নারীই নারীর বড় শত্রু?

Print

লেখা পড়ে পাঠক প্রশংসা করুক আর না করুক, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা বোধ করি, আমার মত নাম না জানা লেখকের লেখাকে তারা ছাপার অক্ষরে সহ্য করেন বলে। তবে আশ্চর্যজনক হলেও সত্যি প্রশংসাই বেশি পাই, মূলত নারী পাঠকদের কাছ থেকে, যদিও তাদের মধ্যে দু’চারজন সামাজিক বা ধর্মীয় নিয়মের বিরোধীতা করছি বলে তিরস্কারও করেন। সবচেয়ে ভাল লাগে যখন কোন নারী জানান লেখা পড়ে সাহস পেয়েছেন, বা কোন পুরুষ সাহসী লেখার জন্য ধন্যবাদ দেন। খুব আমোদিত বোধ করি যখন একই লেখায় একদিকে অনেক প্রশংসা, আবার অন্যদিকে অনেক তিরস্কার পাই।

গঠনমূলক সমালোচনার মধ্যে একটা কথা বারবার উঠে আসে, লেখায় ‘পুরুষতান্ত্রিক সমাজ’ কথাটার ব্যবহার। আমি জানি না এই শব্দদু’টির ব্যবহারে এতো আপত্তির কারণ কী। আসলেই কি সমাজ পুরুষতান্ত্রিক নয়, এমন কি পশ্চিমা দেশগুলোতেও? আজ ক্লাসে নামের আগের টাইটেলের বিষয়টা পড়াতে গিয়ে আবার নতুন করে খেয়াল হলো, একজন নারীর নামের টাইটেল (মিস অথবা মিসেস) দেখলেই বোঝা যায় সে বিবাহিত না অবিবাহিত, কিন্তু পুরুষের নামের সাথের ‘মিস্টার’ এরকম কোন তথ্যই দেয় না। ক্ষুদ্র একটা বিষয়, কিন্তু পুরুষের জন্য কী বিশাল একটা সুবিধা, এর ব্যবস্থা কি পুরুষই করেনি?

‘পুরুষতান্ত্রিক সমাজ’ কথাটা পুরুষের প্রতি রাগ দেখানোর জন্য বলা নয়, বরং সমস্যার ধরণ তুলে ধরার জন্যই বারবার আসে। অনেকে আবার বলেন, ‘পুরুষকে দোষ দিয়ে কী লাভ? আপনারা মেয়েরাই আপনাদের সবচেয়ে বড় শত্রু।’ ছোটবেলা থেকেই এই কথাটা শুনে এসেছি, এবং নানান অভিজ্ঞতা থেকে এর সত্যতাও টের পেয়েছি। বিয়ের পরপর ঘরসংসারের কাজ কতটা পারি, না পারি তার হিসাব নারীরাই বেশি নিয়েছেন, ডিভোর্সের পর পিঠের পিছে চরিত্র নিয়ে নারীরাই বেশি কথা বলেছেন।

কিন্তু কথা হচ্ছে এই যে নারীর সাথে নারীর শত্রুতা, এর উৎপত্তি কোথায়? বংশানুবংশক্রমে পাওয়া সোশাল ইন্টেলিজেন্স থেকে নারী শিখেছে তার টিকে থাকার মূল উপায় হচ্ছে পুরুষকে খুশি রাখা, তার জন্য যে অপেক্ষাকৃত দুর্বলতর অবস্থান সমাজ তৈরি করেছে, তা নিয়ে খুশি থাকা এবং সেই অবস্থান যাতে পরিবর্তিত না হয় সে দিকে খেয়াল রাখা। তাছাড়া আছে নিজেকে পুরুষের উপযুক্ত প্রমাণ করার প্রতিযোগিতা। সব মিলিয়ে এসবের পরিপন্থী আচরণ দেখলে নারীরাই আগে বাড়িয়ে প্রতিবাদ করেন। এটা প্রতিহিংসা নয়, বরং একধরণের ডিফেন্স মেকানিজম।

পুরুষতান্ত্রিক সমাজে বেড়ে উঠা নারী পুরুষ সকলেই এই ‘তন্ত্রের’ শিকার এবং এই ‘তন্ত্রকে’ বাঁচিয়ে রাখতে তৎপর। বিষয়টা হচ্ছে, যে নৌকায় বসে আছি তাকে কোনমতে ভাসিয়ে রাখার চেষ্টা, তার চেয়ে ভালো নৌকায় পা রাখতে গিয়ে পা ফস্কে যাবার ভয়ে। আমি যখন রাগ ভরে ‘পুরুষতন্ত্র’ কথাটা বলি, আমার রাগটা পুরুষের প্রতি নয় বরং ‘তন্ত্রের’ প্রতিই থাকে। আর এই ‘তন্ত্রের’ মন্ত্র উপেক্ষা করে আমাদের নতুন নৌকা তৈরির প্রচেষ্টাকে যারা ভাল চোখে দেখেন, তাদের প্রতি আমার গভীর কৃতজ্ঞতা, হোক তারা নারী অথবা পুরুষ। আপনাদের জয় হোক।

লেখক: জেসমিন চৌদুরী,শিক্ষক, অনুবাদক ও নাট্যকর্মী

[ প্রিয় পাঠক, আপনিও বিডিসারাদিন24 ডট কম অনলাইনের অংশ হয়ে উঠুন। লাইফস্টাইল, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, রান্নার রেসিপি, ফ্যাশন-রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন- bdsaradin24@gmail.com-এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে। নারীকন্ঠ এবং মত-দ্বিমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে  bdsaradin24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরণের দায় গ্রহণ করে না। ]

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 161 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ
bdsaradin24.com