ভরসার প্রতীক সেই নৌকা-ধানের শীষ

Print
নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে নিজের প্রতীক ছেড়ে আওয়ামী লীগের নৌকা ও বিএনপির ধানের শীষে ভিড়ছে বাকি দলগুলো। ৩৯টি নিবন্ধিত দলের ১১টি ধানের শীষ প্রতীকে এবং ৮টি নৌকা নিয়ে ভোট করতে পারবে। বিকল্পধারাও কিছু আসনে নৌকা চায়। জাতীয় পার্টি নিজস্ব প্রতীক লাঙল নিয়ে নির্বাচনে গেলেও দলটি ভোট করবে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট বেঁধে। জামায়াতে ইসলামীর নেতারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হলেও তারাও তাকিয়ে আছেন বিএনপি জোটের মনোনয়নের দিকে।

নিবন্ধিত ৩৯টি দলের মধ্যে ২০টি আওয়ামী লীগ কিংবা বিএনপির জোটে যুক্ত। বড় দুই দলের বলয়ে আসতে অপেক্ষায় রয়েছে আরও কয়েকটি দল। নৌকায় চড়তে চায় নিবন্ধিত ইসলামী ঐক্যজোট ও ইসলামিক ফ্রন্ট। নিজের প্রতীক ছেড়ে জাতীয় পার্টির সম্মিলিত জাতীয় জোটের নিবন্ধিত খেলাফত মজলিস ও ইসলামী ফ্রন্ট লাঙ্গল প্রতীকে ভোট করতে চায়। বিকল্পধারার নেতৃত্বাধীন যুক্তফ্রন্টের শরিক হলেও আওয়ামী লীগের নৌকা চায় মুক্তিজোট ও বিজেপি (মতিন) নামে দুটি নিবন্ধিত দল। শুধু বাম গণতান্ত্রিক জোটের শরিকরা নিজ নিজ দলের প্রতীকে ভোট করতে সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্নেষক কলামিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ সমকালকে বলেছেন, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বাইরে যে দলগুলো রয়েছে, তারা ভোটের মাঠে দিন দিন দুর্বল হয়ে পড়ছে। এক সময় তারা উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ভোট পেলেও গত কয়েকটি নির্বাচনে ক্রমেই তাদের ভোট কমছে। কারণ, সাধারণ মানুষ জানে, আওয়ামী লীগ বা বিএনপিই ক্ষমতায় আসবে। তাই তারা দুই দলের একটিকে বেছে নিচ্ছে।

একই রকম মূল্যায়ন সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারেরও। তিনি বলেন, দ্বিদলীয় ব্যবস্থায় বাকি দলগুলোর পক্ষে ক্ষুদ্র ভোট ব্যাংক নিয়ে সংসদে প্রবেশ করা সম্ভব নয়। তাই আদর্শের মিল না থাকলেও ছোট দলগুলোর যার যা ভোট সম্বল, তা নিয়েই দুই দলের জোটে যাচ্ছে। এমপি হওয়াই একমাত্র উদ্দেশ্য।

১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত- চারটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের ফলাফল বিশ্নেষণ করেও দুই দলের বলয়ের ভোট বাড়ার চিত্র স্পষ্ট। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সম্মিলিত ভোট ছিল ৬০ দশমিক ৯ শতাংশ। সেবার নির্বাচনে জেতা বিএনপি গৃহীত ভোটের ৩০ দশমিক ৮ শতাংশ পেয়ে ১৪০ আসন ঘরে তুলেছিল। ৩০ দশমিক ১ শতাংশ ভোট পাওয়া আওয়ামী লীগ পেয়েছিল ৮৮ আসন। বাকিরা পেয়েছিল ৩৯ দশমিক ১ শতাংশ। সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট গিয়েছিল বড় দুই দলের বাইরে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বাইরে আসন ছিল ৭২টি। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে জামায়াত ১২ দশমিক ১ শতাংশ এবং জাতীয় পার্টি ১১ দশমিক ৯ শতাংশ ভোট পেয়েছিল। সংসদে দল দুটির আসন ছিল যথাক্রমে ১৮ ও ৩৫টি। এর বাইরেও অন্য দলগুলোর আসন ছিল ১৯টি।

সেবার থেকেই দুই দলের বাইরে আসন ও ভোটের সংখ্যা কমতে শুরু করে। ১৯৯৬ সালের ১২ জুনের নির্বাচনে জেতা আওয়ামী লীগ ৩৭ দশমিক ৪ শতাংশ ভোট নিয়ে ১৪৬টি আসন পেয়েছিল। ৩৩ দশমিক ৬ শতাংশ ভোট টেনে বিএনপি পেয়েছিল ১১৬ আসন। ২৯ শতাংশ ভোট পেয়েছিল বাকিরা। আগেরবারের চেয়ে ৪ শতাংশ বেশি ১৬ দশমিক ৪ শতাংশ ভোট পেয়েও হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের লাঙ্গল পেয়েছিল ৩২ আসন। ৮ দশমিক ৬ শতাংশ ভোট পাওয়া জামায়াতের ঘরে যায় মাত্র তিনটি আসন।

২০০১ সালে জোটের রাজনীতি শুরু করে বিএনপি। জোটবদ্ধ রাজনীতি শুরুর পর আওয়ামী লীগ ও বিএনপির জোটের বাইরে থাকা দলগুলোর ভোট কমছে। অষ্টম সংসদ নির্বাচনে নৌকা ও ধানের শীষের বাইরে ১৮ দশমিক ৪ শতাংশ ভোট পড়লেও সেবার জামায়াত, ইসলামী ঐক্যজোট ও বিজেপির ভোট গিয়েছিল বিএনপির জোটে। এ হিসাবে ২০০১ সালে মাত্র ১৩ শতাংশের কম ভোট পড়ে বড় দুই দলের বলয়ের বাইরে।

পরের নির্বাচনে তা কমেছে অর্ধেকের বেশি। নবম সংসদে প্রতিনিধিত্ব করা চার স্বতন্ত্র এমপি ও এলডিপির একজন সদস্যরা ছাড়া বাকি ২৯৫ জনই ছিলেন দুই জোটের প্রার্থী। পরিসংখ্যানে নৌকা ও ধানের শীষের বাইরে ১৭ দশমিক ৭২ শতাংশ ভোট পড়ার হিসাব দেখালেও সংসদে আসন পাওয়া জাতীয় পার্টি, জাসদ, জামায়াত, ওয়ার্কার্স পার্টি, বিজেপির মতো দলগুলো ছিল দুই দলের বলয়ে। তাদের ভোটসহ হিসাব করলে ছয় শতাংশেরও কম ভোট পড়ে দুই জোটের বাইরে।

২০০১ সালের ১ অক্টোবরের নির্বাচনে ২৭০ আসনে ধানের শীষ প্রতীক ৪১ দশমিক ৪ শতাংশ ভোট পায়। বিএনপি আসন পায় ১৯৩টি। আওয়ামী লীগ ৪০ দশমিক ২ শতাংশ ভোট পেয়েও মাত্র ৬২ আসন পায়। বিএনপির জোটে গিয়ে ৩১ আসনে নির্বাচন করা জামায়াত ৪ দশমিক ২৮ শতাংশ ভোট পেয়েও আসন পায় ১৭টি। জাতীয় পার্টি ৭ দশমকি ২২ শতাংশ ভোট পেয়েও আসন পায় মাত্র ১৪টি।

২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগও জোটের রাজনীতিতে প্রবেশ করে। ২৭১ আসনে নৌকা পায় ৪৯ দশমিক ১৩ শতাংশ আসন। নৌকা প্রতীক বিজয়ী হয় ২৩৫ আসনে। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মহাজোটের শরিক জাতীয় পার্টি পায় ৭ দশমিক ৪ শতাংশ ভোট। আসন পায় ২৭টি। ২৬৫ আসনে বিএনপির ধানের শীষ পায় ৩৩ দশমিক ১৫ শতাংশ ভোট। আসন পায় ৩১টি। বিএনপি জোটের শরিক জামায়াত ৪ দশমিক ৭ শতাংশ ভোট পেয়ে আসন পায় দুটি।

২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের জোট থেকে চারটি দল ভোটে অংশ নেয়। বিএনপির জোট থেকে অংশ নিয়েছিল পাঁচটি দল। আওয়ামী লীগ জোটের ওয়ার্কার্স পার্টি ও জাসদ জয়ী হওয়া আসনে নৌকা প্রতীকে ভোটে অংশ নেয়। একমাত্র জাতীয় পার্টি নিজস্ব প্রতীকে অংশ নেয়। বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের শরিক জামায়াত দলীয় প্রতীকে ভোটে লড়লেও বাকি তিন দল জামানত বাঁচাতে পারা আসনগুলোতে ধানের শীষে নির্বাচন করে।

আসন্ন নির্বাচনে দুই দলের জোট আগের চেয়ে সম্প্রসারিত হয়েছে। নৌকার যাত্রী বেড়েছে। ধানের শীষের প্রত্যাশী বেড়েছে। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোটের নিবন্ধিত আট শরিক দল জাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টি, সাম্যবাদী দল, গণতন্ত্রী পার্টি, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্ট-ন্যাপ, তরীকত ফেডারেশন ও জাতীয় পার্টি-জেপি নৌকা প্রতীকে ভোট করতে নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দিয়েছে। জোটের বাকি অনিবন্ধিত দলও ভোট করতে চায় নৌকায় চড়ে।

বিএনপির জোটের নিবন্ধিত দল এলডিপি, কল্যাণ পার্টি, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, খেলাফত মজলিশ, বিজেপি, জাগপা ও মুসলিম লীগ ধানের শীষে ভোট করতে নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দিয়েছে। ঐক্যফ্রন্টের শরিক গণফোরাম, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ ও জেএসডিও ধানের শীষে ভোট করবে। নির্বাচন কমিশন সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ বলেছেন, অভিন্ন প্রতীক ব্যবহারে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি জোট শরিকদের তালিকা আগেই দিয়েছে। দলগুলো আলাদা আলাদা চিঠিও দিয়েছে। ঐক্যফ্রন্টও তালিকা দিয়েছে।

বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক সমকালকে বলেন, দ্বিদলীয় ব্যবস্থা গড়ে ওঠার পেছনে অন্যতম একটি কারণ বাম দলগুলোর ব্যর্থতা। আরেকটি কারণ নির্বাচনী ব্যবস্থা। দুর্বৃত্ত ও কালো টাকার মালিকরা নির্বাচনে আসে দুই দলের হয়ে। তারাই জয়ী হয়। এখানে নীতি-আদর্শ বলে কিছু নেই।

চরমোনাইর পীরের দল ইসলামী আন্দোলন কোনো জোটে নেই। দলটির মহাসচিব অধ্যক্ষ ইউনুস আহমাদ সমকালকে বলেছেন, যারা বড় দুই দলের প্রতীকে নির্বাচন করতে চান, তাদের কাছে আদর্শের চেয়ে আসন গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামী আন্দোলন এ প্রতিযোগিতায় নামতে চায় না।

 

[ প্রিয় পাঠক, আপনিও বিডিসারাদিন24 ডট কম অনলাইনের অংশ হয়ে উঠুন। লাইফস্টাইল, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, রান্নার রেসিপি, ফ্যাশন-রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন- bdsaradin24@gmail.com-এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে। নারীকন্ঠ এবং মত-দ্বিমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে  bdsaradin24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরণের দায় গ্রহণ করে না। ]

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 64 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ
bdsaradin24.com