রাব্বানীর সঙ্গে জাবি ছাত্রলীগ নেতার ‘কথোপকথনের’ অডিও ফাঁস

Print
মোঃ রায়হান চৌধুরী, জাবি প্রতিনিধি :
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্পে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও শাখা ছাত্রলীগের অর্থ কেলেঙ্কারীর বিষয়ে ছাত্রলীগের সদ্য সাবেক সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী ও বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের দুই নেতার ফোনালাপের অডিও ফাঁসের পর উক্ত ঘটনায় শাখা ছাত্রলীগের নেতাকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টর কর্তৃক জেরা করার আরেকটি ফোনালাপের অডিও ফাঁস হয়।
রবিবার রাতভর বিভিন্ন সময়ে এসব ফোনালাপের অডিও ফাঁস হয়। আর সংশ্লিষ্ট ঘটনায় প্রক্টরের জেরা করায় নিরাপত্তাহীনতার শঙ্কায় আছেন বলে সাংবাদিকদের উদ্দেশে একটি খোলা চিঠি দিয়েছেন ফোনালাপের সাথে সংশ্লিষ্ট শাখা ছাত্রলীগের এক নেতা।
অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্পের টাকা দুর্নীতির ঘটনায় ফাঁস হওয়া ১ম ফোনালাপের অডিওটি ছাত্রলীগের সদ্য সাবেক কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী এবং জাবি শাখা ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন ও সহ-সভাপতি হামজা রহমান অন্তরের মধ্যে। রবিবার সন্ধ্যায় ফাঁস হওয়া ওই অডিওতে শোনা যায় প্রকল্পের টাকা থেকে শাখা ছাত্রলীগ এক কোটি টাকা চাঁদা পেয়েছেন।আর এ বিষয়টি নিশ্চিত জাবি শাখা ছাত্রলীগ নেতাদের।
একই সাথে এই দুর্নীতির সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. ফারজানা ইসলামের পুত্র, স্বামী, ব্যক্তিগত সচিব ও প্রকল্প পরিচালকের সংশ্লিষ্টতা দেখানো হয়েছে। ৬ মিনিট ১১ সেকেন্ডের ওই অডিওতে কারা কীভাবে কত টাকা পেয়েছে সেটাও নিশ্চিত করা হয়। গণমাধ্যম ও শাখা ছাত্রলীগের সূত্র মতে, ৯ আগস্ট যে চারজন ভিসির বাসায় টাকা বাঁটোয়ারার জন্য গিয়েছিলেন তাদের মধ্যে সাদ্দাম হোসেনও ছিলেন।
এদিকে গোলাম রাব্বানীর সাথে জাবি শাখা ছাত্রলীগ নেতাদের ফোনালাপ ফাঁসের পর এবার ওই
ফোনালাপের সাথে সংশ্লিষ্ট শাখা ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি হামজা রহমান অন্তর ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টর আ স ম ফিরোজ উল হাসানের আরেকটি ফোনালাপের অডিও সাংবাদিকদের হাতে এসেছে। রবিবার রাতে ফাঁস হওয়া এই অডিওতে প্রক্টরকে বলতে শোনা যায়, ‘কাজটি (অডিও প্রকাশ) ঠিক হয় নি। অডিওটি জাবির মান-সম্মান নষ্ট করছে!’
আর এ বিষয় নিয়ে নিরাপত্তাহীনতার শঙ্কায় আছেন উল্লেখ করে রবিবার রাতেই গণমাধ্যম সাংবাদিকদের উদ্দেশে একটি লিখিত চিঠি প্রেরণ করেন হামজা রহমান অন্তর। প্রেরিত ওই চিঠিতে তিনি বলেন, “ক্যাম্পাস ও শাখা ছাত্রলীগের অর্থ কেলেঙ্কারীর বিষয়ে গোলাম রাব্বানী ভাইয়ের সাথে শাখা ছাত্রলীগের ১নং যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন ভাইয়ের ফোনালাপের অডিও ফাঁসের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ফিরোজ উল হাসান স্যার আমাকে ফোন দেন। ফোনে তিনি ঐ ভাইরাল অডিও নিয়ে আমাকে প্রছন্ন হুমকির সুরে বলেন আমি কেন অডিও ভাইরাল করছি এবং এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মান-সম্মান নষ্ট করছে দাবি করে কাজটি ঠিক হয়নি বলেন ও আমাকে দুর্নীতির প্রমাণ দেখাতে হুমকি প্রদান করেন।
তখন আমি বলি, ‘এটি জাহাঙ্গীরনগর ও দেশব্যাপী ওপেন সিক্রেট এবং আমাকেও টাকার ভাগ দেবার চেষ্টা করলে আমি প্রত্যাখ্যান করি। জাবির ৩৮ থেকে ৪৫ এর জুনিয়রেরাও টাকার ভাগ পেয়েছে’। উপরোক্ত কথা বলার পরে উনি আমতা-আমতা করে বিষয়টি স্বীকার করলেও ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করেন। এমতাবস্থায়, আমি আমার শিক্ষা জীবন ও নিরাপত্তা নিয়ে সংশয়ে আছি। আমার কোন ক্ষতি হলে তার দায়ভার বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ওপর বর্তাবে।”

রাব্বানী ও সাদ্দামের ৬ মিনিটের ফোনালাপের সেই কথোপকথন তুলে ধরা হলো

রাব্বানী ফোনের শুরুতেই বলেন- টাকা নেয়ার সময় ছিলো কে কে? উত্তরে ‘অন্তর’ বলেন- জুয়েল ভাই, চঞ্চল ভাই, আর সাদ্দাম ভাই ছিলো।

রাব্বানী: টাকাটা দিছে কোন জায়গায় বসে?
অন্তর: ম্যামের বাসাতেই … সাদ্দাম ভাই আপনার সাথে কথা বলবে এইযে আমার পাশে আছে।
রাব্বানী: দাও দাও। (প্রথমে হামজা রহমান অন্তর (সহ-সভাপতি, জাবি ছাত্রলীগ) রাব্বানীর সাথে ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকা সাদ্দামকে ফোনে ধরিয়ে দেয়)

সাদ্দাম: ভাই, আসসালামু আলাইকুম।
রাব্বানী: ওয়ালাইকুম সালাম, সাদ্দাম কি খবর ভাই?
সাদ্দাম: ভাই খবরতো হচ্ছে আমিতো আপনাকে জানাইছি ভাই খবর ভালো না বেশি একটা…. আমি, তাজ, জুয়েল, চঞ্চল, আমরা ৪ জন ছিলাম। ওই মিটিংয়ের সময়। আর আজকে জাহাঙ্গীর নগর ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে প্রেস রিলিজ দিছে আপনাদের বিপক্ষে

রাব্বানী: সেটাতো দেখলাম… বিষয়টা কি…
সাদ্দাম: বিষয়টা তারা হচ্ছে বামের সাথে সিটিংয়ে গেছে… হ্যাঁ হ্যাঁ দুইটা বৈঠক হইছে।
বৈঠকে বিচার বিভাগীয় তদন্ত বাদে বাকি দাবিগুলো মেনে নিছে। আর বিচার বিভাগীয় তদন্ত হবে কিনা সেটা নিয়ে আগামী বুধবার বসবে ভাই।

রাব্বানী: আন্দোলন নিয়া…
সাদ্দাম: হ্যাঁ হ্যাঁ… আন্দোলন…
রাব্বানী: ম্যামতো নাকি বলছে যে আন্দোলনও আমরা নাকি করাইছি বা সামথিং এমন কিছু একটা… আন্দোলন কারা করছে সেটাতো আমরা জানিনা। সাদ্দাম, বিষয়টা হচ্ছে উনি আরকি ছাত্রলীগের উপর দিয়ে সব কিছু করে নিজের ফ্যামেলিকে সেভ করতে চাচ্ছে। আর নিজে বাঁচতে চাচ্ছে। আর প্রধানমন্ত্রীর রেফারেন্স দিয়ে অনেকগুলা কথা বলছে আপনার বিপক্ষে বা সেন্ট্রাল ছাত্রলীগের বিপক্ষে।

রাব্বানী : কি রকম?
সাদ্দাম: ওই যে যুগান্তরে ভাই…
রাব্বানী: ওইটা দেখছি দেখছি… আচ্ছা যখন টাকাটা দিলো তুই ছিলি না?
সাদ্দাম: হ্যাঁ হ্যাঁ আমি ছিলাম ভাই। আমি আর তাজ ছিলাম। আমরা… আপনি ভাই বলেন ভাই কি করতে হবে আমরা করতেছি সমস্যা নাই। আমি আর তাজ ওইখানে উপস্থিত ছিলাম।

রাব্বানী: তুই আর কে?
সাদ্দাম: আমি আর তাজ আমার বন্ধু ভাই…
রাব্বানী: ও হ্যাঁ তাজ… তুইতো জয়েন সেক্রেটারি …..
সাদ্দাম: জি ভাই।

রাব্বানী: আচ্ছা… টাকাটা ম্যাডাম দিছে নিজে না অন্য কেউ ছিলো?
সাদ্দাম: ওখানে আর কেউ ছিলো না। ম্যাম আমাদের সাথে ডিলিংস করছে করে সে হচ্ছে টাকাটা আমাদের হলে পৌঁছাই দিছে।

রাব্বানী: হলে পৌঁছে দিছে টাকা?
সাদ্দাম: হ্যাঁ… হ্যাঁ….
রাব্বানী: কয় টাকা দিছে? আমাদের কে বলছে হইছে এক কোটি… এর বেশি আর জানিনা। জুয়েলের সাথে আলাদা সেটিং হইতে পারে…। বাট আমাদের সাথে হইছে।

রাব্বানী: আমরাতো শুনলাম ১ কোটি ৬০…
সাদ্দাম: ওইটাতো ভাই আমরা জানিনা…৬০ এরটা আমরা জানিনা.. আমরা হচ্ছে ভাই.. ওখানে হচ্ছে উনি ভাগ করে দিছে ৫০ হচ্ছে জুয়েলের, ২৫ আমাদের, আর ২৫ চঞ্চলের।
রাব্বানী : কত টাকা দিসে?

সাদ্দাম : আমাদেরকে বলসে ১ কোটি। আমরা বাকিটা আর জানিনা। ভাগ করে দিয়ে বলছে ৫০ জুয়েলের, ২৫ আমাদের আর ২৫ চঞ্চলের।
রাব্বানী : ম্যাডামই এভাবে ভাগ করে দিসে?
সাদ্দাম : হুম।

রাব্বানী : জুয়েল ভালো ছেলে এজন্য তাকে ৫০ আর চঞ্চল ক্যাম্পাসের বাইরে থাকে এজন্য তাকে ২৫।
সাদ্দাম : হ্যাঁ, চঞ্চল সে তো আমাদের বাদ দিতে পারে নাই, ঝামেলা এড়ানো জন্য বা আমাদেরকে ঠিক রাখার জন্য এটা করছে।
রাব্বানী : ভাগের টাকাই তোদেরকে দিসে।

সাদ্দাম : চঞ্চলের ওখান থেকে আমরা বলছি যে আমাদেরকে ২৫ পার্সেন্ট দেয়া লাগবে। মানে চঞ্চলের ২৫ পার্সেন্ট দিতে হবে ওর ভাগের, ওরে ফুল টাকা দেয়া যাবে না। আর পত্রিকার হিসাবটা হলো ভাই এক্সটা আলাদা করে ওদের ৬০ লাখ টাকা দিসে আমাদেরকে না জানাই, এটা হইতে পারে।

রাব্বানী : তোমাদেরকে না জানাইয়া দিসে, না?
সাদ্দাম : হ্যাঁ, আমরা এটা জানি না। আমরা ১ কোটির হিসাব জানি ভাই।
রাব্বানী : ঠিকাছে এখন ম্যাডাম যে আমাদের নাম জড়াইলো, এখানে আমাদের সম্পর্কে কোনো আইডিয়াই নাই, টাকার ব্যপারে কথা বলতেছে।
সাদ্দাম : ভাই উনি খুব নোংরামি করতেছে ভাই, ঠিকাছে, আপনারা ভাই সিদ্ধান্ত নেন কি করা লাগবে, আমরা করতেছি সমস্যা নাই ভাই।

রাব্বানী : না, তোমাদের কিছু করা লাগবে না। তোমরা সাইলেন্ট থাকো। এটা যেহেতু আপার কানে দিয়েছে.. আমিও বুঝতেছি যে নিজে সেভ হওয়ার জন্য, তার ফ্যামিলি সেভ করার জন্য এসব করতেছেন।
সাদ্দাম : হ্যাঁ… হ্যাঁ….

রাব্বানী : এই ছয়টা কাজ ডিল করছে কে? বেসিক্যালি ঠিকাদারদের সাথে এসব ডিল কে করছে?
সাদ্দাম : তার ছেলে, মূলত হচ্ছে তার ছেলে আর তার পিএস সানোয়ার ভাই আর হচ্ছে পিডি আর তার হাসবেন্ড। এই চার জন।

রাব্বানী : আগে থেকেই এই ছয়টা কোম্পানি রেডি করে রাখছে?
সাদ্দাম : হ্যাঁ ভাই, শুরু থেকেই তারা সব কিছু করছে, টেকনিক্যাল কমিটিতেও ভিসি ছিলো ভাই।

রাব্বানী : ও, টেকনিক্যাল কমিটিতেও ভিসি ছিলো? সাধারনত টেকনিক্যাল কমিটিতে তো ভিসি থাকতে পারে না। সেখানেও ছিলো?
সাদ্দাম : না থাকে না, সে ছিলো এবং সে হচ্ছে প্রথমে টেন্ডার জমা দেয়ার সময় সবাইকে ফেরত পাঠাই দিলো না? তখন আমরা বললাম সবাইকে টেন্ডার ড্রপ করতে দিতে হবে, তখন ড্রপ সবাইরে করাইসে বাট কাজ হচ্ছে সব নিজ হাতে করছে ভিসি। আর যখন হাসপাতালে ভর্তি হইসে ওইটা নাটক ছিলো। হাসপাতালে ভর্তি হইছে যেন তাকে কেউ প্রশ্নবিদ্ধ করতে না পারে।

রাব্বানী : ও আচ্ছা আচ্ছা, শিডিউল বিক্রির টাইমে সে হাসপাতালে ভর্তি হইসে ইচ্ছা করে?
সাদ্দাম : হ্যাঁ… হ্যাঁ…. ভাই।

রাব্বানী : আচ্ছা আমি তোর সাথে কথা বলবো পরে যদি প্রয়োজন হয়।’

এদিকে ফোনালাপের বিষয়ে জাবি ভিসি অধ্যাপক ফারজানা ইসলাম বলেন, ‘অডিওতে আমি টাকা দিয়েছি এমন গল্প ফাঁদছে। আমার সাথে টাকার কোন দেখা হইনি। এই মিথ্যাটা সত্য করার দায়িত্ব আমার না। ওরা করুক। আর ওরা তো বলতেই পারে। সাদ্দাম বলতে পারে রাব্বানীকে যে ভিসি আমাদেরকে টাকা দিলেন বলে আমরা টাকা পেলাম। রাব্বানীর যেহেতু পদ নেই এটা সে ষড়যন্ত্র থেকে এসব বলাতে পারে। কিন্তু নিশ্চিত থাকেন আমরা বাসায় কোন টাকা পয়সার কোন কথায় বলিনি, আনিওনি।’

[ প্রিয় পাঠক, আপনিও বিডিসারাদিন24 ডট কম অনলাইনের অংশ হয়ে উঠুন। লাইফস্টাইল, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, রান্নার রেসিপি, ফ্যাশন-রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন- bdsaradin24@gmail.com-এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে। নারীকন্ঠ এবং মত-দ্বিমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে  bdsaradin24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরণের দায় গ্রহণ করে না। ]

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 55 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ
bdsaradin24.com