অধিক । তবে ৯ জন চিকিৎসক উপস্থিত থাকলেও তাদের মধ্যে থেকে ইউনানি, আয়ুর্বেদ ও হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক পদে ১জন চিকিৎসক রয়েছেন যার কর্মস্থল ঢাকা ইএমও অফিসে। এর ফলে চিকিৎসক পদ শূন্যতার তালিকায় যোগ হয় আরো এক।

স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রনালয়ের এক জরিপে দেখা যায়,গত মাসে চিকিৎসা সেবা প্রদান সহ নানাদিক থেকে এগিয়ে হয়ে র‍্যাংকিং ০৬তে উন্নীত হয়েছে দোহার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। কিন্তু প্রকৃত পক্ষে চিকিৎসকের অভাবে প্রতিনিয়ত রোগীরা হচ্ছে হয়রানির শীকার। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটিতে নেই অপারেশনের রোগীকে অপারেশনের পূর্বে অজ্ঞান করার জন্য এনেস্থিসিয়া ডাক্তার, নেই শিশু বিশেষজ্ঞ, অর্থপেডিকস্, কার্ডিওলোজী, চক্ষু, নাক-কান গলা, যৌন ও চর্ম, প্যাথলজিস্ট সহ প্রায় ৮ জন চিকিৎসক! প্রতিদিন ডাক্তার চেম্বার খালি পড়ে থাকে যার ফলে উপরোক্ত বিভাগের রোগীদের চিকিৎসা সেবা প্রদান করতে পারছে না দোহার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। তাছাড়া শুধু বর্হিবিভাগেই নয় হাসপাতালের ভেতরে ওয়ার্ডে ভর্তিকৃত রোগীদের সেবা প্রদানের জন্য নেই পর্যাপ্ত সিনিয়র স্টাফ নার্স। যেখানে সিনিয়র স্টাফ নার্স থাকার কথা ২৬ জন কিন্তু প্রকৃত পক্ষে যেখানে মাত্র ১৪ জন নার্স কর্মরত রয়েছেন! যার ফলে শুধু বহির্বিভাগেই নয় হাসপাতালের ওয়ার্ড ভিত্তিক ৫০ শয্যার মধ্যে প্রতিনিয়ত প্রায় ৩০ শয্যায় চিকিৎসাধীন অবস্থানকারী রোগীরা পাচ্ছে না সঠিক মাত্রায় প্রাপ্ত সেবা। তাছাড়া উপযুক্ত চিকিৎসক না থাকায় ঝুঁকি নিয়ে চিকিৎসা সেবা চালানোর বিষয়টি স্বীকার করেছেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। চিকিৎসক না থাকায় সার্জারী বিভাগের রোগীদের অন্যত্র ক্লিনিক গুলো বা ঢাকায় প্রেরণ করতে হয়। তবুও ঝুঁকি নিয়ে গত কয়েক মাস গুলোতে কয়েকটি মাতৃত্বজনিত অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। কিন্তু পর্যাপ্ত চিকিৎসক না থাকায় সার্জারী ও গাইনি বিভাগ এখনো তেমন পূর্ণাঙ্গরুপ ভাবে চালু করা সম্ভব হচ্ছেনা।

গত সোমবার হাটু ব্যাথা জনিত কারনে উপজেলার নারিশা ইউনিয়ন থেকে আসা মজিবুর রহমান (৩২) নামে এক রোগী অর্থপেডিকস ডাক্তারের খোজে হাসপাতালের কাউন্টার থেলে টিকেট কাটলে তাকে দেওয়া হয় হাসপাতালটির হরলাল নামে অন্য এক চিকিৎসককে। পরে ডাঃ হরলাল বিভিন্ন ওষুধ মজিবুর রহমানকে প্রস্তাব করলে মজিবুর রহমান সেই প্রস্তাব অনুযায়ী ওষুধ সেবন করেন। কিন্তু গত বুধবার তিনি আবারো হাসপাতালে আসেন ওই ডাক্তারকে দেখাতে যে তার ব্যাথা তো কমেইনি বরংচ আরো বৃদ্ধি পেয়ে তার হাটাচলা এখন বড় হুমকির মুখে পড়েছে। উপজেলার চর লটাখোলা থেকে আসা মরিয়ম(২৮) মানে এক সদ্য নবাগত সন্তানের মা জানান, গত ১সপ্তাহ যাবত তার ছোট ছেলে শিশুটির ঠান্ডা আর কাশি। কিন্তু হাসপাতালে আসলে শিশু ডাক্তার না দেখিয়ে মেডিসিন ডাক্তার দেখানোর জন্য টিকিটে রুম নির্ধারন করা হয়। কিন্তু ঐ মেডিসিন ডাক্তারের ওষুধ সেবনের পরেও তার শিশু সন্তানটি রোগ মুক্তি হচ্ছে না। তাই সে গত বৃহঃবার হাসপাতালে সকাল ১০:০০ টায় আসলেও সেই মেডিসিন ডাক্তার চেম্বারে এখনো এসে পৌছয়নি। যার ফলে সরকারী টাকায় এমন প্রতিষ্ঠানে সঠিক স্বাস্থ্য সেবা না পাওয়া গেলে এ সকল চিকিৎসক ও হাসপাতাল প্রতিষ্ঠান রেখে লাভ কি ? সরকারের কাছে এমন সব লাভ-লোকসানের পেশ্ন রাখেন শিশু সন্তানের চিকিৎসক সেবা নিয়ে ভুক্তভোগী মরিয়ম আক্তার।

বর্তমান সরকারের ইউনিয়ন ও এলাকাভিত্তিক সরকারী স্বাস্থ্য সেবা প্রদানের লক্ষ্যে এক অন্যতম উদ্যোগশীল স্বাস্থ্য সেবা প্রদানকারী একটি সংস্থা সিএইচসিপি অর্থাৎ কমিউনিটি ক্লিনিক। এই সংস্থা থেকে ইউনিয়ন ও প্রতিটি এলাকা ভিত্তিক সকল জনগনের দৌড়গোড়ায় গিয়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবা ও পরামর্শ প্রদান করে সুস্থতা নিশ্চিত করনে কাজ করে থাকে। কিন্তু দোহার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সধীন কমিউনিটি ক্লিনিক সদস্য থাকা প্রয়োজন প্রায় ২৬ জন যেখানে কর্মরত আছেন মাত্র ১৫ জন সদস্য!
চিকিৎসক ও টেকনিশিয়ানের অভাবে নষ্ট হচ্ছে লক্ষাধিক টাকার চিকিৎসা সরঞ্জাম। পাশাপাশি চালকের অভাবেও লক্ষ-লক্ষ টাকার একটি অ্যাম্বুলেন্স পড়ে রয়েছে জড়াজীর্ন অবস্থায়। হাসপাতালে এক্সরে, রক্ত, প্রসাব, ডায়াবেটিকস, জন্ডিস সহ নানান পরিক্ষন সেবা কাজ চিকিৎসক ও দক্ষ জনবল না থাকায় সঠিক মাত্রায় পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে হাতের নাগালে চিকিৎসা সেবা প্রতিষ্ঠান থাকলেও সেবা বঞ্চিত হচ্ছে উপজেলার লক্ষাধিক মানুষ। গত এক সপ্তাহ পর্যবেক্ষন করে দেখা যায়, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স কর্তৃপক্ষ পঃপঃ কর্মকর্তা ডাঃ জসীম উদ্দিনের রোগী দেখার কথা না থাকলেও রোগীর প্রবল চাপ ঠেকাতে তিনি প্রতিদিন ডাক্তার চেম্বারে বসে রোগী সেবা প্রদান করছেন। তবে এমন পরিস্থিতিতে স্বপ্লসংখ্যক চিকিৎসক নিয়ে এমন একটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স পরিচালনা করে কতোটা শূন্যতা পূরণ করা যাচ্ছে ? তার প্রশ্ন থেকেই যায়। চিকিৎসা সেবার প্রাপ্ত অধিকার থেকে বঞ্চীত হয়ে রোগীরা ঝুকে পড়ছে পার্শ্ববর্তী ক্লিনিক ও বেসরকারি হাসপাতাল গুলোতে। সেখানেও আবার নানান পরিক্ষা-নিরীক্ষা সহ অধিক টাকা আদায়ের ভোগান্তিতেও উপজেলা চিকিৎসা সেবা যেনো এখন ভয়ানক রুপলাভ করেছে! বর্তমান বর্ষা মৌসুমে উপজেলার চরাঞ্চল থেকে স্বল্প আয়ের মানুষ বিনা খরচে সরকারী চিকিৎসা সেবা গ্রহন করতে চাইলেও পর্যাপ্ত চিকিৎসক না থাকায় তাদের সেবা দিতে অপারগ দোহার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। ৯ টি ইউনিয়নের মধ্যে ৬ টিতে সরকারী চিকিৎসা সেবা প্রদানের জন্য সহকারী সার্জন চিকিৎসক থাকলেও নেই বিলাসপুর, মাহমুদপুর ও মালিকান্দা সহ ৩ টি ইউনিয়নে সহকারী সার্জন চিকিৎসক। তবে যে ৬ টি ইউনিয়নের সহকারী সার্জন আছেন তারা রোগী চাপ ঠেকাতে তাদের ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে না গিয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ডাক্তার চেম্বারে বসে রোগীদের সেবা প্রদানের চেষ্টা করছেন। যার ফলে ইউনিয়ন ভিত্তিক রোগীরাও এখন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এসে ভীড় জমাচ্ছে। যেখানে পরিবেশ হয়ে উঠছে আরো ঘোলাটা। এতে করে গোটা উপজেলা স্বাস্থ্য সেবা করুন অবস্থান্তরে বিরাজ করছে। নেই সঠিক পর্যায়ে ল্যাবরেটরিস্ট, ফার্মাসিস্ট, ই পি আই, কার্ডিওগ্রাফার, সহঃ স্বাস্থ্য পরিদর্শক ও স্বাস্থ্য সহকারী।
এ বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পঃপঃ কর্মকর্তা ডাঃ জসীম উদ্দিন জানান, পর্যাপ্ত চিকিৎসক না থাকায় প্রতিদিন শত শত রোগীর স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করা একটু সমস্যা হলেও খুব শীঘ্রই সরকারী নিয়ম নীতির মাধ্যমে শূন্য পদে ডাক্তার ও সার্জন চিকিৎসকদের স্থানান্তর করণের মাধ্যমে শূন্য পদ পুরণ করা হবে। বর্তমান সরকার চিকিৎসা খাতে বিশেষ নজড়দারিতায় চিকিৎসা সেবা আগেই চেয়ে আরো উন্নত হয়েছে। প্রতিটি স্বাস্থ্য তার কড়া নজড়দারিতা রয়েছে। খুব শীঘ্রই দোহার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স চিকিৎসক সংকট কাটিয়ে উঠবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যাক্ত করেন।
তবে আর কতোদিন নাগাত এমন সংকট পূরণের আশা বাস্তবে রুপ নেবে সেই দিনটি এখনো খুজে বেড়াচ্ছেন ভুক্তভোগী রোগীরা।

উল্লেখ্য যে চলতি অর্থ বছরে সরকারী ভাবে দোহার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ছিলেন ২৫ জন নিয়মিত চিকিৎসক ছিলেন। কিন্তু গত মে মাসের ২১ তারিখে সরকারী তলবে এই ২৫ জন চিকিৎসক থেকে ১৩ জন চিকিৎসক’কে এক যোগে বদলী করা হয়। পরে আরো কিছু চিকিৎসক সার্জনকে বিভিন্ন কারনে বিভিন্ন স্থানে স্থানান্তরের ফলে বর্তমানে ৯ জন চিকিৎসকে অবনতি হয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। তবে বদলীকৃত চিকিৎসকের শূন্য পদে গত জুন মাসের ৩ তারিখে কিছু নতুন চিকিৎসক প্রেরণ কথা থাকলেও সরকারী ভাবে এখনো প্রেরণ কোনো চিকিৎসক করা হয়নি।

[ প্রিয় পাঠক, আপনিও বিডিসারাদিন24 ডট কম অনলাইনের অংশ হয়ে উঠুন। লাইফস্টাইল, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, রান্নার রেসিপি, ফ্যাশন-রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন- bdsaradin24@gmail.com-এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে। নারীকন্ঠ এবং মত-দ্বিমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে  bdsaradin24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরণের দায় গ্রহণ করে না। ]

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 159 বার)


Print
bdsaradin24.com