মানুষের পচা গলা অঙ্গের একমাত্র চিকিৎসক রাজীব

Print

 

নিজের সর্বস্ব উজাড় করে পথে পড়ে থাকা রোগি থেকে সাধারণ মানুষ সবার চিকিৎসা করে চলেছেন অক্লান্ত পরিশ্রমে৷ নদীয়ার রানাঘাটের যুবক রাজীব বিশ্বাসই এখন মানসিক ভারসাম্যহীন মানুষের পচা গলা অঙ্গের একমাত্র চিকিৎসক৷

প্রকাশ্যে আলিঙ্গন ও চুমু খাওয়া নিয়ে যখন বিতর্কের ঝড় উঠেছে ঠিক সে সময়ই নিঃশব্দে মানুষ হওয়ার কর্তব্য বোধ নিয়ে এগিয়ে চলেছেন রাজীব বিশ্বাস৷ রাজ্যে বিতর্ক তৈরি ও সেই বিতর্কে হাওয়া লাগলেও এমন মানুষের পালে হাওয়া লাগেনা৷ দাঁড় টানতে মাঝি তিনি একাই৷ নৌকা জলের উল্টো স্রোতে বইছে৷ তবুও দমে যাননি৷

রোজগারের প্রায় সবটাই দিয়ে আসেন রানাঘাট স্টেশনের কোনও মানসিক ভারসাম্যহীন ভবঘুরের পচা পায়ে৷ রাস্তা ঘাটে যেখানেই দেখেন ভবঘুরে, এগিয়ে যান তিনি৷ একাই৷ সংস্থার নাম দিয়েছেন “রানাঘাট প্রকৃতির আলো৷” বাড়ি রানাঘাটের শ্রীনগর পাড়া৷ পেশায় পশু চিকিৎসক৷ সার্জন নন৷ কিন্তু সার্জনের থেকে কোনও অংশে কম কিসে? অসুস্থ পচে যাওয়া শরীরের অঙ্গ থেকে ম্যাগট বের করে তার ড্রেসিং করে দেওয়া পর্যন্ত একা হাতে করেন৷

পাশে অবশ্য পরিবার না থাকলে এভাবে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হতনা৷ স্ত্রী দুই সন্তান ও মা নিয়ে সংসার৷ বাবা মারা গিয়েছেন তিন বছর আগেই৷ তখন থেকেই পরিবারের পেট চালিয়েও এই সমাজসেবা করে চলেছেন রাজীব৷ আর্থিক সাহায্য না পেলেও রানাঘাট হাসপাতালের প্রাক্তন দুই সুপার তাঁকে এ কাজে এগিয়ে যেতে অনেকটা সাহায্য করেছেন৷ রোগির এক্সরে বা আলট্রাসাউন্ড করাতে৷

রাজীব জানান, “রানাঘাট মহকুমা হাসপাতালের সুপার দুজন ছিলেন যাঁদের কথা খুব করে বলতে হয়৷ এঁরা আমাকে অনেক সাহায্য করেছেন৷ হাসপাতালের সুপার ছিলেন ডঃ রঞ্জিত দাস৷ তিনি এখন হাওড়ার ডেপুটি সিএমওএইচ হয়ে চলে গিয়েছেন৷ খুব সাহায্য করেছেন আমাকে৷ আর ছিলেন ডঃ অতীন্দ্রনাথ মন্ডল৷ তিনি এখন পিজির ডেপুটি সুপার৷ এখনও এঁদের সঙ্গে কথা হয়৷” রাজীব আরও জানান বর্তমান চিকিৎসকরাও কেউ কেউ রোগির ছবি দেখে ওষুধ বলে দেন৷ “ডঃ এস রায়চৌধুরি আছেন আর আছেন ডঃ ডিপি মন্ডল৷ রাত বিরেতেও এঁদের ফোন করি কোনও অসুবিধায় পড়লেই৷ গাইড করে দেন৷”

এভাবেই এগোয় চিকিৎসা৷ আর পাশে থাকে জিআরপি ও পুলিশ৷ কাজ করতে গেলে সমস্যা অনেক৷ রোগির নতুন জামা কাপড় থেকে ড্রেসিং এর খরচ পুরোটাই বহন করতে হয়৷ তাই মাঝে মাঝেই অভুক্ত রাখতে হয় পরিবারকে৷ দুদিন আগেই ১ বছর দু মাস বয়সী ছেলের মুখে দুধটুকু তুলে দিতে পারেননি৷ টাকা ছিলনা হাতে৷ সারাদিন বিস্কিট ভিজিয়ে খাওয়ান স্ত্রী৷ এত বড় স্বার্থত্যাগ করার মন থাকতে হয়৷ যার দেখা দূরদূরান্তেও মেলেনা আজকাল৷ কারও কাছ থেকে আর্থিক সাহায্য তো দূর স্টেশনে বসে এই রোগীদের চিকিৎসা করলেও বাধা বিপত্তি আসে৷

রাজীব বিশ্বাস জানান, “আমি মনে করি যে কোনও দিন এরকম অবস্থা আমারও হতে পারে৷ কেউই যদি দেখার না থাকে এঁদের তাহলে দেখবে কে? স্কুলে পড়ি যখন তখন থেকেই সমাজসেবার কাজে আমার খুব উৎসাহ ছিল কিন্তু টাকার অভাবে করতে পারিনি৷ যবে থেকে নিজে রোজগার করতে শিখলাম তখন থেকে এই পথে পুরোপুরি পা বাড়াই৷”

রাজীবের কথায়, “এই যে দেখুন মানসিক ভারসাম্যহীন মানুষেরা কখনও এক জায়গায় থাকেনা৷ এদের চিকিৎসা করাতে রাজি করানো বা একটু সুস্থ করে তুললেই এরা আবার কোথায় চলে যায় আর খুঁজে পাইনা৷ তবে আমি আজ পর্যন্ত এমন পাঁচ জনকে সুস্থ করে বাড়ি পাঠিয়েছি৷ তবে একজন ছিলেন৷ এক পুরুষ৷ মানসিক ভারসাম্যহীন ও শারীরিক প্রতিবন্ধি৷ তার ওপর আবার ট্রেনে ধাক্কা খেয়েছিলেন৷ তাঁকে বহুদিন ধরে চিকিৎসা করে বাড়ি খুঁজে বের করে যখন বাড়িতে নিয়ে গেলাম৷ পরিবার তাকে ফেরত নিলনা৷ কারণ সম্পত্তি৷ তাকে ভাগ দিতে হবে বলে তাকে ঘরেই নিল না তার আত্মীয়রা৷”

এদের ভর্তি নেয় না হাসপাতাল৷ দুর্গন্ধযুক্ত এই রোগিদের জন্য হাসপাতালে আলাদা কোনও ব্যবস্থা নেই তাই ভর্তি করা দায়৷ তাহলে উপায় কি? উপায় কিছু বেরোয়নি কিন্তু সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন এই সমাজসেবী৷ ভবিষ্যতে একটা আস্তানা গড়তে চান এই সমাজ বহিষ্কৃত মানুষ গুলোর জন্য৷ তার আগে রাস্তায় বসেই চিকিৎসা করছেন৷ তাতেও বিপত্তি বাধে৷

“কাজটা ঝুঁকি নিয়ে করতে হয়৷ কারণ মহিলাদের গায়ে হাত দেওয়া যায়না৷ তখন পুলিশ খুব সাহায্য করে৷ সঙ্গে থাকে৷ জিআরপিও স্টেশনে চিকিৎসা করার সময় অনেক সাহায্য করে৷ অনেকের এমন অবস্থা থাকে যে বাঁচানো মুশকিল৷ তখন পুলিশ থাকলে সুবিধা হয়৷ কখনও কখনও তারাও আমাকে ডাকে এরকম কেউ স্টেশনে থাকলে৷”

ভোট দিতে পারেনা বলে ব্রাত্য করে দেওয়া এই এদের জন্যই খেটে যাওয়া৷ কাজটা সহজ নয়৷ তার জন্য জমি দরকার, আর দরকার টাকা৷ সেই দিকে চেয়েই দিন রাত এক করছেন রাজীব৷ নিজের নিউরো সমস্যা রয়েছে তবু হার মানেননি যুবক৷ রাজনীতি থেকে শত হাত দূরে থাকতে চান৷ রাস্তার অসুস্থ সারমেয় ও ভবঘুরে মানুষের অনেক কাছে আসতে চান৷ তাই বোধহয় পাশে পান না কাউকে৷ আক্ষেপ তাঁর৷

“আমি রাজনীতি থেকে দূরে থাকি৷ গ্রামে গ্রামে গিয়েও চিকিৎসা করি৷ যাঁরা গরিব তাঁদের বাড়ির গবাদি পশুর চিকিৎসার পর হয়ত টাকা নিই না কিমবা বিনা পয়সায় ওষুধ দিয়ে আসি৷ আমি ফ্রি হেলথ ক্যাম্পও করেছি গরিব মানুষের জন্য কিন্তু টাকার খুব অভাব তাই সবটা পেরে উঠিনা৷ আমি একদিন এঁদের জন্য থাকার জায়গা করব৷ আস্তে আস্তে সেই চেষ্টাই করছি৷”

যখন রাজীবকে প্রশ্ন করা হয় রাজনৈতিক সাহায্য বা এলাকা থেকে কোনও সাহায্যর জন্য কোথাও দেখা করেননি? উত্তরে তিনি জানান “অনেকের সঙ্গে দেখা করেছি৷ তাঁরা নিজেদের ব্যানারে কাজ করতে বলেন৷ আর সাধারণ মানুষের থেকে সাহায্য পাইনি৷ বরং সমস্যায় পড়েছি৷ স্টেশনে বসে চিকিৎসা করলেও অনেকে প্রতিবাদ করেন৷”

জীবনের পথে কোনও বাধাই বাধা নয়৷ তিল তিল করে গড়ে তুলবেন স্বপ্নের সেই আবাসন৷ দৃঢ় প্রত্যয় রয়েছে চোখে৷ সেটাই অনেক৷ সাত বছর ধরে করছেন এই কাজ আজীবন করতে চান৷ নীতির দোহাই দেওয়া এই আমরা কি সোশাল মিডিয়ায় তাঁর পাশে দাঁড়াতে পারিনা? বাঁকা চোখে না তাকিয়ে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে পারিনা? বলতে পারিনা এটা নিয়েও হোক কলরব

[ প্রিয় পাঠক, আপনিও বিডিসারাদিন24 ডট কম অনলাইনের অংশ হয়ে উঠুন। লাইফস্টাইল, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, রান্নার রেসিপি, ফ্যাশন-রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন- bdsaradin24@gmail.com-এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে। নারীকন্ঠ এবং মত-দ্বিমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে  bdsaradin24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরণের দায় গ্রহণ করে না। ]

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 914 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ
bdsaradin24.com