নারীর দিবস, নারী দিবস??

Print

সুমনা চৌধুরী

বেশীরভাগ পুরুষ, নাহ্ বেশীরভাগ নারীও ‘নারী দিবস’ বলতে বুঝেন এবং জানেন নারীর ফুল চকলেট উপহার পাওয়ার দিন। সোস্যাল মিডিয়ায় ‘শুধু নারীর জন্যে একটি দিন কেন?’ অথবা ‘পুরুষদের জন্যে আলাদা দিন নেই কেন?’ – এইসব প্রশ্ন তোলার দিন। শপিং মলগুলোতে স্পেশাল উইম্যানস ডে ডিসকাউন্ট দেওয়ার দিন। ফেইসবুক এবং হোয়াট্সঅ্যাপ ইউনিভার্সিটিতে “নারী সম্মানের বস্তু, নারী মহান, মাতৃত্ব তার অহংকার, মা ও নারী” এইসব বানী প্রচারের দিন বিভিন্ন ছবির সাহায্যে। কি নিপুনভাবে আপোষ না করার একটি লড়াই এর ইতিহাসকে বিকৃত করে পুরুষতন্ত্র নারীর মগজ ধোলাই করে, সেটা এই দিনটা না এলে এত প্রত্যক্ষভাবে উপলব্ধি করা যায় না!

পুরুষদের কথা না হয় বাদ ই দিলাম, কিন্তু সেইসব নারী যারা “নারী দিবস” বলতে বুঝেন আবালশ্রেণীর মেসেজ এবং পোষ্ট শেয়ার এবং ফুল প্রজাপতি চকলেট সহ স্পেশাল ডিসকাউন্টে শপিং করার স্বাধীনতা – তাদের এখনো জানার এবং বুঝার বাকী “আন্তর্জাতিক নারী দিবসে”র আদি নাম, ইতিহাস, প্রেক্ষাপট এবং আজকের যুগের নারীর অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে তার অবদান। তাদের বোঝার বাকি এই দিনটি লড়াইকে জিইয়ে রাখার দিন। অতীতের সংগ্রামের হাত ধরে আগামীর আরো কঠিন লড়াইয়ের প্রস্তুতি নেওয়ার দিন। পথে নামার দিন।

তাহলে বরং শুরু থেকে শুরু করা যাক –

ইতিহাস :


এই দিনটি উদযাপনের পেছনে রয়েছে নারী শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের, সংগ্রামের ইতিহাস। দিনটির আদি নাম “আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী নারী দিবস”। এবারে নিশ্চয় প্রশ্ন জাগছে এই নামকরণের নেপথ্যের ইতিহাস কি? কেনই বা এই নাম? দীর্ঘদিনের সংগ্রামের সেই ইতিহাসকে সংক্ষিপ্ত ভাবে বলতে গেলে খানিকটা এরকম, ১৮৫৭ সালের ৮ ই মার্চ নিউইয়র্কের সূতা কারখানার নারী শ্রমিকেরা রাস্তায় নেমেছিলেন মূলত তিনটে দাবী নিয়ে –
১) মজুরী বৈষম্য।
২) কাজের সময় নিদির্ষ্ট করা।
৩) কর্মক্ষেত্রের অমানবিক পরিবেশ বন্ধ করা।

কিন্তু রাষ্ট্র এবং তার তাবেদার সরকার সেটা মেনে নেবে কেন? দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকদের এহেন আস্পর্ধা দেখে অবাক থেকেও বেশী রাগে জ্বলছিল তারা। সুতরাং নারী শ্রমিকদের সেই মিছিলে চললো সরকারী লেঠেল বাহিনীর তান্ডব। মারাত্বকভাবে আহত হলেন আন্দোলনকারী নারী শ্রমিকেরা। পৃথিবীর ইতিহাসে নারীর নিজের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে সবচেয়ে সংগঠিত এবং সংঘবদ্ধ লড়াই বোধহয় এই সূতা কারখানার নারী শ্রমিকদের হাত ধরেই শুরু হয়েছিল।

তারও অনেক পরে ১৯০৮ সালে জার্মান কমিউনিস্ট পার্টির স্থপতিদের একজন, সমাজতান্ত্রিক নেত্রী ক্লারা জেটকিনের নেতৃত্বে সর্বপ্রথম আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন হয়। এরপর ১৯১০ সালে কোপেনহাগেনে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলনে বিশ্বের ১৭ টি দেশ থেকে ১০০ জন নারী প্রতিনিধি যোগ দেন এবং এই সম্মেলনেই ক্লারা জেটকিন প্রস্তাব করেন “৮ ই মার্চ” দিনটি ‘আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী নারী দিবস’ হিসেবে পালনের। সম্মেলনে সিদ্ধান্ত হয়, ১৯১১ সাল থেকে এই দিনটিকে নারীদের সমঅধিকার দিবস হিসেবে পালন করার। ১৯১৪ সাল থেকে বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশ ৮ ই মার্চ উদযাপন করা শুরু করে। অবশেষে ১৯৭৫ সালে এই দিনটিকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি প্রদান করে রাষ্ট্রসংঘ এবং বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রকে আহ্বান করে দিবসটি উদযাপন করার। বর্তমানে সারা বিশ্বেই এই দিবসটি পালিত হচ্ছে, কিন্তু ইতিহাস বিকৃত করে যে নারী দিবসের লাড্ডু আমাদের খাওয়ানো হচ্ছে সেটা নারীর অধিকার আদায়ের সমস্ত লড়াইকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়ার সুগভীর পুরুষতান্ত্রিক ষড়যন্ত্র।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে শ্রমজীবী নারীর অবস্থান :


আমাদের দেশের সামাজিক এবং অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে নারীরা ভয়াবহভাবে শোষন এবং বৈষম্যের শিকার। ১৯৯৪ সালে ভারত রাষ্ট্রসংঘের সিডোও ( CEDAW) অথবা “The Convention on the Elimination of all forms of Discrimination Against Women” – গ্রহণ করে নারীর ক্ষমতায়নের উদ্দেশ্যে। নারীর পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক অসমতা দূর করার লক্ষ্যে। কিন্তু একটি এক্ট বা কনভেনশন গ্রহণ করলেই তো শুধু হয় না, তার বাস্তবায়ন ও জরুরী। এবং ভারতবর্ষের নিরিখে সিডোও এক্টগুলি আজোও বাস্তবায়িত হওয়ার থেকে কয়েকশো হাজার মাইল দূরে অবস্থান করছে।

ভারতের সংবিধানে সামাজিক, রাজনৈতিক, পারিবারিক, অর্থনৈতিক সকল ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমঅধিকার স্বীকৃত আছে। কর্মক্ষেত্রেও সমঅধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ভারত ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশন কনভেনশনে স্বাক্ষর করে। কিন্তু বাস্তবতা?

বাস্তবতা হলো, এদেশে ৮০ শতাংশ নারী দারিদ্রসীমার নীচে বসবাস করে। এবং সংগঠিত এবং অসংগঠিত কাজ করার প্রবণতাও এই দারিদ্রসীমারেখার নীচে বসবাসকারীদের মধ্যে বেশী দেখা যায়। ভারতে বিভিন্ন কলকারখানা, নির্মান কাজ, কৃষিক্ষেত্র, গৃহ পরিচারিকা, বিড়ি বাধা, ভিক্ষাবৃত্তি ইত্যাদি পেশায় প্রায় ৮০ শতাংশ নারী নিয়োজিত আছেন। যদি কৃষিক্ষেত্রের কথা ধরা যায়, সেখানে নিয়োজিত নারী শ্রমিকদের মধ্যে প্রায় ৯৭.৮ শতাংশ নারীই বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করেন। শিল্পক্ষেত্র থেকে নির্মানকাজ – সব জায়গাতেই নারী পুরুষের চেয়ে মজুরী কম পায়। এই ক্ষেত্রে করিমগঞ্জের একটা উদাহরণ দেই। গ্রাম করিমগঞ্জে সুপারির খোসা ছাড়ানোর কাজে বহু সংখ্যক নারী নিয়োজিত আছেন। এই কাজে সময় লাগে বেশী এবং একটানা বসে কাজ করতে হয়। ১০০০ সুপারির খোসা ছাড়িয়ে নারী শ্রমিকেরা সারাদিনে রোজগার করেন ৩০ টাকা, সেই জায়াগায় একজন পুরুষ দিনমজুরের দৈনিক রোজগার ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা।

এতো গেল নিম্নবিত্ত নারীর কথা। সরকারী চাকুরী থেকে শুরু করে বিভিন্ন সেক্টরে নারীদের নিয়োগ পুরুষদের থেকে কম। প্রায় তিনভাগ পুরুষের বিপরীতে নিয়োজিত এক ভাগ নারী। সিনেমা জগতের ক্ষেত্রেও দেখা যায় পুরুষের বিপরীতে নারীর পারিশ্রমিক অর্ধেক।

সারা ভারত জুড়ে বিভিন্ন কর্মচারী এবং শ্রমিক ইউনিয়ন আছে। কিন্তু সেই ইউনিয়নগুলিও পরিচালিত এবং নিয়ন্ত্রিত হয় পুরুষ দ্বারা। নারী সেখানে সদস্য মাত্র। হ্যাঁতে হ্যাঁ এবং না তে না মিলানো যার একমাত্র কাজ। ডিসিশন নেওয়া বা লিডারশিপ দেওয়ার অধিকার তার বাস্তবে নাই। রেল মজদুর ইউনিয়ন থেকে ট্রেড ইউনিয়ন, কৃষক ইউনিয়ন – নারী সেখানে ব্রাত্য। সমাজতান্ত্রিক কমিউনিস্ট দলগুলোতেও এর ব্যতিক্রম এদেশে নেই। নারী শ্রমিক, নারী কৃষক, নারী কর্মচারীর পেশাগত পরিচয় বাদেও আরেকটা পরিচয় তাদের কপালে অদৃশ্য ভাবে সাটা থাকে, তারা নারী। আর নারীরা ডিশিসন নেবে, লিড করবে একটা আন্দোলনকে, সেটা ভারতের অতি বড় কমিউনিস্ট ও বিশ্বাস করেন না, করতে চান না। আর ঠিক সেজন্যেই পুরুষ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত কর্মক্ষেত্রে, পেশাক্ষেত্রে নারী তার দাবী দাওয়াগুলো রাষ্ট্র, সরকার, মালিকপক্ষের কাছে যথাযথভাবে তুলে ধরতে পারে না। আর ক্ষেত্রবিশেষে তা তুলে ধরলেও পুরুষপক্ষ তা শোনে না, শুনতে চায় না।

বেশীভাগ স্বল্প শিক্ষিত নারী পারিবারিক এবং সামাজিক পুরুষতান্ত্রিক চাপ, ধর্মান্ধতা ইত্যাদির কারনে ঘরে বসে থাকে। অথচ এইসব স্বল্প শিক্ষিত, উচ্চ শিক্ষিত, অশিক্ষিত সব নারী যদি নিজেদের যোগ্যতা অনুযায়ী সবধরনের কাজের ক্ষেত্রে নিয়োজিত হওয়ার সুযোগ পেত, তবেই হয়তো কর্মক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা যেত। সিডোও নিয়ম অনুযায়ী সরকারী ক্ষেত্রে ৩৩ শতাংশ নারী নিয়োজিত হওয়ার কথা। অথচ বাস্তবে? অথচ সরকারী বেসরকারী সবক্ষেত্রে যদি নারীর কাজের অংশগ্রহণ, সম বেতন, সম মর্যাদা দেওয়া হতো তাহলে নারী নির্যাতন হ্রাসের পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিও আরো সমৃদ্ধ হতো।

সুতরাং যে পুরুষতন্ত্রের তালে তাল মিলিয়ে নারীরা ‘নারীদিবস’কে চকলেট আর ফুলের রঙিন মোড়কে রাঙিয়ে তুলছেন, শপিং মলের একস্ট্রা ডিসকাউন্টে পাখা মেলে উড়ছেন, সেই পুরুষতন্ত্র দ্বারা আজোও তারা সর্বক্ষেত্রে শোষনের শিকার। তাদের ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত তারা। এই সহজ সরল সত্যটা সময় থাকতে প্রত্যেকজন নারীর বোঝা দরকার এবং আগামী লড়াইয়ের জন্যে সংগঠিত হওয়া দরকার। সংঘবদ্ধ হওয়া দরকার।

প্রতিবছরের মতো এবার ও আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী নারীদিবস তার প্রতিপাদ্য বিষয় বা থীম নিয়ে হাজির হয়েছিল পৃথিবীর দোরগোড়ায়। কিন্তু রঙিন উষ্ণতায় ভেসে যাওয়া নারী-পুরুষগণ সেটা দেখেননি বা দেখলেও বুঝতে চাননি। তাই আরেকবার আমিই বলে যাই এবছরের নারীদিবসের থীম –

“সবাই মিলে ভাবো, নতুন কিছু করো,
নারী-পুরুষ সমতার নতুন বিশ্ব গড়ো।”

“Think Equal, Build Smart
Innovate for Change”

সময় থাকতে এইবোধটুকু মাথায় ঢুকানো খুব জরুরী। কারন আপাতত আরো কয়েক যুগ অব্দি নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে এই দিনটি আপনাকে আমাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবে। আরোও কয়েকযুগ অব্দি এই দিনটি আমাদের সংঘবদ্ধ, সংগঠিত হতে শেখাবে।

[ প্রিয় পাঠক, আপনিও বিডিসারাদিন24 ডট কম অনলাইনের অংশ হয়ে উঠুন। লাইফস্টাইল, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, রান্নার রেসিপি, ফ্যাশন-রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন- bdsaradin24@gmail.com-এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে। নারীকন্ঠ এবং মত-দ্বিমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে  bdsaradin24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরণের দায় গ্রহণ করে না। ]

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 36 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ
bdsaradin24.com