বাবার মুখে হাসি নেই

Print

ক’দিন আগে ও বাবাকে দেখলাম, খুব উৎফুল্ল। খোশ মেজাজ,বোধগম্য কোন সুখবর হয়তো আছে।আর প্রায় বাবা ভালো খবর পেলে এমনটা করে।বাবা কৃষক মানুষ। ভাল-মন্দ আর কি বোঝেন! ওতো খবর রাখেন না।শুধু ধান,পাট,চাল,গম,কলা পটল,এসবের খবর। অন্য কিছুতে বাবার যায় আসে না। বাবার অতি উৎফুল্লতার কারণ পালা ভরা আমন ধানগুলো।
অতি উৎসাহের সাথে বাবা পালায় করা ধানগুলো ৬জন শ্রমিক লাগিয়ে মাড়ায় করে নিলেন।পাশের গ্রামের ধান ব্যাপারী সুবাসকে মুঠোফোনে কল দিয়ে কথা বলে বাবার উৎসাহে ভাঁটা পড়ল। ভাঁটা পড়ার কারন আমন ধানের দাম প্রতি মনে ৪০-৫০ টাকা বেড়ে ফের আবার কমেছে।
মোটামোটী রাত ১০.০০ টায় বাবা মেঝেতে শীতল পাটি বিছিয়ে রাতের খাবার খেতে বসেন। মার সাথে বুদবুদ করে গল্প করেন। গল্পের প্রসঙ্গ ঐ ধান,চাল,পাট,গম,সব্জি কলা ইত্যাদি।
বাবার গল্প আর চিন্তাগুলো আমার কাছে নিছক বিরক্তি কর। গুরুত্বহীনও বটে। কারণ,আমি এতটুকু বোধ করতাম,যাই হোক হয়তো বাবাকে লোকসানের মুখে পড়তে হয় না। এই ফসল ফসল করে এতো চিন্তা আমার কাছে ভালো ও লাগার কথা নয়। বলা ভালো,আমি কৃষকেরই সন্তান। তাই কৃষকের কষ্ট আমাকে নাড়া দেয়।ব্যাপারী সুবাসের সাথে কথা বলার পর বাবার মলিন মুখ। দেখে জিজ্ঞেস করলাম,এতো চিন্তা করেন কেন? যা হবার তাই-হবে।ভাগ্যতো আর কেউ বদলাতে পারবে না।বাবা আমাকে বললেন,দেখতো হিসেবটা।
বাবার উৎফুল্ল মুখটা ভার হওয়ার মাঝেও যুক্তি আছে।সরকার কর্তৃক ২৫ টাকা কেজি দরে ধান কেনার খবর জানে বাবা।কিন্তু সুবাসের মুখে শোনার পর হতাশায় পড়ে যান।কারন সুবাস আর ধানই কিনেন নি।বাজার অনিশ্চয়তা সুবাসকেও হতাশ করেছে।
আমন ধানের দাম হঠাৎ বেড়ে যায়। ঠিক তখনই বাবা আনন্দিত। আর যখন নামতে শুরু করল,তখন হতাশা।তবে আশা ছাড়েনি বাবা। লোকসান যাতে না হয়, সেকারনে এখনও আমনের ধান স্টকে আছে।আবার এরই মধ্যে ইরি ধান কাটাও শুরু হয়েছে।ইরি ধানে বাবার সাথে বসে হিসাব-নিকাশ কষে যা বুঝলাম,ধানের বীজতলা হতে শুরু করে বপন পর্যন্ত খরচ প্রতি বিঘায় ২০০০ টাকা,নিড়ানী ও ঔষুধ খরচ-১৫০০ টাকা,সারবাবদ ১৫শত থেকে ২ হাজার টাকা ধান কাটা মাড়াই,বিঘায় ৪ হাজার টাকা।পানিসেচ-১৩,শ টাকা,আরও আনুসাঙ্গিক বের হবে-নিজস্ব জমি তাই, লিজ ধরলাম না।সর্বসাকুল্যে, একবিঘা ধানে মোট খরচ-১০-১২ হাজার টাকা।ঝড় ও শিলাবৃষ্টি,ও নানা রোগে আক্রান্ত হওয়াই,ধানের ফলন কম।বিঘা প্রতি ২০ মন ধরলে ও এর বিক্রি দাম, ৫০০ টাকা মন দরে-১০০০০ টাকা।
সব মিলিয়ে বিঘা প্রতি লোকসান গুনতেই হচ্ছে।ব্যক্তিগত শ্রম বৃথা।আবার এরই মাঝে কৃষকপাড়ায় শ্রমিক সংকট এখন মহামারী।ধারাবাহিকভাবে চলছে এ ধারা।সব মিলিয়ে ভালো থাকার গল্পটা কৃষকের ঘরে বেমানান।
গত একবছরে ফসলের হিসাব-নিকাশ করলে কোন ফসলেই লাভ মুখ দেখতে পায় নি কৃষকরা।পেঁয়াজের দাম ছিল,৩ টাকা মন,আলু ৩শ টাকা মন,ঝড় বৃষ্টি শিলাবৃষ্টিতে ক্ষতি গ্রস্থ হয়েছে, বেগুন,কলা পটল সহ নানা ফসল।এবার অনেক লোকসান হবে বাবার।
বাবার পেশা কৃষি।আয়-ব্যয়ের উৎসও কৃষি।গত কয়েকবছর হতেই লোকসানের ঘানি টানতে টানতে বাবা কৃষির উপর অনীহা।খোঁজেন বিকল্প আয়ের পথ।কিন্তু কৃষির মায়া ছাড়তে পারেনা।হয়তো আমাদের চারিপার্শে তাকালে বাবার মতো লোকের অভাব নেই।যাদের আশা-ভরসার শেষ ঠিকানা কৃষি।যারা ঝড়,জলোচ্ছাস ঝ া,সবকিছু উপেক্ষা করে ফসল ফলায়।আর বসে থাকেন সুখবরের অপেক্ষায়।একটু ভালো খবর পাবার আশায়। ন্যায্য মুল্যে ফসল বিক্রির আশা।যে কোন ভাবেই হোক না কেন কৃষি স্বপ্ন বাস্তবায়নেও ন্যায্য মুল্য পাওয়ার অধিকার আছে কৃষকদের।বাবার মনটা আবারও উৎফুল্ল হোক এই কামনা।কৃষক হতাশামুক্ত করতে যাবতীয় পদক্ষেপ না নিলে কৃষি হয়তো বিলুপ্ত হবে।বাবার মতো কৃষকরা দুচোখে জল ঝরাবে।

মোঃ ছরোয়ার হোসাইন সুমন
লেখক:-সংবাদকর্মী

[ প্রিয় পাঠক, আপনিও বিডিসারাদিন24 ডট কম অনলাইনের অংশ হয়ে উঠুন। লাইফস্টাইল, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, রান্নার রেসিপি, ফ্যাশন-রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন- bdsaradin24@gmail.com-এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে। নারীকন্ঠ এবং মত-দ্বিমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে  bdsaradin24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরণের দায় গ্রহণ করে না। ]

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 149 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ
bdsaradin24.com