সবুজ বাংলাদেশ গড়তে চান সিরাজগঞ্জের বৃক্ষপ্রেমী আবুল হোসেন

Print

নাসিম আহমেদ রিয়াদঃ ১৬ কোটি বৃক্ষরোপন করে গিনেসরেকর্ড গড়তে সরকারের প্রতি আহবান বৃক্ষপ্রেমী আবুল হোসেনের।

ব্যক্তিগত সামাজিক দায়বদ্ধতামূলক কাজের অংশ হিসেবে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুকি মোকাবেলার আগাম প্রস্তুতি গ্রহণ, প্রকৃতির সৌন্দর্যবর্ধন,পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং সবুজ বাংলাদেশ গড়তে আজীবন মেয়াদী এক  ব্যতিক্রমী উদ্যোগ গ্রহণ করে নিজ এলাকায় হাজার হাজার সবুজ বৃক্ষ রোপন করে চলেছে এক বৃক্ষ প্রেমী।

গত আট বছর ধরে একটি জেলার শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, রাস্তা ও বিভিন্ন জনগুরুত্বপূর্ণ স্থানে বৃক্ষরোপন ও  একই সাথে শিক্ষার্থীদের বৃক্ষ রোপনে উৎসাহিত করতে আনুষ্ঠানিক ভাবে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে  শিক্ষার্থীদের মাঝে বিনামূল্যে গাছের চারা বিতরন  করে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। ইতিমধ্যে সে নিজের অর্থায়নে সিরাজগঞ্জের বিভিন্ন শিক্ষা,ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, রাস্তা,শহীদ মিনার সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্রায় ১০ হাজার বৃক্ষ রোপন ও চারা বিতরণ করেছেন।দরিদ্র পরিবার চালানোর পাশাপাশি  নিজের বেতনের কিছু জমানো টাকায় চলছে তার এই নীরব বৃক্ষ রোপন কর্মসূচি।

পরিবারের নানা অভাব অনাটনেও তার এ  বৃক্ষ রোপন কর্মসূচি কখনো থেমে যায়নি। বৃক্ষভক্ত এই ব্যক্তি হলেন সিরাজগঞ্জ উল্লাপাড়া উপজেলার বড়হর ইউনিয়নের ডেফলবাড়ি গ্রামের আবুল হোসেন।সে ডেফলবাড়ী গ্রামের ভূমিহীন দরিদ্র কৃষক আব্দুল কাদের ও সুগৃহিনী মালেকা বেগমের পুত্র। তার এই কর্মকান্ডের জন্য ইতিমধ্যে সে সকলের নিকট একজন বৃক্ষপ্রেমী হিসেবে পরিচিত। কেউ কেউ  তাকে বৃক্ষ পাগল, বৃক্ষবন্ধু, পরিবেশ যোদ্ধা,সাদা মনের মানুষও বলে ডাকেন।

সে বৈশ্বিক তাপমাত্রা, কার্বন নিঃসরণ, জলবায়ু পরিবর্তন ইত্যাদির ক্ষতির ব্যাপকতা রোধ করে আগামী প্রজন্মের বসবাসের উপযুক্ত পরিবেশ এবং সবুজ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে আবুল হোসেন এই বৃক্ষ রোপন বিপ্লব চালিয়ে যাচ্ছেন।তার রোপনকৃত এসব গাছের মধ্যে রয়েছে আম,
কাঠাল,নারিকেল,লিচু,কাজুবাদাম,জামরুল,
চালতা,কদবেল,জলপাই,আমরা,পেয়ারা,বকুল,মেহগনি,দেবদারু ইত্যাদি। একই সাথে সে গ্রামগঞ্জে-পেপে চারা,লাউ,কুমড়া,শসা, করলা,চিচিংগা, ঢেরস,লাল শাক, পুই শাক,মুলা শাক,সবুজ শাক ইত্যাদি সবজী বীজ বিতরন করেছে।

নিজের চাকুরীর ছুটির দু’দিন সে এই বৃক্ষ রোপন অভিযান কর্মকান্ড করে থাকে।এই সামাজিক কর্মকান্ড দেশের শীর্ষ দৈনিক ও টেলিভিশনে গুরুত্ব সহকারে প্রকাশিত ও  প্রচারিত হওয়ায় কোটি কোটি মানুষের নিকট সবুজ বাংলাদেশ গড়ার জন্য আবুল হোসেন এক উজ্জল দৃষ্টান্ত।

সিরাজগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপপরিচালক আরশেদ আলী জানান,আবুল হোসেন নিজ উদ্যাগ্যে এমন সামাজিক কর্মকান্ড করে সাদা মনের  মানুষের পরিচয় দিয়েছে। নিজের সংসারে অভাব থাকা সত্বেও বৃক্ষ প্রেমী  আবুল হোসেন প্রতিদিন নিজ অর্থায়নে বৃক্ষ রোপন করে  সবাইকে দেখিয়ে দিয়েছে ইচ্ছা থাকলে উপায় হয়।ইতিমধ্যে সে বাংলাদেশ একাডেমী অব এগ্রিকালচার ক্রেস্ট অব মেরিট ২০১৮ অর্জন করে সিরাজগঞ্জের গৌরব বয়ে এনেছে।ভবিষ্যতে সে তার কাজের জন্য আরো বড় পুরষ্কার ছিনিয়ে আনবে বলে আমি মনে করি।সারা দেশেই আবুল হোসেনের মত সেচ্ছাসেবী মানুষ তৈরি হলে বাংলাদেশ হতে পারে বিশ্বের রোল মডেল।

ভূমিহীন কৃষক পরিবারে জন্ম হওয়ায় অনেক পরিশ্রম করে লেখাপড়া করতে হয়েছে।বড়হর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জীবন টা একটু ভালো কাটলেও মাধ্যমিক বিদ্যালয় জীবন শেষ হয়েছে নানা উত্থানপতনের ভিতর দিয়ে।প্রাথমিক বিদ্যালয় পড়া অবস্থায়  ছুটি হলেই স্থানীয় হাট বাজারে বাদম বিক্রি করতেন।
বিশাল প্রতিকুলতা আর সীমাহীন অভাবের শিকারে ২০০০ সালে তার জীবনে নেমে আসে ঘোর অন্ধকার। বন্ধ হয়ে যায় লেখাপড়া।কারো কোন সহযোগিতা, পড়ালেখা করানোর আশ্বাস না পেয়ে হতাশ হয়ে ঘুরে বেড়ায় দেশের বিভিন্ন এলাকায়। বিশ টাকা ভাড়া দিয়ে গাড়ীর ছাদে বসে ঢাকায় গিয়ে একটি চায়ের দোকানেও কিছু দিন কাজ করেছেন।বাবা-মা ও বড়ভাইয়ের আশ্বাসে আবার ফিরে আসে বাড়িতে।অতঃপর ২০০১ সালে উল্লাপাড়া মার্চেন্ট পাইলট হাই স্কুলে নবম শ্রেনীতে ভর্তি হয়ে নতুন ভাবে শিক্ষাজীবন শুরু করেন আবুল হোসেন। ভেবেছিলেন এস.এস.সি পাস করলেই শেষ হবে শিক্ষাজীবন। কিন্তু অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও আল্লাহতালার অশেষ মেহেরবানিতে নিয়মিত পড়াশুনা করে বড়হর স্কুল এন্ড কলেজে থেকে এইচ.এস. সি পাস করে ভর্তি হলেন  জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে সিরাজগঞ্জ সরকারী কলেজে।২০১০ সালে এক্সিম ব্যাংক শিক্ষা বৃত্তি পেয়ে কিছুটা দূর হয় অভাব নামের দুর্ভিক্ষের। হিসাববিজ্ঞান বিষয়ে প্রথম শ্রেণি পেয়ে বি.বি. এস অনার্স কোর্স সম্পন্ন করে মাস্টার্স এ ভর্তি হয় ঢাকা কলেজে।সেখান থেকেও প্রথম শ্রেণি লাভ করে শেষ করেন শিক্ষাজীবন। দরিদ্র মা বাবার হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম,অনেকের সহযোগিতা, নিজের অদম্য ইচ্ছাশক্তি  ও কঠোর অধ্যয়ন আবুল হোসেনকে এনে দিয়েছে  ডেফলবাড়ী পূর্বপাড়ার প্রথম মাস্টার্স পাশ করার খেতাব।

২০১৩ সালে এক্সিম ব্যাংকে যোগদানের মাধ্যমে শুরু করে পেশাদারী কর্মজীবন। বর্তমানে সে এক্সিম ব্যাংক সিরাজগঞ্জ শাখায় কর্মরত আছে।ছোট বেলা থেকে তার ইচ্ছা ছিল যদি কখনো নিজ পায়ে দাঁড়ায় সে দেশ ও মানুষের কল্যাণে কিছু করবে। সেই তাগাদা থেকে সে চালিয়ে যাচ্ছে আজীবন মেয়াদী বৃক্ষ রোপন কর্মসূচি। তার মতে মানুষের জন্য বিনামূল্যে সবুজ নির্মল পরিবেশ গড়ার চেয়ে বড় কাজ আর নেই।একান্ত সাক্ষাতকারে
বৃক্ষ রোপন প্রসঙ্গে আবুল হোসেন জানান,বিগত ৮ বছর ধরে আমি সিরাজগঞ্জ জেলার  বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা,কবরস্থান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও জন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বৃক্ষরোপন ও শিক্ষার্থীদের মাঝে চারা বিতরণ করে  আসছি। এই কার্যক্রম করে  আমি অসংখ্য মানুষের ভালোবাসা পেয়েছি যা আমাকে উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত করেছে।

সরকার সহ সকলের সার্বিক সহযোগিতা পেলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সহ জনগুরুত্বপূর্ণ স্থানে বৃক্ষরোপন ও শিক্ষার্থীদের মাঝে চারা বিতরণের মাধ্যমে  সবুজ শ্যামল ও  সুন্দর  বাংলাদেশ  উপহার দিতে এবং বাংলাদেশকে বিশ্বের সবুজ রোল মডেল হিসেবে তুলে ধরতে জীবনের শেষদিন পর্যন্ত এমন কার্যক্রম চালিয়ে যাবো ইনশাআল্লাহ।একসাথে ষোল কোটি বৃক্ষরোপন করে বাংলাদেশকে  গিনেসরেকর্ড করতে সরকারের প্রতি আহবান জানিয়েছেন সিরাজগঞ্জের এই বৃক্ষবন্ধু আবুল হোসেন।

 

[ প্রিয় পাঠক, আপনিও বিডিসারাদিন24 ডট কম অনলাইনের অংশ হয়ে উঠুন। লাইফস্টাইল, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, রান্নার রেসিপি, ফ্যাশন-রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন- bdsaradin24@gmail.com-এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে। নারীকন্ঠ এবং মত-দ্বিমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে  bdsaradin24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরণের দায় গ্রহণ করে না। ]

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 265 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ
bdsaradin24.com