যদি রুখে দাঁড়াও, তবে তুমি নোংরা, চরিত্রহীনা..!

Print

সুমনা চৌধুরী

ধরুন একটা মেয়ে, যার সাথে যুক্তি বুদ্ধিতে কিছুতেই আপনি পেরে উঠছেন না, খবর চাউর করে দিন মেয়েটা নোংরা। মেয়েটা অসতী। মেয়েটার জন্মের ঠিক নেই। ব্যস দেখবেন একমূহূর্তে আপনার দলে এসে যোগ দিয়েছেন হাজার হাজার পুরুষ। আর কি, জিতে গেলেন আপনি। ইয়েএএ.. হাততালি।

আচ্ছা, এসব বলতে টলতে যাবেন না, কারন আপনি প্রগতিশীল, আপনি লিব্যারাল, আপনি বাম, আপনি নারীবাদী পুরুষ?? তবে চাউর করে দিন, মেয়েটার ভাষাটা বড় নোংরা, বড় এগ্রেসিভ! ব্যাস হাজার হাজার পুরুষ জুটে যাবে আপনাকে সহমর্মিতা জানাতে। আর কি, আপনি জিতে গেলেন। ইয়েএএ হাততালি।

কোন মেয়েকে চুড়ান্ত খিস্তি দিচ্ছে একক বা দলবদ্ধভাবে কোন পুরুষ, আপনি চুপচাপ দেখে যাচ্ছেন, একবারও চুপ করতে বলছেন না ঐ পুরুষটিকে, একবারও বলছেন না এভাবে কোন মানুষকে ব্যক্তি আক্রমন করে খিস্তি দেওয়ার অধিকার কারো নেই, এবং অপেক্ষার প্রহর গুনছেন কখন মেয়েটি হাতজোড় করে আপনার কাছে সাহায্য প্রার্থনায় আসবে, বলবে “আমি অবলা নারী, আমার সম্ভ্রম রক্ষা কর তোমারই সমগোত্রীয়দের থেকে, হে মহান পুরুষ” ; এবং আপনি ঢাল তলোয়ার নিয়ে মঞ্চে উপস্থিত হয়ে ‘নারী সম্মানের বস্তু” বলে নিজের নারীবাদী ইমেজ ঝাড়বেন, কিন্তু দেখলেন মেয়েটি আপনার সব স্বপ্নের, সব অপেক্ষার মুখে মুতে নিজের লড়াই নিজে করছে, খিস্তির জবাবে প্রয়োজনে খিস্তি দিচ্ছে – আপনার প্রচন্ড ইগোতে লাগলো, আপনি পরাজিত বোধ করলেন নিজে নিজেই, এবারে আপনি জিততে চান ? শুধু বলে দিন মেয়েটার মুখ বাজে। খুব খিস্তি করে। ব্যস হাজার হাজার পুরুষ সমস্বরে আপনার কথায় সম্মতি জানাবে। আর কি, আপনি জিতে গেলেন। ইয়েএএ হাততালি।

আপনি মেয়েটির প্রেমিক হোন বা বন্ধু, দাদা হোন বা মামা, শিক্ষক হোন বা ছাত্র, আপনি ভুলেও কক্ষণো ভাববেন না, এই চুড়ান্ত খিস্তির সম্মুখীন হতে মেয়েটির কেমন লাগে! খারাপ লাগে কি না, হতাশ হয় কি না, দুঃখ পায় কি না। কখনো ভুলেও বুঝতে চাইবেন না এসব শুনে তার মানসিক অবস্থা আসলে কি হয়! সে ডিপ্রেশনে ডুবে যায় কি না! তার কোন সাহায্য লাগে কি না! আপনি শুধু লিঙ্গ উচিয়ে মজা নেওয়াটাকেই পরম কতর্ব্য ভেবে মেয়েটিকে উপদেশ দিয়ে বসবেন, “জানোই তো এরা এরকম, তুমি ব্লক করে দাও না কেন!” অথবা “তোমারই বা এসব লেখার কি প্রয়োজন?”

আপনি যতোই লিব্যারাল হোন, যতোই প্রগতিশীল, যতোই নারীবাদী হোন, যতোই নিজের কমিউনিস্ট ইমেজ বজায় রাখুন না কেন, ব্যসিক্যালি ভিতরে ভিতরে আপনি অতোটাই পুরুষতান্ত্রিক, যতোটা হলে নিজেকে নারীর রক্ষাকর্তা ভাবা যায়। মনে মনে আপনিও ভাবেন খিস্তিগুলোর উপর একচেটিয়া অধিকার পুরুষদের। এবং সেজন্যেই পুরুষের খিস্তি আপনার কাছে স্বাভাবিক, ছেলেরা ওরম করেই একটু আধটু। কিন্তু নারী হয়ে খিস্তি?? হায় হায়, পুরো দেশ, সভ্যতা, সংস্কৃতি ভোগে গেল। নারীরা তো চিরকাল খিস্তি খাবে আর আঁচলের খুটে চোখ মুছে হাতজোড় করে সবাইকে বলবে আমাকে খিস্তি দেবেন না, দোহাই আপনাদের। অথবা আপনাদের বলবে হে দাদা/কাকু/মামা/ভাই/স্বামী/প্রেমিক দেখ আমাকে খিস্তি দিচ্ছে, তোমরা এর বিচার করে দাও। তবেই নারী আপনার কাছে মহান/সতী/ভদ্র/সভ্য/শিক্ষিত। আর নাহলে চরিত্রহীন/বেশ্যা/অভদ্র/এগ্রেসিভ/ অশিক্ষিত। মেয়েদের “চুদে” দেওয়ার হুমকি যে কেউ যখন তখন দিতেই পারে। সেটা আপনার কাছে স্বাভাবিক ও। আপনি চুপচাপ সেটা শুনে দুবার খেচেও নেবেন ঘরে বসে। কিন্তু কোন মেয়ে যদি তার প্রতি করা এই চুড়ান্ত ক্রিমিন্যাল মন্তব্যের উত্তরে বলে “তোদের মতো বালছালদের আমরা চুদি না” তবে তো আপনার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো। কারন আপনার হিসেবে মেয়েরা তো “চুদা” খাওয়ার জন্যেই সমাজ/দেশে আছে। তার এই দুঃসাহস হয় কি করে মুখে মুখে উঠে “চুদি না” বলার!

তো এহেন আস্পর্ধা মেনে নেওয়ার পাত্র তো আপনি নন, তাই রটিয়ে দিন মেয়েটা অসভ্য। মেয়েটা বাজে। মেয়েটার ভাষার ঠিক নেই। ব্যস পঙ্গপালের মতো পুরুষরা ছুটে আসবেন আপনার কথাটাকে সত্যি প্রমাণ করতে। এবং মেয়েরাও আসবে। ওই মেয়েরা যাদের মাথায় ভদ্র-সতী-শিক্ষিত নারীর কনসেপ্ট বেশ ভালো করে ঠেসে ঢুকিয়ে দিয়েছেন আপনি অথবা আপনারা। আর কি, চারদিকে ধন্য ধন্য রবের মাঝে জিতে গেলেন আপনি। নিজের প্রগতিশীলতার, বামপন্থার, নারীবাদীতার পতাকা উড়িয়ে।

পুরুষলেখকের নারীর শরীর ব্যাখ্যা করে লেখা সাহিত্য আপনার কাছে খুবই উচ্চমানের। “প্রজাপতি” উপন্যাসের যৌন ক্রীড়ার ব্যাখ্যা আপনার কাছে অশ্লীল নয়। “পূর্ব পশ্চিমে” অতীনের অলিকে চুমু খাওয়ার ব্যাখ্যা আপনার কাছে অশ্লীল নয়, নবারুন, ঋত্বিক ঘটকের খিস্তি আপনার কাছে বিরাট ইন্টেল্যাকচ্যুয়ালিটির প্রকাশ। এদেরকে চটি লেখকের তালিকায় স্বপ্নেও ফেলবেন না আপনি অথবা আপনারা। কিন্তু তসলিমার লেখা আপনার কাছে অশ্লীল। নিম্নমানের। তসলিমাকে সহজেই চটি লেখিকার তকমায় দাগিয়ে দিতে পারেন আপনি। কারন ওই যে, মেয়ে হয়ে নিজের শরীর, যৌনতা নিয়ে লেখার আস্পর্ধা। কারন আপনার কাছে সাহায্যের ঝুলি না ফেলে নিজের লড়াই নিজে করা।

তাই নারীর ভাষা ঠিক করে দেওয়া মহান ভাষা শিক্ষক, আপনি নারীর ভাষা আর রুচিশীলতা ঠিক করে দেওয়ার লেকচার চালিয়ে যান। আর আমিও এই লেকচারের মুখে চাবকানোর কাজ চালিয়ে যাই। কারন আপনার রুচিশীলতা,চেতনা, বিবেক, শিক্ষা, মেধার মাপকাঠি আমার বোঝা শেষ। এবং এই কয়েকটা লাইন আপনাকে ডেডিকেট করে গেলাম –

“তুমি কোমরে দুহাত রেখে পা ফাঁক করে দাঁড়িয়ে বলবে, হ্যাঁ আমি বেশ্যা।
ওদের পিলে চমকে উঠবে।
ওরা বিস্ফারিত চোখে তোমাকে দেখবে। ওরা পলকহীন তোমাকে
দেখবে। তুমি আরও কিছু বলো কি না শোনার জন্য কান পেতে থাকবে।
ওদের মধ্যে যারা পুরুষ তাদের বুক দুরু দুরু কাঁপবে,
ওদের মধ্যে যারা নারী তারা সবাই তোমার মত বেশ্যা হওয়ার স্বপ্ন দেখবে। “

[ প্রিয় পাঠক, আপনিও বিডিসারাদিন24 ডট কম অনলাইনের অংশ হয়ে উঠুন। লাইফস্টাইল, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, রান্নার রেসিপি, ফ্যাশন-রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন- bdsaradin24@gmail.com-এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে। নারীকন্ঠ এবং মত-দ্বিমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে  bdsaradin24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরণের দায় গ্রহণ করে না। ]

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 191 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ
bdsaradin24.com