মনে এতো প্রেম কেন?

Print

জেসমিন চৌধুরী

প্রিয়তম সঙ্গী অপুর সাথে দীর্ঘ বিরহের কারণেই বোধ হয় মনে আজকাল বড় বেশি প্রেম প্রেম ভাব হচ্ছে। কত কিছু লিখার ছিল, অথচ মনের দিঘিতে প্রেমের মাতাল হাওয়া ছোট ছোট ঢেউ তুলে দিয়ে যাচ্ছে বারবার, ভাবনাগুলোকে করে দিয়ে যাচ্ছে বিক্ষিপ্ত। নতুন-পুরাতন, একতরফা-দুইতরফা, সফল-বিফল, নিজের-পরের নানান রকম প্রেমের গল্পের ভীড়ে অন্য ভাবনাগুলো মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে পারছে না কিছুতেই।

প্রায় তিরিশ বছর আগের কথা। সিলেট মহিলা কলেজে একাদশ শ্রেণীতে সবেমাত্র ভর্তি হয়েছি। স্কুলের গৎবাঁধা জীবন থেকে মুক্তি পেয়ে আমি তখন ডানা মেলা বিহঙ্গ। নাটকের একটা গ্রুপের সাথে জড়িয়ে গেছি, দলের বড়ভাইদের কাছ থেকে কমলালেবুর গন্ধবিহীন উচ্চারণে কবিতা আবৃত্তি করতে শিখছি, ইভটিজারদের হাত থেকে ক্লাসমেটদের রক্ষা করার দায়িত্বও নিয়েছি। বেশ আড্ডাবাজ হয়ে গেছি, ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে বন্ধুরা মিলে প্রায়ই কোক, আইসক্রিম খেতে জিন্দাবাজার পয়েন্টে যাই। ছেলেরা টিটকারি মারলে রুখে দাঁড়াই আবার মজাও পাই।

আইসক্রিম খেতে খেতে প্রায়ই লক্ষ করি স্ন্যাকবারের একজন কর্মচারী আমার দিকে চোরা চোখে তাকায়, কিন্তু আমি তাকালেই চোখ ফিরিয়ে নেয়। মাথাভর্তি ফ্যাশনেবল কাটের ঘন চুল পেছন দিকে ব্রাশ করা ছেলেটা অসম্ভব রকম হ্যান্ডসাম, পোশাক-আশাকে ভীষণ স্মার্ট, স্লিম এবং লম্বা। চোখ ফেরানো যায় না, তবু চোখাচোখি হলেই আমিও চোখ ফিরিয়ে নেই। এই চোরাগুপ্তা চাওয়া-চাওয়িতে বেশ একটা নেশা ধরে গেল। এই প্রথম যার দিকে তাকাচ্ছি সেও অন্য কারো দিকে নয়, আমার দিকেই তাকাচ্ছে। নির্বাক হলেও পারস্পরিক আগ্রহের অভিজ্ঞতা আমার জীবনে এই প্রথম। সদ্য কৈশোর পেরিয়ে আসা আমার মনে এই প্রথম সত্যিকারের ভালোলাগার পুলক, ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।

দোকানে যাওয়া বেড়ে গেল। বেশিরভাগ সময় ছেলেটা নিজেই সার্ভ করত, ভালোরকম ডিসকাউন্ট দিত, একটা বাড়তি কথাও বলতো না। কী অসম্ভব ভদ্র! কী মার্জিত! কী মিষ্টি! ছেলেরাও এমন হয়! এমন চমৎকার একটা ছেলে সেলসম্যানের কাজ করে কেন? খুব ইচ্ছে হতো তার সাথে আলাপ করি, কিন্তু মনে পড়ে যেত বড়দের সতর্কতাবাণী- পারিবারিক এবং সামাজিক বৈষম্যের কথা, আব্বার রক্তচক্ষুর কথা। কাজেই বিষয়টা দৃষ্টি বিনিময়েই সীমাবদ্ধ থেকে গেল।

ক্লাসে প্রায়ই আনমনা হয়ে যেতে থাকলাম। ইংরেজির অধ্যাপক জিনাত আরা ম্যাডাম আমাকে খুব স্নেহ করতেন, কারণ তার ইংরেজি প্রশ্নের উত্তর আমি ইংরেজিতে দেয়ার চেষ্টা করতাম, কঠিন শব্দগুলো নিজে থেকেই অভিধান ঘেঁটে বুঝে নিতাম।, জটিল সব কবিতার লাইন নিজের ভাষায় ব্যাখ্যা করবার চেষ্টা করতাম। আমার আনমনা ভাব ম্যাডাম লক্ষ করলেন, একদিন একটু বিরক্তির সুরেই বললেন, ‘তুমি এতো আনমনা কেন? কী হয়েছে তোমার? প্রেমে পড়েছ নাকি?’

তার কিছুদিন পরই আমার বিয়ে ঠিক হয়ে গেল। পাকা কথা দেবার আগে আব্বা জানতে চাইলেন কারো সাথে সম্পর্কে আছে কী না। ঝাকড়া চুলের মিষ্টি ছেলেটার কথা মনে এলো, সেই সাথে আরো কয়েকজনের কথা যারা আগ্রহ দেখাতো, যাদের সাথে হালকা পাতলা খুনসুটিও হতো, কিন্তু সম্পর্ক ছিল না কারো সাথেই। আব্বাকে বলবার মত কিছুই খুঁজে পেলাম না। যার নাম ঠিকানা জানি না, তার কথা আব্বাকে কেমন করে বলি? বিয়ে হয়ে গেল, বিলেতে চলে গেলাম। শুরু হলো নতুন জীবন। সুখ-দুঃখ-যুদ্ধ মিলিয়ে মহা হুলুস্থুলের এক জীবন। কারো কথাই মনে রইলো না আর।

তারপর আটাশ বছর পেরিয়ে গেছে। আমি এক অর্বাচীন বালিকা থেকে দুই সন্তানের মা হয়েছি, ছাত্রী থেকে শিক্ষিকা হয়েছি, ভালো পাঠক হবার আগেই পাকেচক্রে যাচ্ছেতাই এক লেখকে পরিণত হয়েছি, বইমেলায় আমার একখানা বইও কীভাবে যেন প্রকাশিত হয়ে গেছে।

২০১৭ সালের কথা বলছি। সদ্যজাত ‘নিষিদ্ধ দিনলিপি’ নিয়ে সিলেটে গেছি।
উপভোগ করছি পাঠকদের উচ্ছ্বাস, বন্ধুদের উদ্দীপনা, সুহৃদদের অভিনন্দন জ্ঞাপন। এর মধ্যে হঠাত একটা চেহারা সামনে এসে দাঁড়িয়ে আমাকে চমকে দিল, ‘জেসমিন, চিনতে পারো?’

চুলে পাক ধরেছে খানিকটা, চামড়ায় দুচারটা ভাঁজ, চোখে চশমা, জিন্স আর টি-শার্টের পরিবর্তে স্যুট পরা এখন, কিন্তু না চেনার প্রশ্নই ওঠে না। হাসিটা তেমনই স্নিগ্ধ, দৃষ্টি তেমনই নম্র, উপস্থিতি মার্জিত। বইয়ের কথা, আমার কথা বলতে গিয়ে তিনি বললেন, ‘জেসমিনকে চিনি অনেক বছর ধরে কিন্তু পরিচয় হলো আজই প্রথম।’

সত্যিই, এর আগে কণ্ঠস্বর পর্যন্ত শোনা হয়নি, পরিচিতি তো দূরের কথা। কিছুটা কুণ্ঠার সাথে তিনি ফোন নাম্বার চাইলেন, সেদিন রাতেই কল করলেন। অবাক হয়ে জানলাম যাকে সাধারণ এক কর্মচারী মনে করে আব্বার রক্তচক্ষুর কথা ভেবে অবহেলা করেছিলাম, প্রকৃতপক্ষে তিনি একজন মেধাবী মানুষ, বাবার ব্যবসা দেখাশোনার পাশাপাশি সাহিত্য ও নাট্যচর্চ্চা করতেন, বেশ কয়েকটা বই লিখেছেন, প্রিন্ট মিডিয়ার জগতে এখন তিনি একটি শ্রদ্ধেয় নাম। শেখ সাদির পোষাকের গল্প মনে পড়ে গেল।

বললেন, ‘আপনাকে যা বলতে কল করেছি আটাশ বছর আগে সাহসের অভাবে তা বলা হয়নি। এবারও যদি না বলি তাহলে হয়তো আর কখনোই বলা হবে না। আপনাকে দেখলে কী যেন হয়ে যেত, ঘামতে শুরু করতাম, এতো নার্ভাস হয়ে যেতাম যে মুখই খুলতে পারতাম না। দেখা হবার অপেক্ষায় থাকতাম, কিন্তু হঠাত করেই আপনার দোকানে আসা বন্ধ হয়ে গেল, আমিও উচ্চশিক্ষার্থে বিদেশ চলে গেলাম। বছর কয়েক পর যখন ফিরে এলাম, আমার জন্য পাত্রী খোঁজা শুরু হলো, মুরব্বিরা জানতে চাইলেন কোনো পছন্দ আছে কী না, তখন আপনার কথাই মনে পড়ল। মনে হলো, এই মেয়েটাকেই আমার চাই। নাম পরিচয় ঠিকানা কিছুই জানি না তবু অনেক খুঁজলাম আপনাকে। বিনিময়ে শুধু হতাশা ছাড়া আর কিছু পেলাম না।

‘শেষ পর্যন্ত যার সাথে বিয়ে হলো তাকে নিয়ে খুব ভালো আছি, তবু আপনার কথা প্রায়ই মনে হতো। বহু বছর পর একদিন দেখলাম আপনি একটা টয়োটা স্টারলেট চালিয়ে যাচ্ছেন, পেছনের সিটে বসে আছে সুন্দর দুটো শিশু। আমি আপনাকে দেখলাম, আপনি আমাকে দেখলেন না। বুঝলাম আপনিও ভালোই আছেন।

‘তারপর এতো বছর পর আজ দেখা হয়ে গেল। আপনার সাফল্যে আমি গর্বিত। কিন্ত আশ্চর্যের বিষয়, আজ যখন ব্যাটে-বলে লাগার সমস্ত সম্ভাবনা শেষ হয়ে গেছে, আপনার সাথে কথা বলতে আমার একটুও নার্ভাস লাগছে না, গলা কাঁপছে না।

‘বিশ্বাস করুন, এটা ছিল আমার জীবনের প্রথম কোনো মেয়েকে ভাল লাগা, মেয়েটি কি আমাকে পছন্দ করতো তা আমি যেমন জানতাম না তেমনি আমি যে তাকে পছন্দ করতাম সে টা কি সে জানতো? তাও আমি জানতাম না। এ ছিল এক অবাক করা কান্ড!’

এই বলে তিনি খানিকক্ষণ অপেক্ষা করলেন, হয়তো আশা করলেন আমিও তাকে পছন্দ করতাম কী না সেকথা বলবো। এতো বছরের নীরবতার পর একটা মানুষ এতোটুকু তো চাইতেই পারে। কিন্তু আমি স্পষ্ট কোনো স্বীকারোক্তি না দিয়েই পরিচিত হতে পেরে আনন্দিত হয়েছি জানিয়ে আলাপ শেষ করলাম। কিছু বিষয় রহস্যাবৃত্ত থেকে যাওয়াই ভালো।

দয়া করে তার নাম/পরিচয় কেউ জানতে চাইবেন না, অথবা আবিষ্কার করবারও চেষ্টা করবেন না। কারণ যতটুকু বুঝেছি তিনি প্রকাশ্যে এই গল্পটা শেয়ার করতে বিব্রত বোধ করবেন। আমার মত সবাইকে মলাট-ছেঁড়া বই হতে হবে এমন কোনো কথা নেই। গল্প বলতে আমার ভালো লাগে, বিশেষ করে যখন সেই গল্প একটা সময়কে, সেই সময়ের মানুষদের আবেগকে, তাদের সীমাবদ্ধতাকে তুলে ধরে, তা গল্পটা যারই হোক না কেন।

একটা মানুষের প্রতি অল্প বয়সে জন্ম নেয়া আগ্রহ চিরদিন থাকে না, কিন্তু সেই পুলক জাগানো অনুভূতিগুলোর স্মৃতিকে আমরা সযত্নে লালন করি। মানুষটা এক সময় গৌণ হয়ে গেলেও মুহুর্তগুলো চিরতরে বিশেষ হয়েই থেকে যায়—-
‘তুমি যদি রহিতে দাঁড়ায়ে !
নক্ষত্র সরিয়া যায়,- তবু যদি তোমার দুপায়ে
হারায়ে ফেলিতে পথ-চলার পিপাসা !

একবার ভালোবেসে কেন আমি ভালোবাসি সেই ভালোবাসা !’

ম্যানচেস্টারে ফিরে আমার জীবনসঙ্গী অপুকে যখন পুরো গল্পটা বললাম, প্রশ্রয়সূচক একটা মুচকি হাসি দিয়ে সে নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। লোকটা একটু ঈর্ষান্বিত হলেও তো পারত! আজকালকার আধুনিক পুরুষদের নিয়ে এই এক জ্বালা, কখন কী অনুভব করতে হবে তাও তারা জানে না। এদের দিয়ে কিছু হবে টবে না।

[ প্রিয় পাঠক, আপনিও বিডিসারাদিন24 ডট কম অনলাইনের অংশ হয়ে উঠুন। লাইফস্টাইল, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, রান্নার রেসিপি, ফ্যাশন-রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন- bdsaradin24@gmail.com-এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে। নারীকন্ঠ এবং মত-দ্বিমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে  bdsaradin24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরণের দায় গ্রহণ করে না। ]

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 192 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ
bdsaradin24.com