নারীর রক্তও লাল!

Print

সুমনা চৌধুরী

টিভির পর্দায় ‘বাহুবলী’ আর ভিলেনের যুদ্ধ দৃশ্য। প্রচন্ড মারামারি, রক্তের ফোয়ারা ছুটছে। কালারিং টিভিতে সেই রক্তের টকটকে লাল রং ছিটকে পড়ছে আমাদের চোখেমুখেও। মাঝে এল বিজ্ঞাপন বিরতি। স্যানিটারি ন্যাপকিনের আরেকটা নতুন ব্রান্ড দেখাচ্ছে, যা ব্যবহার করলে অলিম্পিকে সোনা জেতা নিশ্চিত। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখানো হচ্ছে এই ন্যাপকিন কিভাবে লিক্যাইজ আটকাবে, তাতে রক্তের ফোঁটা ঢেলে ঢেলে! রক্তের রঙ? নীল! ব্লু ব্লাড! মেয়েদের শিরায় শিরায় দৌড়োচ্ছে ব্লু ব্লাড! প্রতিমাসে যোনী দিয়ে চুঁইয়ে পড়ছে ব্লু ব্লাড! সব নীল রক্ত! এলিয়েনের রক্তও বোধহয় টিভিতে নীলই দেখায়!

খোঁজ নিয়ে দেখলাম মানে পড়লাম, লাল রক্ত না দেখানোর সম্ভাব্য কারনগুলো কি হতে পারে! তাতে পেলাম, ১) “শিশুদের উপর লাল রক্ত বিরূপ প্রতিক্রিয়া ফেলতে পারে” এবং ২) “পিরিয়ড খুব অশুচি, লুকিয়ে রাখতে হয় এবং বিজ্ঞাপনে লাল রঙ দেখানো মানে যৌনতাকে প্রমোট করা!” প্রথম কারণের ক্ষেত্রে বলি, ডব্লিউডব্লিউই-তে রেসলারদের রক্তাক্ত খুনোখুনি মারামারি, টিভিতে সিনেমায় রক্তাক্ত ফাইট, সিরিয়ালে জবা’র ঠাকুরের মূর্তির সামনে মাথা ঠুকে ঠুকে ফাটিয়ে রক্ত বের করা দেখেও যদি শিশুদের উপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া না পড়ে, তবে স্যানিটারি ন্যাপকিনে লাল রক্ত দেখালে তাতে শিশুদের নৈতিকতা কি এমন খসে পড়ে যাবে? আজকাল বেশিরভাগ কার্টুনেও তো রক্তের রঙ লাল দেখায়! যৌনতাকে প্রমোট করা যদি হয়, তবে কন্ডমের বিজ্ঞাপনগুলো কি? বাথটাবে বসে আবেদনময়ী পন্থায় লাস্যময়ী নারীদের সাবান গায়ে মাখতে থাকা বিজ্ঞাপনগুলো কি? পারফিউমের বিজ্ঞাপনগুলো, যেখানে মেয়ে সহ মা পারফিউম মাখা ছেলেটার উপর হামলে পড়ছে আর বাবা চিবিয়ে চিবিয়ে ছেলেকে ডাকছে, সেটা কি? তার চেয়ে বরং শিশুরা যদি ছোট থেকেই জেনে বড় হয় পিরিয়ড কি, এবং এর সাথে তার জন্মের সম্পর্ক কি, তবে সেও পিরিয়ড এবং নারী শরীরকে স্বাভাবিক জেনে বড় হবে। এবং সেটাই তো বড্ড বেশী প্রয়োজন!

পিরিয়ড আর অশুচি! পিরিয়ড আর লজ্জা! এই অশুচিতায়, এই লজ্জায় মরতে মরতে আমরা মেয়েরাও বলতে পারি না, বলতে পারিনি, রক্তের রঙ লালই হয়। পিরিয়ডের রঙও তাই লাল, নীল নয়! এবং পিরিয়ড কোনো অসুখ নয়, অশুচি নয়, গোপন বিষয়ও নয়। আমরা সুস্থ তাই আমাদের পিরিয়ড হয়। ১২/১৩ বছর বয়স থেকে এভাবে প্রতিমাসে রক্তাক্ত হই বলেই সভ্যতা এতদূর এগিয়েছে, নীতিবাগীশরা নীতি ফলাতে পৃথিবীর মুখ দেখতে পেরেছেন! নাহলে কবেই ‘মানুষ’ নামক প্রজাতিটি ডাইনোসরের মতো বিলুপ্তির খাতায় নাম লেখাতো!

এই যে প্রতিমাসে পিরিয়ড হওয়ার পর বাথরুমে গিয়ে পা চুঁইয়ে নামা রক্তস্রোত ধুয়ে ন্যাপকিন লাগাই, সেই রক্তের রঙ লাল। সিঁড়িতে পড়ে গিয়ে পা কাটলে, সব্জি কাটতে গিয়ে হাত কেটে গেলে, ছোটবেলায় পড়ে গিয়ে মাথা ফেটে গেলে যে রক্ত বেরিয়েছে, তার রঙ লাল। ছোটোবেলা থেকেই তো জেনে এবং দেখে এসেছি “রক্তের রঙ লাল”- Blood is Red। আমরা মেয়েরা ‘এলিয়েন’ নই। পিরিয়ডের রক্তও তাই নীল হয় না, হে ভারতীয় সংস্কৃতির রক্ষকগণ!

লেখক: শিক্ষক ও অ্যাক্টিভিস্ট

[ প্রিয় পাঠক, আপনিও বিডিসারাদিন24 ডট কম অনলাইনের অংশ হয়ে উঠুন। লাইফস্টাইল, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, রান্নার রেসিপি, ফ্যাশন-রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন- bdsaradin24@gmail.com-এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে। নারীকন্ঠ এবং মত-দ্বিমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে  bdsaradin24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরণের দায় গ্রহণ করে না। ]

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 377 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ
bdsaradin24.com