ফার্মেসীতে এ-গ্রেড ফার্মাসিস্ট নিয়োগ করাটা কতটা জরুরী?

Print

রাজকুমার অরফে রাজু। কলেজের দ্বিতীয় বর্ষে পড়া টগবগে যুবক। তার এখন লেখাপড়া করার পাশাপাশি নেচে-গেয়ে-আড্ডা দিয়ে বন্ধুদের সংগে ঘুরে বেড়ানোর কথা। অথচ আজ কয়েকদিন এই গ্রীক কাটিং এর রাজপুত্রটি হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে কাতরাচ্ছে। পাশে বাবা-মা দুইজন বসা, আরো অনেক আত্মীয় স্বজনে ঠাসা কেবিনের চারপাশ। তাঁদের চোখ অশ্রুসিক্ত। একবার ডাক্তার আবার নার্সের কাছে দৌড়াচ্ছেন। এটা-ওটা, যখন ডাক্তার যা বলছে তখন তা টেস্ট করাচ্ছেন। যদি এবার সোনামানিক প্রানে বেঁচে যায়। ঘটনাটি কি ঘটেছিল এই কলেজ পড়ুয়া যুবাটির সাথে?

৫/৬ দিন আগে কলেজ থেকে বাড়ী ফেরার পথে গাড়ির সাথে ধাক্কা খেয়ে পায়ে ব্যথা পায় এবং খুব স্বাভাবিকভাবেই বাড়ির/বাসার কাছের ফার্মেসী বা ওষুধের দোকানে যায়। ওষুধের দোকানদার (খেয়াল করুন, আমি ফার্মাসিস্ট বলছি না) তাঁকে ব্যথার ওষুধ (ডাই ক্লোফেনাক সোডিয়াম) ও এন্টিবায়োটিক খেতে দেয়। কিন্তু ব্যথার ওষুধের সাথে কোন এন্টাসিড (রেনিটিডিন বা অমিপ্রাজল) দেয় নাই। ব্যথার ওষুধ তিন বেলা খেতে বলে দেয়। যুবকটি ওষুধ সেবন করতে থাকে। দ্বিতীয় দিন থেকে সে পেটে ব্যথা অনুভব করতে শুরু করে এবং তৃতীয় দিনে সে পেটের ব্যথায় এতোই কাতর হয়ে পড়ে যে তার বাপ-মা তাঁকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলে ডাক্তার সব শুনে তক্ষুনি তাকে হাসপাতালে ভর্তি করতে বলে এবং ছেলেটি হাসপাতালে এখন মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে।

আমার মনে পড়ছে আরেক তরুনপ্রান, তরতাজা যুবক হাফিজের কথা। হাফিজের বাড়ি ছিল টাঙ্গাইল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিজিক্স বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ছিল হাফিজ। শহীদুল্লাহ হলের ছাত্র ছিল হাফিজ (আমিও শহীদুল্লাহ হলের ছাত্র ছিলাম)। দাঁতের ব্যথার জন্য ডাক্তারের কাছে গেলে ডাক্তার দাঁত তুলে ফেলে। বাকি চিকিৎসা হিসাবে ব্যথার ওষুধ (ডাই ক্লোফেনাক সোডিয়াম) ও এন্টিবায়োটিক দেয় কিন্তু কোন এন্টাসিড (Antacid, H2 blocker or Proton pump inhibitor or chewing antacid) দেয় নাই। রাতে ব্যথার ওষুধ খেয়ে হাফিজ ঘুমাতে যায়। মাঝরাতে তার পেট ব্যথা শুরু হয়। প্রচন্ড ব্যথা। তার গোঙ্গানির শব্দে রুমমেটগন জেগে উঠেন। তাড়াতাড়ি রুমমেটগন মিলে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইমার্জেন্সী বিভাগে নিয়ে যায়। শুরু হয় ডাক্তার আর যমের টানাটানি। হাসপাতালে নেওয়ার পথেই হাফিজের রক্তক্ষরন শুরু হয়। বিনা এন্টাসিডে ব্যথার ওষুধ খাওয়ায় অতিরিক্ত এসিড নিঃসরনের ফলে হাফিজের পাকস্থলী ঝাঁঝরের মত (perforated) ছিদ্র হয়ে যায়। সূর্য উঠার আগেই ডাক্তারগন হাফিজকে মৃত ঘোষনা করেন। অকালে ঝড়ে যায় একটি তরুন তরতাজা প্রান।

আমরা যদি আমাদের সমাজে একটা সার্ভে করি তবে ওষুধের এই রকম নির্বিচার বা অযৌক্তিক (Irrational) ব্যবহারের কারনে অনেক লোক মৃত্যু বরন করেছেন এই রকম অনেক তথ্য-উপাত্ত জানতে পারব। বস্তুত আমাদের সবারই ওষুধের অপব্যবহার বা অতি ব্যবহারজনিত বা অযৌক্তিক (Irrational) ব্যবহারজনিত ক্ষয়-ক্ষতির অভিজ্ঞতা আছে।

ওষুধের সুষ্ঠু / যৌক্তিক ব্যবহার (Rational Use of Drugs) নিশ্চিত করতে হলে প্রতিটি ওষুধের দোকানে একজন যোগ্য (এ-গ্রেড) ফার্মাসিস্টের নিয়োগদান নিশ্চিত করতে হবে। আর তা যদি আমরা করতে না পারি, তাহলে হাফিজের মত বহু তাজা প্রান অকালে ঝড়ে যাবে। রাজুর মত বহু তরুন যুবক হাসপাতালের বেডে কোকাবে-কাতরাবে। আর আমরা হায় হায় করতে থাকব। আফসোস করতে থাকব।

সেই জন্য আমি বাংলাদেশ সরকারের নিকট আকুল আবেদন রাখছি – Pharmacy Practice Act নামে নুতন আইন করে বাংলাদেশের সকল ওষুধের দোকান তথা ফার্মেসীতে এ-গ্রেড (A-Grade) ফার্মাসিস্টের নিয়োগদান নিশ্চিত করুন।

ড. মো. শাহ এমরান
(প্রফেসর, ফার্মেসি অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়)

[ প্রিয় পাঠক, আপনিও বিডিসারাদিন24 ডট কম অনলাইনের অংশ হয়ে উঠুন। লাইফস্টাইল, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, রান্নার রেসিপি, ফ্যাশন-রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন- bdsaradin@gmail.com-এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে। নারীকন্ঠ এবং মত-দ্বিমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে  bdsaradin24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরণের দায় গ্রহণ করে না। ]

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 214 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ
bdsaradin24.com