রাবি’র শিক্ষকের গালি সংস্কৃতির কবলে নারী !

Print

রুমানা বিনতে রেজাঃ

রাবির এক পুরুষ শিক্ষক রামেকের এক নারী ইন্টার্ন চলার পথে ধাক্কা খেল,ইন্টার্ন স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ায় ‘দেখে চলতে পারেন না?’ বললেন,এর উত্তর এলো ‘ইউ আর কিলিং মাই ফাকিং টাইম’,ইন্টার্ন ডাক্তারটি সবিস্ময়ে এর প্রতিবাদ করলেন,উত্তর এলো– ‘ফাক ইউ ফাকিং গার্ল’….এরপর নানাবিধ ঘটনা
অন্য ইন্টার্নরা এসে উক্ত শিক্ষককে ইন্টার্ন ডাক্তারের কাছে সরি বলতে বলায় তিনি অই মেয়েকে ‘খেয়ে দেয়ার’ ইচ্ছা প্রকাশ করেন।এরপর তাকে আটকে পিটুনি দেয়া হয়,পিটুনির বিরুদ্ধে তিনি এখনো মামলা করেননি,কিনতু রাবির ছাত্ররা গতকাল থেকে আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছেলেন (প্রস্তুতি এখনো শেষ হয় নি)।

আসুন,পাশের পাড়ার অই মাস্তান ছেলেটার কথা বলি,যে প্রতিদিন আপনার বোন স্কুলে যাওয়ার সময় শিষ বাজায়।একদিন বোনের হাত ধরল,বাসায় এসে বোনের কান্না,ভাই গিয়ে ব্যাপক উত্তমধ্যম দিয়ে এলো।ব্যাস সব ঠান্ডা।

কিংবা রঞ্জনার কথা মনে আছে?
তার উঠতি বয়সের নাছোড়বান্দা প্রেমিকের পাড়ায় ঢুকলে ঠ্যাং খোড়া করে দেয়ার কথা ছিল দাদাদের।
অই মাস্তান কিংবা রঞ্জনার প্রেমিক,বয়স হলো,ভার্সিটির টিচার হলেন,কিন্তু অভ্যাস বদলালো না।
নিজের হাসপাতালে ভর্তি মেয়েকে দেখতে এসে বিশেষ পরিস্থিতিতে আরেকজন মেয়েকে ‘ফাক করার’ অভিপ্রায় প্রকাশ করে ফেললেন।
এরপর সেই মেয়ে ফেসবুকে যখন স্ট্যাটাস দিল,ভার্সিটির স্টুডেন্টরা ইন্টার্ন মেয়েটির আইডিতে হামলে পরল।মেয়েটির ইনবক্স ভেসে গেল হাজার গালির বন্যায়,প্রায় সবাই গালি শেষ হলো তাকে বিছানায় নিয়ে গিয়ে শোয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করে (যেমনটি করেছেন তাদের শিক্ষক)।
#মেডিকেলের_মেয়ে শব্দটা গালি হিসেবে ব্যবহার শুরু হয়ে গেল।
তার দৈহিক সৌন্দর্য নিয়ে প্রশ্ন তুলে তাদের শিক্ষক যদি মেয়েটিকে বিছানায় নিয়ে শোন তবে তা হবে মেয়েটির সৌভাগ্য,এমন মতবাদ এলো।
কিন্তু সবচেয়ে ভয়ংকর যে তত্ত্বটি বেরিয়ে এলো, সেটি হলো অমুক স্যার খুবই অমায়িক,খুব ভাল,খুবই মহান,কিন্তু তিনি ক্লাসে প্রতিটা বাক্য ‘ফাক ইউ’ দিয়ে শুরু ও শেষ করেন,ক্লাসে মেয়েদের ‘বেইবি’ ও ‘বিচ’ বলেই সম্বোধন করেন।যেহেতু তার ছাত্র-ছাত্রীরা এতে অভ্যস্ত,তাই অই ইন্টার্ন ডাক্তারকে ‘ফাক ইউ’ বলা এমন কোন বিরাট অপরাধ না!!

সেদিন হাসপাতালে ভ্রমনের নিয়মকানুন শিরোনাম দিয়ে একটা স্ট্যাটাস দিয়েছিলাম,এখন মনে হচ্ছে তাতে এডিট করে ‘সামাজিক ভাষা ব্যবহার’ জাতীয় একটা প্যারা লেখা উচিৎ ছিল। আপনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়ে যদি কোন ব্যক্তির উপর তার-ই কর্মক্ষেত্রে অশালীন ভাষা ব্যবহার করেন এবং সেটিকে স্বাভাবিক মনে করেন,তবে জেনে রাখুন শিক্ষা আপনার জীবিকার উপকরণ হয়েছে শুধু,আদতে আপনি ভীষণভাবে অ-শিক্ষিত।

কর্মক্ষেত্রে নারীরা কতটা অনিরাপদ তা এই একটা ঘটনা দিয়ে বিচার করা যায়।
একজন বাসার বুয়া,একজন গার্মেন্টসকর্মী,একজন প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষিকা,একজন ডাক্তার,ইঞ্জিনিয়ার,বিভিন্ন অধিদপ্তর-অফিস-আদালতে-কর্মরত নারী–ট্যালি করে দেখুন সবার কি বিচিত্র অভিজ্ঞতা রয়েছে অফিস-হ্যারেশমেন্ট নিয়ে।
একজন কর্মজীবী মহিলা বাসে যাত্রী হিসেবে প্রতিদিন কিসের মধ্যে দিয়ে যান সে বলতে গেলে মহাভারত হয়ে যাবে।

মেন্টাল এসল্ট,ভার্বাল এসল্ট,ফিজিকাল এসল্ট–কতভাবেই না নিগৃহীত হতে হয় মেয়েদের।
এই ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন নয়।
কিন্তু এসবের কোন বিচার হয় না।
যে ছাত্ররা আজ তাদের শিক্ষক ইভ টিজিং করার পরেও তার পক্ষে কথা বলেন,এরাই আবার ব্যক্তিজীবনে একেকজন রঞ্জনাদের দাদা,সন্দেহ নেই!
অথচ ইন্টার্ন মেয়েটি ও তার সহপাঠীদের কাছে রঞ্জনার মতই,সেটা আবার তারা বেমালুম ভুলে গেছে!

মার খেতে খেতে, অসম্মানিত হতে হতে, কালো ব্যাজ-মানববন্ধন আর দুই মিনিটের নিরবতাকেন্দ্রিক এই মেরুদণ্ডহীন চিকিৎসক সমাজের সম্মান বলে আজ যা কিছু আছে তার ইজারা দেয়া আছে অই ইন্টার্ন বাচ্চাগুলোরই কাছেই।
এরা একটা ইভটিজারের শিক্ষক পরিচয় জেনেও যে দমে যায় নি,দু ঘা বসিয়ে তারপরে কথা বলেছে,এরজন্য আমি অন্তত তাদের কাছে কৃতজ্ঞ।
এই মারের ঘটনা আর দশটা ডাক্তারের বুকে সাহস আনুক,এর পরের বার হাসপাতালে এসে কোন নারী ডাক্তারকে কেউ ‘ফাক ইউ’ বলে গালি দিলে তার জিহবা টেনে ছিড়ে ফেলার সম্ভাবণা তৈরী হয়ে থাক।

যারা আইনের কথা বলবেন,তারা কর্মক্ষেত্রে কেন নারী ভার্বাল এসল্টের শিকার হবেন সেই হিসাবটুকু আগে বুঝিয়ে দিন আমাকে।
রাস্তায় আমি যখন বের হই,আমার মানসিক প্রস্তুতি থাকে যে আমার গায়ে কেউ ইচ্ছাকৃত হাত দিলে আগে আমি সেই হাত মচকে দিব,তারপরে কথা বলব।
আপনারা যারা ‘আচ্ছা হোক হোক,যা হয়েছে হয়ে গেছে’ বলে ব্যাপারটা ভুলে যেতে বলেন তারাই আদতে নারীদের কর্মক্ষেত্রে নিগৃহীত হওয়াকে প্রচ্ছন্ন মদদ দেন,সে আপনি স্বীকার করেন আর না-ই করেন।

লেখকঃরুমানা বিনতে রেজা

[ প্রিয় পাঠক, আপনিও বিডিসারাদিন24 ডট কম অনলাইনের অংশ হয়ে উঠুন। লাইফস্টাইল, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, রান্নার রেসিপি, ফ্যাশন-রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন- bdsaradin24@gmail.com-এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে। নারীকন্ঠ এবং মত-দ্বিমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে  bdsaradin24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরণের দায় গ্রহণ করে না। ]

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 152 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ
bdsaradin24.com