প্রবাসী নববর্ষ, যেনো খুঁজে ফেরা তালপাতার বাঁশী!

Print

 

রীতা রায় মিঠু

বছর ছয়েক পূর্বে দুই একটা দৈনিক পত্রিকায় মাঝে মাঝে ফিচার লিখে পাঠাতাম। কাঁচা লেখা তবুও সম্পাদক সাহেব নতুন লেখকের প্রতি কিছুটা পক্ষপাতিত্ব দেখিয়ে লেখাগুলো পত্রিকায় ছাপিয়ে দিতেন। বছর তিন হয়ে গেলো পত্রিকায় আর কোন লেখা পাঠাইনা, নতুন কিছু লেখার নেই তো।

কয়েক বছর আগে একটি দৈনিক পত্রিকা থেকে প্রবাসে নববর্ষ উপলক্ষে একটি লেখা চেয়ে পাঠিয়েছিলো। লেখা তৈরী করতে গিয়ে খুব আতান্তরে পড়েছিলাম। কী লিখবো, প্রবাসে কি আর নববর্ষ উদযাপনের তেমন কোন সুযোগ আছে! আমরা এখানে যা করি, তা নিছক সান্ত্বনা ছাড়া আর কিছুই না।
এখানে শনি রবি ছাড়া কিছুই করা যায়না। সব উৎসব শনি রবি ধরে আসেও না। ফলে দেশে যখন সব আনন্দ উল্লাস শেষ হয়ে যায়, আমরা তখন কোন একটা শনিবারে বাসি উৎসব পালন করে থাকি। এ যে কি কষ্টের তা বলে বা লিখে বুঝানো যাবেনা।

তারপরেও নিউইয়র্ক, হিউস্টন, ডালাস, ফ্লোরিডা, ক্যালিফোর্ণিয়া হলেও একটা কথা ছিল, আমি থাকি একেবারে বাংলার ছোঁয়ার বাইরের রাজ্য মিসিসিপিতে। মিসিসিপিতে বাঙ্গালী নেই বললেই চলে, হাতে গোনা পঁচিশ ত্রিশ জন নিয়ে কি কিছু করা যায়?
পহেলা বৈশাখের আয়োজন করতে গেলেই চোখের সামনে হুড়মুড় করে এসে ভীড় করে নানা বয়সের স্মৃতি। কি মধুময় সেসব দিন, অর্থের প্রাচুর্য্য ছিলো না, কিনতু প্রাণের প্রাচুর্য্যে ভরা ছিল সমস্ত শৈশব, কৈশোর, যৌবন।

শিশুকালের স্মৃতিতে নববর্ষ মানে দিদিমার হাত ধরে বৈশাখী মেলাতে যাওয়া, মাটির হাঁড়ি পাতিল আর প্লাস্টিকের রঙিন চুড়ি নিয়ে বাড়ী ফেরা। আমি ছিলাম দিদিমার এক মাত্র নাতনী। দাদু নারায়ণগঞ্জ শহরেই সারা জীবন মোক্তারী করেছেন, ফলে নারায়ণগঞ্জের সকলেই দাদুকে নামে চিনতো। আমার সুন্দরী দিদিমাকে মেলার দোকানীরা ডাকতো, ‘ঠাইরেন’ বলে। ঠাইরেনের মতোই সুন্দরী আর ব্যক্তিত্বময়ী ছিল দিদিমা। দিদিমার সাথে মেলায় যাওয়ার আরেকটি মজা ছিল, তেলেভাজার দোকানে নিমকী ফুলুরী কিনতে গেলেই দোকানী আমার হাতে কিছু না কিছু দিত। আহামরী কিছুনা, কিনতু আমার মনে হতো আমি বুঝি দুনিয়া জয় করে বাসায় ফিরছি। হাতের মুঠির মধ্যে রেখে দিতাম ঐ কয়েয়কটা নিমকী। দিদিমা আমাকে লাল নীল চুড়ি কিনে দিত। আমার কাছে পাঁচ বছর বয়সে তোলা একটি ছবি আছে। ছবিটি তোলা হয়েছিল নারায়ণগঞ্জ ‘প্রিন্স’ স্টুডিওতে। পায়ে ছিলো সাদা রঙের টেডী জুতো, পরনে ছিল মায়ের হাতে বানানো ফুলছাপা স্কার্ট-ব্লাউজ আর হাতে ছিল মেলা থেকে কিনে আনা নীল প্লাস্টিকের চুড়ি।

স্বাধীনতার পরে ধীরে ধীরে চৈত্র সংক্রান্তি, পহেলা বৈশাখসহ নানা দেশীয় উৎসবের পার্থক্যগুলো বুঝতে শুরু করলাম। চৈত্র সংক্রান্তির উৎসব গ্রামে হিন্দু মুসলিম নির্বিশেষে সকলেই একভাবেই পালন করতো কিনা তা আমার জানা হয়নি কোনদিন। মুক্তিযুদ্ধের সময় চৈত্র সংক্রান্তিতে সোনারগাঁও-য়ের আমিনপুর গ্রামে ছিলাম। সেখানে বিশাল বড় এক দীঘি ছিল। এক দিন দেখলাম, আমিনপুরের কিছু যুবক সেই দীঘিতে ডুব দিয়ে অনেক লম্বা এক গাছের গুঁড়ি তুলে এনেছে। এরপর মহিলারা সেই গাছের গুঁড়িতে সিঁদুর দিয়েছে, ঢাক-ঢোল বাজিয়ে পূজো করেছে। সারা গ্রামের মানুষ এসে জড়ো হয়েছিল সেই দীঘির পারে।
মানুষগুলো নিশ্চয়ই শুধুই হিন্দু ছিল না, হিন্দু-মুসলমান হিসেবেও কেউ ওখানে ছিলনা, ছিল আমিনপুরের গ্রামবাসী হিসেবে! আমার সেই দৃশ্যটি এখনও এত বেশী জীবন্ত মনে হয়। অনেক পরে দিদিমা-মায়ের কাছে জেনেছিলাম, ঐদিন ছিল চৈত্র সংক্রান্তি, পূজোর নাম ‘চড়ক পূজো’। স্মৃতিতে গ্রামে দেখা চৈত্র সংক্রান্তির একমাত্র দৃশ্য।

তবে শহরে থেকে দেখতাম, চৈত্র সংক্রান্তি আর পয়লা বৈশাখে মুসলিমদের চেয়ে হিন্দুদের বাড়িতেই যেনো হইহই রই রই বেশী ছিল। চৈত্র সংক্রান্তির দিন প্রতিটি হিন্দু বাড়ীতে ‘তেতো’ খাওয়ার হিড়িক পড়ে যেতো। বাজার ঘুরে যত রকম তিতা জিনিস কিনতে পাওয়া যায়, সব কিনে আনা হতো। নিমপাতা, পাটশাক, উচ্ছে, বেতের কচি ডগা, গিমা শাকসহ রাজ্যের তিতকুটি জিনিস দিয়ে ‘পাঁচন’ নামে বিশ্রী স্বাদের কিছু একটা রান্না করা হতো প্রায় সব বাড়ীতে।

আমার মা অবশ্য একটু ভালো ছিলো, আমরা অত তিতা জিনিস খেতে পারতামনা বলে পাট শাকের বড়া করতো, করলা ভাজা করতো, কাঁচা আমের ডাল করতো। কারো কারো বাড়ীতে দুপুরে দৈ চিড়া, খৈ, ক্ষীর, আম, কলা, বাতাসা দিয়ে অপূর্ব স্বাদের ‘ফলার’ খাওয়া হতো। সবই অবশ্য হিন্দু বাড়ীগুলোতে হতো।

আমাদের বাড়ীওয়ালা অথবা পাশের বাড়ীর ডাক্তার চাচার বাড়ীতে এর কোনটাই হতোনা।
তিতা কেনো খেতে হয় চৈত্র সংক্রান্তিতে প্রশ্নের জবাবে মা বলেছিল যে সারা বছরের দুঃখ-কষ্ট, রোগ-শোকের গ্লানি বছরের শেষ দিনেই শেষ করে দিয়ে নতুন বছর শুরু করার প্রস্তুতি হিসেবে তিতা খাওয়া হয়।
পাঁচ তিতা কেন?
মানুষের জীবনে দুঃখ কি একটা থাকে? সাত -সতেরো দুঃখ থাকে। সম্ভব হলে সতেরো রকমের তিতা খেতো সবাই।
মনে মনে ভাবি, ভাগ্যিস সতেরো রকমের তিতা জিনিসের সন্ধান মা জানতো না।
খুব ছোটবেলায় ঠাকুমা আমাদের ভাইবোনদের সবাইকে সকালে খালি পেটে চিরতার জল খাওয়াতো, ইস! তিতার প্রতি অভক্তি সেই তখন থেকেই।

চৈত্র সংক্রান্তির দিন ‘শিব পার্বতীর’ নাচ দেখাতে আসতো বিভিন্ন পাড়া থেকে। একজন গায়ে নীল রঙ মেখে, মাথায় পাটের তৈরী জটাজুটা পড়ে চোখে কাজল দিয়ে শিব সাজতো। সেই শিবের গলায় ঝুলতো প্লাস্টিকের সাপ, কপালে আঁকা হতো ত্রিনয়ন। আর পার্বতী যে সাজতো, তার গায়ে মাখা হতো হলুদ রঙ, চোখে কাজল ঠোঁটে লিপস্টিক। ঝকমকে শাড়ি পরানো হতো পার্বতিকে। ঢাক ঢোলের বোলের সাথে শিব নাচতো, পার্বতি শিবকে পেছন থেকে তালপাখায় বাতাস করতো। বিকেলের দিকে ঢাকা থেকে আসতো স্মার্ট শিব পার্বতীর দল। এই দলের শিব ছিল খুব সুন্দর দেখতে। গায়ের রঙ ফরসা, চেহারা সুন্দর , গলায় ঝুলতো সত্যিকারের সাপ। পার্বতিও ছিল সুন্দরি। তাদের সাথে আসতো ব্যান্ড পার্টি। ঢাকার দলের অনেক দাম ছিল আমাদের কাছে। সারাদিনে পাড়াতো দলকে দেয়া হতো চাল, নাহয় দুই এক টাকা। কিন্তু ঢাকার দলকে চাল ডাল দেয়া হতোনা, পাড়ার ইজ্জত আছে তো। পাড়ার কমিটি থেকে তাদেরকে ভাল অংকের টাকা দেয়া হতো।

পরের দিন পয়লা বৈশাখে সকাল থেকেই সব বাড়ীতে সাজ সাজ রব পড়ে যেতো। সকালবেলায় স্নান সেরে ভাল জামাকাপড় পরে ছোটরা গুরুজনদের প্রণাম করতো। এই প্রণামপর্বটি ছিল আমাদের জন্য অত্যন্ত আনন্দের, বছরের প্রথম দিনে বকা খাওয়ার ভয় নেই, প্রণাম করলেই হাতে পেতাম এক টাকার নোট!
এক টাকার নোট হাতে পেলে আনন্দে চোখের পাতা ফেলতেই ভুলে যেতাম। বছরের পয়লা দিনে বকা খাওয়া নেই, তাই টাকা নিয়ে রাস্তায় চলে যেতাম। মেছের আলীর আইসক্রিম কিনতাম, আচারওয়ালার কাছ থেকে ‘বরইয়ের আচার, চালতার আচার, গুল্লির আচার, হজমি’ কিনতাম, আহাহা!! বছরের এক দিন এই স্বাধীনতাটুকু পেয়ে কৃতার্থ হয়ে যেতাম।

বিশাল বড় বাড়িতে থাকতাম আমরা। বাজারে গিয়ে কে কত বড় মাছ কিনে আনলো, কার বাড়ীতে কত সের মাংস আসলো, দৈ মিষ্টি আনার ধুম লেগে যেতো। আর আমাদের ঘরেও অন্য রকম এক ফুরফুরে হাওয়া বইতো। আমরা জানতাম বছরের প্রথম দিন যেমন যায়, সারা বছর তেমনই কাটে। সারা বছর যেনো ভালো কাটে ঐ আশায় বছরের প্রথম দিন চেষ্টা করতাম ভালো হয়ে চলতে। দুপুরের খাওয়া দাওয়াতেও ছিল দারুণ ব্যাপার! আলু দিয়ে রান্না করা খাসীর মাংস! আমার মা রান্নায় ছিলেন দ্বিতীয় দ্রৌপদী, নিজে মাংস খেতেন না অথচ রান্না করতেন পৃথিবী শ্রেষ্ঠ মাংসের ঝোল।

খাসীর মাংস দিয়ে ভাত খাওয়ার লোভে একটু পর পর রান্নাঘরে উঁকী দিতাম। মাংস সেদ্ধ হয়েছে কিনা তা দেখার জন্য বাটিতে এক টুকরো মাংস আর ঝোল বাবাকে দেয়া হতো। বাবা চেখে মত দিতেন, তখন মেজদা হাজির হতো। মেজদা ছিল আমাদের ঘরের অন্যতম ‘খাদক’, মা মেজদাকেও মাংস খেতে দিত! দেড় সের মাংস কেনা হতো, আলু দিয়ে সেই মাংস রান্না করা হতো বলেই রাতের বেলায় আলু ঝোল পেতাম। আমার কাছে মাংসের চেয়েও অনেক বেশী ভালো লাগতো আলু-ঝোল।
খাসীর মাংসের প্রসঙ্গে এত কথা বলার একটিই কারণ, শুধুমাত্র পয়লা বৈশাখ আর দূর্গাপূজাতেই আমাদের ঘরে খাসীর মাংস আসতে দেখতাম। আমার বাবা-মায়ের মত আগাগোড়া সৎ ও পরোপকারী মানুষ আমার জীবনে দেখিনি। উনাদের সততা ও পরোপকারের ধকল আমাদের উপর দিয়েই গেছে।

আশেপাশে সব বড়লোক প্রতিবেশীর মাঝখানে আমরা ছিলাম অতি সাধারণ মধ্যবিত্ত যাদের বাড়ীতে বছরে দুইবারের বেশী মাংস আসতোনা। পয়লা বৈশাখের দুপুরে আমাদের খাবারের তালিকায় থাকতো, রুই মাছের কালিয়া, মাছের মাথার মুড়িঘন্ট, মুগ ডাল, খাসীর মাংস, আমের চাটনী, আর দই। তোফা খানা। বছরের প্রথম দিন খেতাম, আবার ঠিক দূর্গা পূজার সময় খেতাম। বছরের বাকী দিনগুলিতে ডাল, একটা তরকারী আর একটা মাছের ঝোল। বছরের প্রথম দিন যেমন কাটে, বছরের বাকী দিনগুলোও তেমন কাটবে আশায় প্রথম দিনটি সুন্দর করে কাটিয়েও মনে প্রশ্ন জাগেনি, পয়লা বৈশাখে যা খেয়েছি, যা পেয়েছি, বছরের বাকী দিনগুলোতে কেনো তা পাচ্ছিনা!

আমরা থাকতাম আমলাপাড়া নামের এলাকাতে। সেখানে জুয়েলারী দোকান আগেও ছিল, এখনও আছে। আরও নানা রকম দোকান আছে। আমার মামীর বাবার একটি মিষ্টির দোকান ছিল। পয়লা বৈশাখের দিন ঐ দোকান গুলোতে ‘হালখাতা’ নামে একটা পর্ব ছিল। সেদিন কোন ব্যবসা চলতোনা। সকালে দোকানগুলো খোলা হতো, পূজা হতো, তারপরেই পাড়ার গণ্যমান্যদের ডেকে বসিয়ে মিষ্টি খাওয়ানো হতো। গণ্যমান্যদের মধ্যে হিন্দু মুসলমান ভেদাভেদ ছিলনা, পাড়ার মুরুব্বীরাই ছিলেন গণ্যমান্যের তালিকায়।

আমার মেজদা মিষ্টি খেতে ভালোবাসত, যদিও সে গণ্যমান্যের তালিকায় পড়তোনা তারপরেও আমাদের গণ্যমান্য দাদুর নাতি হিসেবে সব দোকানে গেলেই মিষ্টির ভাগ পেতো। বাসায় এসে মিষ্টি খাওয়ার গল্প রসিয়ে রসিয়ে করতো, আর আমি ‘মেয়ে’ হয়ে জন্মানোর দুঃখে মনের ভেতর জ্বলতাম।

বৈশাখ শুরুর দুই তিনদিন পরেই মায়ের সাথে বা দিদিমার সাথে মেলায় যেতাম। এক বয়সে কিনেছি চুড়ি, টিনের বা মাটির রান্না হাঁড়ি কুড়ি, এরপর কিনেছি রঙীন ফিতা, কাঁচের চুড়ি, নাহলে খেলনা টেলিভিশন (চাবি ঘুরালে একটার পর একটা ছবির রীল ঘুরতো, যেখানে নায়িকাদের ছবি থাকতো), বাঁশী কিনতাম, ঢোল কিনতো আমার ছোট ভাই। এরপরই তেলেভাজার দোকানে চলে যেতাম। মুরলী ভাজা, পিঠি ভাজা, নানা ছাঁচে তৈরী চিনির খেলনা, তিলা, কদমা, গুড়ের তক্তি, সাদা বাতাসা, গুড়ের বাতাসা দিয়ে পসরা সাজিয়ে দোকানী বসে থাকতো। মানুষের ভিড় উপচে পড়তো। বড় বড় মাছি ভন ভন করে উড়তো, আর দোকানীরা কাঁধের থেকে নোংরা গামছা নামিয়ে, সেটা দিয়ে বাতাস করে মাছি তাড়াতো আর দাঁড়ি পাল্লাতে মাপামাপি করতো নিমকী, মুড়ুলী, পিঠি, বাতাসা।

কেনাকাটির এই পর্ব শেষ হলেই সবচেয়ে বিরক্তিকর পর্ব শুরু হতো। মা দিদিমাদের দা, বটি, পাটা-পুতা, হাতা, চামচ, সিলভারের ঘটি, মাটির কলস, বেলন-পিঁড়ি, বেতের মোড়া সহ অন্যান্য যাবতীয় জিনিস কেনাকাটা শুরু হতো। আমি খাবারের পোঁটলা হাতে দাঁড়িয়ে থাকতাম। তর সইতোনা, কখন বাসায় যাব, তবে কুড়ুমুড় কুড়কুড় করে সব খেতে পারবো।

মেলায় কাঠের নাগরদোলা ছিল, ওটাতে আমার সমবয়সী সবাই চড়তো, আমি ছাড়া। আমার বয়সীরা নাগরদোলা চড়ছে আর আমি হাঁ করে তাকিয়ে দেখছি! মায়ের কাছে দুই একবার আবদার করেও লাভ হয়নি। অনেক পরে বুঝতে পেরেছি, আমাদের মনে হয় অনেক বেশী মাপা পয়সা ছিল তাই মা ফালতু খরচ করতে চাইতো না অথবা মা ভয় পেত যদি নাগরদোলা থেকে পড়ে যাই, মেয়ে সন্তান তায় আবার কালো, হাত পা ভাঙ্গলে বিয়ে দিতে পারবেনা!

বিয়ের পরেতো অন্যরকম পহেলা বৈশাখ। নিজের সংসারে নিজেই রাণী। আমি যা চাই তাই হবে, এমন একটা ভাব চলে এসেছে। মাথার উপর ছড়ি ঘোরানোর কেউ নেই, আমার স্বামী আমাকে শাসন করবে? তাহলেই হয়েছে, সে বেচারা তো আমার চাইতেও খারাপ অবস্থার ভেতর দিয়ে বড় হয়েছে! আমি তো তবুও মা-দিদিমার আদর স্নেহ পেয়েছি, উৎসব পার্বন দেখেছি। আমার স্বামী তো কৈশোর থেকেই ঘর ছাড়া, মা-বাবার স্নেহ আদর অত পেলে তো! আমাকে পেয়ে তো সে সংসার করার আনন্দ পেয়ে গেছে, কাজেই আমার উপর খবরদারী করলে তো সংসার জীবনের আনন্দটুকু খোয়ানোর সম্ভাবনা ছিল! সেই ভাবনাতেই হয়তো সে আমার সব কর্মে সায় দিয়েছে।

নিজের সংসারে চৈত্র সংক্রান্তি, পয়লা বৈশাখ পালন করতে গিয়ে অবাক হয়েছি, যে তেতো ব্যাপারকে খুবই তেতো একটি বিষয় মনে হতো, সেই আমিই চৈত্র সংক্রান্তিতে তেতো রান্না করতে শুরু করেছি যা এই বিদেশ বিভুঁইয়েও চালিয়ে যাচ্ছি। এভাবেই বোধ হয় বংশ পরম্পরায় মানুষের কৃষ্টি, ঐতিহ্য বেঁচে থাকে, বাঁচিয়ে রাখতে হয়।
বিয়ের পরে পহেলা বৈশাখের সকালে চলে যেতাম রমনা বটমূলে, তারপর ঢাকার রাস্তায় রাস্তায় হেঁটেছি, চারিপাশে মানুষের ভীড় দেখতে কি যে ভালো লাগতো। মানুষের ভীড়তো সহজে শেষ হওয়ার নয়, তাই দুপুরের আগেই নারায়ণগঞ্জ চলে যেতাম বাবার বাড়ীতে। জামাই যাচ্ছে শ্বশুরবাড়ী, ঝুড়ি ভর্তি আম, মিষ্টি নিয়ে যেতাম। আহা! সে আরেক মহামিলনমেলা। ছোট মাসী আসতো তার শ্বশুরবাড়ি থেকে, দাদু,দিদিমা, মামা-মামী, মাসী আর এদিকে আমার বাবা-মা, ভাইয়েরা! সে কী আনন্দ!
এরপর মেয়েরা জন্মালো, কিছুটা বড় হতেই টের পেলাম, মেয়েগুলোও আমার মতই বাউন্ডুলে স্বভাবের হয়েছে। পয়লা বৈশাখ এলেই তাদেরও রমনা বটমূলে যেতেই হবে। যেতাম, আমি তো একপায়ে দাঁড়িয়েই থাকতাম।

মানুষের মিছিল চলতো রমনা বটমূলের দিকে। একবার রমনা বটমূল থেকে বের হবার সময় গেটের কাছে এসে আমি আমার মিশা মেয়েটাকে নিয়ে মানুষের ভীড়ে আটকে গেছিলাম। সে কী চাপ, মানুষের ভীড়ের চাপে আমার দম বন্ধ হয়ে আসছিলো, নড়তেও পারছিলাম না, হাতে ধরা তিন বছরের মিশাকে বাঁচাবো কী করে! চারদিকে চেঁচামেচী, ধাক্কাধাক্কি, ছোট গেট দিয়ে সবাই আগে বের হতে চাইছে! আমার পাশে থাকা ভীড়ের কেউ একজন মনে হয় টুপ করে মিশাকে তুলে সামনে এগিয়ে দিয়েছে, মিশার বাবা দুই হাত বাড়িয়ে মিশাকে তুলে নিতে পেরেছিল।

মানুষের চাপে মৃত্যু কিভাবে হয়, তার একটা মহড়া দিয়ে ফেলেছি। মৃত্যুর দ্বারপ্রান্ত থেকে বেরিয়ে কিন্তু মৃত্যুর কথা মনে ছিল না, ছুটেছি চারুকলার দিকে। কারণ মানুষের ভীড়ে মরতে রাজী থাকলেও চারুকলার সেই মঙ্গল শোভাযাত্রা মিস করতে রাজী ছিলাম না। মঙ্গল শোভাযাত্রা বের হতো চারুকলা থেকে। শোভাযাত্রা এত বড় হতো, কত মুখোশ, বিশাল সাইজের হাতী ঘোড়া বাঘ ময়ুর পেঁচা নিয়ে দীর্ঘ শোভাযাত্রার শুরু থেকে শেষ দেখা যেতোনা, এত মানুষ অংশ গ্রহণ করতো এই মিছিলে। মিছিল দেখার জন্য পথের দুই পাশে হাজার হাজার উৎসবমুখর মানুষের ভিড়, আহা, আমার প্রাণ জুড়ানো দেশ, মন জুড়ানো পহেলা বৈশাখ!

যে বছর রমনার মূলে বোমা ফেটেছিলো, সেখানে আমার থাকার কথা ছিলো। কিনতু পরের দিন আমার বি এড পরীক্ষা ছিলো বলে উত্তরা থেকে অত সকালে আর যাওয়া হয়নি। তবে টিভিতে বোমার ঘটনা দেখে আর থাকতে পারিনি, বিকেলের দিকে গিয়েছি খুব কাছাকাছি। এরপর চলে এসেছি। পরদিন পরিক্ষা দিয়েছি, সব পরীক্ষা শেষে বাংলাদেশ থেকে আমেরিকা চলে এসেছি।

মনটা খারাপ লাগে, দেশের শেষ পয়লা বৈশাখটা আমার করে আসা হলো না।
আমেরিকা আসার পর বেশ কয়েক বছর তিন মেয়েকে নিয়ে ঘরেই পয়লা বৈশাখ করেছি, কিনতু এখন আর সেটাও হয়ে ওঠেনা। তিন মেয়ের তিনজনেই কর্ম এবং লেখাপড়ার কারণে দূরে থাকে। মন চাইলেই যখন তখন আসা হয়না।
ওদের হয়তো মন খারাপ হয়। ওরা হয়তো ভাবে, বছরের প্রথম দিন মন খারাপ করে থাকলে সারা বছর মন খারাপ যাবে। কারণ আমিই আমার মেয়েদেরকে শিখিয়েছি, বছরের প্রথম দিন যা করবে, সারা বছর তাই করবে। ভাল করলে ভাল খারাপ করলে খারাপ। শিখিয়েছি তো অনেক কিছুই, কে জানে ওরা কতখানি ধরে রাখতে পারবে! একবার মনে হয় মেয়েরা তাদের ছেলেমেয়েদের এগুলো শেখাবেনা, পরক্ষণেই মনে হয়, অবশ্যই শেখাবে, প্রতিটি মানুষ তার শেকড় ধরে রাখতে চায়। আমি থাকবোনা, আমাকে পেতে গেলে তো ওভাবেই খুঁজতে হবে, শেকড়ের মাঝেই খুঁজতে হবে।

বিয়ের আগে পর্যন্ত আমাদের বাসায় পহেলা বৈশাখে আমরা ভাই-বোন, মা বাবা সব সময় একসাথে কাটিয়েছি। এখন মনে হয়, কি ভুল বিশ্বাস মনে আঁকড়ে ছিলাম যে বছরের প্রথম দিন যা করা হবে সারা বছর সেভাবেই দিন যাবে। তা-ই যদি হতো, তাহলে আমরা চার ভাইবোন চার জায়গায় ছিটকে পড়তামনা। আবার ভাবি, একসাথে থাকতে পারিনা ঠিকই, কিনতু প্রতিটা দিন আমরা একের সাথে অন্যের রক্তের বন্ধন টের পাই, খুব বেশীই টের পাই। আমরা ভাইবোনেরা বুঝতেই পারিনা, আমরা পরস্পর থেকে সাত সমুদ্দুরসম দূরত্বে আছি।

তারপরেও সুযোগ এবং সময়ে মিলে গেলে কিছু বাঙালি একত্র হয়ে নিজেদের সাধ্যে যতখানি কুলোয় ততখানিই উৎসব আমেজে মাতিয়ে তুলতে চেষ্টা করি বাংলা নববর্ষের প্রথম দিনটিকে। সেতো জোড়াতালির জীবন, জোড়াতালির উৎসব , জোড়াতালি দেয়া আনন্দ। এই আনন্দ, এই উৎসব নিয়ে কি লেখা যায়! কতখানি লেখা যায়! আমরা কি পারি রমনা বটমূলকে আমাদের ম্যাগনোলিয়া গাছের নীচে নিয়ে আসতে! আমরা কি পারি তালপাতা দিয়ে বাঁশি বানাতে! নিমকি মুড়লি পিঠা পায়েস বানাতে পারি, কিন্তু তিলা কদমা চিনির খেলনা বিন্নি ধানের খই পাই কই!

*** লেখাটি ছয় বছর আগে লেখা, তখন আমার মা বেঁচে ছিলেন। ছয় বছরে আমার জীবনেও অনেক পরিবর্তন এসেছে। দুই বছর আগে পহেলা বৈশাখে বাংলাদেশে ছিলাম, ছিলাম রমনার বটমূলে। সাথে ছিল না কেউ, ছোটবেলার সাথী দিদিমা, মা, মাসী, ভাই বোন, বড়বেলার সাথী আমার স্বামী, তিন কন্যার কেউ! তবুও ঘুরে বেড়িয়েছি রমনার বটমূল থেকে শাহবাগ চত্বর, শাহবাগ থেকে আর্ট কলেজ!

এক বুক হাহাকার নিয়ে খুঁজে বেড়িয়েছি হারিয়ে যাওয়া শৈশব, কৈশোর, যৌবন! কান পেতে শুনতে চেয়েছি তালপাতার বাঁশী, বাঁশের বাঁশী, প্লাস্টিকের বাঁশীর সেই প্যাঁ পোঁ আওয়াজ, ঢোলের ঢুম ঢুম আওয়াজ, খুঁজে ফিরেছি নারায়ণগঞ্জের সেই মেলার নিমকি, মুরলি, পিঠি! খুঁজেছি নিরন্তর, কিন্তু হঠাৎ খেয়াল হয়েছে, ” হঠাৎ দেখি অনেকটা পথ চলে এসেছি”!

রীতা রায় মিঠু

[ প্রিয় পাঠক, আপনিও বিডিসারাদিন24 ডট কম অনলাইনের অংশ হয়ে উঠুন। লাইফস্টাইল, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, রান্নার রেসিপি, ফ্যাশন-রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন- bdsaradin24@gmail.com-এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে। নারীকন্ঠ এবং মত-দ্বিমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে  bdsaradin24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরণের দায় গ্রহণ করে না। ]

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 151 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ
bdsaradin24.com