আগামী ২৬ মার্চ বাংলাদেশ তার জন্মের ৫০ বছর উদযাপন করবে। বাংলাদেশসহ বিশ্বকে কভিড-১৯ মহামারি কাবু করে না ফেললে এই সময় বেশ উৎসব হতো। হতো সভা-সমাবেশ। আসতেন বিশ্বের বেশ কয়েকজন নেতা। সবকিছু তছনছ করে দিয়েছে কভিড-১৯। এখন যা কিছুই হচ্ছে তা হয় ছোট আকারে অথবা ভার্চুয়ালি। অনেকটা দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর মতো। দেশে এই সময়ে চলছে জাতির পিতার জন্মশতবর্ষ উদযাপন। তারও অবস্থা একই।

বিগত দিনের ৫০ বছরের অর্জন দেখলে আমার প্রজন্মের কাছে সবকিছু রূপকথার গল্প মনে হয়। ১৯৭২ সালের পর রিলিফের চাল-গম না এলে বেশিরভাগ বাড়িতে চুলায় হাঁড়ি চড়ত না। রিলিফের শাড়ি, রিলিফের কাপড়, জুতা! দেশটা সম্পূর্ণ যুদ্ধবিধ্বস্ত। ৮৫ শতাংশ মানুষের বাস দারিদ্র্যসীমার নিচে। এর মধ্যে আবার ৫০ শতাংশের মতো দিন আনে দিন খায়। গায়ে কাপড় নেই; পায়ে নেই স্যান্ডেল। সরকারি প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তার বেতন মাসে ৪৫০ টাকা। সংসার চালানো দায়। বঙ্গবন্ধুর সরকার অনেক জায়গায় সরকারের সব শ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের রেশনের ব্যবস্থা করেছিলেন। বিশ্বের কোনো অর্থনীতিবিদ বা রাজনৈতিক বিশ্নেষক যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটির কোনো ভবিষ্যৎ দেখতে পাননি। সেই বাংলাদেশকে ক’দিন আগে জাতিসংঘ মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দিল। একটি রিলিফ বা খয়রাতনির্ভর দেশ বর্তমানে মাঝেমধ্যে অন্যদেশকে প্রয়োজনে ছোট আকারে হলেও রিলিফ দেয়। ৫০ বছরে দেশের এই পরিবর্তন আমার কাছে যে রূপকথার গল্প। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যা না করলে এই রূপকথা অনেক আগেই বলা যেত।

বিশ্বায়নের এই যুগে বাংলাদেশের বর্তমান অগ্রগতি ধরে রাখতে হলে প্রথমে প্রয়োজন দূরদর্শী নেতৃত্ব, যেমনটি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী দিচ্ছেন। দেশকে দুর্নীতিমুক্ত করা একেবারেই অপরিহার্য। এই মুহূর্তে দেশের যা কিছু অর্জন তার সিংহভাগ খেয়ে ফেলছে দুর্নীতি। বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন দরকার। শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তন না হলে দেশে অতি প্রয়োজনীয় মানবসম্পদ তৈরি হবে না। তৈরি হবে না দেশপ্রেমিক মানবিক গুণাবলিসম্পন্ন মানুষ, যারা এ দেশের ইতিহাস নিয়ে গর্ব করতে পারে। জাতির পিতা বলতেন, ‘সোনার দেশ গড়তে হলে সোনার মানুষ চাই’। প্রকৃত শিক্ষা না হলে সোনার দেশ পাওয়া যাবে না। বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় সার্টিফিকেটসর্বস্ব বেকার তৈরি হয়। যার ফলে লাখ লাখ বিদেশি বাংলাদেশে কাজ করে। অর্থবহ শিক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হলে চাই সর্বস্তরে মেধাবী শিক্ষক। আর মেধাবীদের এই পেশায় আনতে হলে চাই তাদের জন্য পৃথক বেতন স্কেল, সুযোগ-সুবিধা, যেমনটা অন্য দেশে আছে। স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় সবার জন্য এ সুবিধা প্রযোজ্য হতে হবে।

বাংলাদেশের উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে বর্তমানে এক ধরনের অস্থিরতা; কোনো কোনো ক্ষেত্রে নৈরাজ্য চলছে। এটি দেশের জন্য নিকট ভবিষ্যতে ভয়াবহ সংকট তৈরি করবে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ ঘটাতে হলে শিক্ষা প্রশাসনে যোগ্য ব্যক্তিদের পদায়ন নিশ্চিত করতে হবে। এটি বেশি প্রযোজ্য সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। কারণ এসব প্রতিষ্ঠান জনগণের অর্থে পরিচালিত হয়। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এখনও সম্পূর্ণ অকেজো সিলেবাস ব্যবহার করা হয়। যার কারণে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অনেকাংশে ‘শিক্ষিত’ বেকার তৈরির কারখানা হয়ে পড়েছে। এ দুরবস্থা থেকে উত্তরণের দায়িত্ব শিক্ষক তথা শিক্ষা প্রশাসনের। বাংলাদেশের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা অনেকাংশে চাকরিমুখী। কিন্তু আমাদের যেমন যোগ্য চাকুরে প্রয়োজন; একইভাবে প্রয়োজন ভালো উদ্যোক্তা। ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি এপিজে আবদুল কালাম বলতেন, ‘দেশের সবাই যদি চাকরির পেছনে ছোটে, তাহলে তো দেশটা চাকরে ভর্তি হয়ে যাবে; মালিক থাকবে না।’ সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত আগামী ৫০ বছরে বাংলাদেশকে সম্পূর্ণ বদলে দিতে পারে। বাংলাদেশ হয়ে উঠতে পারে এ অঞ্চলের অন্যতম অর্থনৈতিক পরাশক্তি; যে স্বপ্ন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ও ৩০ লাখ শহীদ দেখেছিলেন।

সব শেষে বলতে হয়, বর্তমানে সরকার অতিরিক্ত আমলানির্ভর হয়ে পড়েছে। আমলাতন্ত্র একটি সরকার পরিচালনার জন্য অপরিহার্য। তার চেয়েও অনেক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে যোগ্য পেশাদারদের কাজে লাগানো। আগামী ৫০ বছরে সোনার বাংলার স্বপ্ন সফল হোক।

সাবেক চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন