দুর্বোধ্য প্রেসক্রিপশনের কারণে মৃত্যুও হতে পারে

Print

হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ড. রামচন্দ্র কল্লুরু এনজাইনার জন্য রেমন ভেসকুয়েজ নামের এক রোগীকে ৬ ঘণ্টা অন্তর অন্তর ২০ মি.গ্রা. সরডিল (আইজোসরবিড ডাইনাইট্রেট) গ্রহণের পরামর্শ দিয়ে প্রেসক্রিপশন প্রদান করেন।

কিন্তু প্রেসক্রিপশন পড়তে না পারার কারণে ফার্মাসিস্ট রোগীকে একই মাত্রার অর্থাৎ ২০ মি. গ্রামের উচ্চ রক্তচাপের ক্যালসিয়াম চ্যানেল ব্লকার গ্রুপের ওষুধ প্লেন্ডিল (ফেলোডিপিন) প্রদান করেন। কিন্তু উচ্চ রক্তচাপের ক্যালসিয়াম চ্যানেল ব্লকার গ্রুপের এ ওষুধ প্লেন্ডিলের সর্বোচ্চ গ্রহণযোগ্য মাত্রা হল ১০ মি. গ্রাম। অত্যধিক মাত্রার এ ওষুধ সেবন করার একদিন পর রেমন ভেসকুয়েজ হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হন এবং এর কিছুদিন পর তিনি মারা যান। চিকিৎসকের সার্বিক স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে আদালত কোনো প্রশ্ন তোলেননি।

রোগীর মৃত্যুর জন্য অস্পষ্ট অক্ষরে লেখা তার প্রেসক্রিপশনকে দায়ী করে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয় এবং জরিমানা করা হয়। রেমন ভেসকুজের আইনজীবী বাকিংহাম প্রশ্ন তুলে বলেন, প্রেসক্রিপশন লেখার আগে চিকিৎসকদের কি ভাবা উচিত নয় যে, তার অস্পষ্ট হাতের লেখার কারণে রোগী বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন? এর পরিপ্রেক্ষিতে আমেরিকান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন পরবর্তী কয়েক বছরে প্রেসক্রিপশন লেখার ব্যাপারে বেশ কয়েকটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।

আমেরিকান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন চিকিৎসকদের স্পষ্ট অক্ষরে প্রেসক্রিপশন লেখার আহ্বান জানিয়েছেন। প্রেসক্রিপশন লেখার পর তাতে কোনো ভুল-ত্রুটি আছে কিনা বা তা পাঠযোগ্য কিনা, তা পুনর্বার পরীক্ষা করে দেখার জন্য বলা হয়। যেসব চিকিৎসকের হাতের লেখা খারাপ, তাদের কম্পিউটার ব্যবহারের অনুরোধ জানানো হয় অথবা অন্তত ব্লক লেটার ব্যবহার করতে আহ্বান জানানো হয়।

দ্য ডেইলি স্টার ১৩ সেপ্টেম্বর অস্পষ্ট অক্ষরে প্রেসক্রিপশন লেখা নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, স্পষ্ট অক্ষরে পাঠ উপযোগী করে প্রেসক্রিপশন লেখার হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করায় সুপ্রিমকোর্টের একজন আইনজীবী দিনাজপুর এম আবদুর রহিম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডেন্টাল সার্জন ডা. প্রজ্ঞা পারমিতা রায় ও পরিচালক ডা. সারোয়ার জাহানকে আইনি নোটিশ পাঠিয়েছেন।

নোটিশে আগামী সাত দিনের মধ্যে বিষয়টির ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। শুক্রবার সকালে আইনি নোটিশের বিষয়টি এটিএন বাংলার সাংবাদিক হুমায়ুন কবীর চিশতী নিশ্চিত করেছেন। গত বুধবার স্পেশাল করসপন্ডেন্ট হুমায়ুন কবীর চিশতী তার আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদের মাধ্যমে ওই আইনি নোটিশ পাঠান। নোটিশ সূত্রে জানা যায়- ৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮ দিনাজপুর এম আবদুর রহিম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বেসরকারি টেলিভিশন এটিএন বাংলার স্পেশাল করসপন্ডেন্ট হুমায়ুন কবির চিশতীর মা লুৎফা আজাদ (৭১) চিকিৎসার জন্য যান।

এ সময় ডেন্টাল সার্জন ডা. প্রজ্ঞা পারমিতা রায় তার চিকিৎসা শেষে প্রেসক্রিপশন দেন। লেখা স্পষ্ট না হওয়ায় রোগীর স্বজনদের প্রেসক্রিপশনে উল্লিখিত ওষুধ কিনতে বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। সব ওষুধের দোকানিরা প্রেসক্রিপশনে কী লেখা রয়েছে- তা উদ্ধার করতে ব্যর্থ হন।

পরে এ ঘটনায় রোগী লুৎফা আজাদের ছেলে ও এটিএন বাংলার সাংবাদিক তার আইনজীবীর মাধ্যমে দিনাজপুর এম আবদুর রহিম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ও ডেন্টাল সার্জনকে উচ্চ আদালতের নির্দেশ অমান্য করায় আইনি নোটিশ প্রদান করেন। উল্লেখ্য, ২০১৭ সালে হাইকোর্ট থেকে চিকিৎসকদের স্পষ্ট অক্ষরে পাঠ উপযোগী ব্যবস্থাপত্র লিখতে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল।

আমি প্রায়ই অপাঠযোগ্য প্রেসক্রিপশন হাতে পাই। তার মধ্যে বেশিরভাগই পড়তে পারি না। কিছুদিন আগে এক রোগীর জন্য অর্ধডজন ডিগ্রিধারী একজন চিকিৎসক একটি প্রেসক্রিপশন দিয়েছেন। দোকানদার/ফার্মাসিস্ট দু-একটি ছাড়া বাকি সব ওষুধের নাম পড়তেই পারেননি। পরিচিত ব্যক্তি প্রেসক্রিপশনটি আমার হাতে দিয়ে বললেন- দেখুন তো স্যার, প্রেসক্রিপশনের ওষুধগুলোর নাম পড়তে পারেন কিনা। উৎসুক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম- প্রেসক্রিপশন নিয়ে আমার কাছে কেন এসেছেন?

ভদ্রলোক বললেন- দোকানদার কয়েকটি ওষুধের নাম পড়তে পারেনি বলে ওষুধ দেয়নি। ভাবলাম, আপনি হয়তো পড়তে পারবেন। আর কিছু না বলে প্রেসক্রিপশনে প্রদত্ত ওষুধগুলোর নাম উদ্ধার করতে চেষ্টা করলাম। কিন্তু রীতিমতো দুঃসাধ্য কর্ম বলে মনে হল। সেই সনাতনী ও চিরাচরিত প্রক্রিয়ার বাজে ও অপাঠ্য হাতের লেখা।

প্রেসক্রিপশনটি হাতে নিয়ে ভাবছিলাম- স্পষ্ট অক্ষরে পাঠ উপযোগী করে প্রেসক্রিপশন লেখার হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করায় সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ কর্তৃক দিনাজপুর এম আবদুর রহিম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডেন্টাল সার্জন ডা. প্রজ্ঞা পারমিতা রায় ও পরিচালক ডা. সারোয়ার জাহানকে আইনি নোটিশ পাঠানো যথাযথ হয়েছে।

জেনেরিক নামে ব্লক লেটার বা প্রিন্ট করার মাধ্যমে প্রেসক্রিপশন লেখার আদালতের আদেশটি আমাদের চিকিৎসকরা মেনে চলছেন না- এম আবদুর রহিম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডেন্টাল সার্জনকে আইনি নোটিশ দেয়া সেটাই প্রমাণ করে। অনেকদিন আগেই ওষুধের দোকানে খোঁজ নিয়ে আমি জানতে পেরেছিলাম- আনুমানিক ১০ শতাংশের বেশি চিকিৎসক আদালতের নির্দেশ মেনে প্রেসক্রিপশন লিখছেন না। আর সেই কারণে রোগী ও ওষুধ বিক্রেতাদের ভোগান্তিও কমছে না।

পাঠকদের অবগতির জন্য জানাচ্ছি- ২০১৭ সালের ৯ জানুয়ারি উচ্চ আদালত চিকিৎসকদের ব্লক লেটার বা প্রিন্ট করে জেনেরিক নামে প্রেসক্রিপশনে ওষুধ লিখতে বিজ্ঞপ্তি প্রচারের জন্য স্বাস্থ্য সচিবের কাছে নির্দেশ পাঠিয়েছিলেন। নির্দেশে ছয় মাস তদারকির পর আদালতের নির্দেশ মেনে চিকিৎসকরা প্রেসক্রিপশন লিখছেন কিনা, তা আদালতকে জানাতে বলা হয়েছিল। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে- চিকিৎসকসমাজ আদালতের উল্লিখিত নির্দেশ পুরোপুরি মেনে প্রেসক্রিপশন লিখছেন না। এরই মধ্যে প্রায় দু’বছর অতিবাহিত হতে চলেছে।

স্বাস্থ্য সচিব আদালতের কাছে কোনো রিপোর্ট আদৌ পাঠিয়েছেন কিনা বা পাঠালে কী রিপোর্ট পাঠিয়েছেন, তা এখনও জানা যায়নি। একজন ফার্মাসিস্ট হিসেবে চিকিৎসকসমাজের কাছে আমি আহ্বান জানাই- অনুগ্রহ করে আপনারা আপনাদের চিরাচরিত আচরণ পরিবর্তন করে আদালতের নীতিমালা অনুসরণ করে পরিপূর্ণ তথ্য ও পরামর্শ প্রদানপূর্বক স্পষ্ট ও ঝকঝকে পাঠযোগ্য অক্ষরে জেনেরিক নামে প্রেসক্রিপশন লিখুন।

চিকিৎসা পেশার নীতিশাস্ত্রেও এই একই নির্দেশনা দেয়া আছে। সুন্দর ও পাঠযোগ্য প্রেসক্রিপশন লিখলে আপনাদের মান-মর্যাদা ও ভাবমূর্তি বৃদ্ধি পাবে; মানুষও উপকৃত হবে। অপাঠ্য প্রেসক্রিপশনের ভুল ওষুধ সেবন বা গ্রহণ করে মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে না বা মৃত্যুবরণ করবে না।

ওষুধের অযৌক্তিক প্রয়োগের বড় উৎস হল, চিকিৎসকের রোগ নির্ণয় ও প্রেসক্রিপশন। চিকিৎসক ঠিকমতো রোগ নির্ণয় করে যুক্তিসঙ্গতভাবে ওষুধ প্রদান না করলে রোগী ওষুধের অপব্যবহারজনিত সমস্যার শিকার হবে। চিকিৎসক তার দায়িত্ব সঠিক ও নির্ভুলভাবে পালন করলেও ওষুধের ডিসপেনসিং যুক্তিসঙ্গত বা সঠিক না হলে রোগী ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অন্যদিকে প্রেসক্রিপশনে প্রদত্ত ওষুধ সম্পর্কে রোগীকে পর্যাপ্ত ও প্রকৃত তথ্য, পরামর্শ বা উপদেশ প্রদান করা না হলে যুক্তিহীন ব্যবহারের কারণে রোগী ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

রোগীর জন্য প্রেসক্রিপশনে ওষুধ প্রদানে চিকিৎসক যত সতর্কতা, জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা প্রয়োগ করবেন; রোগী তত বেশি উপকৃত হবেন। রোগ প্রতিকার ও প্রতিরোধে চিকিৎসকদের ভূমিকাকে কোনোভাবেই খাটো করে দেখার অবকাশ নেই। আমাদের দেশে একটি ধারণা প্রচলিত রয়েছে- চিকিৎসক হাসলে ওষুধ ছাড়াই রোগীর অর্ধেক রোগ ভালো হয়ে যায়।

এর পেছনে বৈজ্ঞানিক সত্য রয়েছে। কারণ রোগের ক্ষেত্রে অনেক সময় শরীর ও মনের যোগসূত্র অভিন্ন। উন্নত বিশ্বে প্রকৃত চিকিৎসা শুরুর আগেই চিকিৎসকরা প্রায়শ রোগীকে মনস্তাত্ত্বিকভাবে চাঙ্গা করার উদ্যোগ নেন। রোগীকে তার রোগ সম্পর্কে প্রকৃত তথ্য প্রদান এবং চিকিৎসা সম্পর্কে অবহিত করতে চিকিৎসকরা সদা সচেষ্ট থাকেন।

এতে রোগীর আস্থা ও আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায়। রোগী সন্তুষ্ট না হওয়া পর্যন্ত ন্যায়সঙ্গত তথ্য জানার জন্য চিকিৎসককে প্রশ্ন করার অধিকার রাখেন। এর ফলে রোগ নির্ণয় ও ওষুধ প্রয়োগে ভুল কম হয় বলে ওষুধের অপব্যবহারও কমে আসে। কিন্তু আমাদের দেশে চিকিৎসকদের একটির বেশি দুটি প্রশ্ন করলেই চিকিৎসক বিরক্ত হন ও ক্ষেপে যান। কারণ বেশি প্রশ্নের উত্তর দেয়ার সময় তাদের নেই। এ আচরণ প্রশংসনীয় নয়। রোগীর প্রতি একটু সদয় ও সহানুভূতিশীল হলে রোগীর আস্থা অনেক বেড়ে যায়, রোগী খুশিও হন।

বিশ্বজুড়ে চিকিৎসকরা তাদের প্রেসক্রিপশনে যেসব ওষুধ লিখে থাকেন, তার সব কটি যুক্তিসঙ্গতভাবে লেখেন না। ওষুধের এ অযৌক্তিক প্রয়োগের পেছনে বহুবিধ কারণ কাজ করে। বহু চিকিৎসক পেশাগত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার অভাবে রোগীকে সঠিক ওষুধ প্রদানে সক্ষম হন না। জ্ঞান-বিজ্ঞানের অগ্রগতি ও পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এসব চিকিৎসক নিজেদের যুগোপযোগী করে গড়ে তুলতে সচেষ্ট হন না।

এসব চিকিৎসক সাধারণত সনাতনী পদ্ধতিতে যুগ যুগ ধরে সেকেলে মানসিকতা নিয়ে চিকিৎসা চালিয়ে যান বলে রোগ নির্ণয় বা ওষুধ প্রদানে প্রায়শই ভুল হয়। আমাদের মতো দেশে অতিমাত্রায় ব্যবসায়িক মনোবৃত্তির কারণে রোগীর প্রচণ্ড চাপ সহ্য করতে না পেরে চিকিৎসকরা অসতর্কতা ও অবহেলার কারণে রোগীকে সঠিক চিকিৎসা প্রদানে ব্যর্থ হন।

অন্যদিকে বহু চিকিৎসক ওষুধ কোম্পানি কর্তৃক প্রভাবান্বিত ও প্রলুব্ধ হয়ে গুণগত মানসম্পন্ন এবং সস্তা ওষুধের পরিবর্তে দামি ওষুধ প্রেসক্রিপশনে লিখে থাকেন। আবার অনেক চিকিৎসক দেশে উৎপাদিত মানসম্পন্ন ওষুধ বাদ দিয়ে বিদেশি নামিদামি ওষুধ প্রেসক্রাইব করে থাকেন। এতে রোগীর আর্থিক ক্ষতি হয়। এই আচরণ বদলানো উচিত। ওষুধ কোম্পানিগুলো ওষুধ বাজারজাত করার পর ওষুধ প্রমোশনে সর্বশক্তি নিয়োগ করে থাকে তাদের ওষুধের কাটতি বাড়ানোর জন্য।

ওষুধের কাটতি বাড়ানোর জন্য ওষুধ কোম্পানিগুলোর মূল টার্গেট চিকিৎসক। কারণ চিকিৎসকরা প্রেসক্রিপশনে যে ওষুধ লেখেন, রোগী মূলত সেই ওষুধই কিনে থাকেন। অধিক হারে মুনাফা অর্জনের উদ্দেশ্যে ওষুধ কোম্পানিগুলো সাধারণত টনিক, ভিটামিন, হজমিকারক, বলবৃদ্ধিকারক, এনজাইম, কফ মিকচার, অ্যালকালাইজার জাতীয় অপ্রয়োজনীয় ও ক্ষতিকর ওষুধ উৎপাদনে বেশি তৎপর থাকে।

কারণ অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের চেয়ে এসব তথাকথিত ওষুধে মুনাফার হার বহুগুণ বেশি। এ মুনাফার হার আরও অধিক গুণে বেড়ে যায়, যখন চিকিৎসকরা তাদের প্রেসক্রিপশনে এসব ওষুধ নামধারী পণ্য নির্বিচারে প্রেসক্রাইব করে থাকেন। ওষুধ কোম্পানির সঙ্গে এসব ওষুধ প্রেসক্রাইবারের সম্পর্ক যতটা না পেশাগত, তার চেয়ে বেশি ব্যবসায়িক।

তৃতীয় বিশ্বের সব দেশের মতো আমাদের দেশেও সবচেয়ে বেশি অপব্যবহৃত ওষুধগুলোর মধ্যে রয়েছে অ্যান্টিবায়োটিক, সিডেটিভ, অ্যান্টিডায়ারিয়াল, ভিটামিন, টনিক, এনজাইম, কফমিকচার, স্টেরয়েড, অ্যান্টিহিস্টামিন, অ্যান্টিকোলেস্টেরল ও অ্যান্টাসিড জাতীয় ওষুধ। টনিক ভিটামিনের প্রতি মানুষের অকৃত্রিম দুর্বলতা রয়েছে। এ দুর্বলতার কারণ ওষুধ কোম্পানিগুলোর অনৈতিক ড্রাগ প্রমোশন এবং চিকিৎসক কর্তৃক এসব ওষুধের ঢালাও প্রয়োগ।

টনিক ও ভিটামিন সম্পর্কে ওষুধ কোম্পানিগুলো অনেক অমূলক ভ্রান্ত ধারণা চিকিৎসক ও জনসমক্ষে তুলে ধরে। এসব বক্তব্যের কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি না থাকা সত্ত্বেও বহু চিকিৎসক প্রায়শ এসব বস্তু প্রেসক্রিপশনে লিখে থাকেন। রোগী প্রয়োজনীয় মনে করে প্রচুর অর্থ ব্যয়ের মাধ্যমে এসব ওষুধ কিনে থাকেন। এই অপব্যাখ্যা ও অপব্যবহার স্পষ্টতই প্রবঞ্চনার শামিল।

ওষুধের অপপ্রয়োগ ও অপব্যবহারের ফলে রোগী বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। প্রেসক্রিপশনে প্রদত্ত ওষুধের কোনটি প্রয়োজনীয়, কোনটি অপ্রয়োজনীয় বা প্রদত্ত ওষুধের সঙ্গে সৃষ্ট রোগের আদৌ সম্পর্ক রয়েছে কিনা- এসব প্রশ্ন উপস্থাপন করার যোগ্যতা ও ক্ষমতা রোগীরা সচরাচর রাখে না। ফলে রোগী প্রেসক্রিপশন মোতাবেক ওষুধ কিনতে ও গ্রহণ করতে বাধ্য হন।

প্রেসক্রিপশন মোতাবেক অপ্রয়োজনীয় ওষুধ কিনলে রোগী আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। অপ্রাসঙ্গিক বা ক্ষতিকর ওষুধ কিনতে গেলে রোগী মারাত্মক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায়, বিষক্রিয়া বা বিরূপ প্রতিক্রিয়ার শিকার হন। এ ক্ষতির দায় থেকে চিকিৎসক কোনোমতেই অব্যাহতি পেতে পারেন না। উন্নত বিশ্বে চিকিৎসকের ভুল সিদ্ধান্তের কারণে রোগী ক্ষতিগ্রস্ত হলে আইনের আশ্রয় নিতে পারেন।

অনুন্নত দেশে রোগী এ সুবিধা বা অধিকার ভোগ করেন না। বাংলাদেশে ড্রাগ প্রমোশনে কোম্পানিগুলো মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভ বা ড্রাগ প্রমোশন প্রতিনিধি নিয়োগ করে থাকে। এ রিপ্রেজেন্টেটিভরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে ওষুধ বিশেষজ্ঞ নয় এবং কোনো কোনো সময় ওষুধের ওপর এদের পর্যাপ্ত জ্ঞান থাকে না। তাদের কোনো কোনো সময় ড্রাগ প্রমোশনের ওপর প্রশিক্ষণ দেয়া হয়ে থাকে।

কিন্তু ড্রাগ প্রমোশনের জন্য ওষুধ কোম্পানি কর্তৃক পরিচালিত এ প্রশিক্ষণ কতটুকু নিরপেক্ষ এবং প্রকৃত তথ্যসাপেক্ষ, তা মূল্যায়নের প্রয়োজন রয়েছে। এরা সাধারণত কোম্পানির ব্যবসায়িক স্বার্থটাকে বড় করে দেখে এবং সে মোতাবেক চিকিৎসককে ওষুধ প্রয়োগ ও ড্রাগ স্টোরগুলোকে ওষুধ কিনতে প্রলুব্ধ করে। প্রকৃত প্রস্তাবে কোনো রোগের ক্ষেত্রে ওষুধ নির্বাচনে প্রকৃত তথ্য না পেলে চিকিৎসক বিভ্রান্ত হন এবং ফলশ্রুতিতে ভুল বা ক্ষতিকর ওষুধ প্রয়োগের ফলে রোগী ক্ষতিগ্রস্ত হন।

বর্তমানে ওষুধের জোয়ারে আমাদের চিকিৎসকরা ভাসছেন আর এতসব ওষুধের ওপর প্রকৃত তথ্য অন্বেষণে হিমশিম খাচ্ছেন। কোনো দেশে ওষুধের সংখ্যায় সীমাবদ্ধতা না থাকলে এবং বাজার প্রয়োজনীয় বা অপ্রয়োজনীয় ওষুধে প্লাবিত হয়ে গেলে সব ওষুধের ওপর সম্যক ধারণা অর্জন কোনো চিকিৎসকের পক্ষে সম্ভব নয়। সুচিকিৎসার জন্য সীমাবদ্ধ ওষুধের ওপর পর্যাপ্ত জ্ঞান, অসংখ্য ওষুধের ওপর অপূর্ণ ও ভাসাভাসা জ্ঞানের চেয়ে অনেক উপকারী।

ওষুধের ফলপ্রসূ ও যুক্তিসঙ্গত প্রয়োগের জন্য কোম্পানি প্রদত্ত নামের পরিবর্তে ওষুধের জেনেরিক নাম ব্যবহার আবশ্যক। এ ব্যাপারেও আদালতের স্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে। কিন্তু সেই নির্দেশও বাস্তবায়িত হচ্ছে না। কয়েকটি বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসক জেনেরিক নামে ওষুধ লিখে থাকেন। প্রেসক্রিপশন লেখার ব্যাপারেও তারা যত্নবান। এসব হাসপাতালে প্রেসক্রিপশন লেখার জন্য কম্পিউটার ব্যবহার করা হয়ে থাকে। তাদের আমি সাধুবাদ জানাই।

পরিশেষে একটি কথা। মানবসেবায় চিকিৎসকদের ভূমিকাকে খাটো করে দেখার কোনো অবকাশ নেই। মানুষ রোগাক্রান্ত হলে চিকিৎসকের কাছে যায়; চিকিৎসক রোগ নির্ণয় করে রোগীকে ওষুধ দেন এবং রোগী সেই ওষুধ খেয়ে সুস্থ হয়ে ওঠেন। রোগীর রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসাসেবা প্রদানের জন্য মানুষের কাছে চিকিৎসকদের সম্মান ও মান-মর্যাদা অনেক বেশি। সুতরাং আমাদের মতো গরিব দেশের অসহায় ও দরিদ্র রোগী ও মানুষের দুঃখ-কষ্ট, অসহায়ত্ব, অভাব-অনটন ও দুর্দশার কথা চিকিৎসকরা না ভাবলে আর কে ভাববে?

ড. মুনীরউদ্দিন আহমদ : অধ্যাপক, ফার্মেসি অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

drmuniruddin@gmail.com

 

[ প্রিয় পাঠক, আপনিও বিডিসারাদিন24 ডট কম অনলাইনের অংশ হয়ে উঠুন। লাইফস্টাইল, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, রান্নার রেসিপি, ফ্যাশন-রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন- bdsaradin@gmail.com-এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে। নারীকন্ঠ এবং মত-দ্বিমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে  bdsaradin24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরণের দায় গ্রহণ করে না। ]

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 198 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ
bdsaradin24.com