জার্মানিতে পড়তে আসার আগে যা জানা জরুরি

Print

জার্মানি। ল্যান্ড অব আইডিয়াজ। ইঞ্জিনিয়ারদের স্বর্গরাজ্য। ব্যবসা-প্রশাসনও কম না। বিশ্বের সব নামীদামি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির কোনো না কোনো শাখা এখানে পাওয়া যাবে।

স্বপ্ন যেখানে, সেখানে কিছু বাস্তবতার কঠিন দিক থাকে। যে বিষয়গুলো হয়তো সবার অজানা। সফল হতে হলে এই বিষয়গুলো সামনে আনা উচিত। মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকা যাবে। মুখোমুখি হওয়া সহজ হবে।

চিন্তা যখন টিউশন ফি! আছে এবং নেই

জার্মানিতে ১৭টি রাজ্য। ১৬টি রাজ্যে অধিকাংশ সরকারি ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা অবৈতনিক। মানে শিক্ষার্থীকে কোনো টাকাপয়সা দিতে হয় না। সরকার ট্যাক্সের টাকায় ভর্তুকি দিয়ে থাকে। একটি রাজ্যের সব ধরনের ইউনিভার্সিটি কমবেশি ১৫০০+ ইউরো করে টিউশন ফি। এ ছাড়া অনেক বিশ্ববিদ্যালয় এবং কোর্স আছে যেখানে সরকার থেকে কোনো ভর্তুকি নেই। মানে আপনার টাকায় পড়তে হবে। যা মোটেই সহজ কাজ নয়।

সেই সঙ্গে মনে রাখা উচিত ফান্ডেড কোর্সে অ্যাডমিশন পাওয়ার জন্য আপনার অ্যাকাডেমিক রেকর্ড ভালো থাকতে হবে। অন্যথায় সম্ভব হবে না। অন্যদিকে টিউশন ফি দিয়ে জার্মানিতে পড়াশোনা করার মতো সাহস বা রিস্ক নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। এখানে শিক্ষার্থী হিসেবে পার্টটাইম অথবা নির্দিষ্ট সময় পার্টটাইম জব করে হয়তো থাকা–খাওয়ার জোগান দিতে পারবেন। টিউশন ফি কঠিন ব্যাপার হবে। কাজেই কোনো এজেন্সি বা দালাল অথবা কাছের ভাইবোন যে আপনাকে উৎসাহ দিচ্ছে তাকে বিশ্বাস করার আগে নিজেই ক্যালকুলেশন করে নিন।

কাজ করলেই শুধু টাকা! টাকা নয় ইউরো

জার্মানিতে আইনগতভাবে সপ্তাহে ২০ ঘণ্টা অথবা ১২০ দিন পূর্ণ দিবস অথবা ২৪০ দিন অর্ধদিবস কাজ করা যায়। কোথাও দুই মিনিট কাজ করলেও সেটা রেকর্ড করা হয়। ভুলভাল রিপোর্ট বা তথ্য দিয়ে ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ নেই। দিলে হিতে বিপরীত হবে। অনেকেই ভাবতে পারে হয়তো দেখার কেউ নেই। একটু না হয় বেশি করলে ক্ষতি কী! ক্ষতি কিছুই না। ট্যাক্স অথবা ইনস্যুরেন্স নিয়ে দৌড়াতে হবে। ভিসা অফিসে হাজিরা দেওয়া লাগতে পারে। ভিসা জটিলতা আসতে পারে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হচ্ছে পড়াশোনায়।

‘দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র’ নামে একটি প্রবাদ আছে। যত উপার্জনের দিকে যাবেন অন্য ফোকাস থেকে আপনার বিচ্যুতি আসতে শুরু করবে। এই ইউরো চক্রে পড়ে অনেকেই চার–পাঁচ বছর শুধু ঘুরতে থাকেন। অবশেষে কোর্সের দরকারি মডিউল শেষ করতে না পারায় নতুন কোনো গন্তব্য খুঁজতে বাধ্য হন। সবশেষে ‘সম্ভাবনাময় ইঞ্জিনিয়ার’ তালিকা থেকে নাম মুছে নবাগত ‘ডে-লেবার’ হিসেবে নাম লেখাতে বাধ্য হন। যা কোনোভাবেই ফোকাস হওয়া উচিত নয়। শিক্ষার্থী হিসেবে মূল ফোকাস হচ্ছে পড়াশোনা। ঠিক রাখুন। সাতখুন মাফ। জার্মানিতে টিকে থাকলে ইউরো আসবেই।

নিজেই নিজের গাইড! প্রতিকূলতা থাকবেই

জার্মানিতে স্ট্রাগলের শুরুটা প্রথম দিন বিমানবন্দর থেকেই। সবাই চলছে রোবটের গতিতে। আপনাকে সাহায্য করবে কে? অপরিচিত কাউকে জিজ্ঞাসা করে হয়তো ডিরেকশন মিলবে। প্রতিদিনের কাজে এভাবে ডিরেকশন জোগাড় করা অসম্ভব ও অপেশাদারি ব্যাপার। নিজের সমস্যা সমাধান রয়েছে নিজের হাতে। আশার কথা হচ্ছে, পুরো জার্মানি টেকনোলোজি বেইজড। হাতে স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট থাকলে আপনি অপ্রতিরোধ্য। এটাই হচ্ছে জার্মানির সাধারণ ট্রেন্ড। কাউকে আপনার দরকার নেই। আপনি নিজেই নিজের গাইড।

ধরা যাক, গন্তব্য হচ্ছে আপনার বাসা থেকে পাশের শহর। মোবাইল অ্যাপসে পয়েন্ট ‘এ’ আপনার বাসার লোকেশন এবং পয়েন্ট ‘বি’ গন্তব্যের নাম। কীভাবে, কখন এবং কত নম্বর বাস-ট্রাম-ট্রেন ধরতে হবে তালিকা হাজির। কাছের দূরত্ব হলে নেভিগেশনে অ্যাপসে পয়েন্ট ‘এ’ এবং পয়েন্ট-‘বি’ টাইপ করুন। দেখানো নির্দেশনা অনুসারে হাঁটা শুরু করুন। কখন গন্তব্যে পৌঁছে যাবেন নিজেও বোঝা মুশকিল।

ও হ্যাঁ। জার্মানিতে সবচেয়ে বাজে ব্যাপার হচ্ছে আবহাওয়া। আজকে চকচকে রোদ তো কালকে শীতের জামাকাপড় পরে নামা লাগতে পারে। গতকাল রোদ ছিল ভেবে আজ শর্টস পরে বেরিয়ে নিশ্চয়ই শীতে ঠকঠক করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। উপায় হচ্ছে সেই স্মার্টফোন ও ওয়েদার অ্যাপস। দিনের শুরুতে অবশ্যই চেক করে সেভাবে গেটআপ নিতে হবে।

পরীক্ষার মার্কস গেল কই! ফাঁদ দেখেছ এবার ঘুঘু ধরো…

আমেরিকা ও কানাডা। বিশ্বের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত স্টাডি গন্তব্য। অন্যদিকে জার্মানিতে ইউনিভার্সিটির স্টাডি সিস্টেম পুরোটাই আলাদা। সব নিয়ন্ত্রণ থাকবে আপনার হাতে। ক্লাস ও পরীক্ষায় কোনো দিন না গেলেও কেউ আপনাকে ‘তুমি এসেছিলে পরশু, কাল কেন আসনি…’ বলে মনে করিয়ে দেবে না। নির্দিষ্ট সময় পরে কর্তৃপক্ষ ধরেই নেবে আপনি অন্য কিছুতে মজে আছেন। যা আপনার ফ্রিডম।

আপনার প্রয়োজনে আপনি নিজেই আওয়াজ তুলবেন। এটাই হচ্ছে জার্মান পেশাদারি। ক্লাসে অংশ নেওয়া, স্টাডি পোর্টাল ও পরীক্ষার আলাদা সার্ভারের পদ্ধতি, এগুলো নিয়ে ওরিয়েন্টশনের দিনই আপনাকে বয়ান করানো হবে। ভাগ্য ভালো থাকলে ইংরেজিতে। অন্যথায় জার্মান ভাষায়। মাথায় রাখতে হবে এখানে সব অনলাইন বেইজড। ইউনিভার্সিটির শুরুর দিনই এগুলো কীভাবে কাজে লাগাতে হবে সে সম্পর্কে প্রশ্ন করে জেনে নিতে হবে। অন্যথায় পরীক্ষা দিয়ে ভালো গ্রেড পাওয়ার পরও বাতিল হিসেবে গণ্য হবে। আবার পরীক্ষা দিতে হবে। অধিকাংশই ইউনিভার্সিটির পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার আগে অনলাইনে রেজিস্ট্রেশন করা বাধ্যতামূলক। যার ভিত্তিতে ইউনিভার্সিটি কর্তৃপক্ষ আপনাকে পাস-ফেল ঘোষণা করার এখতিয়ার রাখে।

নিয়মিত মডিউল হ্যান্ডবুক-কোর্সের মধ্যে কী কী বিষয় আছে, কয়টি ল্যাব আছে এগুলোর বিবরণীর তালিকা চেক করতে হবে। পরীক্ষা ও ল্যাব রিপোর্ট বা প্রটোকল করার দায়িত্ব আপনার নিজের। অথোরিটির কাজ হচ্ছে চেক করে ওয়েবসাইটে পাবলিশ করা। পরীক্ষা দিয়েছেন সেই গত বছর, এখনো রেজাল্ট অনলাইনে আসছে না। হয়তো ধরে নিতে পারেন আপনার দায়িত্ব শেষ। খেলা এখন অথোরিটির হাতে। হ্যাঁ, আপনি একই সঙ্গে সত্য ও বিচ্যুত। খেলা ঠিকই অথোরিটির হাতে। অন্যদিকে প্রটোকল অ্যাকসেপ্ট হয়েছে কী হয়নি চেক করা আপনার হাতে। কোনো কারণে অ্যাকসেপ্ট না হলে, বছর পার হবে তবু রেজাল্ট পাবলিশ হবে না। মানে হচ্ছে ওই প্রোটোকলে অথোরিটি গ্রিন সিগন্যাল পাওয়ার আগে আপনাকে কোনো রেজাল্ট দেবে না। কাজেই এই বিষয়গুলো মাথায় রেখেই জার্মান ইউনিভার্সিটি এনরোল হতে হবে।

পড়াশোনা-নেটওয়ার্কের বাইরে! নিজেকে নিজে শিক্ষিত করা

‘জার্মান ফল টক’। আসলেই টক। বিশেষ করে ইঞ্জিনিয়ারিং যাঁরা পড়তে আসবেন। বেশি বেশি টক খাওয়ার সঙ্গে সখ্য গড়ার মানসিকতা নিয়ে আসতে হবে। দেশ ছাড়ার আগে ভালোভাবে মুরব্বিদের দোয়া নিয়ে আসবেন। জার্মানিতে লাইফ হেল করা ব্যাপার হচ্ছে ইঞ্জিনিয়ারিং সাবজেক্টে মাস্টার্স করা। যদিও অনেক গুরুজনের এখানে ভিন্নমত আছে। বৃহত্তর জনগণের স্বার্থে ইঞ্জিনিয়ারিং মানেই কঠিন চ্যালেঞ্জ নিতে হবে, এ সংকল্প মাথায় নিয়ে আসতে হবে।

[ প্রিয় পাঠক, আপনিও বিডিসারাদিন24 ডট কম অনলাইনের অংশ হয়ে উঠুন। লাইফস্টাইল, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, রান্নার রেসিপি, ফ্যাশন-রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন- bdsaradin24@gmail.com-এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে। নারীকন্ঠ এবং মত-দ্বিমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে  bdsaradin24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরণের দায় গ্রহণ করে না। ]

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 48 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ
bdsaradin24.com