পেশাব-পায়খানা করার পর পরিচ্ছন্নতা অর্জন: ঢিলা-কুলুপ ব্যবহার করা কি আবশ্যক?

Print

ইসলাম আমাদেরকে জীবনের নিতান্ত গোপনীয় এবং ছোট্ট ছোট্ট বিষয় সম্পর্কেও অত্যন্ত চমৎকার নির্দেশনা দিয়েছে আল হামদুলিল্লাহ-সকল প্রশংসা একমাত্র আল্লাহর।
যা হোক, নিম্নে মানব জীবনের নিত্য প্রয়োজনীয় বিষয় পেশাব-পায়খানার পরে পরিচ্ছন্নতা অর্জনের বিষয়টি হাদিস ও ফিকদের দৃষ্টিকোন থেকে সংক্ষেপে আলোকপাত করা হল:

♦ পরিচ্ছন্নতা অর্জন: কী কারণে এবং কোন জিনিস দ্বারা?

পেশাব-পায়খানার রাস্তা দিয়ে বায়ু ছাড়া অন্য কোনো কিছু-যেমন: পেশাব, পায়খানা, রক্ত, কৃমি, ধাতু, মযী বা এক প্রকার হালকা তরল আঠালো পদার্থ, মহিলাদের সাদা স্রাব ইত্যাদি বের হলেই পরিচ্ছন্নতা অর্জন করা অপরিহার্য (ওয়াজিব)। চাই তা পানি দ্বারা হোক বা টিস্যু পেপার, কাপড়ের টুকরা, পাথর খণ্ড, শুকনো মাটি ইত্যাদি দ্বারা হোক।

তবে কুরআন-হাদিস, দুআ, যিকির ও আল্লাহ-রাসূল নাম লেখা সম্মানযোগ্য কাগজ, হাড্ডি, গোবর, কয়লা, খাদ্যদ্রব্য ইত্যাদি বস্তুকে কুলুপ হিসেবে ব্যাবহার করা জায়েয নাই।
– এ ক্ষেত্রে ডান হাত ব্যবহার করাও সঙ্গত নয়। বরং বাম হাত ব্যবহার করতে হবে।
– পানি বা কুলুপ সর্ব নিম্ন তিনবার ব্যবহার করা উচিৎ। প্রয়োজনে তিনের অধিক যতবার প্রয়োজন ততবার ব্যবহার করা যায়।

♦ পেশাব-পায়খানার পরে পরিচ্ছনতা অর্জনের আবশ্যকতা:

পেশাব-পায়খানা শেষে পরিপূর্ণভাবে পরিচ্ছন্নতা অর্জনের ক্ষেত্রে অলসতা বা অবহেলা করা উচিৎ নয়। কেননা পেশাব-পায়খানা থেকে পবিত্র না হওয়া কবরের শাস্তি হওয়ার অন্যতম কারণ। যেমন: হাদিসে এসেছে, একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দু’টি কবরের নিকট দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় সেখানে দাঁড়িয়ে বললেন:

إنَّهُماَ لَيُعَذَّباَنِ وَماَ يُعَذَّباَنِ فِيْ كَبِيْرٍ, ثُمَّ قَالَ: بَلَى, أماَّ أحَدُهُماَ فَكاَنَ يَسْعَي بِالنَّمِيْمَةِ, وَأمَّا الآخَرَ فَكَانَ لاَ يَسْتَتِرُ مِنْ بَوْلِهِ …
“ এ দুটি কবর বাসীকে শাস্তি দেয়া হচ্ছে। তবে বড় কোনো কারণে শাস্তি দেয়া হচ্ছে না। অত:পর বললেন:
“হ্যাঁ, তাদের একজন চুগলখোরি করত (তথা একজনের কাছে আরেকজনের কুৎসা রটনা করত বা ঝগড়া-দন্দ্ব লাগানের উদ্দেশ্যে একজনের কথা আরেকজনকে লাগাত)
অপর জন নিজেকে পেশাব থেকে পবিত্র রাখত না।” (বুখারী ও মুসলিম)

♦ পেশাব-পায়খানার পরে পরিচ্ছন্নতা অর্জনের পদ্ধতি:

▪পেশাব-পায়খানা করার পর শৌচকার্য বা পবিত্রতা অর্জনের সবচেয়ে উত্তম উপায় হল, ইস্তিনজা বা পানি ব্যবহার করা।

▪ তবে পানি না পেলে বিকল্প উপায় হিসেবে কুলুপ তথা টিস্যু পেপার, পাথর, মাটির ঢিলা, কাপড়ের টুকরা, ইত্যাদি বস্তু দ্বারা পরিচ্ছন্নতা অর্জন করতে হবে।

▪কেউ যদি পানির পরিবর্তে কেবল টিস্যু, কাপড় বা ঢিলা-পাথর দ্বারা যথার্থভাবে পরিচ্ছন্ন হয় তাহলেও যথেষ্ট। কারণ উদ্দেশ্য হল, পরিচ্ছন্নতা অর্জন করা।

▪আবার কেউ যদি প্রথমে টিস্যু, কাপড় বা মাটির ঢিলা বা পথর দ্বারা পরিচ্ছন্নতা অর্জন করার পর পুনরায় পানি দ্বারা পরিচ্ছন্নতা অর্জন করে তাহলেও জায়েয আছে।

কিন্তু উভয়টি ব্যবহার করাকে ওয়াজিব বা সুন্নত মনে করা দ্বীনের মধ্যে বাড়াবাড়ি ছাড়া অন্য কিছু নয়। অথচ দুর্ভাগ্য যে, বর্তমানে আমাদের সমাজের এক শ্রেণীর মানুষ পেশাব-পায়খানার পরে পানি ব্যবহারের পূর্বে টিস্যু বা কুলুপ ব্যবহার করাকে ওয়াজিবের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছে! অথচ তা কাম্য নয়। কারণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং সাহাবীগণ ছিলেন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার সর্বোৎকৃষ্ট উদাহরণ। তারা কেবল পানি দ্বারা পরিচ্ছন্নতা অর্জন করতেন এবং পানি না পেলে ঢিলা-কুলুপ দ্বারা পরিচ্ছন্নতা অর্জন করতেন। কিন্তু তারা উভয়টি ব্যবহার করতেন-এমন কেনো বিশুদ্ধ কোনো বর্ণনা পাওয়া যায় না।

♦ আল্লাহ তাআলা কি পাথর অত:পর পানি ব্যবহার করার কারণে কুবাবাসীর প্রশংসা করেছেন?
আমাদের সমাজে যারা পানি ব্যবহারের পূর্বে ঢিলা-কুলুপ ব্যবহারকে সুন্নত বা ওয়াজিব বলতে চান তারা কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াত দ্বারা দলিল পেশ করে থাকেন। তা হল:
আল্লাহ তাআলা মদিনার উপকণ্ঠে অবস্থিত কুবা বাসীদের প্রশংসায় বলেন:

فِيهِ رِجَالٌ يُحِبُّونَ أَن يَتَطَهَّرُوا ۚ وَاللَّهُ يُحِبُّ الْمُطَّهِّرِينَ

“সেখানে রয়েছে এমন লোক, যারা পবিত্রতা অর্জন করাকে ভালবাসে। আর আল্লাহ পবিত্র লোকদের ভালবাসেন।” (সূরা তওবা: ১০৮)

এই আয়াতের তাফসীরে ইবনে কাসীর রহ. অনেকগুলো হাদিস পেশ করেছেন। যেগুলোর মূল বক্তব্য হল, আল্লাহ তাআলা কুবা বাসীর প্রশংসা করেছেন এ কারণে যে, তারা পেশাব-পায়খানার পর পানি দ্বারা পরিচ্ছন্নতা অর্জন করতেন। এ মর্মে তিনি একাধিক সহিহ হাদিস ও মুফাসরিদের বক্তব্য তুলে ধরেছেন।
পক্ষান্তরে তিনি ‘পাথর ও পানি উভয়টি ব্যবহার করা’র ব্যাপারেও একটি বর্ণনা উল্লেখ করেছেন। কিন্তু বড় বড় মুহাদ্দিস যেমন: ইবনুল মুলাক্কিন, হায়সামী, ইবনে হাজার আসকালানী প্রমুখ এ বর্ণনাটিকে যঈফ বা দুর্বল বলে আখ্যায়িত করেছেন।
ইবনে হাজার তার ‘আত তালখীসুল হাবীর’ গ্রন্থে উক্ত বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেন:
“পাথর ও পানি উভয়টি ব্যবহারের ব্যাপারে বর্ণিত হাদিসের সনদে রয়েছে মুহাম্মদ বিন আব্দুল আযিয় নামীয় এক বর্ণনাকারী। তাকে আবু হাতিম দুর্বল বলেছেন। এছাড়াও আরেক বর্ণনাকারী আছে যার নাম আব্দুল্লাহ বিন শাইব। তিনি অত্যন্ত দুর্বল।” (উৎস: আত তালখীসুল হাবীর ১/১৬৯)
♦ শৌযকার্য করার পর হাত সাবান, মাটি ইত্যাদি দ্বারা ঘোষে তারপর পানি দ্বারা ভালোভাবে ধৌত করা নি:সন্দেহ উত্তম-যেন হাতে কোন দুর্গন্ধ অবশিষ্ট না থাকে। আল্লাহু আলাম।
▬▬▬▬●◈●▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার , সৌদি আরব
FB ID: AbdullaahilHadi

[ প্রিয় পাঠক, আপনিও বিডিসারাদিন24 ডট কম অনলাইনের অংশ হয়ে উঠুন। লাইফস্টাইল, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, রান্নার রেসিপি, ফ্যাশন-রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন- bdsaradin24@gmail.com-এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে। নারীকন্ঠ এবং মত-দ্বিমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে  bdsaradin24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরণের দায় গ্রহণ করে না। ]

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 49 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ
bdsaradin24.com