রাজনীতির মেরুকরণ

Print

মোঃ সানোয়ার হোসেন।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে অপসংস্কৃতির চর্চা স্বাধীন বাংলাদেশের সৃষ্টির আগে থেকেই। সেটা বুঝতে হলে অনেকগুলো ঘটনার অতীতে যেতে হবে ও বিচার বিশ্লেষণ করে বের করতে হবে।
আমেরিকার গোয়েন্দা সংস্থা CIA ( Central Intelligence Agency) থাকার পরেও FBI( Federal Bureau Of Investigation) এর কেন প্রয়োজন পড়েছিল?
কি উদ্দেশ্য নিয়ে ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থা MOSSAD পৃথিবী ব্যাপি গোয়েন্দা তৎপরতা চালায়?
ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা RAW কখন কোন প্রেক্ষাপটে তৈরি হলো? তাদের কর্ম পদ্ধতিই বা কি? কিভাবে তারা কাজ করে?

একটি ঘটনার কথা বলে শুরু করি, আফগানিস্তান সহ মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশই যেমন আফগানিস্তান, কাজাকিস্তান, উজবেকিস্তান, খিরগিস্তান, আর্মেনিয়া, তুরস্ক, মধ্যে এশিয়ার এই দেশগুল রাশিয়ার সোভিয়েত ইউনিয়ন ভুক্ত দেশ ছিল। বলাবাহুল্য প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে ইউরোপিয় ইউনিয়নের জাতিগত বিরোধ ও শত্রুতা সৃষ্টি হয়েছিল। যা আজো বর্তমান। ইউরোপিয় ইউনিয়নের নেতারা ঠিক করল রাশিয়াকে দুর্বল করতে হলে রাশিয়ার নেত্রিত্ত্বে থাকা সোভিয়েত ইউনিয়ন দুর্বল বা ভেঙ্গে দিতে পারলে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সাম্রাজ্যবাদ বাড়বে। আর একটা লক্ষ্য হলো মধ্য এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের নেত্রিত্ত্ব ও কর্তৃত্ব ওদের হাতে থাকবে। বানিজ্যিক আগ্রাসন ও খনিজ সম্পদের একক মালিক হবে ইউরোপ আমেরিকা। অবশ্য এর পিছনেও ইসরাইলি ধর্মিও ও রাজনৈতিক গোপন কারণ বিদ্যমান। সেটা বুঝতে হলে অন্যভাবে বলতে হবে ও ভাষা জ্ঞান থাকতে হবে। অন্তত পক্ষ্যে হিব্রু ভাষা সম্পর্কে জ্ঞান থাকতে হবে, যেটা একপ্রকার অসম্ভব! যাইহোক,
যখন ব্রিটিশরা ভারতবর্ষ শাসন করে তখন ১৯২৫ সালে ভারত- আফগান সীমান্তে ব্রিটিশ বাহিনী ও আফগানের তৎকালীন মুসলিম বাদশা হাবিবুল্লাহর বাহিনীর মধ্যকার যুদ্ধ সংঘটিত হয়। সেই যুদ্ধে ব্রিটিশরা চরম ভাবে আফগান বাদশা হাবিবুল্লাহর নীকট পরাজিত হয়। এই খোব ব্রিটিশদের অনেকদিন পর্যন্ত থেকে যায়। তারা তাদে্র কর্মপরিকল্পনা তখনই ঠিক করে। আফগান বাদশার ছোট ছেলে আমানুল্লাহ তখন মুসলিম গোড়ামী ভেঙ্গে আধুনিক ইংরেজী শিক্ষা লাভের জন্য ফ্রান্সে পড়ালেখা করে। গোপনে ছদ্মবেশে মুসলিম সেজে কিছু ছাত্র ফ্রান্সেই আমানুল্লার সাথেই যোগাযোগ করে ও অবন্ধুত্ব স্থাপন করে। সেই সমস্ত ইউরোপীয় তথা ব্রিটিশ এজেন্ড ছাত্রদের কাজই ছিল মনিস্তাত্ত্বিকভাবে আমানুল্লাহকে ইসলামের মূল নীতি থেকে বের করে আধুনিক ও ইউরোপিয় সংস্কৃতির সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া। এতোটুকুই তাদের কাজ ছিল। যেটা হয়ত কারো কাছেই তেমন গুরুত্বপূর্ণ মনে নাও হতে পারে।
যাই হোক বাদশা হাবিবুল্লাহর ইন্তেকালের পর প্রাসাদ ষড়যন্ত্রে বড় ছেলে এনায়েতুল্লা ক্ষমতাচুত্য ও বন্দি হয়। তার পর আমানুল্লাহ ক্ষমতা গ্রহন করে। আমানুল্লাহ ক্ষমতা পাওয়ার পরেই তুরস্কের তৎকালীন বাদশা কামাল পাশা( আতাতুর্ক উপাধী) এর মেয়ের সাথে আফাগ নতুন বাদশা আমানুল্লাহর বিয়ে দেয়া হয়। বলেরাখা ভালো আমানুল্লাহর মাতা আলীয়া হযরত তুরস্কের সংস্কার পন্থী নেতা কামাল আতাতুর্কের বংশের মেয়ে ছিল। কামাল পাশার মেয়েও আধুনিক সংস্কার পন্থী ইসলামী মনমানসিকতার মেয়ে ছিল। যেটা কিনা ইসলামের মূল নীতির সাথে সাংঘর্ষিক ছিল। এদিকে আমানুল্লাহও ইসলামী সংস্কার পন্থী মনভাবে মোটিভেটেড হয়েছিল নিজের অজান্তেই ফ্রান্সে পড়াকালীন সময়ে। সমস্যা এখান থেকেই শুরু। আমানুল্লাহ আফগানে ক্ষমতা পাওয়ার পর ইউরোপ, আমেরিকা, ইংল্যান্ড ব্যাপক ভুয়োষী প্রশংসা শুরু করে। আমানুল্লাহ কে আধুনিক কলকারখানা স্থাপনের জন্য অর্থ সাহায্য ও যন্ত্রপাতি প্রদান করে ইংল্যান্ড। নারীর আধুনিক শিক্ষা, ইংরেজী শিক্ষা প্রদানের জন্য ইংল্যান্ড, ফ্রান্স আমানুল্লাহকে উৎসাহিত করতে থাকে। বলাবাহুল্য আফগানিস্তানে তখনো ইসলামী শিক্ষার বাইরে আধুনিক ইংরেজি শিক্ষা হারাম বলে ফতোয়া জারি ছিল আর মাদ্রাসা, মক্তব ব্যাতিত আধুনিক ইংরেজি স্কুলে পড়ানো ধর্মিয় ও সামাজিক  রীতিতে ছিল না। কিন্তু আমানুল্লাহ দেশের কথা, উন্নয়নের কথা চিন্তা করে আধুনিক শিক্ষার প্রসার করতে চাইল। নারীদের উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করতে চাইল। অবশ্য আফগানিস্তানে আঞ্চলিক পীর বা ধর্মিয় নেতার ব্যবস্থা ছিল। প্রত্যেক প্রদেশেই ধর্মি্য পীর বা নেতার আদেশ ও জনপ্রিয়তা বাদশার আদেশের চেয়েও গুরুত্ব বহন করত। দেশের যেকোন স্বিদ্ধান্ত নিতে গেলে বাদশাকে ধর্মি্য নেতাদের সাথে পরামর্শ করে তাদের মতের উপর ভিত্তি করে করতে হতো। বাদশাকেও কোন না কোন পীরের মুরিদ হতে হতো। আর আর সকল প্রদেশের পীর দের আবার একজন প্রধান পীর বা নেতা ছিল। তার কথা ও ক্ষমতা ছিল আদশার চেয়েও বেশি। আফগানিস্তানের এই ধর্মিও অনুভুতিটা ও দুর্বল জায়গাটা ব্রিটিশরা খুব ভালো করে বুঝেছিল।
যাই হোক যখন ইংল্যান্ড আমানুল্লাহকে সংবোর্ধনার জন্য ও ইংল্যান্ডের কলকারখানাগুলো পরিদর্শনের জন্য আমন্ত্রণ জানাল ঠিক তার দশ বছর আগেই ভারত- আফগান সীমান্তের কাছে আফগান এক পর্বতের অঞ্চলের খুবই শক্তিশালী পীরের দরবারে ব্রিটিশ গুপ্তচর কর্নেল লরেন্স কে নাম ও চেহারা পরিবর্তন করে সম্পুর্ণ মুসলিম সাজিয়ে আহাম্মাদ পরিচয়ে পাঠানো হলো। কর্নেল লরেন্স একজন ব্রিটিশ গুপ্তচর ও ভারতে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর আন্ডারকাভার অফিসার ছিল। সে আরবী, উজবেক, আফগান, উর্দু, ফার্সি এইসব ভাষা স্পষ্ট ও আঞ্চলিকভাবেই অনর্গল বলতে ও লিখতে পারত। সে টানা দশবছর পীরের একনিষ্ট ভক্ত ছিল। নামাজ পড়ত, কোরআন তেলাওয়াত করত, পীরের সেবা করত। পীর তার আচরণে মুগদ্ধ ছিলো।
অন্যদিকে আমানুল্লাহ তার স্ত্রী সহ ইংল্যান্ডে সর্বচ্চ রাষ্ট্রিয় মর্যাদায় সফরে গেলো সঙ্গি সাথী নিয়ে। ইংল্যান্ড সরকার আফগান বাদশা আমানুল্লাহ ও তার বিবিকে লাল গালিচা বিছিয়ে রাষ্ট্রিয় অথিতিশালায় নিয়ে গেলো। সমুদ্রবন্দর থেকে অতিথিশালা পর্যন্ত রাস্তার দু পাশে ব্রিটিশ নাগরিকেরা আমানুল্লাহকে আমন্ত্রণ জানাতে লাগল ফুল দিয়ে, বাজনা বাজিয়ে, উপহার দিয়ে, গান গেয়ে, নেচে। এতো বিশাল সংবর্ধণা দেখে আমানুল্লাহ ও তার স্থত্রী অভিভুত, আনন্দিত! আমানুল্লাহ কলকারখানা পরিদর্শনে গেলে আমানুল্লাহর স্ত্রী আয়েশা রাষ্ট্রীয় মেহেমান খানায় বিশ্রাম নিচ্ছিল।

মুসলিম নারী হওয়ায় আয়েশার বিশ্রামশালায় নারী ছাড়া পুরুষের প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল। তাই আমানুল্লাহর স্ত্রী তার কক্ষে বোরখা ছাড়া সাভাবিক সেলোয়ার কামিজ পরিহিত অবস্থায় ছিল। ব্রিটিশ সরকারের নির্দেশে সমাজসেবা সংস্থার নামে কয়েকজন আধুনিক নারী আয়েশার কক্ষে দেখা করতে যায়। তারা আয়েশার সাথে বিছানায় বসা, আধশোয়া অবস্থায় গল্প গুজব করতে করতে ফাকে ফাকে সেলুলয়েড ফিল্মের সাদা কালো ছবি তুলতে থাকে। তাতে আয়েশারো তেমন আপত্তি ছিল না কারণ সবাই মেয়ে ছিল। এই ছবিগুলোই আমানুল্লাহর বড় কাল হয়ে দাড়াল! ছবিগুলোর সেলুলয়েড ফিল্ম কালার ল্যাবে কাটছাট করে অন্য এক পুরুষের সাথে আয়েশার ছবি জোড়া দিয়ে ছবি বের করা হলো। ছবি দেখে বোঝা যায় আফগান রানী আয়েশা আর পরপুরুষ পাশাপাশি শুয়ে আছে। এই ছবির কথা আয়েশা ও বাদশা আমানুল্লাহ কেউই জানল না। ছবিটির অনেক কপি গোপনে ভারত সীমান্তবর্তি গুপ্তচর কর্নেল লরেন্স ওরফে আহাম্মাদের কাছে পৌছল। আহমদ ছবিগুল মূর্খ, আধুনিক জ্ঞানহীন ধর্মান্থ বারো প্রদেশের বারোজন পীর বা ধর্মিও নেতাদের নিকট পাঠাল আর বাদাশা আমানুল্লাহর বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করল ও অপপ্রচার চালাল যে আমানুল্লাহ পুরাই নাস্তিক হয়ে গেছে। তার বিবিকে পরপুরেষের সাথে রাত কাটিয়েছে। তারা ধর্মের সাথে তামাশা করেছে। তারা পাপ করেছে। সুতরাং পীরের নেতারা একত্র হয়ে আমানুল্লাহর অনুপস্থিতিতেই বাদশা আমানুল্লাহকে ক্ষমতাচ্যুত করল। কার্যসিদ্ধি সম্পর্কে আফগান বাদশা তখনো অবগত নন। এদিকে কর্নেল লরেন্স ওরফে আহমাদের আর কোন খোজ পাওয়া যায়নি। তার কাজ শেষ। মূর্খ পীরেরা তখন হাতে করা ফটোশপের কাজগুলো সম্পর্কে কোন জ্ঞানই ছিল না তাদের। আর ধর্মিও গোড়ামিকে ব্রিটিশরা কাজে লাগিয়ে উস্কে দিয়েছে অন্য দিকে বাদশাকে আধুনিক ব্যবস্থার পক্ষ্যেও সায় দিয়েছে। আমানুল্ললাহর পতনের মধ্যদিয়ে আফগানের সাড়ে চারশ বিছরের মুসলিম বাদশাহী পরিবারের ক্ষমতার অবসান ঘটে।
আর ব্রিটিশরা গুপ্তচর বা গোয়েন্দা তৎপরাতার মাধ্যমে নোংরা ধর্মিও খেলা খেলে ভারত- আফগান সীমান্তে পরাজয়ে প্রতিশোধ নেয় আফগানের শাসন ব্যবস্থা ভেঙ্গে দিয়ে। এভাবেই গুপ্তচর বৃত্তির মাধ্যমে আজো মুসলিম দেশে দেশে চলছে ষড়যন্ত্র।
(চলবে)

[ প্রিয় পাঠক, আপনিও বিডিসারাদিন24 ডট কম অনলাইনের অংশ হয়ে উঠুন। লাইফস্টাইল, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, রান্নার রেসিপি, ফ্যাশন-রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন- bdsaradin24@gmail.com-এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে। নারীকন্ঠ এবং মত-দ্বিমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে  bdsaradin24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরণের দায় গ্রহণ করে না। ]

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 171 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ
bdsaradin24.com