দুু’বার রিটেন ও ভাইভাতে পাশ করেও অদৃশ্য কারনে প্রাইমারী স্কুল শিক্ষিকার চাকরী পাননি উচ্চ শিক্ষিতা হিরামতী

Print

সালেকিন মিয়া সাগর/চুয়াডাঙ্গা
কোন কাল্পনিক বা অবাস্তবিক কোন গল্প নয়। আজ আপনাদের শোনাবো উচ্চশিক্ষিতা হতভাগিনী এক নিভৃত পল্লীর হিরামতীর বাস্তব জীবনী।
হয়তো এ কাহিনীটি বাংলা চলচ্চিত্র জগতের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ চিত্র পরিচালক প্রয়াত সত্যজিৎ রায়ের হাতে পড়লে সৃষ্টি হতো পথের পাঁচালী বা অপুর সংসারের মতো কোন কালজয়ী সৃষ্টি।

আসলে এ ঘটনাটি জানতে  হলে অামাদেরকে ফিরে যেতে হবে আজ থেকে ২৭/২৮ বছর পূর্বে। সীমান্তবর্তী চুয়াডাঙ্গা জেলার দামুড়হুদা উপজেলার নিভৃতপল্লী মজলিশপুর। এই গ্রামের হত দরিদ্র দিন আনা দিন খাওয়া পরিবারের কারিমূল হক ও জ্যোৎস্না বেগমের কোল জুড়ে ১৯৯০ সালে জন্ম নেয় ফুটফুটে এক কণ্যা সন্তান। চকচকে ঝকঝকে সৌন্দর্যময় চেহারা দেখে তার নাম রাখা হয় হিরামতী খাতুন বা হীরা। হাজারো অভাব অনটন আর খাদ্যবস্ত্রের সংকট সত্ত্বেও এ সন্তান জন্ম নেয়ার পর থেকেই এ দারিদ্র্য কুঠির যেনো প্রতিনিয়ত স্বর্ণালী আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠে। খুশির বন্যা বয়ে যায় গোটা পরিবারে।

ক্রমশ : শিশুটু একটু একটু করে বড় হতে থাকে। যখন তার বয়স ৯/১০ মাস অর্থাৎ যে সময়টাতে শিশু হামাগুড়ি শেষ করে, আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়িয়ে এক পা এক পা করে হাঁটার চেষ্টা করে, তখনই বাবা মা প্রথম বুঝতে পারেন তাদের মেয়ের বাম পায়ে কিছুটা সমস্যা। অর্থাৎ পোলিও টিকা সে সময় গ্রামে গঞ্জে না পৌঁছানোর কারণে পোলিও আক্রান্ত হয়। তাই বাম পা কিছুটা পা টেনে টেন হাঁটে। তবে দিনমজুর বাবার স্বপ্ন ছিলো শত দারিদ্র্যতার মাঝেও তিনি দেশের সর্বস্ব  শিক্ষায় শিক্ষিত করবেন। যথারীতি ৫/৬ বয়সে হীরামতিকে তার বাবা ভর্তি করে দিলেন গ্রামের সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। কোন গৃহশিক্ষক ছাড়াই হিরামতী ৫ম শ্রণী পাশ করলেন ভালোভাবেই।

এখন হাইস্কুল গার্লস স্কুলে ভর্তি হওয়ার পালা। কিন্তু আশে পাশে ৩/৪ কিলোমিটারের মধ্যে হাইস্কুল বলতে ছিলো দলিয়ারপুর হাইস্কুল। তাই এত দূরের পথ কষ্ট করে যেয়ে পড়ার দরকার নেই বলে জানালেন বাবা মা সহ প্রতিবেশিরাও। কিন্তু কোন মতেই হিরামতীকে তারা রাজি করাতে পারলেন না। হীরার একগুঁয়েমির কারণে শেষে ভর্তি করলেন দলিয়ারমপুর হাইস্কুলে। এখান থেকে ২০০৫ এসএসসি পাশকরে নিজ যোগ্যতায় ভর্তি হলেন চুয়াডাঙ্গা সরকারী কলেজে। ২০০৭ সালে এইচএসসি পাশ করেন।
SSC & HSC ভর্তি পরীক্ষার সময় হিরামতীর বাবা মা ভর্তির টাকা জোগাড় করতে যেয়ে মানুষের দুয়ারে দুয়ারে সাহায্য প্রার্থনাও করেন।
২০০৭ সালে এইচএসসি পাশ করার পর আর অনার্স ভর্তি করানো বাবা মায়ের পক্ষে কোন ভাবেই সম্ভব নয় বলে বাবা মা জানিয়ে দেন। রাত দিন ঘরে বসে নীরবে অশ্রুপাতকরা ছাড়া হীরার আর কোন উপায় থাকেনা।
কয়েকদিন পর হীরামতি কলেজের প্রিন্সিপালেরসাথে দেখা করার উদ্দেশ্যে বাড়ী থেকে চুয়াডাঙ্গার উদ্দেশ্যে রওনা হন। ইচ্ছে প্রিন্সিপাল স্যারের হাতে পায়ে ধরে যেন প্রতিবন্ধী কোটায় হোক আর দুস্থঃ মানুষ হিসাবেই হোক অবৈতনিকভাবে অনার্স করার সুজোগ পান।

কিন্তু বিধাতা খেললেন অন্য খেলা। ঐ সময় চুয়াডাঙ্গা চৌরাস্তার মোড়ে হীরার সাথে দেখা হলো দামুড়হুদার এক পল্লীর গৃহস্থ পরিবারের মানব দরদী এ্ক যুবক মিঠুর সাথে। প্রথমে টুকটাক কথাবার্তা, এরপর পুরো লাইফ হিস্ট্রি শুনে মিঠুর চোখ ভিজে গেলো। হৃদয়ের মধ্যে শুরু হয়ে গেল রক্তক্ষরণ। যে সময় আজমল হক মিঠুর সাথে এলাকার সেরা সেরা ধনী ব্যক্তিরা তাদের বিবাহ উপযুক্ত কন্যকে মিঠুর গলায় ঝুলিয়ে দিতে পারলে নিজেদেরকে ধন্য মনে করতেন। সে সময় পরিবার, আত্মীয়স্বজন,বন্ধুবান্ধব ও এলাকাবাসীর সমস্ত কথা উপেক্ষা করে হৃদয়ের অন্তস্থলে ঠাঁই দিয়ে এক সপ্তাহর মধ্যে আইন সম্মতভাবে বিয়ে করে হীরাকে বসালেন রাজরানীর মসনদে। শুধু তাই নয়। হিরামতীর পড়াশুনার প্রতি গভীর আগ্রহ দেখে বিয়ের এক সপ্তাহর মধ্যেই চুয়াডাঙ্গা সরকারী কলেজে  মিঠু নিজে সাথে করে নিয়ে যেয়ে ” পলিটিক্যাল সায়েন্সে ” অনার্সে ভর্তি করে দিলেন। যথারীতি ২০১২/২০১৩ মৌসূমে অনার্স পাশ করলেন।

হীরামতীর প্রথম থেকেই স্বপ্ন ছিলো সরকারী প্রাইমারী স্কুলে চাকরী করবেন। স লক্ষেপরীক্ষা দিলেন।
রিটেন ও ভাইবাতে দুবার বিজয়ীও হলেন।!! প্রথমবার ৬৭২ ও দ্বিতীয়বার ৭১২ জনের মধ্যে উত্তীর্ণও হলেন। কিন্তু রহস্যজনক কারণে তৎকালীন ডিসি বাবু ভোলানাথ দে মহাশশ হীরামতীকে চাকরী দেননি।
স্বাভাবিক কোঠায় নাহোক অম্তত প্রতিবন্ধী কোটাতেই চাকরীটা দিতে পারতেন,  কিন্তু তিনি তা করেননি।
যেখানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিজেই প্রতিবন্ধীদের বিষয়ে একের পর এক গঠনমূলক কাজ করে চলেছেন, যা অবশ্যই প্রৃশংসার উর্ধে। তাছাড়া প্রধানমন্ত্রীর সুযোগ্যা কন্যা সায়মা ওয়াজেদ পুতুল জাতীসংঘ তথা ইউনিসেফ”র শীর্ষদূত হিসাবে প্রতিবন্ধী / অটিস্টিক শিশুদের নিয়ে বিশ্ব জয় করে চলেছেন। সেখানে দু দুবার রিটেন ও ভাইবাতে প্রথমসারিতে অবস্থান করার পরও সামান্য একটু  বাম পা টেনে হাঁটে, এ ভিত্তিহীন ও হাস্যকর অজুহাত দেখিয়ে হিরামতিকে বাতিল করে দেয়।

শুনেছি বর্তমানে  ভোলানাথ দে উপ-সচিব পদে কর্মরত আছেন।

পুনশ্চ: বর্তমান জনপ্রশাসন সচিব জনাব মোজাম্মেল হক স্যার আপনি যদি বিষয়টি নিজ অামলে নিয়ে একটি স্বপ্ন পূরনে সাহায্য করতেন তাহলে অামার মনে হয় অসহায় পরিবারের এই উজ্জ্বল নক্ষত্রটি ঝড়ে যাবে না নি:শ্বেষ হবে না তার স্বপ্ন। স্যার অাপনি যদি বিষয়টি তদন্ত নিয়ে জানতে চেষ্টা করেন যে বাবু ভোলানাথ দে কেন চাকরীটা দেননি?  বিষয়টি স্যার ছোট ভাই হিসাবে আপনার কাছে আমার সর্বশেষ ফরিয়াদ। কারণ এক দেড় বছরের মধ্যে চাকরী না হলে হিরামতী হীরার সার্টিফিকেটের মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে।

[ প্রিয় পাঠক, আপনিও বিডিসারাদিন24 ডট কম অনলাইনের অংশ হয়ে উঠুন। লাইফস্টাইল, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, রান্নার রেসিপি, ফ্যাশন-রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন- bdsaradin24@gmail.com-এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে। নারীকন্ঠ এবং মত-দ্বিমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে  bdsaradin24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরণের দায় গ্রহণ করে না। ]

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 3026 বার)


Print
bdsaradin24.com