বাংলা নববর্ষ উদযাপনে দুই বাংলায় দুই নিয়ম!

Print

বাংলাদেশে আজ ১৪ই এপ্রিল তারিখে বাংলা নববর্ষ উদযাপিত হলো। পশ্চিমবঙ্গে আজ ছিল চৈত্রসংক্রান্তি, আগামীকাল ১৫ই এপ্রিল বাংলা নববর্ষ উদযাপিত হবে।

বাংলা বর্ষ পঞ্জিকা অনুযায়ী ইংরেজী লিপ ইয়ার ব্যতীত ১লা বৈশাখের তারিখ মিলে যায় ১৫ই এপ্রিল তারিখের সাথে। শুধু ইংরেজী লিপ ইয়ারে ১৪ই এপ্রিল ১লা বৈশাখ।

পঞ্জিকার ব্যবহার হত গ্রামবাংলায়, কৃষিকাজে কৃষকদের সুবিধা অসুবিধা নির্ণয়ে। আর ব্যবহৃত হতো হিন্দু সমাজে, গ্রহ নক্ষত্রের হিসেব করতে, পূজো পার্বণ, ব্যবসা বাণিজ্য, বিবাহ, অন্নপ্রাশনের লগ্ন বিচার করতে।

বাংলাদেশের বর্তমান প্রজন্ম জানে, ১লা বৈশাখ মানে রমনা বটমূলে প্রভাতী সঙ্গীত, ছেলেরা পায়জামা পাঞ্জাবী পরে, মেয়েরা লাল সাদা শাড়ি পরে ইলিশ পান্তা খাওয়ার উৎসব। সাজতে ভালোবাসে বাংলার মেয়েরা, তাই নববর্ষে শাড়ি চুড়ি পরে সাজবার সুযোগ পায়।

কিন্তু মুলত রমনা বটমূলে আনুষ্ঠানিক নববর্ষ উদযাপনের রীতি চালু হয়েছিল এই সেদিন, পূর্ব পাকিস্তান আমলে।

পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী যখন বাংলায় ঊর্দু সংস্কৃতি চালু করার প্রয়াসে বাঙালির প্রতিটি সংস্কৃতিতে হিন্দুয়ানীর গন্ধ পেতো, ভারতীয় গন্ধ পেয়ে বাংলার মুসলমানি করতে চেয়েছিল, বীর বাঙালী যার যার অবস্থান থেকে পশ্চিমাদের বাংলা বিরোধী তৎপরতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতো।

ছায়ানটের ডঃ সনজিদা খাতুন, ওয়াহিদুল হক এবং আরও কিছু সংস্কৃতানুরাগী শিল্পীবর্গ বাংলা পঞ্জিকানুযায়ী নির্ধারিত নববর্ষের ঊষালগ্নে রমনা বটমূলে প্রভাতী সঙ্গীতের সুরে নতুন বাংলা বছরকে আবাহন করার এই নান্দনিক রীতি চালু করেছিলেন।

পশ্চিমবঙ্গে আজও পঞ্জিকামতে বাংলা বছরের হিসেব হয়, বাংলাদেশেও কৃষকসমাজ, এবং হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা পঞ্জিকা মতে বাংলা বছরের হিসেব করে।
পঞ্জিকার হিসেব বদলে গেছে বাংলাদেশে সরকারী হিসেবে, সরকারী খাতায়।

বাংলা নববর্ষ পহেলা বৈশাখ বাঙালি সংস্কৃতি ঐতিহ্যের দিন। বিদায় বছরের শেষ দিন, চৈত্র সংক্রান্ত ও নতুন বছরের প্রথম দিন পহেলা বৈশাখ বাঙালি সংস্কৃতির ধারক বাহক হিসাবে বিদ্যমান। বাংলা সন আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্য ধারক বাহক। তবে বাংলা সনের ইতিহাস নিয়ে নানা মতভেদ রয়েছে। বাংলা সন কার দ্বারা কবে কোথায় প্রবর্তিত হয়েছে তা নিয়ে পন্ডিত জ্যোতিষ বিজ্ঞানীদের মধ্যে বিতর্ক রয়েগেছে।
বাংলা সনের প্রবর্তক নিয়ে বিতর্ক চলছে বহুদিন যাবৎ। এতদিনের বিতর্কের পরও বাংলা সন প্রবর্তকের নাম প্রশ্নবিদ্ধ, মিমাংসা হয়নি। তবে অধিকাংশ পন্ডিতের মতে আর্যভট্ট (৪৭৬ খ্রীষ্টাব্দ), বরাহমিহির (৪৮৭-৫৮৭ খ্রীষ্টাব্দ) এবং ভাস্করাচার্য (১১৬৪ খ্রীষ্টাব্দে) বর্ষপঞ্জী নির্মানে বিশেষ গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা গ্রহন করেন। অনেকের ধারনা গেীড়ের অধিপতি শশাঙ্কই (শশাঙ্ক নরেন্দ্র গুপ্ত) সর্বপ্রথম বৈশাখ মাস থেকে গননা করে বঙ্গাব্দের প্রচলন করেন। ঐতিহাসিক প্রমাণ অনুযায়ী গৌড়বঙ্গ ও বাঙালী জাতিকে শশাঙ্কই সর্বপ্রথম স্বমর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। কজেই তাঁরই উদ্যোগে যে বঙ্গাব্দের প্রচলন হয়েছিল, এমন ধারনাকে অমূলক বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে ইতিহাসের তথ্য-প্রমান অনুসরনে যে সম্পর্কে এ বিষয় কোন দ্বিমত নেই, তা হল- বাংলা ক্যালেন্ডার ১৫৮৪ খ্রীষ্টাব্দে বিক্রমসংবৎ অনূশরণ করে লেখা হয় মোগল শাসনকালে। সম্রাট আকবরের সময়কাল অর্থাৎ ৯৬৩ বঙ্গাব্দ বা ১৫৫৬ খ্রীষ্টাব্দ থেকে ১লা বৈশাখে নববর্ষের দিনটির আনুষ্ঠানিক উদযাপন প্রথা শুরু হয়। তাই বাংলা সনের প্রবর্তক সম্রাট আকবরকেই বলা হয়।
বাংলা সনের ইতিহাস ভিত্তিক বির্তকের পর বাংলা তারিখ নিয়ে শুরু হয়েছে নতুন বির্তক। মতভেদে বাংলা সনের প্রবর্তকের নাম আমাদের নিশ্চত ভাবে আজও জানা সম্ভব হয়নি। বাংলা সন, হিজরী চন্দ্র সনের সৌররূপ তা সকলেই স্ব^ীকার করেন। চন্দ্র পরিক্রময়ের সঙ্গে হিজরী সন সম্পৃক্ত হওয়ায় এ সনের মাস কোনো নির্দিষ্ট ঋতুর সঙ্গে বজায় থাকে না। চান্দ্র সনের বছর ৩৫৪দিনে আর সৌর সনের বছর ৩৬৫ দিনে। চান্দ্র সনের বছর ৩৫৪ দিনে হওয়ায় চাষীরা আগের বছর যে তারিখে ফসল কেটেছিল তা পরের বছর ১১ দিন এগিয়ে গেছে। ফলে ফসল কাটার অসুবিধা হতো। যে কারণে রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে দারুন জটিলতা সৃষ্টি হয়। সম্রাট আকবর রাজস্ব আদায়ের সুবিধার্থে নতুন সৌরসন উদ্ভাবনের লক্ষ্যে ১৫৮৪ খৃষ্টাব্দে পন্ডিত জ্যোতিষ বিজ্ঞানী আমির ফতেহউল্লাহ সিরাজীকে দায়িত্ব অর্পন করেন। তিনি সে সময় বিভিন্ন পঞ্জিকা পরীক্ষা নিরিক্ষা ও পর্যালোচনা করে হিজরী সনের মর্যাদা অক্ষুন্ন রেখে নতুন সৌর সন করেন। তিনি হিজরী চান্দ্র সনের বছর ৩৫৪ দিনের স্থলে ৩৬৫ দিনে এনে নতুন সনের উদ্ভাবন করেন। যাহা বাংলা সন নামে প্রচালিত হয়। ঐতিহাসিক সুকময় মুখোপাধ্যায়কে বাংলা সনের প্রবর্তক হিসাবে সম্রাট আকবর স্বীকার করেননি। সুলতান আলাউদ্দীন হোসেন শাহ অথবা মুর্শিদ কুলি খান, বাংলা সন নিয়ে জোরালো যুক্তি প্রমাণ থাকা সত্বেও বিষয়টি অমিমাংসিত।মানব সভ্যতার সুচনাকাল থেকে তিথি নক্ষত্র ও সময়ের হিসাব ধরে রাখার উন্মেষ সৃষ্টি হয়। এক দিকে সুর্যের পরিক্রমার হিসাব ধরা হয় অন্যদিকে চন্দ্রের পরিক্রমার হিসাব ধরা হয়। সুর্য্যরে নিজ কক্ষে ঘুরতে প্রায় ৩৬৫দিন ৫ঘন্টা ৪৮মিনিট ৪৬সেকেন্ড সময় লাগে। এ সময় কে বলা হয় সৌর বছর। চান্দ্রকলার বৃদ্ধি ও হ্রাসকালের সময় লাগে ২৯দিন ১২ঘন্টা। এ কারনে চন্দ্র তার কক্ষ পথ ঘুরতে সময় নেয় ৩৫৪দিন ৮ঘন্টা ৪৮মিনিট। এ সময়কে বলা হয় চান্দ্র বছর। হিজরী চান্দ্র সনই বাংলা সনের রূপ।
হিন্দুদের পুজা পার্বন তিথি-নক্ষত্র, শুভলগ্ন, বিবাহ, ব্যবসা বাণিজ্য শুরু করতে কোথাও যেতে হলে শুভ দিনক্ষণ দেখার বিশ্বাস থেকে পঞ্জিকার সূচনা হয়েছে। জ্যোতিষ শাস্ত্র অনুযায়ী গ্রহ নক্ষত্রের অবস্থান তিথি থেকে জ্যোতিষিরা পঞ্জিকা তৈরী করেন। বর্তমান পশ্চিমবঙ্গ থেকে এরূপ ৪/৫ টি পঞ্জিকা প্রকাশিত হচ্ছে যার অনুকরণে বাংলা দেশেও ৪/৫টি পঞ্জিকা প্রকাশিত হচ্ছে। ১৯৫২ সালে ড. মেঘনাথ সাহা ভারতীয় পঞ্জিকা বিজ্ঞান ভিত্তিক সংস্কার করেন। তাতে বাংলা পঞ্জিকা সংস্কারেরও সুপারিশ ছিল। ১৯৬৩ সালে ড. মোঃ শহিদুল্লাহর নেতৃত্বে বাংলা একাডেমী পঞ্জিকা সংস্কার করেন। সংস্কারকৃত বাংলা পঞ্জিকা ১৯৮৬ সালে সরকারি ভাবে ব্যাপকভাবে প্রচালিত হয়। পঞ্জিকার সংস্কারে বাংলা সনের মাসগুলো নির্দিষ্ট সংখ্যক দিবসে ধরা হয়। বাংলার প্রথম মাস বৈশাখ থেকে ভাদ্র পর্যন্ত প্রত্যেক মাস ৩১দিন এবং আশ্বিন থেকে চৈত্র মাস ৩০দিন করে। অতিবর্ষ (লিপিয়ার) মাস চৈত্র ৩১ দিন হবে। ভারতের জ্যোতিষ বিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞদের সমন্বয় গঠিত কমিটি ১৪ এপ্রিলকে বাংলা নববর্ষ হিসাবে নির্দিষ্ট করেছেন। বাংলাদেশের বাংলা একাডেমী ১৪ এপ্রিল বাংলা নববর্ষ এই একই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। তার পরও দু’বাংলায় (বাংলাদেশ ও পশ্চিম বঙ্গ) বাংলা নববর্ষ ভিন্ন ভিন্ন দিনে উদযাপিত হচ্ছে। এর ফলে বাংলা নববর্ষ সহ গুরুত্বপূর্ণ দিন নিয়ে বাংলাদেশ ও পশ্চিম বঙ্গে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান আচার উদযাপনে বিভ্রান্ত হচ্ছে। এখন বাংলাদেশ ও পশ্চিম বঙ্গে ২টি নিয়মে বাংলা পঞ্জিকায় ভিন্ন ভিন্ন তারিখ। বাংলা সনের তারিখ ব্যবহারে আমাদের নতুন এক বিড়ম্বনার সৃষ্টি। বাংলাদেশ পঞ্জিকায় পয়লা বৈশাখ রবিবার আর পশ্চিমবঙ্গের বাংলা পঞ্জিকায় পহেলা বৈশাখ সোমবার একই বাঙালির উৎসব দুই দেশে ভিন্ন ভিন্ন তারিখে উদযাপিত হচ্ছে। এতে বাঙালি জাতি দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের হিন্দুরা ধর্মীয় ক্রীয়া কর্ম সামাজিক অনুষ্ঠান পশ্চিম বঙ্গের বাংলা পঞ্জিকা মতে শুরু থেকে পালন করে আসছে। ধর্মীয় ক্রিয়া পালনে অসুবিধা না হলেও বিপত্তি ঘটে পহেলা বৈশাখে। গত বছর অর্থাৎ ১৪২২ সনের পহেলা বৈশাখ বাংলাদেশে মঙ্গলবার উদযাপিত হয়েছে, আর পশ্চিমবঙ্গে বুধবার। বাংলাদেশের হিন্দুরা এর একটি সুনির্দিষ্ট সমাধান চায়। তারা মঙ্গলবার ধর্মীয় মতে চৈত্র সংক্রান্তি পালন করেছে, আবার ঐ দিন জাতীয় ভাবে বাংলাদেশে বাংলা নববর্ষ পহেলা বৈশাখও পালন করেছে। বাংলাদেশের হিন্দুরা পড়েছে মহা-বিড়ম্বনায়। তারা একই দিন চৈত্র সংক্রান্তি ও পহেলা বৈশাখের উদযাপন নিয়ে বিভাজনে বাঁধা পড়েছে। তবে গত বছর অর্থাৎ ১৪২৩ সনের পহেলা বৈশাখ বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে একই দিন বৃহস্পতিবার উদযাপিত হয়েছে। আবার বর্তমান বছর অর্থাৎ ১৪২৪ সনের পহেলা বৈশাখ বাংলাদেশে শুক্রবার উদযাপিত হচ্ছে, আর পশ্চিমবঙ্গে হবে শনিবার। বাংলাদেশের হিন্দুদের, তথা সকল বাঙ্গালীর জন্য এর একটি সুনির্দিষ্ট সমাধান হওয়া উাচৎ। তারা শুক্রবার ধর্মীয় মতে চৈত্র সংক্রান্তি পালন করবে, আবার ঐ দিন জাতীয় ভাবে বাংলাদেশে বাংলা নববর্ষ পহেলা বৈশাখও পালন করবে। বাংলাদেশের হিন্দুরা সহ সচেতন ও বিজ্ঞ মহল পড়েছে মহা-বিড়ম্বনায়। তারা একই দিন চৈত্র সংক্রান্তি ও পহেলা বৈশাখের উদযাপন নিয়ে বিভাজনের বাঁধা মক্ত হতে চায়। বাঙালি জাতির অত্যন্ত গুরুত্বপুর্ণ ও ঐতিহ্যবাহী দিন বাংলা নববর্ষ পহেলা বৈশাখ। জাতির মুল বৈশিষ্ট নববর্ষের স্বতঃস্ফুর্ত আনন্দ। পহেলা বৈশাখ মানেই বর্ষ বরণ। নতুন বছরকে স্বাগত জানানো। জাতি ধর্ম নির্বিশেষে শুভেচ্ছা জানানোর দিন। উৎসব আর মিলন মেলায় সম্প্রিতির অটুট বন্ধনের দিন। বাংলা সনের তারিখ বিভক্তি থেকে পহেলা বৈশাখ সহ জাতির উৎসবের দিন বিড়ম্বনা মুক্তি পাক। নববর্ষের নব প্রহরে প্রার্থণা যা কিছু গ্লানিময় জরাজীর্ণ ক্লেদাক্ত ও পুরাতন তা বৈশাখের রুদ্র দহনে পুড়ে ছাই হোক, শুচি হোক পৃথিবী ।

[ প্রিয় পাঠক, আপনিও বিডিসারাদিন24 ডট কম অনলাইনের অংশ হয়ে উঠুন। লাইফস্টাইল, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, রান্নার রেসিপি, ফ্যাশন-রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন- bdsaradin24@gmail.com-এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে। নারীকন্ঠ এবং মত-দ্বিমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে  bdsaradin24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরণের দায় গ্রহণ করে না। ]

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 62 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ
bdsaradin24.com