নোবেল ও ওপার বাংলার শুভঙ্করের ফাঁকি!

Print

‘সারেগামাপা’ খ্যাত নোবেলের কাভার নাম্বার আগে থেকেই ভালো। তার তিন-চারটি কাভার নাম্বার সারাগামাপা নামক অনুষ্ঠানে যাবার কিছু আগে ইউটিউবে একবার আমার চোখে পড়েছিল। তবে তার আগের কাভার ভিডিওগুলোর সাথে এখনকার হুলস্থুল পার্থক্য হচ্ছে, তার সামনে এখন শান্তনু মৈত্র, মোনালি ঠাকুর এবং শ্রীকান্তর মতন বিচারকেরা বসে থাকেন। মাঝেমধ্যে তারা কি এক বাটনে তিনজন মিলে চেপে দিলে ম্যাজিকের মতন নোবেলের গায়ে সোনালি বৃষ্টি পড়ে। শান্তনু মৈত্র একদিন চেয়ার ছেড়ে দেন অথবা মোনালি প্রায়ই বলেন, “তুমি তো একটা রকষ্টার” আবার শ্রীকান্ত তার স্বভাবসুলভ গম্ভীর গলায় বলেন, “তোমার দম নেয়ার টেকনিক সাংঘাতিক”।

এইসব দৃশ্যে যেকোন বাংলাদেশীর জন্যেই আরামদায়ক। রাতে খাবার পরে বিরাট আনন্দ নিয়ে দু’একজনকে চূড়ান্ত উত্তেজিত গলায় বলতেও শুনেছি, দেখ শালারা বাংলাদেশী পোলা কি জিনিস!

তবে বিনয়ের সাথে বলি, সাম্প্রতিক এই নোবেল বিষয়ক আহ্লাদপনায় আমি কেন যেন আগ্রহ পাই না। শুভঙ্করের ফাঁকি মনে হয়। আপনারা আপনাদের দেশে আমার দেশের টেলিভিশন ঢুকতে দেবেন না, কিন্তু আমার দেশের মানুষকে আপনাদের টেলিভিশনের এক রিয়েলিটি শো’য়ের প্রতিযোগী বানিয়ে সে দেশে ঢুকতে দেবেন। তার বিলবোর্ড টাঙিয়ে রাস্তায় ঝুলিয়ে দেখাবেন, আহা দুই বাংলা এক হয়ে গেল?

আপনাদের এই “দুই বাংলা আজ এক হয়ে গেল” টাইপ অতি পরিচিত একটা আবেগ আপনারা ছড়িয়ে দেন কেন, তা কমনসেন্সওয়ালা যেকোন মানুষের পক্ষেই টের পাওয়া সম্ভব। এটা হতেই পারে কেউ কেউ এটা সত্যিকার অর্থেই আবেগ থেকে বলেছেন, তবে আপনাদের অর্ধেকের বেশি লোক যে এই ডায়ালগ স্রেফ বলার খাতিরে বলেন তা আমি বহু আগেই টের পেয়েছি। তার কারণ হচ্ছে, দিনশেষে দুই বাংলাকে আপনারা কখনো এক হতে দেন না!

কেউ যেমন নিয়মিত কাচাবাজারে গেলে জানেন, কোথায় ভালো মাছ পাওয়া যায়, কোথায় ভাল কুমড়া লাউ পাওয়া যায়। তেমনি আমার ধারনা, পশ্চিমবঙ্গ ও তার চ্যানেলের হর্তাকর্তা কিছু ধূর্ত লোকেরাও জানে প্রতিবেশীদের মধ্যে কেবলমাত্র বাংলাদেশেই তাদের দিকে মুখিয়ে থাকা বিশাল এক বোকা লোকেদের বাজার রয়েছে। এদের ভাত দিলে বিরিয়ানী মনে করে চেটে খাবে!

কারন একটি ন্যায্য প্রসঙ্গ উঠলেই এই শান্তনু মৈত্ররা বোবা হয়ে যান। প্রসঙ্গটি হচ্ছে, সমগ্র ভারত বাদ দিলাম কেবলমাত্র পশ্চিমবাংলা ও তার আশেপাশে যেহেতু বাংলা ভাষাভাষী তাই তাদের আকাশ সংস্কৃতিতে বাংলাদেশের টেলিভিশনের প্রবেশাধিকার!

 

এ বিষয়ে কেউ টুঁ শব্দ করেন না। কেউ না!

তাই আপনারা বাংলাদেশের টেলিভিশন চ্যানেল ঢুকতে দিচ্ছেন না, অথচ বাংলাদেশি প্রতিযোগী নেন। তারপর তার গান শুনে চেয়ার ছেড়ে দেন অথবা কেউ কেউ কথায় কথায় বলেন, রকষ্টার। দুঃখিত কোলকাতা, এই দৃশ্যে সন্তুষ্ট হবার মতন উদার আমি হতে পারিনা! এইসব ষ্টান্টবাজি টাইপ কান্ডকারখানা ‘সারাগামাপা’ নামক অনুষ্ঠানের টিআরপি বাড়ানো ছাড়া বাংলাদেশের কিছু কাজে আসছে বলে আমার মনে হয় না।

আমি পরিসংখ্যান না করেও বলে দিতে পারি, এইমুহুর্তে পশ্চিমবঙ্গ ও তার আশেপাশের দর্শকের চেয়ে বেশি বাংলাদেশের লোক সারেগামাপা নিয়ে ব্যস্ত। নোবেল একা সারেগামাপায় যাননি তার পেছনে রয়েছে অন্তত ষোল সতের কোটি মানুশের বাজার। এটি অংক খুব বেশি জটিল নয়। আর ষ্টার জলসার টিভি সিরিয়াল নামক ব্যাধির প্রসঙ্গ না হয় আর নাই তুললাম। এ বিষয়ে বহু কথা হয়েছে। আর না!

গানবাজনা থামাই। যাই, সাহিত্যে!

সীমান্তের ওপারের মানুষজন বাংলাদেশী লেখকদের বইপত্র পড়েন না। পড়লেও হাতগোনা। বাংলাদেশী বইয়ের বিপননের কি বেহাল ব্যবস্থা তা আমি তেমন গভীরভাবে জানিনা। তাই বলতে চাচ্ছিনা। অথচ ঔপন্যাসিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় একবার এক সাক্ষাৎকারে বললেন, আমার উপন্যাস যদি ধরো কোলকাতায় বিক্রি হয় পাঁচশ, তাহলে বাংলাদেশে বিক্রি হয় পাঁচ হাজার। ঔপন্যাসিক সমরেশ মজুমদার কৃতজ্ঞচিত্তে এক টেলিভিশনকে জানিয়েছেন, তাকে বিশ্বের কাছে পরিচিত করেছে বাংলাদেশিরা। গায়ক এবং অভিনেতা অঞ্জন দত্ত এই সেদিনও আলাপচারিতায় বাংলাদেশে এসে বলে গেছেন তার শ্রোতাদের প্রায় বেশিরভাগই বাংলাদেশি। চলচ্চিত্রের অবস্থা আরও করুন। চরম সম্ভাবনাময় যৌথ প্রযোজনা প্রক্রিয়া যতসব হাস্যকর কর্মকান্ডে আটকে কিছুদিন পর পর তামিল তেলেগুর রিমেক টাইপ চলচ্চিত্র প্রসব করছে।

যাই হোক, শেষ করি!

কয়েক বছর আগে মীরাক্কেল নামের একটা কমেডি শো হতো। সেখান থেকে যেসব বাংলাদেশীরা ফাষ্ট সেকেন্ড হয়ে ফিরেছিলেন, তার মধ্যে একমাত্র জামিলকে আয়নাবাজী সিনেমায় কাজের ছেলের ভূমিকায় মদ চুরি করে খাওয়ার অভিনয় করতে দেখা ছাড়া বাকিদের কাউকে আহামরী কিছু করতে দেখিনি। জানিনা সেইসব বিজয়ীরা কেমন আছেন!

নোবেলের কপালে স্রেফ এসব না জুটলেই হলো। সে ফিরে আসুক। নিজের গান গাক। অন্যের কাভার ট্র‍্যাকে না, তার নিজের গানেই তাকে মানুষ চিনবে এই আশাবাদ ব্যক্ত করলাম। আর কোলকাতার সাধারন মানুষের উপর আমার কোনো বিরাগ নাই। ইতিহাসে যতবার পেছনে ফিরি ততবারই দেখেছি তারা পাশে এসে দাঁড়িয়েছে ভাইয়ের মতন। আমার ক্ষোভ সেইসব ব্যবসায়ীদের প্রতি যারা বাংলাকে এক করে দেয়ার লোভ দেখিয়ে ক্রমাগত দূরেই সরিয়ে দিচ্ছেন। ব্যবসা করছেন সংস্কৃতির মতন বিষয় নিয়েও!

নোবেলের জন্যে শুভকামনা!

বিঃদ্রঃ আইয়ুব বাচ্চুকে নিয়ে টাইমস অফ ইন্ডিয়াতে ফুল পেজ কলাম দেখে অনেকে শেয়ার দিচ্ছেন দেখলাম। শেয়ারের কারন অনুসন্ধান করে শুনলাম, তারা মন থেকে বিশ্বাসই করতে পারছেন না টাইমস অফ ইন্ডিয়ার মতন পত্রিকায় আইয়ুব বাচ্চুকে নিয়ে কলাম লেখা হবে। গর্বে তাদের বুক ফুলে উঠেছে যার ফলাফল স্বরুপ তারা এই শেয়ার কর্মকান্ড চালাচ্ছেন।

মানসিক দৈন্যদশা কোন পর্যায়ে নেমে গেলে এমন বিশ্বাস সম্ভব আর কি বলবো!

[ প্রিয় পাঠক, আপনিও বিডিসারাদিন24 ডট কম অনলাইনের অংশ হয়ে উঠুন। লাইফস্টাইল, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, রান্নার রেসিপি, ফ্যাশন-রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন- bdsaradin24@gmail.com-এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে। নারীকন্ঠ এবং মত-দ্বিমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে  bdsaradin24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরণের দায় গ্রহণ করে না। ]

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 47 বার)


Print
bdsaradin24.com