যৌনকামনা জাগলেই কী ধর্ষণ বৈধতা পায়!

Print

আফরিন শরীফ বিথী

ধর্ষণ নিয়ে অনেক লিখেছি। লিখতে লিখতে ক্লান্ত। কিছুদিন এ বিষয়টি এড়িয়ে গেছি নিজেকে সুস্থ রাখতেই। কিন্তু ধর্ষণের নিউজ এ জাতির সাথে এমনভাবে পাকাপোক্ত হয়ে গেছে যে কোনভাবেই এই বিষয়টিকে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।

আগে লিখতে হতো ধর্ষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে, ধর্ষকের প্রতি নিন্দা জানিয়ে, ধর্ষকের বিচারের দাবিতে, ধর্ষিতাকে স্বাভাবিক দৃষ্টিতে গ্রহণ করা নিয়ে। কিন্তু একটা দল যখন ধর্ষণের জন্য পোশাককে দায়ী করে পক্ষান্তরে ধর্ষণকেই বৈধতা দিতে চাচ্ছে তখন লিখতে হচ্ছে ধর্ষণের বৈধতা-অবৈধতা নিয়ে। এ বড় দুঃখের বিষয়।

“ধর্ষণের জন্য পোশাক দায়ী নাকি দায়ী নয়”– বর্তমানে এই টপিকেই চলছে দুই পক্ষের তুমুল তর্কযুদ্ধ। বলাবাহুল্য ধর্ষণের জন্য পোশাক কোনভাবেই দায়ী নয় -আমি এই পক্ষের। এ নিয়ে বহু যুক্তি-তর্ক চলে আসছে ইতোমধ্যে। সেসব নিয়ে নতুন করে কিছু বলতে চাচ্ছি না।

কিন্তু প্রতিনিয়ত অবুঝ শিশুসহ যখন চার মাসের শিশুও ধর্ষিত হচ্ছে এবং সেই শিশুর ধর্ষণের জন্য যখন যুক্তির মারপ্যাঁচে পোশাককেই টেনে আনা হচ্ছে তখন এই অসার মস্তিষ্কধারীদের যুক্তি-তর্কের প্রাথমিক কিছু জ্ঞান না দিলেই নয়।

যারা ধর্ষণের জন্য পোশাককে দায়ী করছে তাদের যুক্তি হচ্ছে, নারীদের পর্দাহীন অশ্লীল পোশাক পুরুষের যৌনকামনা জাগায়। পুরুষ সেই জাগ্রত যৌনতা মেটাতে নারীদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। এমনকি চার মাসের শিশুকেও সে যৌনকার্য সম্পাদনের বস্তু করে ফেলে। সুতরাং ধর্ষণের জন্য পোশাক দায়ী।

যারা এই যুক্তি দেয় তাদের প্রত্যেককে আমি একজন সম্ভাব্য ধর্ষক মনে করি। কারণ যেহেতু তারা এই ধরণের যুক্তি দিয়ে ধর্ষণকে বৈধতা দেয়ার চেষ্টা করে সেহেতু সুযোগ পেলে তারা নিজেরাও ধর্ষণ করতে ছাড়বে না মনে করাটাই যুক্তিযুক্ত এবং আমার এই লেখাটা এদের উদ্দেশেই।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, পোশাক কি আসলেই যৌনকামনা জাগায় নাকি জাগায় না?

যেহেতু একটা বিরাট অংশ তাদের নিজস্ব অভিজ্ঞতায় দাবি করছে যে পোশাকও যৌনকামনা জাগার কারণ সেহেতু তাদের দাবিকে অগ্রাহ্য করাটা অন্যায় হবে। সুতরাং তাদের দাবিকে মেনে নিলাম। হ্যাঁ, পোশাকও যৌনকামনা জাগাতে পারে, নারী-পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই জাগাতে পারে। যৌনতা শুধু পুরুষেরই থাকে না, নারীদেরও থাকে। শুধু পোশাকই না বিভিন্ন কারণেই মানুষের যৌনকামনা জাগতে পারে।

যেহেতু সমাজে বিচিত্র মানসিকতা ও দৃষ্টিভঙ্গির মানুষ রয়েছে সেহেতু ব্যক্তিভেদে ভালো লাগাটা আপেক্ষিক। একজন শাড়ি পরা নারীকে দেখে কারো ভালো লাগতে পারে/প্রেম জাগতে পারে/যৌনকামনা জাগতে পারে, একজন হিজাব-বোরকা পরা নারীকে দেখে কারো ভালো লাগতে পারে/প্রেম জাগতে পারে/যৌনকামনা জাগতে পারে, একজন জিন্স-শার্ট পরা নারীকে দেখে কারো ভালো লাগতে পারে/প্রেম জাগতে পারে/যৌনকামনা জাগতে পারে, একজন কাপড়হীন নারীকে দেখে কারো যৌনকামনা জাগতে পারে। আবার একজন কাপড়হীন নারীকে দেখে কারো যৌনকামনা নাও জাগতে পারে।

ঠিক বিপরীতভাবে একজন স্যুটেড-বুটেড পুরুষকে দেখেও একজন নারীর ভালো লাগতে পারে/প্রেম জাগতে পারে/যৌনকামনা জাগতে পারে, একজন খোলা বুকের সুদর্শন পুরুষকে দেখেও একজন নারীর ভালো লাগতে পারে/প্রেম জাগতে পারে/যৌনকামনা জাগতে পারে। এমনকি একজন মানুষের ব্যক্তিত্বে মুগ্ধ হয়েও তাকে কাছে পাওয়ার কামনা-বাসনা বা যৌনতা জাগতেই পারে।

কামনা-বাসনা জাগার বিষয়টাই তো আসবে এক ধরণের ভালো লাগা থেকে; সে ভালো লাগা সচেতনভাবেই হোক আর অবচেতনভাবেই হোক। কিন্তু আমি এটা বুঝি না যে, যাকে মানুষের ভালো লাগে না তার প্রতি মানুষের যৌনকামনা কিভাবে জাগতে পারে! যে নারীর উঁচু বুক, স্বল্পবসন শরীর একজনের কাছে অশ্লীল বা খারাপ মনে হয় তার সাথে যৌনাচার করার ইচ্ছা বা তার প্রভাবে অন্য নারীর উপর যৌনাচার করার ইচ্ছা কিভাবে জাগতে পারে তা আমার বোধগম্য নয়।

বরং যে নারীকে তার খারাপ বা অশ্লীল মনে হয় সেই নারী তাকে ছুঁতে আসলেও তো তার বিরক্ত হওয়ার কথা, ঘৃণা করার কথা! তাহলে কি এইখানে পুরুষ স্ববিরোধীতা করে? সম্ভবত তাই।

যৌনকামনা না জাগলে মানবজাতি টিকে থাকবে কেমনে? কামনা জাগাকেই যদি আপনি অনৈতিক/খারাপ/নিকৃষ্ট মনে করেন তাহলে সেটা অবিবেচনাপ্রসূত চিন্তা। কারণ যৌনকামনা জাগা মানুষের সহজাত স্বাভাবিক প্রবৃত্তি এবং সেটা জরুরীও। যৌনকামনা থাকে মানুষের মগজে-মননে। যৌনতা মানে শরীরের ক্ষুধা, শরীরের প্রয়োজন, শরীরের ভালো লাগা, শরীরের প্রেম।

যৌনকামনা জাগা মানেই কারো উপর ঝাঁপিয়ে পড়া নয়, কামনা জাগা মানেই ধর্ষকামী হয়ে ওঠা নয়। কামনা জাগলেই সবাই ধর্ষণ করে না। যারা ধর্ষণ করে তারা নিকৃষ্ট, জঘন্য, বিকৃতবোধের মানুষ। ধর্ষকের পক্ষে যায় এমন যুক্তি দেয়াটাও একই বোধের মানুষের কাজ।

ধরেন, মিষ্টি আপনার অনেক পছন্দ। মিষ্টি দেখলে আপনার জিভে জল চলে আসে, খাওয়ার লোভ জেগে ওঠে। তো আপনি কি কারো হাতে মিষ্টির প্যাকেট বা দোকানের মিষ্টি দেখে ঝাঁপিয়ে পড়েন, একটু ছুঁয়ে দেখেন, মিষ্টির প্যাকেট নিয়ে দৌড় দেন? আর কেউ যদি লোভ সামলাতে না পেরে মিষ্টির উপর ঝাঁপিয়েই পড়ে তাহলে কি আপনি দোকানদারকে দায়ী করবেন মিষ্টি ঢেকে রাখে নাই বলে? আপনি পাগল না হলে নিশ্চয় তা করবেন না। এক্ষেত্রে আপনি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করেন। কারণ আপনি সামাজিক জীব। অথচ আপনি সামাজিক জীবনযাপনের মধ্যে থেকে ধর্ষণ করাকে বৈধতা দেয়ার যুক্তি বের করেন পোশাককে দায়ী করে!

কী অযৌক্তিক যুক্তি আপনার!

পর্নোগ্রাফির চেয়ে যৌনতা উদ্রেককারী বিষয় আর কি হতে পারে! ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা, হাতে হাতে এন্ড্রয়েড ফোনের যুগে যেখানে অশিক্ষিত কেউ ভুল বানানে পর্ন লিখে সার্চ দিলেও হাজার হাজার পর্ন সাইট চলে আসে সেখানে সেসব নিয়ে কথা না বলে আপনারা পড়ে আছেন নারীদের পোশাক নিয়ে!

কারণ হচ্ছে আপনাদের গোপনে পর্ন দেখতে ভালো লাগে, পর্ন আপনাদের যৌনকামনা জাগায়, আপনাদের কাজে লাগে। তাই যত দোষ নন্দ ঘোষের থিওরিতে পুরুষতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখতে নারীদের বস্তাবন্দী করে রাখার জন্য যেকোন অজুহাতে নারীদের উপর ঢাল-তলোয়ার নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন। নারীদের পোশাকের স্বাধীনতাকে আপনারা ঔদ্ধত্য মনে করেন।

অথচ খোলা বুকে হেঁটে বেড়ানো, ঠ্যাং এর উপর শর্টস পরে বেড়ানো, পাতলা লুঙ্গি পরে বেড়ানো পুরুষদের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ নেই। অথচ একই তো ব্যাপার। একরকমই তো হওয়ার কথা ছিল! নারীদের যৌনকামনা জাগার মত কোন সৌন্দর্য কি পুরুষের শরীরে নাই? যদি বলেন নাই তাহলে সেটা চিন্তার বিষয় এবং হাস্যকরও বটে। আর যদি বলেন আছে তাহলে পুরুষদের পোশাক নিয়ে কেন কোন প্রশ্ন আসে না? কারণ নারীরা পোশাকের দোহাই দিয়ে পুরুষের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে ধর্ষণ করে না, পুরুষের পোশাক নিয়ে কখনো অভিযোগ তোলে না।

বস্তুত এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজের অভ্যস্ততায় নারীদের এ ধরণের অভিযোগ তোলারই সুযোগ নাই। অথবা পুরুষতান্ত্রিক সমাজের প্রভাবে পুরুষের শারিরীক সৌন্দর্যে যৌনকামনা জাগার বিষয়টাই নারীদের মগজে স্থান পাওয়ার দৃষ্টিভঙ্গিগত অভ্যাস গড়ে ওঠে নাই। কারণ মানুষের ইচ্ছা-অনিচ্ছা জাগার বিষয়টাও সমাজপ্রসূত দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই গড়ে ওঠে।

যৌনকামনা জাগলেই ধর্ষণ করার অধিকার/বৈধতা/যুক্তি/গ্রহণযোগ্যতা কোন ধর্মগ্রন্থে, কোন সংবিধানে, কোন নীতিবাদেই নাই। সামাজিক জীব হিসেবে আপনার যৌনকামনাকে আপনার সংযত করতে হবে অথবা দুজনের সম্মতিতে যৌনতা পূরণ করতে হবে অথবা নিজে নিজেই তা করতে হবে (মাস্টারবেট)।

মোদ্দাকথা পোশাক যৌনকামনা জাগার কারণ হতে পারে কিন্তু ধর্ষণের জন্য পোশাককে দায়ী করে ধর্ষণকে বৈধতা দেয়ার চেষ্টা কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

লেখক: অ্যাক্টিভিস্ট

[ প্রিয় পাঠক, আপনিও বিডিসারাদিন24 ডট কম অনলাইনের অংশ হয়ে উঠুন। লাইফস্টাইল, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, রান্নার রেসিপি, ফ্যাশন-রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন- bdsaradin24@gmail.com-এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে। নারীকন্ঠ এবং মত-দ্বিমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে  bdsaradin24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরণের দায় গ্রহণ করে না। ]

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 630 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ
bdsaradin24.com