নারীই নারীর শত্রু ?

Print
‘আপনারা নারীরাই তো নারীর শত্রু, পুরুষকে দোষ দিয়ে কী লাভ?’

নারী নির্যাতনবিষয়ক বিভিন্ন লেখায় যারা এই মন্তব্যটা করে থাকেন তারা হয়তো সচেতনভাবে নারী-অধিকারের পরিপন্থী নন কিন্তু তাদের এসব মন্তব্য আমাকে ভাবিত করে। সমাজে নারীর অবস্থান ও ভূমিকা, তার আচরণের সীমাবদ্ধতার কারণ ও ইতিহাস সম্পর্কে এদের অজ্ঞতা ও অন্তর্দৃষ্টির অভাব নারী-নির্যাতননামক সমস্যাটির প্রকৃতি নির্ধারণে বাধার সৃষ্টি হয়ে দাঁড়ায়, সমাধানের মক্কা আরও বহুদূরে চলে যায়। তো, এদের এই দাবি কি সম্পূর্ণরূপে ভিত্তিহীন? নাকি এর মধ্যে কিঞ্চিত সত্যতাও আছে?

 

নারী বন্ধুত্বের হাতও বাড়িয়ে দেয়
প্রথমত বলব, একজন নারী হিসেবে আমার আজকের সাফল্যের পেছনে যাদের অবদান রয়েছে তাদের অনেকেই নারী। নিজের সমস্যাগুলোর কথা নির্ভয়ে নিঃসংকোচে বলতে পারার সাহস আমি যার কাছ থেকে অর্জন করেছিলাম তিনি ছিলেন পুরুষতান্ত্রিক মনোভাবমুক্ত একজন পশ্চিমা নারী।
আমি যখন সিলেটে একা দুই সন্তানকে মানুষ করতে গিয়ে টাকার অভাবে হিমশিম খাচ্ছিলাম, তখন কয়েকজন নারীই তাদের সন্তানদের আমার কাছে প্রাইভেট পড়ানোর মাধ্যমে আমার অর্থনৈতিক স্বাচ্ছল্যে অবদান রেখেছিলেন। স্বামীকে ছেড়ে আসা একজন নারীর যোগ্যতাকে মূল্যায়ন করেছিলেন তারা।
পক্ষান্তরে, ওইসময়ে কিছু পুরুষ সহযোগিতার নামে আমার অসহায়ত্বের সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, আমার অর্বাচীনতার ফায়দা লুটে যথেষ্ট ক্ষতিও করেছিলেন।
বন্ধুত্বের মুখোশ পরে পুরুষ নারীর যতটুকু ক্ষতি করতে পারে নারী শত্রুতা করেও তার একাংশ করতে পারে না। আমার প্রথম বইটি প্রকাশিত হয়েছিল একজন নারীর উৎসাহে এবং সহায়তায়, সেই বইয়ের জন্য একটি অসাধারণ ভূমিকা লিখেছিলেন সেলিনা হোসেন, একজন সফল নারী।
বইটি প্রকাশের পর নারীরাই বেশি উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছিলেন, একের পর এক ইতিবাচক রিভিউ লিখে সাড়া জাগিয়েছিলেন, বইটিকে সফল হতে সহায়তা করেছিলেন। ননদ-ভাবীর ঝগড়া নিয়ে প্রচলিত সব কাহিনীকে ভুল প্রমাণ করে আমার ননদও বইটিকে সফল করে তুলতে ভীষণ খেটেছিল।

বায়াস বা পক্ষপাতদুষ্টতা  
দ্বিতীয়ত, যারা নারীকে নিঃসন্দেহে নারীর শত্রু বলে প্রতিপন্ন করতে চান তাদের চিন্তাভাবনা সাধারণীকরণ বা ‘অবজারভার বায়াস’ দ্বারা প্রভাবিত। গভীর অন্তর্দৃষ্টি, যুক্তি বা সহমর্মিতার আশ্রয় গ্রহণ না করে তারা নিজেদের দেখা বা শোনা কতিপয় ঘটনার ওপর ভিত্তি করে নারীকে অবধারিতভাবে নারীর শত্রু বলে ঘোষণা দিয়ে দেন, এর বিপরীত উদাহরণগুলোকে ধর্তব্যের মধ্যেই রাখেন না।
যেমন ধরুন, ‘ভোর বেলায় দেখা স্বপ্ন সত্য হয়ে থাকে’ বলার সময় আপনি শুধু ভোরে দেখা যেসব স্বপ্ন সত্যি হয়েছে সেগুলোকেই উদাহরণ হিসেবে ব্যবহার করেন, কিন্তু ভোরে দেখা যেসব স্বপ্ন সত্যি হয়নি সেগুলোকে সতর্কতার সঙ্গে হিসেবের বাইরে রাখেন। কারণ, আপনার মূল উদ্দেশ্য সত্যে উপনীত হওয়া নয়, বরং জোর করে তর্কে জিতে যাওয়া।
এভাবে যতবার জোর করে জেতেন ততবারই আপনি আসলে আরও একটু হেরে যান, সত্য থেকে আরও একটু দূরে চলে যান। তার ওপর যদি আপনি হন একজন পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার পুরুষ এবং আলোচনা হয় নারীর প্রতি নির্যাতন, তখন এই পক্ষপাতদুষ্টতা মারাত্মক রূপ ধারণ করে।

কলকাঠি কে নাড়ে?
আমি স্বীকার করি, আমি নিজেও বিভিন্ন সময়ে নারীদের শত্রুতার শিকার হয়েছি। বিয়ের পরপর ঘর-সংসারের কাজ কতটা পারি না পারি তার হিসাব নারীরাই বেশি নিয়েছেন,  ডিভোর্সের পর পিঠের পিছে চরিত্র নিয়ে নারীরাই বেশি কথা বলেছেন।
আবার যখন বিয়ে করেছি, নারীরাই ইনবক্সে বলেছেন ‘দ্বিতীয় বিয়ে নিয়ে এতটা হইচই না করলে কি চলত না?’ পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব নিয়ে বড় হওয়া এসব নারীরা নিজের ভালো-মন্দের বিষয়টাই বুঝতে শেখেননি, নিজের অধিকারের বা মর্যাদার জন্য রুখে দাঁড়াতে শেখেননি। তারা কীভাবে অন্য নারীর পাশে দাঁড়াবেন?  সমাজ-নির্ধারিত ছক বাঁধা জীবনের শৃঙ্খলে আবদ্ধ এই নারীরা অন্য নারীকে ছকের বাইরে পা ফেলতে দেখলে আঁতকে ওঠেন এবং থামাতে চেষ্টা করেন।
আসলে মুক্তচিন্তায় অক্ষম এসব নারীদের পুতুল নাচের পাপেটের মতোই পেছন থেকে নাচায় পুরুষতন্ত্র নামের অদৃশ্য শো-মাস্টার। পরিবারের সবার স্বার্থে দাবি করা যৌতুক আদায়ের জন্য পরিবারের পুরুষরাই নতুন বৌটির পেছনে অন্য নারীকে লেলিয়ে দেন। নির্যাতক নারীটি হচ্ছে বিলিয়ার্ড গেইমের সেই সাদা বল যাকে পেছন থেকে ঠেলে দেয় লম্বা একটা কাঠি যার নাম পুরুষতন্ত্র।
এ ক্ষেত্রে গ্রুপ ডাইনামিকস বলেও একটা ব্যাপার কাজ করে। সবার সামনে যেসব নারীরা অন্য নারীর পাশে দাঁড়ান না, তারাই আবার গোপনে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন। আমি যখন আমার প্রথম স্বামীকে তালাক দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেই তখন পরিচিত অনেক পুরুষ এর বিরোধিতা করলেও আমার সাবেক স্বামীর আত্মীয় কয়েকজন নারী গোপনে আমাকে তাদের শক্ত সমর্থন দিয়েছিলেন।
এরাই আবার প্রকাশ্যে এই কাজটি করতে পারতেন না কারণ তারা জানেন পুরুষতান্ত্রিক এই সমাজে এ ধরনের সমর্থনের জন্য তাদের অনেক ভোগান্তি পোহাতে হবে।

সারভাইভাল টেকনিক
সবশেষে, নারীর প্রতি নারীর কিছুটা শত্রুতা আছে মেনে নিলেও প্রশ্ন থেকে যায়-এর উৎপত্তি কোথায়? বংশানুবংশক্রমে পাওয়া সোশ্যাল ইন্টেলিজেন্স থেকে নারী শিখেছে তার টিকে থাকার মূল উপায় হচ্ছে পুরুষকে খুশি রাখা, তার জন্য যে অপেক্ষাকৃত দুর্বলতর অবস্থান সমাজ তৈরি করেছে, তা নিয়ে খুশি থাকা এবং সেই অবস্থান যাতে পরিবর্তিত না হয় সেদিকে খেয়াল রাখা।
পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় বেড়ে ওঠা নারী যখন তার আশপাশের নারীদের পুরুষের দ্বারা নির্যাতিত হতে দেখে, অবধারিতভাবেই সে নিজ স্বার্থে ‘প্রভুর’ পক্ষাবলম্বন করে।
এটা প্রতিহিংসা নয়, বরং এক ধরনের ডিফেন্স মেকানিজম। এটা শুধু নারী জীবনে নয়, সর্বত্রই ঘটে থাকে। আপনার অফিসের বসকে আপনার সহকর্মীর সঙ্গে অন্যায় করতে দেখলে কি আপনি রুখে দাঁড়ান? অবশ্যই না।
অতিমাত্রায় চালাক হলে আপনি বসের অন্যায়কে অন্যায় জেনেও সমর্থন করেন, আর কিছুটা মানবিকতা বোধ থাকলে বড়জোর চুপ করে থাকেন। একই কারণে ব্রিটিশরা একটা আজ্ঞাবহ স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সহায়তা পেয়েছিল, পাকিস্তানিরা পেয়েছিল কতিপয় বাঙালির সমর্থন। রাজনীতি বা অন্য ক্ষেত্রে যেমন পুরুষে-পুরুষে প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলে ঠিক তেমনি ঘরে নারীতে-নারীতে ঠোকাঠুকি ঘটতে পারে।
একে নারী-পুরুষ লেবেল লাগানো আমার দৃষ্টিতে খুবই নিম্নমানের একটা সামাজিক কৌশল যার দ্বারা নারী-নির্যাতনের প্রক্রিয়াকে সহযোগিতা করা হয়।
আমি বলব যাদের মগজের আকার তোতা পাখির মতো ক্ষুদ্র, তারাই বারবার শুনতে শুনতে নিজের ক্ষুদ্র মগজে গেঁথে যাওয়া লাইনটির পুনরাবৃত্তি করেন-‘নারীই নারীর শত্রু’।
আবার যাদের মগজের আকার অপেক্ষাকৃতভাবে বড়, যারা নিজের মতো করে ভাবতে সক্ষম তারা আরেকটু গভীরে তাকান, ইতিহাস ঘাটেন, পারিপার্শ্বিকতাকে সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করেন এবং নারীর প্রতি চরম অবমাননাকর এসব সাধারণীকরণ থেকে বিরত থাকেন। আপনি কোন দলে থাকবেন সেই সিদ্ধান্তের ভার আপনার ওপরেই ছেড়ে দেওয়া হলো।

জেসমিন চৌধুরী : অভিবাসী লেখক, অনুবাদক।
jes_chy@yahoo.com

[ প্রিয় পাঠক, আপনিও বিডিসারাদিন24 ডট কম অনলাইনের অংশ হয়ে উঠুন। লাইফস্টাইল, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, রান্নার রেসিপি, ফ্যাশন-রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন- bdsaradin24@gmail.com-এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে। নারীকন্ঠ এবং মত-দ্বিমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে  bdsaradin24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরণের দায় গ্রহণ করে না। ]

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 234 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ
bdsaradin24.com