নারীর পঞ্চাশে শুরু

Print
করভী মিজান

আমি কে?
আমি একজন পঞ্চাশোর্ধ নারী। এই সময়ের পঞ্চাশোর্ধ নারী। যার বা যাদের সঙ্গে তার বা তাদের মা-খালাদের জীবনাচরণ বা দর্শনের কোনও মিল নেই। কোনও এককালে বলা হতো—বাঙালি নারী কুড়িতে বুড়ি। এরপর দেখলাম আমাদের মায়েদের। এককালে সুচিত্রা সেনের মতো ব্লাউজ কালো চশমা পরলেও পঞ্চাশে এসে নাতি-নাতনি, ধর্ম, সংসার, বয়স্ক স্বামীর সেবা, বোন-ননদ-ভাইদের নিয়ে অন্তহীন সমস্যায় খাবি খাচ্ছে। বাচ্চাদের জীবনে অযাচিত উপদেশ নিয়ে জর্জরিত জীবন। এই নারীদের পঞ্চাশ মানেই অসুখ। ওষুধ, ডাক্তার, স্থূলতার মাঝেই আমাদের মা-খালারা হারিয়ে গেলেন। এরপর ‘আমরা’ এলাম পঞ্চাশে। শুরু হলো ‘নিউ জেনারেশন অব ফিফটি’। আবারও আমরা বাঙালি পঞ্চাশোর্ধ নারীর সংজ্ঞা পরিবর্তন করলাম। সংসার-সমাজ-সব কিছুর পরেও আমাদের জীবনে ‘নিজস্বতা’ গড়ে উঠলো। যৌনতা, নিজের যত্ন নেওয়া, ফিট থাকা, ফিগার ঠিক রাখা। চেহারায় স্কিন টাইটেনিং, ব্রেস্ট আপলিফটিং, বোটোক্স, লাইপো বা স্টোমাক স্টিচিম, নিটোল ত্বক, যোগ ব্যায়াম, ট্রেড মিল, কিটি পার্টি, ফ্যাশনেবল ড্রেস, ব্র্যান্ডেড ব্যাগ, ম্যাক মেকআপ, ফলস আইল্যাশেস, হেয়ার এক্সটিংসনস ইত্যাদি পঞ্চাশোর্ধ জীবনের অনেকখানিই জায়গা দখল করে নিলো। মন্দ না খারাপ, জানি না। তবে এই নারীরা পঞ্চাশে কেউ বুড়ি নন। নিজের বিশ্বাস, সমঝোতা, ভালোবাসা, স্বাধীনতা, প্রতিবাদ, চাহিদা, চাওয়া, সেক্সলাইফ ইত্যাদি অনেক কিছুরই পঞ্চাশে এসে পরিবর্তন ঘটলো বা ঘটে চলেছে। যাকে বলা যায় ‘পঞ্চাশের নতুন জেনারেশন’। এমনকি শত বছর দূরের কথাও না। যখন ১০ বছর বয়সের আগেই বউ হয়ে যাওয়া, প্রথম মাসিকেই বাচ্চা প্রসব শুরু। তারপর অসুখে ধুঁকে ধুঁকে মরা। ইতোমধ্যে হয়তোবা ডজনখানেক বা কাছাকাছি সন্তান উৎপাদন শেষ।পঞ্চাশে নাতি-পুতিদের নিয়ে ছিল জীবন। এই অবস্থা থেকে মুক্ত ছিল না স্বয়ং জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারও। কাদম্বরীর ফেইট তো সবারই জানা। মৃণালিনী দেবীও ৩০ পার হতে পারেননি ৫ সন্তান জন্ম দেওয়ার পর। শত বছরের আগের ঘটনা কি আজকের সমাজের চিত্র? না। আমাদের মা-খালারা যেমন আমাদের নানী-দাদির অশিক্ষা-অন্ধবিশ্বাস, নির্ভরতা, নীরবতা, যন্ত্রণা ইত্যাদি ভেঙে দিয়ে নতুন জেনারেশন গড়ে তুলেছিল। তেমনি আজকের আমারও নিজেদের নতুন ভাবনা ও আচরণে নারীর নতুন জেনারেশন পরিচয়ে উঠে আসছি। পুরো বাংলাদেশ বাদই দিলাম ঢাকা বা চট্টগ্রামের মতো শহরের সংখ্যাগরিষ্ঠদেরই ধরা যাক। আজ আমরা সমাজকে অবাক করছি। পুরুষদের আলোড়িত করছি। এসবের কিছুই আরোপিত নয়। এসব তো হওয়ারই ছিল।

মিল্ফ-মোনোপেজ-মাতৃত্ব

সম্পূর্ণ সম্মান নিয়ে বলছি–বিবি খাদেজা (রা.) আমাদের মহানবী হজরত মুহম্মদ (সা.) থেকে বয়সে বড় ছিলেন প্রায় ২০ বছর। অথচ হাজার বছর পর এই বিশ শতকে অতি উৎসাহী ধর্ম ব্যবসায়ীরা (সংখ্যায় কম হলেও) আমাদের সমাজে প্রচলিত করলো  ‘মিল্ফ’ শব্দটির।

ধিক্কার জানাই এই অশিক্ষিত প্রজন্মের অসুস্থ মানসিকতার! সমাজের সমস্যা কী? পুরুষদের সমস্যা কী? ইউটেরাস অপারেশন হোক বা না হোক। মেনোপজ হোক বা না হোক। পঞ্চাশের নারীরও যৌনাকাঙ্ক্ষা বিদ্যমান। এটাই সত্য। এটাই মেডিক্যালি প্রুভেন। মানা না মানা সময়ের ব্যাপার।

আরও যে নেগেটিভ বিষয়গুলো অনিবার্যভাবে জীবনে ঢুকে পড়েছে তার মধ্যে চরম শত্রুগুলো যেমন, স্ট্রেস, ডিপ্রেশন বা বিষণ্নতা, অ্যাবানডান্স বা পরিত্যাজ্যতা বোধ; যৌনতাবোধের অপবাদ, আইডেন্টিটি ক্রাইসিস, অসুখী মন ইত্যাদি। এটাও যে হওয়ারই ছিল। কারণ বিশ্বজুড়েই মানবগোষ্ঠী এসবের শিকার। জঘন্য শিকার। আধুনিকতার অন্যটা অন্ধ দিক।

নতুন নতুন শব্দ সাইবার ক্রাইমে জায়গা করে নিচ্ছে যেমন ‘হট আন্টি’, ‘মিলফ (MILF)’, বা টয় বয় কিপার, ডিলডো ইত্যাদির  অযাচিত ব্যবহার।  সীমাহীন নোংরামি। আর বাস্তবতা হলো পঞ্চাশের নারীরা সফল। আমাদের অধিকাংশই শিক্ষিত। অনেকেই ঢাকা শহরের নামকরা স্কুল বা কলেজের ছাত্রী ছিলেন এবং মাস্টার্স পাস। গৃহবধূর সংখ্যা বেশি হলেও সফল ডাক্তার, আর্কিটেক্ট, পেইন্টার, অর্থনীতিবিদ, রাজনীতিবিদ, বিদেশি সংস্থায় উচ্চ অবস্থানে প্রতিষ্ঠারত, সরকারি আমলা, কালচারাল ফিল্ডে—কোথায় নেই পঞ্চাশোর্ধ নারীরা। সফল। সফল তারা জীবনে। সংসারে। কর্মে। তারপরও কতটুকু জানে সমাজ এই নিউ জেনারেশন নারীদের? এখনও কি Sexual Harassment এর শিকার হতে হয় না আমাদের? সেদিন আমার পুরনো সিনিয়র বন্ধু হঠাৎ জিজ্ঞেস করে বসলো—‘রিভি বলো তো মেয়েদের মনোপজ কখন হয়। চল্লিশে না?’ বলাই বাহুল্য ভদ্রলোকের স্ত্রী আছে। বিবাহিত বা ডিভোর্সড কন্যা আছে। তিনি নিজেও ষাটোর্ধ। তারপরও আমাকে এই প্রশ্ন করার উদ্দেশ্য কী? জানার দরকার থাকলে গুগল করলেই যথেষ্ট। ভাবখানা এমন যে, আমি পঞ্চাশ পেরিয়েছি। কাজেই আমার জীবনে আর কী? পুরুষদের মানসিকতাই এমন। ষাট বা পঁচিশ সব একই। আমাদের অনেকেরই এখনও অন-টাইম পিরিয়ড চলছে। অ্যাকটিভ সেক্স লাইফ। ফিট বডি। বান্ধবীরা যখন একসঙ্গে হই একেকজনের ফেসবুক মেসেঞ্জার দেখে অবাক হই ছেলের বয়সী ছেলেদের প্রেম নিবেদন দেখে! এদের পারিবারিক শিক্ষা কী? বুঝে করছে? নাকি জাস্ট ফান।বিশ্ব পাল্টাচ্ছে। পাল্টাচ্ছে নতুন জেনারেশনের তরুণদের মানসিকতা। বিয়ে হচ্ছে ছোট বয়সের ছেলেদের সঙ্গে। প্রেমিকরাও এখন বয়সে ছোট। এটাই বাস্তব ছবি। আর হবেই বা না কেন? যুগের পর যুগ ধরে আজ পর্যন্ত বুড়ো স্বামীগুলো যদি নিজ কন্যার বয়সের ছোট মেয়েদের নিয়ে ফুর্তি করতে পারে এবং সেটা দেখেও সমাজ যদি না দেখে চোখ ফিরিয়ে থাকতে পারে, তবে আমাদের দোষ কেন? দোষটাও বা কোথায়? পঞ্চাশ মানেই ‘মা’ শুধু? ‘মানুষ’ নই?

পুত্র সন্তানদের প্রায়ই দেখি ‘মা’-এর দ্বিতীয় বিয়েতে ভীষণ দ্বিমত। আর সিঙ্গেল ‘মা’-এর প্রেমিক থাকা মানে তো জঘন্য অপরাধ। অথচ নিজেরা ৩০-এর কোঠা না পেরোতেই ডিভোর্স বা কেউ বউ রেখে প্রেমিকা নিয়ে ব্যস্ত বেশি। হায়রে মানসিকতা! আমার লেখা বাস্তবতাকেই নিয়ে। বাঙালি সমাজ Hypocrisy বা ভণ্ডামির কোনও প্রতিযোগিতা থাকলে অবশ্যই বিশ্বে এক নম্বর অবস্থানটি বিনা প্রতিযোগিতায় জিতে নিতো। আমার লেখা নোংরামি নয়। আমি যা লিখছি তা বিকারগ্রস্ত নয়। এর পুরোটাই ঢাকা শহরের উচ্চবিত্ত   শ্রেণির সামাজিক চিত্র। পুরুষদের মানসিকতার প্রতিচ্ছবি।

শরীরে ৫০ মনে ২১

তরুণ বয়সে আমি যখন আমার মাকে দেখতাম আমার ভালো লাগতো না। মন খারাপ হতো। প্রশ্ন উঠতো মনে—আমার মা কেন শুধু রান্নাঘর, স্বামী, সংসারে নিজেকে পরাধীন রেখেছে? যে মা হানিমুন করেছিলেন জামার্নিতে সেই ষাট শতকে। এখন কেন আমার মা একাকী বাড়ির বাইরে যেতে সন্তান বা স্বামীর সাহায্যের দরকার পড়ে? কেনই বা আমার মায়ের মনের কথা বলার বান্ধবীদের হারিয়েছে? আমার ভীষণ ভয় হতো নিজেকে নিয়ে। প্রশ্ন করতাম, পঞ্চাশে গিয়ে আমার জীবনেও কী এমন হবে? সবাইকে খুশি রাখো। বাড়িতে কাজের লোকদের খবরদারি করো। আত্মীয়দের নিয়ে পলিটিক্স করো। আর টিভি সিরিয়ালে বুঁদ হয়ে থাকো নেশায়? নাহ! নিজে যখন পঞ্চাশ পেরোলাম জীবনটাকে নতুনভাবে আবিষ্কার করলাম। আমরা এই যুগের পঞ্চাশোর্ধ মায়েরা নিজেদের সন্তানদের মানুষ করেছি। ড্রাগস থেকে ফিরিয়ে এনেছি যুদ্ধ করে। ওদের বিয়ে দিয়েছি। বা দেবো। অনেকের তো নাতি-নাতনিও হয়ে গেছে। কিন্তু একটা জিনিস বিসর্জন দেইনি, এই নিউ জেনারেশনের পঞ্চাশের মায়েরা। সেটা হলো—নিজস্বতা। আত্মবিশ্বাস। নিজের চাওয়া-পাওয়া। ডিজিটাল যুগের কল্যাণে খুঁজে পেয়েছি হারিয়ে যাওয়া স্কুল-কলেজের বন্ধুদের। রান্নাঘরে নিজের অস্তিত্বকে বিলীন না করে যাচ্ছি অফিসে, কাজে, বিদেশে, পার্লারে, জিমে। বেয়াইন দলদেরও ঠিক রেখেছি। নিজের জীবনকেও চালাচ্ছি। স্বামীর সঙ্গে ক্লাবে যাচ্ছি। সন্তানদের খোঁজ রাখছি। মুটিয়ে যাচ্ছি নাকি চেক করে নিচ্ছি। ডারমাটোলজিস্টের কাছেও যাচ্ছি। এতে লজ্জার কী আছে। অনেকেরই এখন হিজাব। তারমানে এই নয় যে, নিজের সৌন্দর্য বিসর্জন দেবো।
আমার ডিভোর্স হয়েছে আজ ৬ বছর। বিয়ে করিনি। বিয়ে আর করার ইচ্ছেও নাই। বাচ্চারা বড় হয়েছে। একেক করে বিয়ে করছে। ভালোই লাগে। Single Mother। ভালোই তো আছি। নিজের জীবন। নিজের সিদ্ধান্ত। অবশ্য এ কারণে কানাঘুষা, কুকথা, কুপ্রস্তাব যে শুনতে হয় না, তা নয়। বাট হু কেয়ার্স! এখন তো ২/৩টা ডিভোর্স মনে হয় কোনও ব্যাপারই না। বন্ধুদের দেখি, বাচ্চাদের কোটি কোটি টাকা খরচ করে বিয়ে দিচ্ছে। আর বিয়ের মেয়াদ বড়জোড় ছয় মাস থেকে একবছর। আবার পঞ্চাশের পরেও বান্ধবীরা বিয়ে করছে। ভালোই আছে। বিয়ে না করেও ক্যারিয়ার নিয়ে চমৎকার আছে। চেনা বা ফেমাস অনেকেই। Salute Them জীবন সংগ্রামে টিকে থাকার জন্য মাথা নিচু করে না চলার জন্য। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নিজের স্থান তৈরি করে নেওয়ার জন্য। আগে ছিল পঞ্চাশ মানেই ফুরিয়ে যাওয়া। এখন মনে হয় জীবন সুন্দর বেঁচে থাকার আনন্দই ভিন্ন। সেটা একজন নারী পঞ্চাশই হোক। বা ষাট।
অপর্ণা সেন তার বিখ্যাত ছবি ‘পরমা’ করার সময় বলেছিলেন, ‘৮০র দশকে আমরা একজন নারীকে নানা ভূমিকায় দেখেছি। তাদের মধ্যে পরমার মতো নারীও ছিল। যারা স্বামীর ওপর আর্থিক ভাবে নির্ভরশীল। এবং পরিবারে তাদের পরিচয় নির্ধারিত ছিল তার নামে নয় বরং মা, স্ত্রী, বউ, বোন, বৌদি কিংবা মাসী-পিসি রূপে।’ মফস্বলের কয়জন আজও এই শেকল থেকে বেড়োতে পেরেছে?নিকোল কিডম্যান তার পঞ্চাশতম জন্মদিনে বলেছেন, ‘মনে হয় নিজেকে পঞ্চাশ। কিন্তু তারপরেও আমি যেন সেই ২১ বছরের তরুণীর মতোই।’

বয়স বাড়ছে তোমারও

মাধুরী দীক্ষিত থেকে শ্রীদেবী। বা হলিউডের সালমা হায়েক বা জুলিয়া রবার্টস। সবাই পঞ্চাশেই গর্বিতভাবে বক্সঅফিস হিট নায়িকা। পুরুষদের হার্টথ্রব। এমনকি কাজল বা ঐশ্বরিয়া রায় বচ্চন পঞ্চাশের কাছেই যাচ্ছে। ঐশ্বরিয়ার  কথায়—‘আমি জীবনের এমন এক স্থানে পৌঁছেছি যে, কারও কাছে জবাবদিহিতা করার দরকার মনে করি না।’
পঞ্চাশের নারীর এই পরিবর্তন হঠাৎ করে আমাজের সমাজে ঢুকে পড়েছে তা কিন্তু না। যদি ইতিহাসের দিকে ফিরে যাই, দেখি যে যুগের পর যুগ নারীরা যুদ্ধ করে এসেছে সমধিকার, বৈষম্য, ভোট আদায়ের অধিকার থেকে শুরু করে ডিভোর্স, হালের গাড়ি চালানোর অধিকারসহ অনেক কিছু। এই লড়াই যারা করেছে তাদের অনেকেরই বয়স ছিল ৫০ বা তার আশোপাশে। কাজেই পঞ্চাশের নারীদের দেখে চমকানোর কিছু নেই। মা-মেয়েকে, দুই বোন মনে হতে পারেই। শাশুড়ি Stuningly Beautiful হতেই পারে। লেখক ও Activist বেটি ফ্রিডম্যান, লেখক অরুন্ধতী রায়, ম্যাডোনা, হিলারি ক্লিনটন, মার্টিনা নাভ্রাতিলোভা, আর্জেটিনার এভা পেরন, লেখক ভার্জিনিয়া উলফ, আইনজীবী যাহা হাডিড, মনীষা কৈরালা—এমন অনেক অনেক প্রতিভাময়ী ও সৌন্দর্য পঞ্চাশ বা পঞ্চাশের ওপরে।

সেদিন শুটিং করার ফাঁকে মেকাপ রুমে বসে আছি। হঠাৎ উঠতি এক নায়িকা আরেকজনকে বলছে, ‘ওই বুড়ির রঙ-ঢঙ দেখলে মেজাজটা খারাপ হয়ে যায়’। আমি সঙ্গে সঙ্গে তাকাতে মেয়েটা বললো, ‘না না আপু তোমাকে না’। আমি শুধু বললাম, ‘Respect, সম্মান করতে শেখো। তোমারও বয়স বাড়ছে কিন্তু। কমছে না।’ আসলেই আমরা কি আদৌ Respect করি আমাদের? জানি কি, শব্দটার মানে কী? সূবর্ণা মুস্তফা বা শম্পা রেজা বা কুমকুম হাসান কিংবা বয়জ্যেষ্ঠ শমির্লী রহমান বা দিলারা জামান—আমরা তাদের সম্মান করি আমাদের পথ দেখানোর জন্য। মাথা নত না করে চলার জন্য। কিন্তু সমাজ কী বলে? সমাজ কি জানে এই পঞ্চাশোর্ধ নারীদের? তরুণ প্রজন্ম তো বুঝতেই পারে না আজকের পঞ্চাশের নারীদের। আমরা যে জানি। বুঝি। অনুভব করি। সেটারও কি ধারণা আছে সমাজের? সব সময় শুনতে হয়—‘ও মাই গড আপনাকে দেখে তো বোঝাই যায় না আপনি পঞ্চাশ!’ Excuse me, পঞ্চাশে কেমন দেখতে হওয়া উচিত ছিল আমার? বিশালদেহী? নো ফ্যাশন? মাথায় চুল নেই? নাকি জিন্স পরা বারণ? বা টপস? চুল ছোট বারণ? নাকি শুধু খোঁপা? সমাজের বুঝতে কষ্ট হয়, আরে এরাই তো এখানকার পঞ্চাশের নারী। না ভণিতা নয়। লেয়ার দেওয়া মেকাপও নয়। শুধু আমি বা আমরা। আমাদের চিনতে পারো কী? বোঝা না হয় বাদই দিলাম।

পশ্চিমায় পঞ্চাশ
কিংবদন্তী গায়িকা ম্যাডোনা তার ৫৭ বছর বয়সে বলেছেন, ‘মাঝে মাঝে বিশ্বাস হয় না আমি আমার বয়সের সংখ্যার মতো বুড়িয়ে গেছি। কিন্তু আমি উপভোগ করি, আমার বর্তমান শরীর ও স্ট্যামিনাকে, যা ১০ বছর আগে করিনি। আমার মনে কখনোই আসে না, হায় আমি কি কিছু মিস করছি!’
পঞ্চাশকে বাদই দিলাম। পঞ্চাশ নিয়ে এত কথা! বিখ্যাত কলামিস্ট সাংবাদিক শোভা দে তার ৭০ বছর বয়সে পদার্পন নিয়ে বই লিখেছেন—‘সেভেনটি…অ্যান্ড দ্য হেল উইথ ইট’! তেমনি দুর্দান্ত সুন্দরী এবং কাজ করছেন এখনো। ২ বার অস্কার প্রাপ্ত এবং ফিটনেস গুরু জেইন ফন্ডা ৮০ বছর বয়সে বলেছেন—‘দেরি নয়। এটা কখনো মোটেই দেরি নয় জীবন আবার শুরু করার। কখনোই দেরি নয় আবারও সুখী হওয়ার।’ আমেরিকায় একজন নারীর জীবন আয়ু প্রায় ৮০ বছর। জীবনে নারীরা মৃত্যুচিন্তা থেকে বেরিয়ে এসে পঞ্চাশে আলিঙ্গন করেছে পজিটিভ ব্যাপারগুলো। স্বাধীনতা উপভোগ, বাকেট লিস্ট তৈরি, সাঁতার, গাড়ি চালানো, যোগ ব্যায়াম, ডায়েট, পিলাটিস, টেনিস, সারফিং, সাইক্লিং, দেশভ্রমণ, ডাক্তারি চেকআপ—সবই। পশ্চিমার নারীরা আথির্কভাবে সচ্ছল। এখন আমরাও অনেকেই। নেদারল্যান্ডসের পঞ্চাশের নারীদের রীতিমতো অনার করা হয় তাদের জন্মদিনে। আর আমরা বয়স লুকোতে ব্যস্ত!

আহা পরিবার, কতটা দায় এড়াবে?

মেনোপজ বা পোস্ট-মেনোপজ  একজন নারীর যে শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন ঘটে, সমাজ বাদ দিলাম, পরিবারের কাছেই বিষয়টির কোনও স্বীকৃতি বা সমঝোতা নেই। নানি-দাদিদের দেখতাম সারাদিনে কয়েকবার গোসল করছে। এখন বুঝি তা ছিল হট ফ্লাশের ফল। কিন্তু এখনো কয়টা পরিবারে পঞ্চাশের ‘মা’দের প্রতি এই সমঝোতা আছে? সমাজও কি তৈরি পঞ্চাশের নারীদের শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনকে বোঝার? সংসারের পাশাপাশি আমাদের পঞ্চাশের নারীদেরও পছন্দের গান আছে ইউটিউবে। আছে পছন্দের হ্যান্ডসাম তারকারা। খেলা উপভোগ করে ষোলোয়ানা। হোক তা ক্রিকেট বা ফুটবল। ফটোগ্রাফিই বা বাদ যায় কেন? অনেকের হাতেই তো দেখি ডিএসএলআর। ঢাকার বিশ্রী ট্রাফিকেও স্টিয়ারিংয়ের পেছনেও অনেককেই দেখা যায়। সঙ্গে ফেসবুকিংও চলছে অনবরত। পশ্চিমা দেশগুলোতে বলা হয়— পঞ্চাশ হলো golden anniversary। অর্থাৎ এই পঞ্চাশেই তো নারীরা জীবনের অর্থ খুঁজে পায়। নিজেকে খুঁজে পায়। ক্যারিয়ারের প্রতিযোগিতা থেকে দূরে, সন্তানদের বড় করার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি। এইতো সময় পৃথিবী ঘুরে দেখবার, নিজের শখকে লালন করবার এবং আবিষ্কার করার সময় এক নতুন আত্মবিশ্বাসী ‘আমি’কে। কারণ আমিও যে পারি।’
কত বছর আগেও বাঙালি বিধবা পঞ্চাশ বা চল্লিশ বা কুড়িতে স্থান ছিল—বাপ বা ভাইয়ের সংসারে দাসী বা সন্তানের দয়ায় জীবনযাপন। সমাজের নীতিই ছিল—বাল্যে পিতা, যৌবনে স্বামী, প্রৌঢ়ে পুত্র। এই ছিল জীবন। পরিবারের দৃষ্টিভঙ্গিও বা কতটুকু বদলেছে? কতটুকু সাপোর্ট তারা দিচ্ছে? সমাজ ভীত। এই নতুন পঞ্চাশের নারীদের নতুন পরিচয়ে। পুরুষরা তটস্থ। সমাজ উদ্বিগ্ন। প্রধান অস্ত্র এড়িয়ে যাওয়া।

লেখক: সাংবাদিক ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব

[ প্রিয় পাঠক, আপনিও বিডিসারাদিন24 ডট কম অনলাইনের অংশ হয়ে উঠুন। লাইফস্টাইল, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, রান্নার রেসিপি, ফ্যাশন-রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন- bdsaradin24@gmail.com-এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে। নারীকন্ঠ এবং মত-দ্বিমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে  bdsaradin24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরণের দায় গ্রহণ করে না। ]

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 244 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ
bdsaradin24.com