মুকুল ফৌজের মাঠ

Print

তখন আমার প্রতিটা দুপুর ছিল একেকটা অনুর পাঠশালা। দুপুরবেলায় ভাতঘুমের অবসর না পেলেও হেঁশেল নিয়ে মায়ের ব্যস্ততা থাকত বিকেল অব্দি আর এই সুযোগে প্রতি দুপুরে খাওয়ার পর-পরই চলত আমার এই নিরুদ্দেশ যাত্রা। কখনও আব্বার পাটের গুদামঘর, কখনও উত্তাল মেঘনার পাড়, কখনও ঝিমমারা মটরের ক্ষেত, কখনোবা হৈহৈ রৈরৈয়ের গুদারাঘাট। অধিকাংশ সময়েই আমার আগ্রহের জায়গা ছিল গুদামঘর আর গুদারাঘাট। গুদামে শ্রমিকরা পাট তুলছে নামাচ্ছে। ঠেলাগাড়ির ঝনঝনাৎ, বিশাল পাল্লার ক্যাঁচক্যাঁচানি ঠিক যেন ম্যাক্সিম গোর্কির পাউরুটির কারখানা। শ্রমিকদের হেইয়ো কিংবা শ্রমিক-নেতাদের হাঁকডাকে কানপাতা দায়। ওখানে আমার মতো ৯/১০ বছরের শিশুর উপস্থিতি একেবারেই অনুচিত। কিন্তু আমি ছিলাম তাদের চোখে অফিসারের মেয়ে যাকে সরাবার সাহস মনে হয় তাদের ছিল না কিংবা এও হতে পারে আজকের মতো নিরাপত্তা নিয়ে তৎকালীন মানুষ এত ভাবিত থাকত না। ব্যাপারটা হয়তো তাদের চোখে এমন ছিল, ‘বড় স্যারের মাইয়া। পোলাপান মানুষ, হাউস করসে কাম দেখবার, দেখুক।’ দুপুরবেলা শ্রমিকদের দেখতাম পাউরুটি খাচ্ছে চিনি দিয়ে। আমার তখন ভরপেট; স্নান সারিয়ে গৃহকর্মী আমায় পটের বিবি বানিয়ে পেট পুরে খাইয়েও দিয়েছে। কিন্তু ওদের ওভাবে চিনি-পাউরুটি খেতে দেখলে আমার মনে হতো এটা হচ্ছে পৃথিবী আর বেহেশতের একমাত্র সুস্বাদু খাবার। দরিদ্র শ্রমিক, ভাত না খেয়ে হয়তো টাকা বাঁচাচ্ছে, সেটা সেই ক্ষুদে আমার জানার কথা নয়, আমি শুধু জানি আমার সামনেই দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ খাবারটি গলাধঃকরণ হচ্ছে। আমার নির্নিমেষ চেয়ে থাকার কারণ তারা বুঝত, প্রায়শই তাদের কেউ-কেউ হাত বাড়িয়ে আমায় তাদের খাবারের ভাগ দিত। আর আমি তো মুখিয়েই থাকতাম! বাসায় এসে নিজের মতো করে খাওয়ার চেষ্টা করতাম চিনি-পাউরুটি, উঁহু সেই স্বাদ তো পাওয়া যাচ্ছে না। কিছুতেই বার করতে পারতাম না গোলমালটা ঠিক কোথায়! সুতরাং ফিরে যাও গুদামঘরে। একদিন ধরা পড়লাম। পড়বি তো পড় মালীর ঘাড়েই, এক ঝাঁক শ্রমিকের মাঝে বসে আয়েশ করে প্রথম কামড় দিয়েছি পাউরুটিতে, দাঁত আর চিনির ঘর্ষণে কিচ-কিচ মধুর ঝঙ্কারে সবে মোহিত হচ্ছি ঠিক তখনি যমদূতরূপী বাবার আবির্ভাব! বাবা এসেছিলেন কাজের অগ্রগতি দেখতে, উপরি হিশেবে পেয়ে গেলেন কন্যার অগ্রগতির সংবাদ। ফলাফল, আমার পায়ে শেকল জুড়ল। কিছুদিন বিছানায় দাদির নাকের বাঁশির সুর শুনে-শুনে ক্লান্ত হয়ে আবার পাল তুললাম সিন্দবাদের জাহাজের। আমাদের বাসা ভর্তি মানুষ থাকত তখন, তাই আমার এই শেকলভাঙার খবর হারিয়ে যেত সেই ভিড়ে। এইবার অবশ্য চিনি-পাউরুটির লোভ ছাড়তে হল। ফেলে আসা গুদারাঘাট আমায় আপন করে নিল। সে এক আশ্চর্য জগত! স্টিমার ভিড়ছে-ছাড়ছে, লম্বা শেকলগুলো খুলে দেওয়া হচ্ছে, ভোঁ করে ভেঁপু বাজল,পাটাতন উঠে যাচ্ছে ধমাধম, মানুষের কলরোল মুখরিত এ যেন আরেক টাইটানিক সিনেমার বন্দর। আমি প্রায়ই কার্নিশে হাত দিয়ে উঁকি মেরে পানি দেখতাম, একদিন এক বাদামওয়ালা আমায় ওখান থেকে নিয়ে আসে। হাতভর্তি বাদাম দিয়ে সাবধান করে ওভাবে নীচু হয়ে পানি না দেখতে। এরপর প্রায়ই দেখা হত বাদামওয়ালার সাথে। আমাকে লবণমরিচ দিয়ে বাদাম খেতে দিত। আমি ভাবতাম আমার নিজগুণেই আমার এই প্রাপ্তি। না পাঠক, ঠিক তা নয়, বাদামওয়ালার ভাই জুটমিলের শ্রমিক, সেই সুবাদে আমার এমন আপ্যায়ন। এরপর স্কুলে যাওয়ার পথে কখনও কখনও কোনও রিকশাওয়ালা ভাড়া না নিলে আমি হৃষ্টচিত্তে এটা ভাবতাম, ‘বাহ! বাবারা জুটমিলে চাকরি করলে তো দারুণ ব্যাপার হয়!’ বেঁচে যাওয়া টাকায় মহা আনন্দে মালাই আইস্ক্রিম খেতাম এবং আমার এমন প্রাপ্তি-সংবাদগুলো খুব সন্তর্পণে চেপে যেতাম বাসায়। লেখাপড়ার বোধ খোলতাই না হলেও সব লাভের সংবাদ প্রকাশ করলে যে লোকশানের আশংকা থাকতে পারে সেই বোধটুকু আমার টনটনে ছিল সেই বয়সেই।
আমার বন্ধুর অভাব ছিল না। কিন্তু তাদের মায়েরা আমার মায়ের মতো চরম ব্যস্ত ছিল না এবং নরসিংদীর থানারঘাট নামক স্থানে যেসব গৃহে তারা থাকত সেগুলোর আকৃতি আমাদের গৃহের আকৃতির চেয়ে বেজায় ছোট ছিল বলে তাদের মায়েদের ফাঁকি দেওয়ারও জো তাদের ছিল না। ফলত বিকেলে আমি আমার অভিযান সেরে যখন ফিরে আসতাম তখন তাদের পেতাম, তারা তাদের দুপুরঘুমের ফাঁকি শেষে আমার সাথে প্রাত্যহিক খেলায় যোগ দিত– ‘কানামাছি ভোঁ-ভোঁ, যারে পাও তারে ছোঁও’ কিংবা ‘বউচি খেলা কেমন খেলা, দশবারোটা মাইরা ফ্যালা’। কোনও কোনও দুপুরে যে আমরা একযোগে উধাও হতাম না তাও কিন্তু নয়। আমার সাথিদের পিতামাতার সুবাদে সেই দিনগুলো হতো ভয়াবহ! নারকেলের শলার বাড়ি সেদিন একটিও মাটিতে পড়তো না। প্রত্যেকে প্রত্যেকের অভিভাবক হতে এই উপঢৌকন পেতে বাধ্য হতাম। তাই এইসব ভ্রমণে ‘একলা চলো রে’ স্লোগানকে সামনে রাখতেই আমি স্বস্তি বোধ করতাম। আমার মায়ের রান্নাঘর ছেড়ে মুখ তুলে সন্তানদের পানে চাওয়ার সময় তখন ছিল না, এখন অবশ্য হয়েছে কিন্তু এখন দেখার জন্য কোনও সন্তানকেই তিনি আর পাশে পান না। সৈয়দ মুজতবা বেশ বলেছিলেন, “ভগবান দয়াময়। তিনি সবই দেন; কিন্তু তার ‘টাইমিং’টা বড্ড খারাপ।”(বাঙালী মেনু, ধূপছায়া)

এমনই এক দুপুরে আমি খোঁজ পেলাম ঘাসের চাদর বিছানো স্নিগ্ধ এক সবুজ মাঠের। মাঠটিতে মুকুল ফৌজ নামক একটি সংগঠনের মহড়া হত, বেশির ভাগ সময়ই দেখতাম ওরা প্যারেড করছে। বিভিন্ন বয়সের শিশু কিশোরেরা আছে ওখানে। নবম/দশম শ্রেণির একটি সুন্দরী মেয়ের দিকে হা করে তাকিয়ে থাকতাম আমি। ফৌজের দলনেত্রী ছিল সে, প্রত্যেক সারির ফৌজিকে দেখতাম মেয়েটিকে সমঝে চলছে। ধীরেধীরে মুকুলফৌজের সেই দলটায় ভিড়ে গেলাম আমি। আমার বয়েসীদের সারিতে মিশে গিয়ে প্যারেড করতে লাগলাম। মহড়া ছিল বলে ওদের গায়ে ফৌজের পোশাক থাকত না। কখনো-কখনো কেউকেউ স্কুল থেকে চলে আসত বলে তাদের গায়ে স্কুলের পোশাক থাকত। আমার তাই এতটুকুও ঝামেলা হল না এদের সাথে এক হয়ে যেতে। এখনও চোখ বন্ধ করলে আমি সুন্দরী মেয়েটির দুই বেণি, বেণিতে লাগান শাদা কিংবা নীল ফিতে, তার ঘামেভেজা ফর্শা নাক দেখতে পাই। কান পাতলে শুনতে পাই ‘পাঁচ সারিতে এগিয়ে চলো, ডান-বাম-ডান। এবার থামো এক দুই।’
মাঝেমাঝে নাশতা দেওয়া হতো। মুড়ি আর গুড়। এই মুড়িগুড়ের কাছে গুদামের পাউরুটি চিনি নিতান্তই পানসে মনে হল। মুকুল ফৌজের প্রথম দিনেই আমি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়ে যাই যে একমাত্র গুড়মুড়িই ত্রিভুবনের সেরা খাবার! আমি জানতাম না ফৌজের কার্যালয় কোথায়, এরা কোন স্কুলের শিক্ষার্থী। এটা অবশ্য জানতাম আমার এই ডান-বাম করাই সার। প্রদর্শনীর দিন অংশগ্রহণ করা তো দূরের কথা ওটা দেখার সৌভাগ্যও আমার হবে না। মাঝেমাঝে বিরতিতে ওরা খেলত। বয়োজ্যেষ্ঠ যে-ভদ্রলোক যিনি প্যারেড করাতেন যাকে ওরা ভাইয়া বলে ডাকত তাকে ঘিরে কত যে হাসি আনন্দে মেতে উঠত তারা! ছোটছোট বাচ্চাগুলো ভাইয়াকে সেই ঘাসের বিছানায় শুইয়ে দিয়ে শুকনো পাতা দিয়ে ঢেকে দিয়ে বলত, ‘ভাইয়া, তুমারে কবর দিয়া ফালাইলাম!’ আমিও নিজেও কতবার সেই গোরখোদকদের একজন হয়েছি। বেশ মনে আছে, একবার খরখরে শুকনো পাকুড় গাছের পাতা দিয়ে ভাইয়াকে ঢেকে দিচ্ছি আর খিলখিল করে হাসছি হঠাৎ আমার পাশের মেয়েটি আমার দিকে সন্দিগ্ধ চোখে তাকাল। আমি তার চোখের ভাষা পড়তে পারছিলাম, সেখানে লেখা ছিল, ‘কে তুমি? ফৌজের কেউ বলে তো তোমাকে মনে হচ্ছে না।’ এই প্রথমবারের মতো মনে হল এখানে আমি অনাহুত। এরা কেউ কখনও আমার নাম ধরে ডাকেনি। ডাকার প্রয়োজন পড়েনি, তা হলেই ধরা খেতাম। আজ পাশের মেয়েটির ভ্রুকুটি আমায় সতর্কবাণী শুনিয়ে গেল। আমি ধীরপায়ে চলে এলাম মাঠ থেকে। একবার পেছনে তাকিয়েছিলাম; মেয়েটি আমার চলে যাওয়া লক্ষ করেনি, ভাইয়া তখন কবর ভেঙে ভূত হয়ে ওদের তাড়া করেছে, ওরা হাহাহিহি রবে আত্মরক্ষায় ব্যস্ত।
আমার মধ্যাহ্ণের পাঠশালা বন্ধ না হলেও মুকুল ফৌজের সেই মাঠটিতে আর কখনও যাইনি।

  • শিলা বৃষ্টি
[ প্রিয় পাঠক, আপনিও বিডিসারাদিন24 ডট কম অনলাইনের অংশ হয়ে উঠুন। লাইফস্টাইল, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, রান্নার রেসিপি, ফ্যাশন-রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন- bdsaradin24@gmail.com-এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে। নারীকন্ঠ এবং মত-দ্বিমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে  bdsaradin24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরণের দায় গ্রহণ করে না। ]

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 126 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ
bdsaradin24.com