রোজা মানে শুধু উপোস আর ইফতার পার্টি নয়

Print

আমার আম্মার ডালের বড়া আর ছোলা- মুড়ি প্রিয় ছিল বলে ইফতার আইটেম থেকে এটা কখনও বাদ পড়তো না, তবে সেটা অবশ্যই কম তেল-মসলা দিয়ে তৈরি করা হতো। ইফতার বলতে বাড়িতে ছোলা-মুড়ি আর দেশি ফলমূলকেই আমরা বুঝতাম। কিন্তু যখন থেকে কলোনাইসড খাবারের সংস্কৃতি বাণিজ্যিকীকরণ হলো অতিমাত্রায় তখন নিজের অজান্তেই কখন যেন স্রোতে গা ভাসাতে শুরু করলাম পুঁজিবাদী ইফতার ইন্ডাস্ট্রিতে!

১৯৯৭ -৯৮ সালের দিকে আমি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি, মনে পড়ে সেই সময়টাতে ধানমন্ডির বাণিজ্যিক ইফতার প্যাক এর ভীষণ জনপ্রিয়তা তৈরি হলো। ওগুলো না খেলে বড়লোকি দেখানোপনা টাইপ বন্ধুদের কাছে যেন আর ইজ্জত থাকে না, তাই পাল্লায় পড়ে সেসকল অস্বাস্থ্যকর, অহেতুক অর্থব্যয়ের কারখানাতে যেতে শুরু করলাম। মুখরোচক ইফতারি খাওয়ার লোভে আর সোশ্যাল স্ট্যাটাস বাড়াবার জন্য মনে পড়ে মোহাম্মদপুর থেকে বনানী, গুলশানেও গেছি অভিজাত বিপণির ইফতার পরখ করতে। ঢাকার নানা অভিজাত ইফতার কারখানার ইফতারের তালিকাতে যেখানে হালিম, দইবড়া, নানা ধরনের প্যাটিস, জিভে জল আনা হাজার ধরনের জানা-অজানা নামের তৈলাক্ত কাবাব, ১০ -১২ ধরনের অস্বাস্থ্যকর ভাজা পোড়া, মিষ্টি, জিলাপি, লাড্ডু, বাকলাভা, টার্কিশ কাদাইফ শোভা পেত।

আর সেই সাথে তেহারি, বিরিয়ানি, মোগলাই পরোটা, ভেলপুরি, নানা রংবেরঙের চোখ রাঙানো শরবত, বোরহানি, ফালুদা ইত্যাদি দেখার পর বাসায় তৈরি করা মায়ের হাতের ইফতার আর খেতে ইচ্ছে করতো না, মনটা পড়ে থাকতো ওই সকল মুখরোচক ইফতারের জন্য। আসলে চোখের খিদেটাই তখন বড় ছিল। আমরা ভাই-বোনেরা মজা করে প্রায়ই ওই সকল অভিজাত ইফতার গিলে সুখ পাবার চেষ্টা করতাম যা আব্বা-আম্মা পছন্দ করতেন না।

খেতেও প্রচুর নিষেধ করতেন কারণ সারা দিন রোজা রাখার পর এতো তৈলাক্ত সব খাবার স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর, অসুস্থ হয়ে যাবো সেকথা কে না জানে! কিন্তু কথা শুনতাম না। আজ উপলব্ধি করি তারা কত সাদামাটা কিন্তু আসল এবং সচেতন মানুষ ছিলেন! জীবন যাপনে ছিল সততা, লোভ করতেন না জাগতিক বিষয় নিয়ে, আর তাদের যাপিত জীবনে ছিল চোখে পড়বার মতো নির্লিপ্ততা। লোক দেখানোর বালাই ছিল না একদম, ভুরিভোজের আয়োজন তারা কখনোই ইফতারে করতেন না, আমরাও সেটা শিখেই বড় হয়েছিলাম।

আব্বা-আম্মা বুঝিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিলেন যে, ইফতারের বাণিজ্যিক ইন্ডাস্ট্রির কাস্টমার হতে পারার মধ্যে কোনো ক্রেডিট নেই, কারণ ধান্দাবাজ ব্যবসায়ীরা সাধারণ জনগণের ধর্মের সূক্ষ অনুভূতিকে নিয়ে ব্যবসা করে অধিক মুনাফা লাভের আশায়! তারা শিখিয়েছেন নিজেকে আলাদাভাবে সাদামাটা জগতের বাসিন্দা বানাতে পারলেই পরিতৃপ্তি আসবে মনে, সমাজের জন্যও তা সুফল বয়ে আনবে! মনের সংযম প্রথমত শুরু করতে হবে প্রয়োজনের অতিরিক্ত, অভিজাত বিপণির ইফতার খাওয়ার লোভ সামলেই! রসনা পূজা করবার জন্য সংযমের মাস নয়।

আজকাল মানুষ ইফতারে যত ধরনের চোখ ধাঁধানো মুখরোচক খাবার খাওয়ার সংস্কৃতি তৈরি করেছে সেসকল খাবারের নাম আমার দাদা বা আব্বা/আম্মার জানার তো প্রশ্নই আসে না, কারণ ওসব খাবার আমিও চিনি না এই প্রজন্মের প্রতিনিধি হয়ে! অবাক হয়ে যাই, যে রোজার অর্থ ‘সংযম’ সেখানে মানুষ উন্মাদ হয়ে পৃথিবীর সকল মানুষ যা খেতে পারবে তা সে একাই বাড়িতে বানাচ্ছে এক রাতের ইফতার পার্টিতে। আর মাসে ৩০ দিনের রোজায় দেখা যায় প্রায় ১৫-২০ দিনই ইফতার পার্টিতে অংশগ্রহণ করছে সমাজের একশ্রেণীর লোক, নারীরা নিত্যনতুন স্টাইলের সালোয়ার-কামিজ পড়তে ব্যস্ত প্রতিটি ইফতার পার্টিতে।

সকলের বন্ধুদের সাথে দেখা হচ্ছে, ভাব বিনিময়ের মাধ্যমে এক ধরনের ইতিবাচক মিথস্ক্রিয়া হয় ইফতার পার্টিগুলোতে সেটা আমি বুঝি এবং সমর্থনও করি। কিন্তু টেবিল ভরা এত্ত এত্ত ইফতার প্রদর্শন ও গোগ্রাসে এক নিমিষে তা ভক্ষণ করে ফেলা আর সকল খাবারের ছবি তুলে তা সোশ্যাল মিডিয়াতে দেখানোর ব্যাপারটা ঠিক বুঝি না। আবার এটাও দেখেছি, সমাজের কোন প্রতিপত্তিশালী ব্যক্তির সান্নিধ্যে ইফতার খেলো সেটাও জাহির করা নিয়ে মানুষ ব্যস্ত।

সারাদিন বাড়িতে অদৃশ্য শেঁকলে যে দাসকে সময়ে-অসময়ে খাটানো হলো বা অধঃস্থন কর্মচারীদের খাটানো হলো ইফতার তৈরি করবার জন্য, তারা আগে পেটভরে খেতে পারলো কিনা তা নিয়ে চিন্তা না করে নিজেই সকল ভালো ভালো টুকরাগুলো বা খাবারগুলো খেয়ে নিলে গৃহকর্তা হিসেবে তা যে চরম অসংযমী আচরণের আওতায় পড়ে তা নিয়ে আর কতদিন না ভেবে থাকবো আমরা?

আজও আমাদের দেশের গৃহ পরিচারিকাদের খাবারের স্থান রান্না ঘরের ফ্লোর, টিনের প্লেট, প্লাস্টিকের গ্লাস, ছেঁড়া কাঁথা-বালিশ, মশারি আর ঘুমাবার স্থানও রান্না ঘরই, অথচ গৃহিনী-গৃহকর্তা রোজা রাখছেন ৩০টি, নামাজ পড়ছেন ৫ ওয়াক্ত।

ইফতারকে কেন ‘পার্টি’ বলে তাতো আজও বুঝি না! শুনেছি আজকাল নাকি সেহরি পার্টিও করে অনেকে! ইফতার এবং সেহরি এগুলোতো প্রতিনদিনকার ধর্মীয় প্রার্থনা, তাহলে কি কোন একদিন শুনবো নামাজ পার্টি হচ্ছে? ইংরেজি পার্টি শব্দটা উৎসব এবং আনন্দ প্রকাশের বিভিন্ন অনুষ্ঠানকে বোঝাবার জন্য ব্যবহৃত হয় বলেই জানতাম। কিন্তু রোজা রাখাটা নিয়মিত নামাজ পড়বার মতোই একটা ফরজ ব্যাপার। সেখানে সমাজের মানুষকে ইফতার পার্টিতে নেমন্তন্ন দিয়ে জৌলুশ দেখানো চোখ ধাঁধানো, টেবিল উপচে পড়া ইফতার খাওয়ার সংস্কৃতি তৈরি হলো কেন ঘরে ঘরে ?

আমরা কখনো কি ভেবে দেখেছি যে সমাজের সবাই আমরা কম বেশি এই অধঃপতিত চর্চাগুলোর সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত যেখানে ধর্মের অন্তর্নিহিত শিক্ষা সংযমের কোনো বালাই নেই! জাতিগতভাবে যে পরিমাণ অসংযমী ইফতার পার্টি উদযাপন করা হয় রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে আর নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে তার দায় কিন্তু আমাদেরকেই নিতে হবে। এ ধরনের লোক দেখানো ইফতার পার্টি সমাজে অসমতা তৈরি করে, এ ধরনের অসংযত সামাজিক চর্চাগুলো সমাজে মানুষের মাঝে নানা ধরনের মানসিক দূরত্ব তৈরি করে এবং এক ধরনের প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশের মধ্যে ঠেলে দেয় মানুষকে নিজেদের অজান্তেই।

মুসলিমরা তাদের নিজস্ব অধঃপতনের সব দোষের ভার ইহুদি, নাসারা আর পশ্চিমা দেশগুলোকে চাপিয়ে দিয়ে নিজেদের দোষ ঢাকতে চেষ্টা করে। কিন্তু সত্যটা হলো- ইহুদি, নাসারারা বাংলাদেশে এসে আজকের অধঃপতিত প্রতিযোগিতামূলক সেহেরি আর ইফতার পার্টির প্রচলন করেনি ঘরে ঘরে। মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করা এই আমরাই মুসলিম কমিউনিটির সমর্থনে ঘরে ঘরে আমরা স্রোতে গা ভাসিয়ে এই অসম, অসংযমী ইফতার ভক্ষণের সংস্কৃতি তৈরি করেছি। আমি আপনি আমরা সকলে এই সামাজিক অসমতা তৈরিতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রতিনিয়ত অংশগ্রহণ করেছি এবং করছি। আমরা তা স্বীকার করি আর নাই করি- এটাই সত্য।

সত্যিকার ধর্মপ্রাণ পরিশীলিত, নির্লোভ, সংযমী আত্মার মানুষ আজ আর দেখি না কেন? সংযমের অর্থ ও তাৎপর্য আমরা মুসলিম ঘরে জন্ম নিয়ে, বেড়ে উঠে, সারা জীবন রোজা পালন করেও সংযমের অন্তর্নিহিত অর্থ জাতিগতভাবে বুঝি না কেন? রাষ্ট্রীয়ভাবে, জাতিগতভাবে জন্মের পর থেকেই ধর্মজ্ঞান ঘরে ঘরে প্রচার করা হয়, প্রাতিষ্ঠানিক উপায়ে ধর্ম স্কুল জীবন থেকে শেখাবার পরও আজ পৃথিবীর মুসলিমরা ধর্ম কেন বুঝে না এবং ধর্মের নামেই সকল অধর্ম কেন করে যাচ্ছে তা নিয়ে কি এখনো ভাববার সময় হয়নি?

আর কতদিন আমরা অর্থ না বুঝে, কনটেক্সট না জেনে, ব্যাখ্যা না বুঝে শুধু কোরআন খতম দিয়ে যাব! আর সংযম যে শুধু মাত্র রমজান মাসের জন্য নয়, তাই বা কেমন করে বুঝিয়ে বলি! সংযমের অনুশীলন করতে হবে জীবন চলার পথে প্রতিটি দিন, সংযম শুধু রমজান মাসে নয়, প্রতিটি ক্ষণ, জীবনের পড়তে পড়তে সংযম থাকতে হবে।

ওয়েস্টার্ন ওয়ার্ল্ড এ দেখেছি ক্রিসমাস এলে খাবারের দাম কমে যায় যাতে করে সকলের সামর্থের মধ্যে খাবারটা থাকে আর এখানে ধনীর খাবার আর গরিবের খাবারে এত আকাশ পাতাল পার্থক্য চোখে ধরা পড়ে না। অথচ আমাদের দেশে দেখেছি ব্যবসায়ীরা এই সংযমের মাসেই সবচেয়ে বেশি অনৈতিক কাজ করে এবং পণ্যমূল্য আকাশচুম্বি উর্দ্ধমুখী করে দেয়।

আমরা কেন লক্ষ লক্ষ ছিন্নমূল শিশুর কথা ভুলে যাই? কেন অনাহারী মানুষের কথা ভুলে যান? ধর্ম পালন মানে শুধুমাত্র জান্নাতের পাসপোর্ট অর্জন করা নয়, নিজের ভেতরের বিবেককে জাগ্রত করাটাই এর মূল লক্ষ্য। ধর্মীয় গ্রন্থে লুকিয়ে থাকা জ্ঞানকে উপলব্ধির অভাব, আত্মজাগৃতির দ্বারগুলোকে বন্ধ করে দিয়ে এবং ধর্মকে আধ্যাত্মিক বিষয় মনে না করে শুধুমাত্র পরকালের জন্য লোভ করা কোনো ধর্মেরই লক্ষ্য নয়।

ধর্মচর্চার নামে যদি সামাজিক অনাচার তৈরি হয় তাহলে তার বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে ধর্মের সম্মান বাঁচাবার স্বার্থেই। ধর্মচর্চার নামে সামাজিক অনাচার বন্ধের দায়িত্ব ঘর থেকেই নিতে হবে এবং ধর্মের নামে এই অসংযমী জীবন ব্যবস্থাকে রোধ করবার জন্য সচেতন হতে হবে প্রতিটি ঘরে ঘরে। নামাজ যেমন একটি একান্ত নিজস্ব প্রার্থনা তেমনি সারাদিন উপোস থাকার পর রোজা শেষ করে ইফতার করাটাও একটা প্রার্থনা। মাঝরাতে সেহরি করাটাও একটা প্রার্থনা।

প্রার্থনার সময় মানুষ অন্তর্দৃষ্টি জাগ্রত করে, ধ্যান করে সেখানে যদি এতো হৈচৈ, খাই দাই, হাপুস হুপুস করে নামাজ পড়া শেষ করে সেকেন্ড রাউন্ড মজাদার বিরিয়ানি খাওয়া নিয়ে ব্যস্ত থাকি তাহলেতো সেটা আর প্রার্থনা হলো না। সেটা হলো পার্টি মুড। অনেকে ইফতার মাহফিল শব্দটা আজকাল ব্যবহার করছেন, কিন্তু সেই মাহফিলও যদি পার্টি স্টাইলে উদযাপন করা হয় তাহলে সেই সমস্যাটা রয়েই গেলো।  মানুষ যেন শুধু উপাস না থাকে স্লিম হবার উদ্দেশ্যে , সত্যিকার সংযমের প্রার্থনাটা যেন একলা পড়ে থেকে বিব্রত না হয় সেদিকে নজর দিতে হবে।

সত্যিকার সংযমের বাণী যদি আমরা পৌঁছে দিতে পারি তাহলে অন্তত এই রোজার মাসে সমাজের খুন, ধর্ষণ, রাহাজানি, দুর্নীতি কিছুটা হলেও কমার কথা। সংযমের উদ্দেশ্য শুধু উপোস থাকা আর ঝাঁপিয়ে পড়ে ইফতার খাওয়া নয়। হিংসা, ঘৃণা, লোভ কমিয়ে সহিষ্ণুতা আর সহমর্মিতা বাড়ানো হচ্ছে প্রকৃত সংযমের লক্ষ্য। আশা করি এই সংযমের মাসে প্রভু আমাদের জ্ঞান দেবেন জাতিগত মূর্খতা ঘুচাবার জন্য এবং সংযমের অন্তর্নিহিত অর্থ উপলব্ধি করতে সহায়তা করবেন।

[ প্রিয় পাঠক, আপনিও বিডিসারাদিন24 ডট কম অনলাইনের অংশ হয়ে উঠুন। লাইফস্টাইল, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, রান্নার রেসিপি, ফ্যাশন-রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন- bdsaradin24@gmail.com-এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে। নারীকন্ঠ এবং মত-দ্বিমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে  bdsaradin24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরণের দায় গ্রহণ করে না। ]

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 168 বার)


Print
bdsaradin24.com