পুরোদস্তর এক রাজনীতিকের নাম তরিকুল

Print

সদ্য প্রয়াত বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী তরিকুল ইসলাম মিয়া পুরোদস্তর বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ। অসুস্থতার কারণে গত কয়েক বছর ধরে দলীয় কার্যক্রমে অনিয়মিত। দলের চেয়ারপারসন কারাগারে যাওয়ার আগে গত ফেব্রুয়ারিতে স্থায়ী কমিটির বৈঠকে শেষবার তাকে দেখা যায় তাকে।

বিএনপির সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটিতে আসার আগে তিনি সহ-সভাপতিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে ডায়াবেটিকস, কিডনি ও হৃদরোগসহ নানা জটিল রোগে ভুগছিলেন তিনি। গত বছর তার অবস্থার অবনতি হলে সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হয়।

বেশ কিছুদিন আগে তাকে অ্যাপোলো হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে তিনি নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) ছিলেন। তাকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছিল। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিলে ৭২ বছর। তিনি স্ত্রী ও দুই ছেলে রেখে গেছেন।

জন্ম ও শিক্ষা জীবন: তরিকুল ইসলাম ১৯৪৬ সালের ১৬ নভেম্বর যশোর শহরে জন্মগ্রহণ করেন। পারিবারিক ব্যবস্থাপনায় তরিকুলের বাল্যশিক্ষা শুরু। ১৯৫৩ সালে তিনি যশোর জিলা স্কুলে তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হন। একটানা আট বছর শিক্ষা গ্রহণের পর ১৯৬১ সালে তিনি এই স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯৬৩ সালে তিনি যশোর মাইকেল মধুসূদন মহাবিদ্যালয় থেকে আই. এ. এবং ১৯৬৮ সালে একই কলেজ থেকে তিনি অর্থনীতিতে বি.এ. (অনার্স) ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৬৯ সালে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে অর্থনীতিতে এম. এ ডিগ্রি লাভ করেন।

পারিবারিক পরিচিতি: তরিকুল ইসলামের পিতা আব্দুল আজিজ ছিলেন একজন ব্যবসায়ী। মাতা মোসাম্মৎ নূরজাহান বেগম ছিলেন একজন গৃহিণী। তরিকুল ইসলাম দুই পুত্র সন্তানের জনক। স্ত্রী নারর্গিস ইসলাম তার অন্যতম রাজনৈতিক সহযোদ্ধা। তিনি যশোর সরকারি সিটি কলেজে উপাধ্যক্ষ পদে দায়িত্ব পালন শেষে অবসরে যান।

পেশা ও রাজনৈতিক জীবন: পেশাগতভাবে তিনি একজন ব্যবসায়ী ছিলেন। ছাত্রজীবন থেকে তিনি ছাত্র রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হন। ছাত্রজীবনে তিনি বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের নেতৃত্ব পুরোধা ব্যক্তিত্ব ছিলেন। ১৯৬৩-৬৪ শিক্ষাবর্ষে তিনি বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের প্রার্থী হিসাবে যশোর এম. এম কলেজ ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। বৃহত্তর যশোর জেলা ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতিও ছিলেন তিনি।

১৯৭০ সালে মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিতে যোগ দেন তরিকুল। ন্যাপ থেকে জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল (জাগদল) হয়ে পরে জিয়াউর রহমানের ডাকে বিএনপিতে যোগ দিয়েছিলেন তরিকুল। মৃত্যু পর্যন্ত এই দলেই অসীন ছিলেন তিনি।

কারাবরণ: বৈচিত্র্যময় রাজনৈতিক জীবনে তিনি বহুবার কারাবরণ করেছেন। যশোর এম. এম কলেজে শহীদ মিনার তৈরি উদ্যোগ নিতে গিয়েও তিনি কারাবরণ করেন। ১৯৬৬ সালে তৎকালীন এম. এন. এ মি. আহম্মদ আলী সর্দার কর্তৃক দায়েরকৃত মিথ্যা মামলায় তাকে বেশ কিছুদিন কারাবরণ করতে হয়। ১৯৬৮ সালে আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনের জন্যে তাকে রাজবন্দি হিসেবে দীর্ঘ নয় মাস যশোর ও রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে ছিলেন। পাকিস্তান আমল ও পরবর্তিতে বাংলাদেশ আমলে প্রত্যেকটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণআন্দোলনে তিনি সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। ১৯৬৯ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবস্থায় গণআন্দোলনে নেতৃত্বদানের জন্যে পুলিশ কর্তৃক নির্যাতিত হন। বেশ কিছুদিন হাজতবাস করেন তিনি।

জাতীয় রাজনীতিতে তরিকুল ইসলাম একজন প্রথম সারির নেতা। ১৯৭০ সালে মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে পরিচালিত ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিতে যোগ দেন তিনি। ভাসানী আহুত ফারাক্কা লং মার্চে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।

স্বাধীনতা যুদ্ধকালে নয়মাস ভারতে অবস্থান করেন। ১৯৭১ সালে চূড়ান্ত বিজয়ের পর তিনি দেশে প্রত্যাবর্তন করেন। বাকশাল আমলের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ফোরামে বক্তব্য রাখার কারণে তরিকুল ইসলাম নির্যাতনের শিকার হন ও কারাবরণ করেন।

১৯৭৩ সালে তরিকুল ইসলাম বিপুল ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হয়ে যশোর পৌরসভার ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।

১৯৭৫ সালে আওয়ামী লীগ শাসনামলে তরিকুল ইসলাম তিন মাস কারাভোগ করেন। ১৯৭৮ সালে তিনি যশোর পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ১৯৭৮ সালে তিনি ফ্রন্টের হ্যাঁ-না নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন। মরহুম মশিউর যাদুমিয়ার নেতৃত্বে ন্যাপ (ভাসানী) বিলুপ্ত হলে তিনি ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির গঠনে ভূমিকা রাখেন। যশোর সদর নির্বাচনী এলাকা (যশোর-৩) থেকে এমপি নির্বাচিত হন। এ সময়ে তিনি জাতীয়তাবাদী দলের জেলা আহ্বায়ক ও কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৮২ সালের ৫ মার্চ তরিকুল ইসলাম সড়ক ও রেলপথ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। ১৯৮২ সালে স্বৈরাচারী এরশাদ সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর তিনি এরশাদ কর্তৃক কারারুদ্ধ হন এবং দীর্ঘ তিন মাস অজ্ঞাত স্থানে আটক থাকেন। অতঃপর তথাকথিত এরশাদ হত্যা মামলার প্রধান আসামি হিসেবে দীর্ঘ নয় মাস ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে থাকেন এবং নির্মম নির্যাতনের শিকার হন। জেলখানা থেকে মুক্ত হয়ে তিনি এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন।

১৯৮৬ সালে তাকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এর যুগ্ম মহাসচিবের দায়িত্ব দেয়া হয়। এ সময়ে তিনি ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্বও পালন করেন।

১৯৯০ এর গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তিনি বিশেষ অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। গণতান্ত্রিক উত্তরণের পর ১৯৯১ এর সংসদ নির্বাচনে তিনি সামান্য ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন। ১৯৯৪ সালের উপ-নির্বাচনে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এমপি হন।

১৯৯১ সালে তরিকুল ইসলাম সমাজকল্যাণ ও মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এবং ১৯৯২ সালে ওই মন্ত্রণালয়ের পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। এ সময়ে তিনি ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে তিনি ওই মন্ত্রণালয়ের পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

২০০১ সালের নির্বাচনে তিনি প্রায় ৪০ হাজার ভোটের ব্যবধানে তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আলী রোজা রাজুকে পরাজিত করে যশোর-৩ আসনের এমপি নির্বাচিত হন। বিএনপি’র মন্ত্রী পরিষদ গঠিত হলে তিনি সরকারের খাদ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে তিনি তথ্য মন্ত্রণালয় এবং পরে বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত হন।

যশোর উন্নয়নে অবদান: তরিকুল ইসলামকে যশোরের উন্নয়নের রূপকার বলা হয়। যশোর কারিগরি প্রশিক্ষণ মহাবিদ্যালয়, যশোর ২৫০ শয্যা হাসপাতাল ও করোনারি কেয়ার ইউনিট, বিভাগীয় কাষ্টমস অফিস, বেনাপোল স্থল বন্দরসহ অনেক অর্জনের কৃতিত্বের দাবিদার তিনি।

সামাজিক কর্মকাণ্ড: তরিকুল ইসলাম যশোর সরকারি সিটি কলেজ পরিচালনা পরিষদের নির্বাহী সদস্য, যশোর ইনস্টিটিউটের সহকারী সম্পাদক, যশোরের সর্ববৃহৎ স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘জাগরণী চক্র’- এর সভাপতি, কিংশুক সঙ্গীত শিক্ষা কেন্দ্রের প্রধান উপদেষ্টা ও যশোর ক্লাবের নির্বাহী সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। যশোর জেলা ক্রীড়া সংস্থাকে আধুনিকীকরণে তিনি বিশেষ ভূমিকা পালন করেছেন।

দেশ ভ্রমণ: তরিকুল ইসলাম ব্যক্তিগত, দলীয়, রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসাবে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, পাকিস্তান, থাইল্যান্ড, গণচীন, উত্তর কোরিয়া, হংকং, ইতালি, ফ্রান্স, শ্রীলংকা, ভুটান, দক্ষিণ আফ্রিকা, সাইপ্রাস, ভারত, সিঙ্গাপুর, ভিয়েনা, আর্জেন্টিনা, সুইজারল্যান্ড ও কানাডাসহ অসংখ্য দেশ ভ্রমণ করেন এবং যশোর পৌরসভার চেয়ারম্যান হিসেবে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড সফর করেন। তিনি এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় ফোরামে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন।

উল্লেখ্য, রোববার (৪ নভেম্বর) বিকেল ৫ টা ৫ মিনিটে রাজধানীর অ্যাপোলো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তরিকুল ইসলাম।

 

 

[ প্রিয় পাঠক, আপনিও বিডিসারাদিন24 ডট কম অনলাইনের অংশ হয়ে উঠুন। লাইফস্টাইল, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, রান্নার রেসিপি, ফ্যাশন-রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন- bdsaradin24@gmail.com-এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে। নারীকন্ঠ এবং মত-দ্বিমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে  bdsaradin24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরণের দায় গ্রহণ করে না। ]

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 23 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ
bdsaradin24.com